০৮:২৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ০৮ অগাস্ট ২০২৬
মাস্কের ভবিষ্যদ্বাণী ও নীতির দায়: এই সময়ের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন কি প্রযুক্তি, নাকি মানবিকতা? প্রাণীর ওপর পরীক্ষা বন্ধে আমেরিকার দুই দল একজোট, কিন্তু মানুষের চিকিৎসাবিজ্ঞানে নামছে কি বড় ঝুঁকি? মালয়েশিয়াকে ৮৯ রানে হারিয়ে বাংলাদেশের এইচপি দলের বড় জয় হাঙ্গুতে সেনা অভিযানে ক্যাপ্টেন শহীদ, নিহত ৭ ‘সন্ত্রাসী’ আশুলিয়ায় ছুটির মধ্যেই ৫৬৫ শ্রমিক ছাঁটাই, কার্যাদেশ ও গ্যাস সংকটে উৎপাদন ব্যাহত শিলাইদহ কুঠিবাড়ি পানিতে ডুবে, দর্শনার্থীদের ক্ষোভ: স্থায়ী নিষ্কাশন ব্যবস্থার দাবি নড়াইলে টানা বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় নষ্ট আউশ ধান, কৃষকের ক্ষতি কয়েক কোটি টাকা সাঘাটায় ছুরিকাঘাতে আহত জামায়াতকর্মীর ৪৮ দিন পর ঢাকার হাসপাতালে মৃত্যু দিল্লিতে শেখ হাসিনার বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন রিজভীর, ‘সরকারের অনুমতি ছাড়া আন্তর্জাতিক আয়োজন কীভাবে?’ সুদানের ভুলে যাওয়া যুদ্ধ: শান্তির জন্য এটাই কি শেষ সুযোগ?

যুক্তরাষ্ট্র-চীন দ্বন্দ্বে ফিলিপাইনের বিপজ্জনক পক্ষপাত: জাতীয় স্বার্থ কোথায়?

পররাষ্ট্রনীতিতে সবচেয়ে বড় ভুলগুলোর একটি হলো কোনো শক্তিধর দেশের প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং অন্য একটি দেশের প্রতি স্থায়ী বিরাগকে রাষ্ট্রীয় কৌশলের ভিত্তি বানিয়ে ফেলা। এতে একটি দেশ ধীরে ধীরে নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা হারায়। ফিলিপাইনের বর্তমান পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তানীতি সেই ঝুঁকির দিকেই এগোচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটন প্রায় আড়াই শতাব্দী আগে যে সতর্কতা উচ্চারণ করেছিলেন, তার মূল বক্তব্য ছিল অত্যন্ত সরল—একটি দেশের পররাষ্ট্রনীতি অন্য কোনো দেশের প্রতি আবেগ, আনুগত্য কিংবা বিদ্বেষ দিয়ে পরিচালিত হওয়া উচিত নয়। জাতীয় স্বার্থই হওয়া উচিত তার প্রধান মাপকাঠি।

ফিলিপাইনের বর্তমান অবস্থানকে সেই আলোকে দেখলে প্রশ্ন ওঠে, দেশটি কি নিজের কৌশলগত স্বাধীনতা ধরে রাখছে, নাকি যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে পড়ছে, যার ফলে ভবিষ্যতের সংঘাতে তার নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে?

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরতার ঝুঁকি

ওয়াশিংটনের সঙ্গে ফিলিপাইনের সামরিক সম্পর্ক সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দ্রুত গভীর হয়েছে। মার্কিন কর্মকর্তারা দুই দেশের পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তিকে বারবার ‘অটুট’ বা ‘লৌহদৃঢ়’ হিসেবে বর্ণনা করছেন। ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট ফার্দিনান্দ মার্কোস জুনিয়রও একই ভাষা গ্রহণ করেছেন।

কিন্তু কূটনীতিতে শব্দ কখনো কখনো বাস্তবতার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। একটি জোটকে যত বেশি স্থায়ী ও অবিচ্ছেদ্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, ততই সেই জোটের বাইরে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার রাজনৈতিক জায়গা সংকুচিত হয়।

২০২৩ সালের পর থেকে ফিলিপাইনে মার্কিন সামরিক উপস্থিতির সুযোগও বেড়েছে। Enhanced Defense Cooperation Agreement-এর আওতায় মার্কিন বাহিনীর ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত স্থাপনার সংখ্যা পাঁচ থেকে বেড়ে নয় হয়েছে। এর মধ্যে কাগায়ান ও ইসাবেলার মতো এমন এলাকাও রয়েছে, যেগুলোর অবস্থান তাইওয়ানকে ঘিরে সম্ভাব্য সামরিক সংঘাতের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

