১২:২৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ০৯ অগাস্ট ২০২৬
জাপানের ভিন্ন পথ: শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ নয়, নিরাপদ ব্যবহারের লড়াই সিলেটে বাস দুর্ঘটনায় ৯ মৃত্যু: তদন্তে ৫ সদস্যের কমিটি, দুই বাসের নিবন্ধন বাতিল অযোধ্যার রামমন্দিরে অনুদান কেলেঙ্কারি, প্রশ্নের মুখে মোদির গর্বের প্রকল্প ফল প্রকাশের আগে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি নিয়ে দুশ্চিন্তা? জেনে নিন ক্লিয়ারিংয়ের পুরো পথ ওজন কমানোর ওষুধ বদলে দিচ্ছে মদ্যপানের অভ্যাস, কারও কমছে নেশার টান বাবার মৃত্যুর শোকে মেসি মাঠের বাইরে, শেষ মুহূর্তের গোলে মন্টেরের কাছে হার মায়ামির শতকোটি ডলারের উত্তরাধিকারেও হতাশ হবেন তরুণেরা, হাতে আসবে সম্পদের ছোট অংশ ব্রাজিলে হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত, একই পরিবারের তিন পর্যটকসহ নিহত ৪ হরমুজ প্রণালি নিয়ে ইরান-ওমান সমঝোতা প্রায় চূড়ান্ত, তবে খুলবে না নৌপথ আধুনিক প্রযুক্তির পুকুরে বদলে যেতে পারে বাংলাদেশের মাছের অর্থনীতি

ইনফান্তিনোর ভাগ্য এখন এশিয়ার ৪৬ ভোটে, চতুর্থ মেয়াদে কি টিকে থাকবেন ফিফা প্রধান?

ফিফার সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর ভবিষ্যৎ এখন অনেকটাই নির্ভর করছে এশিয়ার ওপর। বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রধান হিসেবে চতুর্থ মেয়াদে দায়িত্বে থাকার পথ আপাতদৃষ্টিতে সহজ মনে হলেও সাম্প্রতিক কয়েকটি বিতর্ক সেই সমীকরণ বদলে দিয়েছে। আর সেই পরিস্থিতিতে এশিয়ার ৪৬টি ভোটই হয়ে উঠতে পারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি।

২০১৬ সালে ফিফার সভাপতির দায়িত্ব নেওয়ার পর ইনফান্তিনো ধীরে ধীরে বিশ্ব ফুটবলে নিজের প্রভাব শক্তিশালী করেছেন। চতুর্থ মেয়াদে তার পুনর্নির্বাচন প্রায় নিশ্চিত বলেই মনে হচ্ছিল। ফিফার ২১১ সদস্যের মধ্যে ২০০টির বেশি সদস্যসংস্থা ইতোমধ্যে তার প্রতি সমর্থনের ইঙ্গিত দিয়েছিল। এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিদ্বন্দ্বীও সামনে আসেননি।

কিন্তু বিশ্বকাপের মালিকানার একটি অংশ বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রির প্রস্তাব প্রকাশ্যে আসার পর পরিস্থিতি পাল্টে যায়। প্রস্তাবটি কীভাবে তৈরি ও উপস্থাপন করা হয়েছিল, তা নিয়ে বিভিন্ন মহলে অসন্তোষ তৈরি হয়। বিশেষ করে ফিফার ছয়টি মহাদেশীয় কনফেডারেশনের সঙ্গে যথেষ্ট আলোচনা না করেই এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ ওঠে।

এ কারণেই ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে বিরোধিতা বাড়ছে।

ইউরোপে বিরোধিতা, আফ্রিকায় সমর্থন

Asia holds key to Infantino's future as FIFA chief - Nikkei Asia

ইনফান্তিনোকে সরানোর কোনো প্রচেষ্টা হলে ইউরোপের ফুটবল সংস্থাগুলোই তার মূল শক্তি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অন্যদিকে আফ্রিকার বড় একটি অংশ এখনো ইনফান্তিনোর পাশে থাকার সম্ভাবনা বেশি।

