০৮:০৬ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ০৯ অগাস্ট ২০২৬
ডেমোক্র্যাটদের আসল সংকট অর্থনীতি নয়, সংস্কৃতি ও জনমানস নিয়ন্ত্রণ নয়, রাজনৈতিক বাজি: ট্রাম্পের ইয়েন নীতির আসল হিসাব হাসিনার নির্দেশেই সালাহউদ্দিন আহমদকে গুম, টিএফআই সেলে নির্যাতনের তদন্তে চাঞ্চল্যকর তথ্য মোদি-যোগী বৈঠকে ২০২৭ উত্তরপ্রদেশ নির্বাচন: অযোধ্যা, পরীক্ষার ফাঁস ও তরুণদের ক্ষোভে চাপে বিজেপি ইরান যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজছেন ট্রাম্পের শীর্ষ জেনারেল, বড় হামলা নিয়ে মার্কিন প্রশাসনে উদ্বেগ ইরানের হামলায় হরমুজ প্রণালিতে ট্যাংকারে আগুন, ওমানের সঙ্গে চুক্তি চূড়ান্তের পথে ভারতে ইউপিআই লেনদেন থাকবে বিনা খরচে, সীমিত ব্যবসায়িক পেমেন্টে বসতে পারে নামমাত্র ফি ‘ডিগ্রির কোনো মূল্য নেই’ ভারতে, তরুণদের ‘দুঃখ-তথ্য-সম্পদ’ নিয়ে রাহুল গান্ধীর বিস্ফোরক বক্তব্য চীনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দাপট, মানুষের চাকরি কি রোবটের দখলে যাচ্ছে? হাসিনাকে আশ্রয় দিয়ে ভারতের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হবে: ইসলামী আন্দোলন নেতা

ডেমোক্র্যাটদের আসল সংকট অর্থনীতি নয়, সংস্কৃতি ও জনমানস

মার্কিন ডেমোক্র্যাটিক পার্টি এখন এমন এক রাজনৈতিক সমস্যার মুখোমুখি, যার সমাধান শুধু আরও বেশি অর্থনৈতিক সুবিধা, ধনীদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর বক্তব্য কিংবা কল্যাণমূলক কর্মসূচি বাড়ানোর মধ্যে নেই। দলটির বড় দুর্বলতা অর্থনৈতিক নীতিতে নয়; বরং আমেরিকার একটি বড় অংশের ভোটারের সঙ্গে সংস্কৃতি, সামাজিক মূল্যবোধ এবং দৈনন্দিন নিরাপত্তার প্রশ্নে তৈরি হওয়া দূরত্বে।

মিশিগানের সাম্প্রতিক সিনেট প্রাইমারি সেই দ্বন্দ্বকে খুব স্পষ্ট করে তুলেছে। প্রগতিশীল রাজনীতিক আবদুল এল-সাইয়েদের জয় দেখিয়েছে, ডেমোক্র্যাটদের প্রাইমারি ভোটারদের মধ্যে বামঘেঁষা রাজনীতির যথেষ্ট প্রাণশক্তি রয়েছে। কিন্তু তাঁর সমর্থনের বড় অংশ এসেছে উচ্চশিক্ষিত এলাকা ও বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক শহরগুলো থেকে। বিপরীতে তুলনামূলক মধ্যপন্থী হ্যালি স্টিভেন্স অনেক গ্রামীণ ও নিম্নআয়ের এলাকায় ভালো করেছেন।

অর্থাৎ ডেমোক্র্যাটদের সামনে মৌলিক দ্বন্দ্বটি হলো—দলের সবচেয়ে সক্রিয় অংশটি যেখানে রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে উচ্ছ্বসিত, সাধারণ নির্বাচনে জিততে প্রয়োজনীয় ভোটারদের একটি বড় অংশ সেখানে নেই।