এখানেই মূল উদ্বেগ।

তাইওয়ান প্রণালিকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে সামরিক সংঘাত শুরু হলে ফিলিপাইন তার ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে সেই সংঘাতের বাইরে থাকতে পারবে কি না, সেটিই বড় প্রশ্ন। ফিলিপাইনের সরাসরি জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত নয় এমন একটি যুদ্ধে মার্কিন সামরিক অবকাঠামোর উপস্থিতির কারণে দেশটি অনিচ্ছায় জড়িয়ে পড়তে পারে।

এ ধরনের ঝুঁকি কেবল কল্পনাপ্রসূত নয়। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি থাকা দেশগুলো কীভাবে বৃহত্তর সংঘাতের কৌশলগত বাস্তবতায় জড়িয়ে পড়ে, সাম্প্রতিক ঘটনাবলি তার উদাহরণ দিয়েছে।

চীনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানও কি সমান বিপজ্জনক?

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার পাশাপাশি ফিলিপাইন চীনের প্রতি ক্রমেই কঠোর অবস্থান নিয়েছে। দক্ষিণ চীন সাগরে দুই দেশের ভূখণ্ড ও সামুদ্রিক অধিকার নিয়ে বিরোধ দীর্ঘদিনের। চীনা জাহাজের বাধাদান, জলকামান ব্যবহার এবং ফিলিপাইনের জাহাজকে বিতর্কিত এলাকায় প্রবেশে বাধা দেওয়ার মতো ঘটনা উত্তেজনা বাড়িয়েছে।

ফিলিপাইনের নিজের সার্বভৌম অধিকার ও অর্থনৈতিক অঞ্চলের দাবি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তিতে নিজের অধিকার রক্ষার চেষ্টা কোনোভাবেই ভুল নয়। কিন্তু একটি বৈধ দাবি প্রতিষ্ঠার সঙ্গে এমন এক রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি করার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে, যেখানে অন্য একটি দেশকে স্থায়ী শত্রু হিসেবে দেখানো হয়।

ফিলিপাইনের রাজনৈতিক বক্তব্যে সেই দ্বিতীয় প্রবণতাই ক্রমে শক্তিশালী হচ্ছে।

চীনের সঙ্গে বিরোধকে জাতীয়তাবাদী রাজনীতির প্রধান প্রতীকে পরিণত করলে সামরিক উত্তেজনা সহজেই রাজনৈতিক সাফল্যের হাতিয়ারে পরিণত হতে পারে। কিন্তু জাতীয়তাবাদী বক্তব্য দিয়ে তৈরি উত্তাপ যখন বাস্তব সামরিক সংঘাতের দিকে এগোয়, তখন তার মূল্য দিতে হয় অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও সাধারণ মানুষকে।

ইউক্রেনের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা

এখানে ইউক্রেনের উদাহরণটি গুরুত্বপূর্ণ। একটি বড় শক্তির সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অন্য একটি শক্তির কৌশলগত সমর্থনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে, ইউক্রেনের যুদ্ধ সেই প্রশ্ন সামনে এনেছে।

ইউক্রেনের পরিস্থিতি ফিলিপাইনের সঙ্গে হুবহু তুলনীয় নয়। দুই দেশের ইতিহাস, ভূগোল, সামরিক বাস্তবতা ও রাজনৈতিক পরিবেশ আলাদা। তবু একটি মৌলিক শিক্ষা এখানে প্রাসঙ্গিক—কোনো শক্তিধর দেশের ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার অংশ হয়ে যাওয়া আর নিজের জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় সেই শক্তির সঙ্গে সহযোগিতা করা এক বিষয় নয়।

ফিলিপাইন যদি যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে নিজের পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রীয় কাঠামো বানিয়ে ফেলে, তাহলে একসময় ওয়াশিংটনের কৌশলগত প্রয়োজন এবং ম্যানিলার জাতীয় স্বার্থের মধ্যে পার্থক্য করা কঠিন হয়ে যেতে পারে।

US-Philippines military ensemble tailored to stir up geopolitical tensions  - Global Times