এই দুই মেরুর মাঝখানে রয়েছে এশিয়া। এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের অধীনে থাকা ৪৬টি ভোটই তাই শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন ঐতিহ্যগতভাবেই ইনফান্তিনোর অন্যতম শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক সমর্থক। কিন্তু বিশ্বকাপের অংশীদারত্ব বিক্রির প্রস্তাব নিয়ে কনফেডারেশনের সভাপতি শেখ সালমান বিন ইব্রাহিম আল খলিফা প্রকাশ্যে অসন্তোষ জানিয়েছেন।

শেখ সালমান ২০১৬ সালের ফিফা সভাপতি নির্বাচনে ইনফান্তিনোর কাছে পরাজিত হয়েছিলেন। বিশ্বকাপের অংশ বিক্রির প্রস্তাবটি ছয়টি কনফেডারেশনের কারও সঙ্গে পরামর্শ না করেই তৈরি করা হয়েছে—এমন অভিযোগ তুলে তিনি বিষয়টিকে ‘সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য’ বলে মন্তব্য করেছেন।

তবে কনফেডারেশনের অবস্থান মানেই যে এশিয়ার সব দেশ ইনফান্তিনোর বিপক্ষে চলে যাবে, তা নয়।

৪ কোটি ডলারের আর্থিক সুবিধাও বড় বিষয়

বিশ্বকাপের অংশীদারত্ব বিক্রির প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে ফিফার প্রতিটি সদস্যসংস্থা প্রায় ৪ কোটি ডলার করে পাওয়ার কথা ছিল। ফলে এশিয়ার অনেক ছোট দেশ ইনফান্তিনোর প্রতি সমর্থন ধরে রাখতে পারে।

Dasho Ugen Tsechup Reelected As The President of the Bhutan Football  Federation - BHUTAN FOOTBALL FEDERATION

ভুটান ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি উগেন ছেরিংয়ের বক্তব্যেও সেই বাস্তবতার প্রতিফলন রয়েছে। তার মতে, বর্তমান ফিফা প্রশাসনে ছোট দেশগুলো নিজেদের মতামত প্রকাশের সুযোগ পাচ্ছে।

তার ভাষায়, অতীতে ফিফার সিদ্ধান্ত অনেকটা ওপর থেকে নির্দেশের মতো নিচে নেমে আসত। এখন সদস্যসংস্থাগুলো নিজেদের উদ্বেগ জানাতে পারে, এমনকি সভাপতির সঙ্গে একমত না হলেও নিজেদের অবস্থান প্রকাশের সুযোগ রয়েছে।

ছোট দেশগুলোর কাছে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বড় ফুটবল শক্তিগুলোর তুলনায় এসব দেশের জন্য ফিফার অর্থায়ন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

এশিয়ায় ইনফান্তিনোর সমর্থকও কম নয়

কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, লেবানন ও শ্রীলঙ্কাসহ এশিয়ার কয়েকটি দেশ ইতোমধ্যে ইনফান্তিনোর প্রতি সমর্থন জানিয়েছে।

এশিয়ায় তার জনপ্রিয়তার পেছনে শুধু অর্থনৈতিক সুবিধাই কাজ করছে না। ইনফান্তিনোর দশ বছরের মেয়াদে এশিয়ার বিভিন্ন দেশ একাধিক বড় আন্তর্জাতিক ফুটবল আয়োজনের সুযোগ পেয়েছে।

কাতার বিশ্বকাপ আয়োজন করেছে। সৌদি আরব, ইন্দোনেশিয়া, উজবেকিস্তান ও ভারতও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ফিফা প্রতিযোগিতার আয়োজক হয়েছে। ফলে এশিয়ার অনেক ফুটবল প্রশাসনের কাছে ইনফান্তিনোর নেতৃত্বকে নিজেদের জন্য ইতিবাচক হিসেবেও দেখা হয়।

জর্ডানেই সবচেয়ে স্পষ্ট বিরোধিতা

তবে এশিয়ায় ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে সবচেয়ে সরব দেশগুলোর একটি জর্ডান।

HRH Prince Ali, president of the Jordan Football Association (JFA), said  that FIFA has released Jordan's overdue prize money for reaching the final  of the FIFA Arab Cup, ending an eight-month delay.