অর্থনৈতিক জনপ্রিয়তার ভুল ঠিকানা

ডেমোক্র্যাটদের একটি শক্তিশালী ধারণা হলো, শ্রমজীবী ভোটারদের হারানো সমাধান করতে হলে অর্থনৈতিকভাবে আরও বামদিকে যেতে হবে। ধনকুবেরদের বিরুদ্ধে আক্রমণ, বড় সামাজিক সুবিধা, সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা কিংবা সম্পদের ওপর বেশি কর—এসব নীতির মাধ্যমে শ্রমিক শ্রেণিকে আবার দলের দিকে ফেরানো যাবে, এমন আশা দীর্ঘদিন ধরে রয়েছে।

কিন্তু বাস্তবতা এই ধারণাকে খুব সহজে সমর্থন করে না।

পিউ রিসার্চ সেন্টারের জরিপে দেখা যায়, ডেমোক্র্যাটদের মধ্যেই কলেজশিক্ষিতদের ৪১ শতাংশ নিজেদের ‘ডেমোক্র্যাটিক সোশ্যালিস্ট’ বলা রাজনীতিকদের পছন্দ করেন। কলেজ ডিগ্রিবিহীন ডেমোক্র্যাটদের ক্ষেত্রে এই হার ২৬ শতাংশ। একইভাবে উচ্চআয়ের ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে এ ধরনের রাজনীতির প্রতি সমর্থন ৪০ শতাংশ, যেখানে নিম্নআয়ের ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে তা ২৪ শতাংশ।

অর্থাৎ যে রাজনৈতিক ভাষাকে শ্রমজীবী আমেরিকানদের কাছে আকর্ষণীয় বলে মনে করা হচ্ছে, সেটির প্রতি তুলনামূলক বেশি আগ্রহ দেখা যাচ্ছে শিক্ষিত ও সচ্ছল ডেমোক্র্যাটদের মধ্যেই।

জো বাইডেনের সময়কার অভিজ্ঞতাও গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর প্রশাসন অবকাঠামো, কারখানা, পরিচ্ছন্ন জ্বানি ও সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনে বিপুল সরকারি বিনিয়োগ করেছে। এর উল্লেখযোগ্য অংশ গেছে এমন সব এলাকাতেও, যেগুলো সাধারণত রিপাবলিকানদের ভোট দেয়। তবু ২০২৪ সালের নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্প কলেজ ডিগ্রিবিহীন ভোটার এবং বছরে ৫০ হাজার ডলারের কম আয় করা ভোটারদের মধ্যে জয় পান। শ্রমজীবী কৃষ্ণাঙ্গ ও হিস্পানিক ভোটারদের মধ্যেও তাঁর সমর্থন বেড়েছে।

এখানে একটি অস্বস্তিকর সত্য আছে। গত তিন দশকে ডেমোক্র্যাটরা অর্থনৈতিক নীতিতে ধীরে ধীরে বামদিকে সরে গেছে। বিল ক্লিনটনের তুলনায় বারাক ওবামা ছিলেন বামঘেঁষা, আর ওবামার তুলনায় বাইডেন আরও বেশি বামমুখী। কিন্তু একই সময়ে শ্রমজীবী শ্রেণির একটি বড় অংশ দলটি থেকে ক্রমাগত দূরে সরে গেছে।

তাই সমস্যাটি অর্থনীতিকে গুরুত্ব না দেওয়ার নয়। বরং প্রশ্ন হলো, ডেমোক্র্যাটরা কোন জায়গায় ভোটারদের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে।

যে বিষয়গুলো ভোটারের কাছে সরাসরি অনুভূত হয়

স্বাস্থ্যসেবা, জীবনযাত্রার ব্যয় কিংবা সামাজিক নিরাপত্তার মতো অর্থনৈতিক ইস্যুতে ডেমোক্র্যাটরা এখনো অনেক ক্ষেত্রে রিপাবলিকানদের চেয়ে এগিয়ে। কিন্তু ভোটারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত কেবল আয় বা করের হিসাব দিয়ে তৈরি হয় না। নিরাপত্তা, সীমান্ত, অভিবাসন, অপরাধ এবং সামাজিক পরিচয়—এসব বিষয়ও মানুষের রাজনৈতিক অনুভূতিতে গভীর প্রভাব ফেলে।

Democracy without choice – or just 'the economy, stupid'? Political support  during the Eurozone crisis - Euro Crisis in the Press