এটাই সবচেয়ে বড় বিপদ।

চীনকে শত্রু না বানিয়েও নিজের অধিকার রক্ষা সম্ভব

ফিলিপাইনের চীনের সঙ্গে বিরোধ বাস্তব। স্প্র্যাটলি দ্বীপপুঞ্জ, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং স্কারবোরো শোল নিয়ে দুই দেশের অবস্থান ভিন্ন। অতীতে এসব বিরোধ সংঘর্ষের কাছাকাছি পরিস্থিতিও তৈরি করেছে।

কিন্তু বিরোধ থাকা মানেই সম্পর্কের অন্য সব দরজা বন্ধ করে দিতে হবে—এমন কোনো নিয়ম আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নেই।

বরং দীর্ঘমেয়াদি কূটনীতির সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি হলো এমন কিছু পথ খোলা রাখা, যা উত্তেজনা বাড়ার সময় সমঝোতার সুযোগ তৈরি করতে পারে। একটি দেশের সঙ্গে সামুদ্রিক বিরোধ থাকতে পারে, আবার একই সঙ্গে তার সঙ্গে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, পর্যটন, অবকাঠামো ও কূটনৈতিক যোগাযোগও চালু রাখা যেতে পারে।

ফিলিপাইন সেই ভারসাম্য হারাচ্ছে বলেই উদ্বেগের কারণ তৈরি হয়েছে।

চীনের সঙ্গে দেশটির মোট বাণিজ্য ২০২২ সালে ৮৬.৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল। পরবর্তী সময়ে তা ৬৯.৯ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। একই সময়ে চীন এখনো ফিলিপাইনের আমদানির সবচেয়ে বড় উৎস, মোট আমদানির ২৮.৬ শতাংশ যার কাছ থেকে আসে।

এই বাস্তবতাকে উপেক্ষা করা কঠিন।

ভূগোলও পররাষ্ট্রনীতির একটি বাস্তবতা। চীন ফিলিপাইনের পাশের দেশ। বিশ্বের অন্যতম বড় অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে তার গুরুত্বও বাড়ছে। ফলে রাজনৈতিক বিরোধ থাকা সত্ত্বেও বেইজিংয়ের সঙ্গে একটি কার্যকর সম্পর্ক বজায় রাখার প্রয়োজন ফিলিপাইনের জন্য অস্বীকার করার মতো নয়।

ভিয়েতনাম যে পথ দেখাচ্ছে

এই জায়গায় ভিয়েতনামের অভিজ্ঞতা ফিলিপাইনের জন্য বিশেষভাবে শিক্ষণীয়।

চীনের সঙ্গে ভিয়েতনামের বিরোধ ফিলিপাইনের তুলনায় কোনো অংশে কম গুরুতর নয়। দক্ষিণ চীন সাগরে ভূখণ্ড ও সামুদ্রিক অধিকার নিয়ে দুই দেশের দীর্ঘদিনের সংঘাত রয়েছে। অতীতে চীনের সঙ্গে সংঘর্ষে ভিয়েতনামের নৌসেনার সদস্যরাও প্রাণ হারিয়েছেন।

তবু হ্যানয় যুক্তরাষ্ট্রের দিকে সম্পূর্ণভাবে ঝুঁকে গিয়ে চীনকে মোকাবিলার পথ বেছে নেয়নি।

ভিয়েতনামের প্রতিরক্ষা নীতিতে ‘চারটি না’ নীতির মাধ্যমে সামরিক জোটে না যাওয়া, নিজের ভূখণ্ডে বিদেশি সামরিক ঘাঁটি না দেওয়া, এক দেশের বিরুদ্ধে অন্য দেশের সঙ্গে অবস্থান না নেওয়া এবং সামরিক শক্তি প্রয়োগ বা তার হুমকি থেকে বিরত থাকার নীতি তুলে ধরা হয়েছে।

এটি এক ধরনের কৌশলগত স্বাধীনতা।

ভিয়েতনাম ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ককে ‘সমন্বিত কৌশলগত অংশীদারত্বে’ উন্নীত করেছে। একই বছর চীনের সঙ্গেও সম্পর্কের নতুন কাঠামো তৈরি করেছে। অর্থাৎ হ্যানয় কোনো একটি শক্তিকে বেছে নিয়ে অন্যটিকে প্রত্যাখ্যান করেনি। বরং দুই শক্তির সঙ্গে সম্পর্ককে নিজের জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে আলাদা করে পরিচালনা করেছে।

এটিই ‘বাঁশ কূটনীতি’র মূল দর্শন—শিকড় শক্ত থাকবে, কিন্তু প্রয়োজন অনুযায়ী কৌশল নমনীয় থাকবে।