জর্ডান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি প্রিন্স আলী বিন আল-হুসেইন অভিযোগ করেছেন, ফিফা গত ডিসেম্বর থেকে তার সংস্থার পাওনা অর্থ পরিশোধ করেনি।

তার অভিযোগ আরও গুরুতর। তিনি দাবি করেন, বিশ্বকাপ চলাকালে তাকে মৌখিকভাবে জানানো হয়েছিল যে ইনফান্তিনোর প্রতি সমর্থন জানালে জর্ডান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের পাওনা অর্থ পাওয়ার বিষয়টি সহজ হতে পারে।

পরে অর্থ পরিশোধ করা হলেও হুসেইন তার অবস্থান পরিবর্তন করেননি। তিনি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, তার সংস্থা ইনফান্তিনোকে সমর্থন করবে না এবং নির্বাচনে তার পক্ষে ভোটও দেবে না।

তার মতে, সমস্যাটি মূলত ফিফার নেতৃত্বের ধরন নিয়ে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতাও প্রশ্নের মুখে

এশিয়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ফুটবল শক্তি দক্ষিণ কোরিয়াতেও ইনফান্তিনোকে নিয়ে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।

দক্ষিণ কোরিয়া ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের এক কর্মকর্তা মনে করেন, ইনফান্তিনো ফুটবল প্রশাসনের চেয়ে রাজনীতির দিকে বেশি ঝুঁকে পড়েছেন। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

Asia holds key to Infantino's future as FIFA chief - Nikkei Asia

বিশ্বকাপের সময় ট্রাম্প ইনফান্তিনোর সঙ্গে যোগাযোগ করে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় ফোলারিন বালোগুনের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন বলে জানা যায়। পরে সেই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হলে তা ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়।

এরপর বিশ্বকাপের অংশীদারত্ব বিক্রির নতুন প্রস্তাবও বিতর্ক বাড়িয়ে দেয়। কারণ ওই বিনিয়োগকারী গোষ্ঠীর নেতৃত্বে ছিলেন জ্যারেড কুশনারের ভাই জোশুয়া কুশনার। জ্যারেড কুশনার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জামাতা।

দক্ষিণ কোরিয়ার ওই কর্মকর্তা মনে করেন, ইনফান্তিনো ফুটবল থেকে অনেক দূরে সরে গিয়ে অতিরিক্ত রাজনৈতিক হয়ে উঠেছেন।

চীনের ভোট কোন দিকে যাবে?

এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি—চীন শেষ পর্যন্ত কোন পক্ষ নেবে?

চীনের অবস্থান এখনো স্পষ্ট নয়। বেইজিংভিত্তিক পরামর্শক বি ইউয়ানের মতে, চীনের সাধারণ মানুষ ইনফান্তিনোকে ঘিরে চলমান বিতর্ক গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং অনেকের কাছে তিনি ইতোমধ্যেই নেতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি করেছেন।

তবে চীনের ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন শেষ পর্যন্ত এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের নেতৃত্বের অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সিদ্ধান্ত নিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ইরাকও এখনো কোনো পক্ষ নেওয়ার ঘোষণা দেয়নি। দেশটির ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে, নির্বাচনী প্রক্রিয়া ও সদস্যসংস্থাগুলোর অবস্থান এখনো পরিষ্কার নয়। পরিস্থিতি আরও স্পষ্ট হলে তারা আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় নিজেদের সিদ্ধান্ত জানাবে।

Gianni Infantino's Fifa future uncertain: Senior advisor quits and Asian  association rejects World Cup plan | Irish Independent

ইনফান্তিনোর সামনে কঠিন পরীক্ষা

ফিফা সভাপতির চতুর্থ মেয়াদে যাওয়ার পথ এখনো বন্ধ হয়ে যায়নি। বরং তার হাতে রয়েছে বিপুল সংখ্যক সমর্থনের প্রাথমিক হিসাব। কিন্তু বিশ্বকাপের অংশীদারত্ব বিক্রির বিতর্ক, নেতৃত্বের ধরন নিয়ে প্রশ্ন এবং রাজনীতির সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা—সব মিলিয়ে বিরোধিতার পরিমাণ বাড়ছে।