এখানেই ডেমোক্র্যাটদের দুর্বলতা সবচেয়ে বেশি।

দ্য অ্যারগুমেন্টের একটি জরিপে দেখা গেছে, যারা ট্রাম্পকে অপছন্দ করলেও রিপাবলিকানদের দিকে ভোট দেওয়ার প্রবণতা রাখেন, তাদের মধ্যে অপরাধ দমনের বিষয়ে রিপাবলিকানদের ওপর আস্থা ডেমোক্র্যাটদের তুলনায় ছিল ৪৭ শতাংশ বনাম মাত্র ১ শতাংশ। এমন ব্যবধান কেবল কোনো একটি নীতির ব্যর্থতা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না; এটি ভোটারের গভীর মানসিক বিচ্ছিন্নতার ইঙ্গিত।

সমস্যা হলো, ডেমোক্র্যাটরা যখন রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়ে, তখন অর্থনৈতিকভাবে আরও বামদিকে যাওয়া তাদের কাছে সাংস্কৃতিকভাবে মধ্যপন্থী হওয়ার চেয়ে অনেক সহজ। সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্টভাবে বলা, বারবার অপরাধ করা ব্যক্তিদের কঠোরভাবে শাস্তির পক্ষে অবস্থান নেওয়া কিংবা মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠান পরিচালনার কথা বলা—এসব বক্তব্য দলের সক্রিয় কর্মী, অধিকারকর্মী এবং উচ্চশিক্ষিত কর্মীদের একটি অংশের বিরোধিতার মুখে পড়তে পারে।

ফলে দলটি অনেক সময় নতুন ভর্তুকি, নতুন সরকারি সুবিধা কিংবা বিলিয়নিয়ারদের বিরুদ্ধে আরও তীব্র বক্তব্যকে নিরাপদ রাজনৈতিক পথ হিসেবে বেছে নেয়। কিন্তু এতে সেই সাংস্কৃতিক উদ্বেগগুলো দূর হয় না, যা অনেক ভোটারকে দলটি থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে।

শ্রমজীবী ও শিক্ষিত উদারপন্থীদের দূরত্ব

বিভিন্ন গবেষণাও এই ব্যবধানের বিষয়টি সামনে এনেছে। ২৯টি নীতিগত ইস্যু নিয়ে করা একটি গবেষণায় দেখা গেছে, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রশ্নে মধ্যপন্থার দিকে অগ্রসর হওয়াই অনেক ক্ষেত্রে ডেমোক্র্যাটদের জন্য সবচেয়ে বড় নির্বাচনী লাভ বয়ে আনতে পারে।

আরেকটি গবেষণায় দেখা যায়, শ্রমজীবী ভোটাররা সীমান্ত সুরক্ষা, অপরাধ কমানো এবং পুলিশ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার ওপর উদারপন্থী কলেজশিক্ষিত ভোটারদের তুলনায় অনেক বেশি গুরুত্ব দেন। বিপরীতে উচ্চশিক্ষিত উদারপন্থীরা কর্তৃত্ববাদ প্রতিরোধ, ট্রান্স অধিকার, গর্ভপাতের অধিকার এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো ইস্যুকে বেশি গুরুত্ব দেন।

এই ব্যবধান সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আরও বেড়েছে। মার্কিন রাজনীতি বিষয়ক গবেষক নিকোলাস জ্যাকবসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০০০ সালে ডেমোক্র্যাট ও শ্রমজীবী ভোটার—উভয় গোষ্ঠীর মাত্র প্রায় ৮ শতাংশ অভিবাসন বাড়ানোর পক্ষে ছিলেন। ২০২০ সালে ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে সেই হার ৪৮ শতাংশে উঠলেও শ্রমজীবী ভোটারদের মধ্যে তা ছিল ২৪ শতাংশ।