অর্থনীতিতে ভারসাম্যের বাস্তব ফল

ভিয়েতনামের এই নীতির অর্থনৈতিক ফলও উল্লেখযোগ্য। ২০২৫ সালে চীনের সঙ্গে দেশটির দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ২৯৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। অর্থাৎ চীনের সঙ্গে গুরুতর রাজনৈতিক ও সামুদ্রিক বিরোধ থাকা সত্ত্বেও ভিয়েতনাম অর্থনৈতিক সম্পর্ককে ধ্বংস হতে দেয়নি।

এখানেই ফিলিপাইনের জন্য বড় শিক্ষা রয়েছে।

পররাষ্ট্রনীতিতে আবেগের জায়গা থাকতেই পারে, কিন্তু রাষ্ট্রীয় নীতির কেন্দ্রবিন্দু হতে পারে না। কোনো দেশকে পছন্দ করা বা অপছন্দ করার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—কোন সম্পর্ক দেশের অর্থনীতি শক্তিশালী করছে, কোন সম্পর্ক নিরাপত্তা বাড়াচ্ছে এবং কোন সিদ্ধান্ত ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কৌশলগত বিকল্প খোলা রাখছে।

যুক্তরাষ্ট্র ফিলিপাইনের গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা অংশীদার। এই সম্পর্কের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার কারণ নেই। কিন্তু নিরাপত্তা সহযোগিতা আর কৌশলগত নির্ভরতা এক জিনিস নয়।

একইভাবে চীনের সঙ্গে বিরোধের অর্থ এই নয় যে বেইজিংয়ের সঙ্গে বাণিজ্য বা কূটনৈতিক যোগাযোগ পরিত্যাগ করতে হবে।

জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে নতুন ভারসাম্য

ফিলিপাইনের সামনে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হওয়া উচিত—তারা কি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে একজনকে বেছে নেবে, নাকি দুই শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালনা করে নিজেদের কৌশলগত স্বাধীনতা বজায় রাখবে?

দ্বিতীয় পথটি কঠিন। এতে রাজনৈতিক সাহস প্রয়োজন। কখনো যুক্তরাষ্ট্র অসন্তুষ্ট হতে পারে, কখনো চীনও চাপ সৃষ্টি করতে পারে। কিন্তু স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির মূল্যই হলো এই চাপ সামলানোর সক্ষমতা।

কোনো পরাশক্তিকে স্থায়ী বন্ধু এবং আরেক পরাশক্তিকে স্থায়ী শত্রু হিসেবে নির্ধারণ করে দিলে ছোট রাষ্ট্রের কূটনৈতিক বিকল্প দ্রুত সংকুচিত হয়ে যায়। অথচ শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা যত বাড়ে, ছোট ও মধ্যম শক্তির জন্য তত বেশি প্রয়োজন হয় ভারসাম্যপূর্ণ কৌশলের।

জর্জ ওয়াশিংটনের সতর্কতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা এখানেই। তিনি অন্যায়ের কাছে আত্মসমর্পণের পরামর্শ দেননি। তিনি বলেননি যে একটি দেশকে নিজের অধিকার রক্ষার চেষ্টা বন্ধ করতে হবে। তাঁর মূল বার্তা ছিল—পররাষ্ট্রনীতির চালিকাশক্তি যেন আবেগ না হয়।

ফিলিপাইনেরও তাই চীনকে ভয় বা ঘৃণা করে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার প্রয়োজন নেই। আবার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা থাকলেই চীনের সঙ্গে সংঘাতকে অনিবার্য করে তোলারও প্রয়োজন নেই।

নিজের সার্বভৌম অধিকার রক্ষা, সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক আইন ব্যবহার এবং একই সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক সচল রাখা—এই চারটি পথ একসঙ্গে অনুসরণ করা সম্ভব।

ভিয়েতনাম সেই সম্ভাবনার একটি বাস্তব উদাহরণ।

শেষ পর্যন্ত একটি দেশের পররাষ্ট্রনীতি কতটা সফল, তা নির্ধারিত হয় সে কত জোরে মিত্রের পক্ষে কথা বলছে বা প্রতিপক্ষকে কত কঠোর ভাষায় আক্রমণ করছে দিয়ে নয়। বরং নির্ধারিত হয়, সংকটের মুহূর্তে দেশটি কতটা স্বাধীনভাবে নিজের স্বার্থের পক্ষে সিদ্ধান্ত নিতে পারছে।

ফিলিপাইনের জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি সেই স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনা—যুক্তরাষ্ট্রের ছায়ায় হারিয়ে না গিয়ে এবং চীনের প্রতি স্থায়ী বিরাগে নিজেকে আটকে না রেখে।