এই পরিস্থিতিতে এশিয়ার ৪৬ ভোট হয়ে উঠতে পারে নির্বাচনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমীকরণ।

ইউরোপ যদি ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেয় এবং আফ্রিকা যদি তাকে সমর্থন করে, তাহলে এশিয়ার দেশগুলোর সিদ্ধান্তই ভারসাম্য বদলে দিতে পারে। ফলে চতুর্থ মেয়াদে ফিফার সভাপতি হিসেবে ইনফান্তিনো থাকবেন কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর অনেকটাই লুকিয়ে আছে এশিয়ার ফুটবল প্রশাসনগুলোর ভোটে।

বিশ্ব ফুটবলের ক্ষমতার কেন্দ্রে এখন তাই একটি প্রশ্নই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—এশিয়া শেষ পর্যন্ত ইনফান্তিনোর পাশে থাকবে, নাকি পরিবর্তনের পক্ষে দাঁড়াবে?

ইনফান্তিনোর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে আগামী মাসগুলোতে এশিয়ার অবস্থানই হয়ে উঠতে পারে সবচেয়ে বড় সূচক।

জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর চতুর্থ মেয়াদ হয়তো কাগজে-কলমে প্রায় নিশ্চিত মনে হচ্ছে। কিন্তু ভোটের মাঠে এশিয়ার ৪৬টি ভোটের হিসাব এখনো অনেক কিছু বদলে দিতে পারে।

ইনফান্তিনোর ভাগ্য তাই শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত হতে পারে ইউরোপ বা আফ্রিকায় নয়—এশিয়ার ভোটকক্ষেই।

 

জনপ্রিয় সংবাদ

জাপানের ভিন্ন পথ: শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ নয়, নিরাপদ ব্যবহারের লড়াই

ইনফান্তিনোর ভাগ্য এখন এশিয়ার ৪৬ ভোটে, চতুর্থ মেয়াদে কি টিকে থাকবেন ফিফা প্রধান?

১০:২৯:৪০ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৯ অগাস্ট ২০২৬

ফিফার সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর ভবিষ্যৎ এখন অনেকটাই নির্ভর করছে এশিয়ার ওপর। বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রধান হিসেবে চতুর্থ মেয়াদে দায়িত্বে থাকার পথ আপাতদৃষ্টিতে সহজ মনে হলেও সাম্প্রতিক কয়েকটি বিতর্ক সেই সমীকরণ বদলে দিয়েছে। আর সেই পরিস্থিতিতে এশিয়ার ৪৬টি ভোটই হয়ে উঠতে পারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি।

২০১৬ সালে ফিফার সভাপতির দায়িত্ব নেওয়ার পর ইনফান্তিনো ধীরে ধীরে বিশ্ব ফুটবলে নিজের প্রভাব শক্তিশালী করেছেন। চতুর্থ মেয়াদে তার পুনর্নির্বাচন প্রায় নিশ্চিত বলেই মনে হচ্ছিল। ফিফার ২১১ সদস্যের মধ্যে ২০০টির বেশি সদস্যসংস্থা ইতোমধ্যে তার প্রতি সমর্থনের ইঙ্গিত দিয়েছিল। এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিদ্বন্দ্বীও সামনে আসেননি।

কিন্তু বিশ্বকাপের মালিকানার একটি অংশ বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রির প্রস্তাব প্রকাশ্যে আসার পর পরিস্থিতি পাল্টে যায়। প্রস্তাবটি কীভাবে তৈরি ও উপস্থাপন করা হয়েছিল, তা নিয়ে বিভিন্ন মহলে অসন্তোষ তৈরি হয়। বিশেষ করে ফিফার ছয়টি মহাদেশীয় কনফেডারেশনের সঙ্গে যথেষ্ট আলোচনা না করেই এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ ওঠে।