গর্ভপাতের মতো ইস্যুতেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। ১৯৮০ সালে দুই গোষ্ঠীর মধ্যে ব্যবধান ছিল মাত্র কয়েক শতাংশ পয়েন্ট; ২০২৪ সালে তা প্রায় ৩০ পয়েন্টে পৌঁছায়। ধর্ম, পরিবার এবং করদাতার অর্থ অপচয় না করার মতো বিষয়েও বড় ধরনের দূরত্ব তৈরি হয়েছে।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শ্রমজীবী ভোটাররা রাতারাতি ডানদিকে চলে যায়নি। বরং শিক্ষিত ডেমোক্র্যাটরা অনেক দ্রুত এবং অনেক বেশি বামদিকে সরে গেছেন। ফলে দুই গোষ্ঠীর মধ্যে রাজনৈতিক দূরত্ব ক্রমেই বড় হয়েছে।

ট্রাম্প এই ফাঁকটিই কাজে লাগান

ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক সাফল্য বোঝার জন্য তাঁর প্রচারণার ভাষার দিকে তাকানো যথেষ্ট। তিনি শুধু কর, বাণিজ্য কিংবা কর্মসংস্থান নিয়ে কথা বলেন না। তাঁর বক্তব্যে ট্রান্সজেন্ডার অ্যাথলেট, ডিইআই ব্যবস্থা, অভিজাত বিশ্ববিদ্যালয়, অপরাধ এবং অনিয়ন্ত্রিত সীমান্ত বারবার ফিরে আসে।

কারণ তিনি জানেন, এসব বিষয় অনেক ভোটারের কাছে বিমূর্ত রাজনৈতিক তর্ক নয়। এগুলো নিরাপত্তা, সামাজিক পরিবর্তন, পরিচয় এবং নিজেদের চারপাশের আমেরিকা বদলে যাওয়ার অনুভূতির সঙ্গে যুক্ত।

ডেমোক্র্যাটদের তাই ট্রাম্পের অনুকরণ করার প্রয়োজন নেই। সংখ্যালঘুদের অধিকার ত্যাগ করা বা প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতির দিকে ফিরে যাওয়াও সমাধান নয়। কিন্তু দলটিকে স্বীকার করতে হবে, পুরোনো নিউ ডিল জোটকে ফিরিয়ে আনার জন্য শুধু সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা বা সম্পদের ওপর বেশি করের প্রতিশ্রুতি যথেষ্ট নয়। আমেরিকান সমাজ, অর্থনীতি এবং ভোটারের রাজনৈতিক পরিচয় বদলে গেছে।

নতুন বাস্তবতার জন্য নতুন জোট

ডেমোক্র্যাটদের সামনে বরং একটি কার্যকর আধুনিক রাজনৈতিক জোট ইতিমধ্যেই রয়েছে—উচ্চশিক্ষিত ভোটার, নারী, সংখ্যালঘু, তরুণ এবং মহানগরকেন্দ্রিক বিপুলসংখ্যক শ্রমজীবী ও মধ্যবিত্ত মানুষ। এই জনগোষ্ঠী কোনো সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব চায় না। তারা এমন একটি কার্যকর উদারপন্থী সরকার চায়, যা বাস্তব সমস্যার সমাধান করতে পারে।

তাদের প্রয়োজন সাশ্রয়ী আবাসন, ভালো স্কুল, সহজলভ্য স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপদ রাস্তা, নিয়ন্ত্রিত সীমান্ত, বৈধ অভিবাসনের কার্যকর ব্যবস্থা এবং শক্তিশালী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি।

এই রাজনীতি একই সঙ্গে মানবিক এবং বাস্তববাদী হতে পারে। সহানুভূতি মানেই আইন প্রয়োগে শিথিলতা নয়। উন্মুক্ত সমাজ মানেই সীমাহীন বিশৃঙ্খলা নয়। সমতা মানেই প্রতিটি ক্ষেত্রে একই মতাদর্শ চাপিয়ে দেওয়া নয়।

ডেমোক্র্যাটদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ তাই নিজেদের ভিত্তিকে আরও বামদিকে ঠেলে দেওয়া নয়; বরং নিজেদের উদারপন্থী আদর্শকে এমনভাবে পুনর্গঠন করা, যাতে দেশের বৃহত্তর অংশ মনে করে—এই দল তাদের মূল্যবোধ বুঝতে পারে, তাদের উদ্বেগকে গুরুত্ব দেয় এবং একই সঙ্গে কার্যকরভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে সক্ষম।