কারণ পররাষ্ট্রনীতিতে সবচেয়ে নিরাপদ অবস্থান সবসময় সবচেয়ে শক্তিশালী দেশের পাশে দাঁড়ানো নয়; বরং এমন অবস্থান তৈরি করা, যেখানে কোনো শক্তিই একটি দেশকে নিজের কৌশলের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে না পারে।

এই সংস্করণটি মূল লেখার বৌদ্ধিক কাঠামো ও তথ্যভিত্তিক যুক্তি ধরে নতুন ভাষা, বিন্যাস ও বিশ্লেষণধারায় লেখা হয়েছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

মাস্কের ভবিষ্যদ্বাণী ও নীতির দায়: এই সময়ের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন কি প্রযুক্তি, নাকি মানবিকতা?

যুক্তরাষ্ট্র-চীন দ্বন্দ্বে ফিলিপাইনের বিপজ্জনক পক্ষপাত: জাতীয় স্বার্থ কোথায়?

০৭:১০:৪১ অপরাহ্ন, শনিবার, ৮ অগাস্ট ২০২৬

পররাষ্ট্রনীতিতে সবচেয়ে বড় ভুলগুলোর একটি হলো কোনো শক্তিধর দেশের প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং অন্য একটি দেশের প্রতি স্থায়ী বিরাগকে রাষ্ট্রীয় কৌশলের ভিত্তি বানিয়ে ফেলা। এতে একটি দেশ ধীরে ধীরে নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা হারায়। ফিলিপাইনের বর্তমান পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তানীতি সেই ঝুঁকির দিকেই এগোচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটন প্রায় আড়াই শতাব্দী আগে যে সতর্কতা উচ্চারণ করেছিলেন, তার মূল বক্তব্য ছিল অত্যন্ত সরল—একটি দেশের পররাষ্ট্রনীতি অন্য কোনো দেশের প্রতি আবেগ, আনুগত্য কিংবা বিদ্বেষ দিয়ে পরিচালিত হওয়া উচিত নয়। জাতীয় স্বার্থই হওয়া উচিত তার প্রধান মাপকাঠি।

ফিলিপাইনের বর্তমান অবস্থানকে সেই আলোকে দেখলে প্রশ্ন ওঠে, দেশটি কি নিজের কৌশলগত স্বাধীনতা ধরে রাখছে, নাকি যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে পড়ছে, যার ফলে ভবিষ্যতের সংঘাতে তার নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে?

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরতার ঝুঁকি

ওয়াশিংটনের সঙ্গে ফিলিপাইনের সামরিক সম্পর্ক সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দ্রুত গভীর হয়েছে। মার্কিন কর্মকর্তারা দুই দেশের পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তিকে বারবার ‘অটুট’ বা ‘লৌহদৃঢ়’ হিসেবে বর্ণনা করছেন। ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট ফার্দিনান্দ মার্কোস জুনিয়রও একই ভাষা গ্রহণ করেছেন।

কিন্তু কূটনীতিতে শব্দ কখনো কখনো বাস্তবতার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। একটি জোটকে যত বেশি স্থায়ী ও অবিচ্ছেদ্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, ততই সেই জোটের বাইরে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার রাজনৈতিক জায়গা সংকুচিত হয়।

২০২৩ সালের পর থেকে ফিলিপাইনে মার্কিন সামরিক উপস্থিতির সুযোগও বেড়েছে। Enhanced Defense Cooperation Agreement-এর আওতায় মার্কিন বাহিনীর ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত স্থাপনার সংখ্যা পাঁচ থেকে বেড়ে নয় হয়েছে। এর মধ্যে কাগায়ান ও ইসাবেলার মতো এমন এলাকাও রয়েছে, যেগুলোর অবস্থান তাইওয়ানকে ঘিরে সম্ভাব্য সামরিক সংঘাতের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

এখানেই মূল উদ্বেগ।

তাইওয়ান প্রণালিকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে সামরিক সংঘাত শুরু হলে ফিলিপাইন তার ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে সেই সংঘাতের বাইরে থাকতে পারবে কি না, সেটিই বড় প্রশ্ন। ফিলিপাইনের সরাসরি জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত নয় এমন একটি যুদ্ধে মার্কিন সামরিক অবকাঠামোর উপস্থিতির কারণে দেশটি অনিচ্ছায় জড়িয়ে পড়তে পারে।

এ ধরনের ঝুঁকি কেবল কল্পনাপ্রসূত নয়। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি থাকা দেশগুলো কীভাবে বৃহত্তর সংঘাতের কৌশলগত বাস্তবতায় জড়িয়ে পড়ে, সাম্প্রতিক ঘটনাবলি তার উদাহরণ দিয়েছে।

চীনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানও কি সমান বিপজ্জনক?