এ কারণেই ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে বিরোধিতা বাড়ছে।

ইউরোপে বিরোধিতা, আফ্রিকায় সমর্থন

Asia holds key to Infantino's future as FIFA chief - Nikkei Asia

ইনফান্তিনোকে সরানোর কোনো প্রচেষ্টা হলে ইউরোপের ফুটবল সংস্থাগুলোই তার মূল শক্তি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অন্যদিকে আফ্রিকার বড় একটি অংশ এখনো ইনফান্তিনোর পাশে থাকার সম্ভাবনা বেশি।

এই দুই মেরুর মাঝখানে রয়েছে এশিয়া। এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের অধীনে থাকা ৪৬টি ভোটই তাই শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন ঐতিহ্যগতভাবেই ইনফান্তিনোর অন্যতম শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক সমর্থক। কিন্তু বিশ্বকাপের অংশীদারত্ব বিক্রির প্রস্তাব নিয়ে কনফেডারেশনের সভাপতি শেখ সালমান বিন ইব্রাহিম আল খলিফা প্রকাশ্যে অসন্তোষ জানিয়েছেন।

শেখ সালমান ২০১৬ সালের ফিফা সভাপতি নির্বাচনে ইনফান্তিনোর কাছে পরাজিত হয়েছিলেন। বিশ্বকাপের অংশ বিক্রির প্রস্তাবটি ছয়টি কনফেডারেশনের কারও সঙ্গে পরামর্শ না করেই তৈরি করা হয়েছে—এমন অভিযোগ তুলে তিনি বিষয়টিকে ‘সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য’ বলে মন্তব্য করেছেন।

তবে কনফেডারেশনের অবস্থান মানেই যে এশিয়ার সব দেশ ইনফান্তিনোর বিপক্ষে চলে যাবে, তা নয়।

৪ কোটি ডলারের আর্থিক সুবিধাও বড় বিষয়

বিশ্বকাপের অংশীদারত্ব বিক্রির প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে ফিফার প্রতিটি সদস্যসংস্থা প্রায় ৪ কোটি ডলার করে পাওয়ার কথা ছিল। ফলে এশিয়ার অনেক ছোট দেশ ইনফান্তিনোর প্রতি সমর্থন ধরে রাখতে পারে।

Dasho Ugen Tsechup Reelected As The President of the Bhutan Football  Federation - BHUTAN FOOTBALL FEDERATION

ভুটান ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি উগেন ছেরিংয়ের বক্তব্যেও সেই বাস্তবতার প্রতিফলন রয়েছে। তার মতে, বর্তমান ফিফা প্রশাসনে ছোট দেশগুলো নিজেদের মতামত প্রকাশের সুযোগ পাচ্ছে।

তার ভাষায়, অতীতে ফিফার সিদ্ধান্ত অনেকটা ওপর থেকে নির্দেশের মতো নিচে নেমে আসত। এখন সদস্যসংস্থাগুলো নিজেদের উদ্বেগ জানাতে পারে, এমনকি সভাপতির সঙ্গে একমত না হলেও নিজেদের অবস্থান প্রকাশের সুযোগ রয়েছে।

ছোট দেশগুলোর কাছে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বড় ফুটবল শক্তিগুলোর তুলনায় এসব দেশের জন্য ফিফার অর্থায়ন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

এশিয়ায় ইনফান্তিনোর সমর্থকও কম নয়

কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, লেবানন ও শ্রীলঙ্কাসহ এশিয়ার কয়েকটি দেশ ইতোমধ্যে ইনফান্তিনোর প্রতি সমর্থন জানিয়েছে।

এশিয়ায় তার জনপ্রিয়তার পেছনে শুধু অর্থনৈতিক সুবিধাই কাজ করছে না। ইনফান্তিনোর দশ বছরের মেয়াদে এশিয়ার বিভিন্ন দেশ একাধিক বড় আন্তর্জাতিক ফুটবল আয়োজনের সুযোগ পেয়েছে।

কাতার বিশ্বকাপ আয়োজন করেছে। সৌদি আরব, ইন্দোনেশিয়া, উজবেকিস্তান ও ভারতও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ফিফা প্রতিযোগিতার আয়োজক হয়েছে। ফলে এশিয়ার অনেক ফুটবল প্রশাসনের কাছে ইনফান্তিনোর নেতৃত্বকে নিজেদের জন্য ইতিবাচক হিসেবেও দেখা হয়।

জর্ডানেই সবচেয়ে স্পষ্ট বিরোধিতা

তবে এশিয়ায় ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে সবচেয়ে সরব দেশগুলোর একটি জর্ডান।

HRH Prince Ali, president of the Jordan Football Association (JFA), said  that FIFA has released Jordan's overdue prize money for reaching the final  of the FIFA Arab Cup, ending an eight-month delay.