মিশিগানের প্রাইমারি দেখিয়েছে, ডেমোক্র্যাটদের রাজনৈতিক শক্তি কোথায় আছে। কিন্তু প্রাইমারির ভোটার আর সাধারণ নির্বাচনের আমেরিকা এক নয়। আসল পরীক্ষা হবে—দলের উচ্ছ্বাসকে তারা কতটা এমন একটি বাস্তববাদী রাজনৈতিক ভাষায় রূপ দিতে পারে, যা শুধু সক্রিয় সমর্থকদের নয়, দেশের সেই বৃহত্তর ভোটারদেরও আকৃষ্ট করবে যারা এখনো সিদ্ধান্তহীন, সন্দিহান কিংবা অন্য দলের দিকে ঝুঁকে আছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

ডেমোক্র্যাটদের আসল সংকট অর্থনীতি নয়, সংস্কৃতি ও জনমানস

ডেমোক্র্যাটদের আসল সংকট অর্থনীতি নয়, সংস্কৃতি ও জনমানস

০৮:০০:৩৬ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৯ অগাস্ট ২০২৬

মার্কিন ডেমোক্র্যাটিক পার্টি এখন এমন এক রাজনৈতিক সমস্যার মুখোমুখি, যার সমাধান শুধু আরও বেশি অর্থনৈতিক সুবিধা, ধনীদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর বক্তব্য কিংবা কল্যাণমূলক কর্মসূচি বাড়ানোর মধ্যে নেই। দলটির বড় দুর্বলতা অর্থনৈতিক নীতিতে নয়; বরং আমেরিকার একটি বড় অংশের ভোটারের সঙ্গে সংস্কৃতি, সামাজিক মূল্যবোধ এবং দৈনন্দিন নিরাপত্তার প্রশ্নে তৈরি হওয়া দূরত্বে।

মিশিগানের সাম্প্রতিক সিনেট প্রাইমারি সেই দ্বন্দ্বকে খুব স্পষ্ট করে তুলেছে। প্রগতিশীল রাজনীতিক আবদুল এল-সাইয়েদের জয় দেখিয়েছে, ডেমোক্র্যাটদের প্রাইমারি ভোটারদের মধ্যে বামঘেঁষা রাজনীতির যথেষ্ট প্রাণশক্তি রয়েছে। কিন্তু তাঁর সমর্থনের বড় অংশ এসেছে উচ্চশিক্ষিত এলাকা ও বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক শহরগুলো থেকে। বিপরীতে তুলনামূলক মধ্যপন্থী হ্যালি স্টিভেন্স অনেক গ্রামীণ ও নিম্নআয়ের এলাকায় ভালো করেছেন।

অর্থাৎ ডেমোক্র্যাটদের সামনে মৌলিক দ্বন্দ্বটি হলো—দলের সবচেয়ে সক্রিয় অংশটি যেখানে রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে উচ্ছ্বসিত, সাধারণ নির্বাচনে জিততে প্রয়োজনীয় ভোটারদের একটি বড় অংশ সেখানে নেই।

অর্থনৈতিক জনপ্রিয়তার ভুল ঠিকানা

ডেমোক্র্যাটদের একটি শক্তিশালী ধারণা হলো, শ্রমজীবী ভোটারদের হারানো সমাধান করতে হলে অর্থনৈতিকভাবে আরও বামদিকে যেতে হবে। ধনকুবেরদের বিরুদ্ধে আক্রমণ, বড় সামাজিক সুবিধা, সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা কিংবা সম্পদের ওপর বেশি কর—এসব নীতির মাধ্যমে শ্রমিক শ্রেণিকে আবার দলের দিকে ফেরানো যাবে, এমন আশা দীর্ঘদিন ধরে রয়েছে।