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার পাশাপাশি ফিলিপাইন চীনের প্রতি ক্রমেই কঠোর অবস্থান নিয়েছে। দক্ষিণ চীন সাগরে দুই দেশের ভূখণ্ড ও সামুদ্রিক অধিকার নিয়ে বিরোধ দীর্ঘদিনের। চীনা জাহাজের বাধাদান, জলকামান ব্যবহার এবং ফিলিপাইনের জাহাজকে বিতর্কিত এলাকায় প্রবেশে বাধা দেওয়ার মতো ঘটনা উত্তেজনা বাড়িয়েছে।

ফিলিপাইনের নিজের সার্বভৌম অধিকার ও অর্থনৈতিক অঞ্চলের দাবি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তিতে নিজের অধিকার রক্ষার চেষ্টা কোনোভাবেই ভুল নয়। কিন্তু একটি বৈধ দাবি প্রতিষ্ঠার সঙ্গে এমন এক রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি করার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে, যেখানে অন্য একটি দেশকে স্থায়ী শত্রু হিসেবে দেখানো হয়।

ফিলিপাইনের রাজনৈতিক বক্তব্যে সেই দ্বিতীয় প্রবণতাই ক্রমে শক্তিশালী হচ্ছে।

চীনের সঙ্গে বিরোধকে জাতীয়তাবাদী রাজনীতির প্রধান প্রতীকে পরিণত করলে সামরিক উত্তেজনা সহজেই রাজনৈতিক সাফল্যের হাতিয়ারে পরিণত হতে পারে। কিন্তু জাতীয়তাবাদী বক্তব্য দিয়ে তৈরি উত্তাপ যখন বাস্তব সামরিক সংঘাতের দিকে এগোয়, তখন তার মূল্য দিতে হয় অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও সাধারণ মানুষকে।

ইউক্রেনের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা

এখানে ইউক্রেনের উদাহরণটি গুরুত্বপূর্ণ। একটি বড় শক্তির সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অন্য একটি শক্তির কৌশলগত সমর্থনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে, ইউক্রেনের যুদ্ধ সেই প্রশ্ন সামনে এনেছে।

ইউক্রেনের পরিস্থিতি ফিলিপাইনের সঙ্গে হুবহু তুলনীয় নয়। দুই দেশের ইতিহাস, ভূগোল, সামরিক বাস্তবতা ও রাজনৈতিক পরিবেশ আলাদা। তবু একটি মৌলিক শিক্ষা এখানে প্রাসঙ্গিক—কোনো শক্তিধর দেশের ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার অংশ হয়ে যাওয়া আর নিজের জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় সেই শক্তির সঙ্গে সহযোগিতা করা এক বিষয় নয়।

ফিলিপাইন যদি যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে নিজের পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রীয় কাঠামো বানিয়ে ফেলে, তাহলে একসময় ওয়াশিংটনের কৌশলগত প্রয়োজন এবং ম্যানিলার জাতীয় স্বার্থের মধ্যে পার্থক্য করা কঠিন হয়ে যেতে পারে।

US-Philippines military ensemble tailored to stir up geopolitical tensions  - Global Times

এটাই সবচেয়ে বড় বিপদ।

চীনকে শত্রু না বানিয়েও নিজের অধিকার রক্ষা সম্ভব

ফিলিপাইনের চীনের সঙ্গে বিরোধ বাস্তব। স্প্র্যাটলি দ্বীপপুঞ্জ, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং স্কারবোরো শোল নিয়ে দুই দেশের অবস্থান ভিন্ন। অতীতে এসব বিরোধ সংঘর্ষের কাছাকাছি পরিস্থিতিও তৈরি করেছে।

কিন্তু বিরোধ থাকা মানেই সম্পর্কের অন্য সব দরজা বন্ধ করে দিতে হবে—এমন কোনো নিয়ম আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নেই।