কিন্তু বাস্তবতা এই ধারণাকে খুব সহজে সমর্থন করে না।

পিউ রিসার্চ সেন্টারের জরিপে দেখা যায়, ডেমোক্র্যাটদের মধ্যেই কলেজশিক্ষিতদের ৪১ শতাংশ নিজেদের ‘ডেমোক্র্যাটিক সোশ্যালিস্ট’ বলা রাজনীতিকদের পছন্দ করেন। কলেজ ডিগ্রিবিহীন ডেমোক্র্যাটদের ক্ষেত্রে এই হার ২৬ শতাংশ। একইভাবে উচ্চআয়ের ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে এ ধরনের রাজনীতির প্রতি সমর্থন ৪০ শতাংশ, যেখানে নিম্নআয়ের ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে তা ২৪ শতাংশ।

অর্থাৎ যে রাজনৈতিক ভাষাকে শ্রমজীবী আমেরিকানদের কাছে আকর্ষণীয় বলে মনে করা হচ্ছে, সেটির প্রতি তুলনামূলক বেশি আগ্রহ দেখা যাচ্ছে শিক্ষিত ও সচ্ছল ডেমোক্র্যাটদের মধ্যেই।

জো বাইডেনের সময়কার অভিজ্ঞতাও গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর প্রশাসন অবকাঠামো, কারখানা, পরিচ্ছন্ন জ্বানি ও সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনে বিপুল সরকারি বিনিয়োগ করেছে। এর উল্লেখযোগ্য অংশ গেছে এমন সব এলাকাতেও, যেগুলো সাধারণত রিপাবলিকানদের ভোট দেয়। তবু ২০২৪ সালের নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্প কলেজ ডিগ্রিবিহীন ভোটার এবং বছরে ৫০ হাজার ডলারের কম আয় করা ভোটারদের মধ্যে জয় পান। শ্রমজীবী কৃষ্ণাঙ্গ ও হিস্পানিক ভোটারদের মধ্যেও তাঁর সমর্থন বেড়েছে।

এখানে একটি অস্বস্তিকর সত্য আছে। গত তিন দশকে ডেমোক্র্যাটরা অর্থনৈতিক নীতিতে ধীরে ধীরে বামদিকে সরে গেছে। বিল ক্লিনটনের তুলনায় বারাক ওবামা ছিলেন বামঘেঁষা, আর ওবামার তুলনায় বাইডেন আরও বেশি বামমুখী। কিন্তু একই সময়ে শ্রমজীবী শ্রেণির একটি বড় অংশ দলটি থেকে ক্রমাগত দূরে সরে গেছে।

তাই সমস্যাটি অর্থনীতিকে গুরুত্ব না দেওয়ার নয়। বরং প্রশ্ন হলো, ডেমোক্র্যাটরা কোন জায়গায় ভোটারদের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে।

যে বিষয়গুলো ভোটারের কাছে সরাসরি অনুভূত হয়

স্বাস্থ্যসেবা, জীবনযাত্রার ব্যয় কিংবা সামাজিক নিরাপত্তার মতো অর্থনৈতিক ইস্যুতে ডেমোক্র্যাটরা এখনো অনেক ক্ষেত্রে রিপাবলিকানদের চেয়ে এগিয়ে। কিন্তু ভোটারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত কেবল আয় বা করের হিসাব দিয়ে তৈরি হয় না। নিরাপত্তা, সীমান্ত, অভিবাসন, অপরাধ এবং সামাজিক পরিচয়—এসব বিষয়ও মানুষের রাজনৈতিক অনুভূতিতে গভীর প্রভাব ফেলে।

Democracy without choice – or just 'the economy, stupid'? Political support  during the Eurozone crisis - Euro Crisis in the Press

এখানেই ডেমোক্র্যাটদের দুর্বলতা সবচেয়ে বেশি।

দ্য অ্যারগুমেন্টের একটি জরিপে দেখা গেছে, যারা ট্রাম্পকে অপছন্দ করলেও রিপাবলিকানদের দিকে ভোট দেওয়ার প্রবণতা রাখেন, তাদের মধ্যে অপরাধ দমনের বিষয়ে রিপাবলিকানদের ওপর আস্থা ডেমোক্র্যাটদের তুলনায় ছিল ৪৭ শতাংশ বনাম মাত্র ১ শতাংশ। এমন ব্যবধান কেবল কোনো একটি নীতির ব্যর্থতা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না; এটি ভোটারের গভীর মানসিক বিচ্ছিন্নতার ইঙ্গিত।

সমস্যা হলো, ডেমোক্র্যাটরা যখন রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়ে, তখন অর্থনৈতিকভাবে আরও বামদিকে যাওয়া তাদের কাছে সাংস্কৃতিকভাবে মধ্যপন্থী হওয়ার চেয়ে অনেক সহজ। সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্টভাবে বলা, বারবার অপরাধ করা ব্যক্তিদের কঠোরভাবে শাস্তির পক্ষে অবস্থান নেওয়া কিংবা মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠান পরিচালনার কথা বলা—এসব বক্তব্য দলের সক্রিয় কর্মী, অধিকারকর্মী এবং উচ্চশিক্ষিত কর্মীদের একটি অংশের বিরোধিতার মুখে পড়তে পারে।

ফলে দলটি অনেক সময় নতুন ভর্তুকি, নতুন সরকারি সুবিধা কিংবা বিলিয়নিয়ারদের বিরুদ্ধে আরও তীব্র বক্তব্যকে নিরাপদ রাজনৈতিক পথ হিসেবে বেছে নেয়। কিন্তু এতে সেই সাংস্কৃতিক উদ্বেগগুলো দূর হয় না, যা অনেক ভোটারকে দলটি থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে।

শ্রমজীবী ও শিক্ষিত উদারপন্থীদের দূরত্ব

বিভিন্ন গবেষণাও এই ব্যবধানের বিষয়টি সামনে এনেছে। ২৯টি নীতিগত ইস্যু নিয়ে করা একটি গবেষণায় দেখা গেছে, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রশ্নে মধ্যপন্থার দিকে অগ্রসর হওয়াই অনেক ক্ষেত্রে ডেমোক্র্যাটদের জন্য সবচেয়ে বড় নির্বাচনী লাভ বয়ে আনতে পারে।

আরেকটি গবেষণায় দেখা যায়, শ্রমজীবী ভোটাররা সীমান্ত সুরক্ষা, অপরাধ কমানো এবং পুলিশ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার ওপর উদারপন্থী কলেজশিক্ষিত ভোটারদের তুলনায় অনেক বেশি গুরুত্ব দেন। বিপরীতে উচ্চশিক্ষিত উদারপন্থীরা কর্তৃত্ববাদ প্রতিরোধ, ট্রান্স অধিকার, গর্ভপাতের অধিকার এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো ইস্যুকে বেশি গুরুত্ব দেন।

এই ব্যবধান সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আরও বেড়েছে। মার্কিন রাজনীতি বিষয়ক গবেষক নিকোলাস জ্যাকবসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০০০ সালে ডেমোক্র্যাট ও শ্রমজীবী ভোটার—উভয় গোষ্ঠীর মাত্র প্রায় ৮ শতাংশ অভিবাসন বাড়ানোর পক্ষে ছিলেন। ২০২০ সালে ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে সেই হার ৪৮ শতাংশে উঠলেও শ্রমজীবী ভোটারদের মধ্যে তা ছিল ২৪ শতাংশ।

গর্ভপাতের মতো ইস্যুতেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। ১৯৮০ সালে দুই গোষ্ঠীর মধ্যে ব্যবধান ছিল মাত্র কয়েক শতাংশ পয়েন্ট; ২০২৪ সালে তা প্রায় ৩০ পয়েন্টে পৌঁছায়। ধর্ম, পরিবার এবং করদাতার অর্থ অপচয় না করার মতো বিষয়েও বড় ধরনের দূরত্ব তৈরি হয়েছে।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শ্রমজীবী ভোটাররা রাতারাতি ডানদিকে চলে যায়নি। বরং শিক্ষিত ডেমোক্র্যাটরা অনেক দ্রুত এবং অনেক বেশি বামদিকে সরে গেছেন। ফলে দুই গোষ্ঠীর মধ্যে রাজনৈতিক দূরত্ব ক্রমেই বড় হয়েছে।