বরং দীর্ঘমেয়াদি কূটনীতির সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি হলো এমন কিছু পথ খোলা রাখা, যা উত্তেজনা বাড়ার সময় সমঝোতার সুযোগ তৈরি করতে পারে। একটি দেশের সঙ্গে সামুদ্রিক বিরোধ থাকতে পারে, আবার একই সঙ্গে তার সঙ্গে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, পর্যটন, অবকাঠামো ও কূটনৈতিক যোগাযোগও চালু রাখা যেতে পারে।

ফিলিপাইন সেই ভারসাম্য হারাচ্ছে বলেই উদ্বেগের কারণ তৈরি হয়েছে।

চীনের সঙ্গে দেশটির মোট বাণিজ্য ২০২২ সালে ৮৬.৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল। পরবর্তী সময়ে তা ৬৯.৯ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। একই সময়ে চীন এখনো ফিলিপাইনের আমদানির সবচেয়ে বড় উৎস, মোট আমদানির ২৮.৬ শতাংশ যার কাছ থেকে আসে।

এই বাস্তবতাকে উপেক্ষা করা কঠিন।

ভূগোলও পররাষ্ট্রনীতির একটি বাস্তবতা। চীন ফিলিপাইনের পাশের দেশ। বিশ্বের অন্যতম বড় অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে তার গুরুত্বও বাড়ছে। ফলে রাজনৈতিক বিরোধ থাকা সত্ত্বেও বেইজিংয়ের সঙ্গে একটি কার্যকর সম্পর্ক বজায় রাখার প্রয়োজন ফিলিপাইনের জন্য অস্বীকার করার মতো নয়।

ভিয়েতনাম যে পথ দেখাচ্ছে

এই জায়গায় ভিয়েতনামের অভিজ্ঞতা ফিলিপাইনের জন্য বিশেষভাবে শিক্ষণীয়।

চীনের সঙ্গে ভিয়েতনামের বিরোধ ফিলিপাইনের তুলনায় কোনো অংশে কম গুরুতর নয়। দক্ষিণ চীন সাগরে ভূখণ্ড ও সামুদ্রিক অধিকার নিয়ে দুই দেশের দীর্ঘদিনের সংঘাত রয়েছে। অতীতে চীনের সঙ্গে সংঘর্ষে ভিয়েতনামের নৌসেনার সদস্যরাও প্রাণ হারিয়েছেন।

তবু হ্যানয় যুক্তরাষ্ট্রের দিকে সম্পূর্ণভাবে ঝুঁকে গিয়ে চীনকে মোকাবিলার পথ বেছে নেয়নি।

ভিয়েতনামের প্রতিরক্ষা নীতিতে ‘চারটি না’ নীতির মাধ্যমে সামরিক জোটে না যাওয়া, নিজের ভূখণ্ডে বিদেশি সামরিক ঘাঁটি না দেওয়া, এক দেশের বিরুদ্ধে অন্য দেশের সঙ্গে অবস্থান না নেওয়া এবং সামরিক শক্তি প্রয়োগ বা তার হুমকি থেকে বিরত থাকার নীতি তুলে ধরা হয়েছে।

এটি এক ধরনের কৌশলগত স্বাধীনতা।

ভিয়েতনাম ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ককে ‘সমন্বিত কৌশলগত অংশীদারত্বে’ উন্নীত করেছে। একই বছর চীনের সঙ্গেও সম্পর্কের নতুন কাঠামো তৈরি করেছে। অর্থাৎ হ্যানয় কোনো একটি শক্তিকে বেছে নিয়ে অন্যটিকে প্রত্যাখ্যান করেনি। বরং দুই শক্তির সঙ্গে সম্পর্ককে নিজের জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে আলাদা করে পরিচালনা করেছে।

এটিই ‘বাঁশ কূটনীতি’র মূল দর্শন—শিকড় শক্ত থাকবে, কিন্তু প্রয়োজন অনুযায়ী কৌশল নমনীয় থাকবে।

অর্থনীতিতে ভারসাম্যের বাস্তব ফল

ভিয়েতনামের এই নীতির অর্থনৈতিক ফলও উল্লেখযোগ্য। ২০২৫ সালে চীনের সঙ্গে দেশটির দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ২৯৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। অর্থাৎ চীনের সঙ্গে গুরুতর রাজনৈতিক ও সামুদ্রিক বিরোধ থাকা সত্ত্বেও ভিয়েতনাম অর্থনৈতিক সম্পর্ককে ধ্বংস হতে দেয়নি।