ট্রাম্প এই ফাঁকটিই কাজে লাগান

ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক সাফল্য বোঝার জন্য তাঁর প্রচারণার ভাষার দিকে তাকানো যথেষ্ট। তিনি শুধু কর, বাণিজ্য কিংবা কর্মসংস্থান নিয়ে কথা বলেন না। তাঁর বক্তব্যে ট্রান্সজেন্ডার অ্যাথলেট, ডিইআই ব্যবস্থা, অভিজাত বিশ্ববিদ্যালয়, অপরাধ এবং অনিয়ন্ত্রিত সীমান্ত বারবার ফিরে আসে।

কারণ তিনি জানেন, এসব বিষয় অনেক ভোটারের কাছে বিমূর্ত রাজনৈতিক তর্ক নয়। এগুলো নিরাপত্তা, সামাজিক পরিবর্তন, পরিচয় এবং নিজেদের চারপাশের আমেরিকা বদলে যাওয়ার অনুভূতির সঙ্গে যুক্ত।

ডেমোক্র্যাটদের তাই ট্রাম্পের অনুকরণ করার প্রয়োজন নেই। সংখ্যালঘুদের অধিকার ত্যাগ করা বা প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতির দিকে ফিরে যাওয়াও সমাধান নয়। কিন্তু দলটিকে স্বীকার করতে হবে, পুরোনো নিউ ডিল জোটকে ফিরিয়ে আনার জন্য শুধু সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা বা সম্পদের ওপর বেশি করের প্রতিশ্রুতি যথেষ্ট নয়। আমেরিকান সমাজ, অর্থনীতি এবং ভোটারের রাজনৈতিক পরিচয় বদলে গেছে।

নতুন বাস্তবতার জন্য নতুন জোট

ডেমোক্র্যাটদের সামনে বরং একটি কার্যকর আধুনিক রাজনৈতিক জোট ইতিমধ্যেই রয়েছে—উচ্চশিক্ষিত ভোটার, নারী, সংখ্যালঘু, তরুণ এবং মহানগরকেন্দ্রিক বিপুলসংখ্যক শ্রমজীবী ও মধ্যবিত্ত মানুষ। এই জনগোষ্ঠী কোনো সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব চায় না। তারা এমন একটি কার্যকর উদারপন্থী সরকার চায়, যা বাস্তব সমস্যার সমাধান করতে পারে।

তাদের প্রয়োজন সাশ্রয়ী আবাসন, ভালো স্কুল, সহজলভ্য স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপদ রাস্তা, নিয়ন্ত্রিত সীমান্ত, বৈধ অভিবাসনের কার্যকর ব্যবস্থা এবং শক্তিশালী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি।

এই রাজনীতি একই সঙ্গে মানবিক এবং বাস্তববাদী হতে পারে। সহানুভূতি মানেই আইন প্রয়োগে শিথিলতা নয়। উন্মুক্ত সমাজ মানেই সীমাহীন বিশৃঙ্খলা নয়। সমতা মানেই প্রতিটি ক্ষেত্রে একই মতাদর্শ চাপিয়ে দেওয়া নয়।

ডেমোক্র্যাটদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ তাই নিজেদের ভিত্তিকে আরও বামদিকে ঠেলে দেওয়া নয়; বরং নিজেদের উদারপন্থী আদর্শকে এমনভাবে পুনর্গঠন করা, যাতে দেশের বৃহত্তর অংশ মনে করে—এই দল তাদের মূল্যবোধ বুঝতে পারে, তাদের উদ্বেগকে গুরুত্ব দেয় এবং একই সঙ্গে কার্যকরভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে সক্ষম।

মিশিগানের প্রাইমারি দেখিয়েছে, ডেমোক্র্যাটদের রাজনৈতিক শক্তি কোথায় আছে। কিন্তু প্রাইমারির ভোটার আর সাধারণ নির্বাচনের আমেরিকা এক নয়। আসল পরীক্ষা হবে—দলের উচ্ছ্বাসকে তারা কতটা এমন একটি বাস্তববাদী রাজনৈতিক ভাষায় রূপ দিতে পারে, যা শুধু সক্রিয় সমর্থকদের নয়, দেশের সেই বৃহত্তর ভোটারদেরও আকৃষ্ট করবে যারা এখনো সিদ্ধান্তহীন, সন্দিহান কিংবা অন্য দলের দিকে ঝুঁকে আছে।