এখানেই ফিলিপাইনের জন্য বড় শিক্ষা রয়েছে।

পররাষ্ট্রনীতিতে আবেগের জায়গা থাকতেই পারে, কিন্তু রাষ্ট্রীয় নীতির কেন্দ্রবিন্দু হতে পারে না। কোনো দেশকে পছন্দ করা বা অপছন্দ করার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—কোন সম্পর্ক দেশের অর্থনীতি শক্তিশালী করছে, কোন সম্পর্ক নিরাপত্তা বাড়াচ্ছে এবং কোন সিদ্ধান্ত ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কৌশলগত বিকল্প খোলা রাখছে।

যুক্তরাষ্ট্র ফিলিপাইনের গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা অংশীদার। এই সম্পর্কের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার কারণ নেই। কিন্তু নিরাপত্তা সহযোগিতা আর কৌশলগত নির্ভরতা এক জিনিস নয়।

একইভাবে চীনের সঙ্গে বিরোধের অর্থ এই নয় যে বেইজিংয়ের সঙ্গে বাণিজ্য বা কূটনৈতিক যোগাযোগ পরিত্যাগ করতে হবে।

জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে নতুন ভারসাম্য

ফিলিপাইনের সামনে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হওয়া উচিত—তারা কি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে একজনকে বেছে নেবে, নাকি দুই শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালনা করে নিজেদের কৌশলগত স্বাধীনতা বজায় রাখবে?

দ্বিতীয় পথটি কঠিন। এতে রাজনৈতিক সাহস প্রয়োজন। কখনো যুক্তরাষ্ট্র অসন্তুষ্ট হতে পারে, কখনো চীনও চাপ সৃষ্টি করতে পারে। কিন্তু স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির মূল্যই হলো এই চাপ সামলানোর সক্ষমতা।

কোনো পরাশক্তিকে স্থায়ী বন্ধু এবং আরেক পরাশক্তিকে স্থায়ী শত্রু হিসেবে নির্ধারণ করে দিলে ছোট রাষ্ট্রের কূটনৈতিক বিকল্প দ্রুত সংকুচিত হয়ে যায়। অথচ শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা যত বাড়ে, ছোট ও মধ্যম শক্তির জন্য তত বেশি প্রয়োজন হয় ভারসাম্যপূর্ণ কৌশলের।

জর্জ ওয়াশিংটনের সতর্কতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা এখানেই। তিনি অন্যায়ের কাছে আত্মসমর্পণের পরামর্শ দেননি। তিনি বলেননি যে একটি দেশকে নিজের অধিকার রক্ষার চেষ্টা বন্ধ করতে হবে। তাঁর মূল বার্তা ছিল—পররাষ্ট্রনীতির চালিকাশক্তি যেন আবেগ না হয়।

ফিলিপাইনেরও তাই চীনকে ভয় বা ঘৃণা করে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার প্রয়োজন নেই। আবার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা থাকলেই চীনের সঙ্গে সংঘাতকে অনিবার্য করে তোলারও প্রয়োজন নেই।

নিজের সার্বভৌম অধিকার রক্ষা, সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক আইন ব্যবহার এবং একই সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক সচল রাখা—এই চারটি পথ একসঙ্গে অনুসরণ করা সম্ভব।

ভিয়েতনাম সেই সম্ভাবনার একটি বাস্তব উদাহরণ।

শেষ পর্যন্ত একটি দেশের পররাষ্ট্রনীতি কতটা সফল, তা নির্ধারিত হয় সে কত জোরে মিত্রের পক্ষে কথা বলছে বা প্রতিপক্ষকে কত কঠোর ভাষায় আক্রমণ করছে দিয়ে নয়। বরং নির্ধারিত হয়, সংকটের মুহূর্তে দেশটি কতটা স্বাধীনভাবে নিজের স্বার্থের পক্ষে সিদ্ধান্ত নিতে পারছে।

ফিলিপাইনের জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি সেই স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনা—যুক্তরাষ্ট্রের ছায়ায় হারিয়ে না গিয়ে এবং চীনের প্রতি স্থায়ী বিরাগে নিজেকে আটকে না রেখে।

কারণ পররাষ্ট্রনীতিতে সবচেয়ে নিরাপদ অবস্থান সবসময় সবচেয়ে শক্তিশালী দেশের পাশে দাঁড়ানো নয়; বরং এমন অবস্থান তৈরি করা, যেখানে কোনো শক্তিই একটি দেশকে নিজের কৌশলের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে না পারে।

এই সংস্করণটি মূল লেখার বৌদ্ধিক কাঠামো ও তথ্যভিত্তিক যুক্তি ধরে নতুন ভাষা, বিন্যাস ও বিশ্লেষণধারায় লেখা হয়েছে।