জর্ডান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি প্রিন্স আলী বিন আল-হুসেইন অভিযোগ করেছেন, ফিফা গত ডিসেম্বর থেকে তার সংস্থার পাওনা অর্থ পরিশোধ করেনি।

তার অভিযোগ আরও গুরুতর। তিনি দাবি করেন, বিশ্বকাপ চলাকালে তাকে মৌখিকভাবে জানানো হয়েছিল যে ইনফান্তিনোর প্রতি সমর্থন জানালে জর্ডান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের পাওনা অর্থ পাওয়ার বিষয়টি সহজ হতে পারে।

পরে অর্থ পরিশোধ করা হলেও হুসেইন তার অবস্থান পরিবর্তন করেননি। তিনি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, তার সংস্থা ইনফান্তিনোকে সমর্থন করবে না এবং নির্বাচনে তার পক্ষে ভোটও দেবে না।

তার মতে, সমস্যাটি মূলত ফিফার নেতৃত্বের ধরন নিয়ে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতাও প্রশ্নের মুখে

এশিয়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ফুটবল শক্তি দক্ষিণ কোরিয়াতেও ইনফান্তিনোকে নিয়ে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।

দক্ষিণ কোরিয়া ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের এক কর্মকর্তা মনে করেন, ইনফান্তিনো ফুটবল প্রশাসনের চেয়ে রাজনীতির দিকে বেশি ঝুঁকে পড়েছেন। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

Asia holds key to Infantino's future as FIFA chief - Nikkei Asia

বিশ্বকাপের সময় ট্রাম্প ইনফান্তিনোর সঙ্গে যোগাযোগ করে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় ফোলারিন বালোগুনের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন বলে জানা যায়। পরে সেই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হলে তা ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়।

এরপর বিশ্বকাপের অংশীদারত্ব বিক্রির নতুন প্রস্তাবও বিতর্ক বাড়িয়ে দেয়। কারণ ওই বিনিয়োগকারী গোষ্ঠীর নেতৃত্বে ছিলেন জ্যারেড কুশনারের ভাই জোশুয়া কুশনার। জ্যারেড কুশনার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জামাতা।

দক্ষিণ কোরিয়ার ওই কর্মকর্তা মনে করেন, ইনফান্তিনো ফুটবল থেকে অনেক দূরে সরে গিয়ে অতিরিক্ত রাজনৈতিক হয়ে উঠেছেন।

চীনের ভোট কোন দিকে যাবে?

এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি—চীন শেষ পর্যন্ত কোন পক্ষ নেবে?

চীনের অবস্থান এখনো স্পষ্ট নয়। বেইজিংভিত্তিক পরামর্শক বি ইউয়ানের মতে, চীনের সাধারণ মানুষ ইনফান্তিনোকে ঘিরে চলমান বিতর্ক গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং অনেকের কাছে তিনি ইতোমধ্যেই নেতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি করেছেন।

তবে চীনের ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন শেষ পর্যন্ত এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের নেতৃত্বের অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সিদ্ধান্ত নিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ইরাকও এখনো কোনো পক্ষ নেওয়ার ঘোষণা দেয়নি। দেশটির ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে, নির্বাচনী প্রক্রিয়া ও সদস্যসংস্থাগুলোর অবস্থান এখনো পরিষ্কার নয়। পরিস্থিতি আরও স্পষ্ট হলে তারা আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় নিজেদের সিদ্ধান্ত জানাবে।

Gianni Infantino's Fifa future uncertain: Senior advisor quits and Asian  association rejects World Cup plan | Irish Independent

ইনফান্তিনোর সামনে কঠিন পরীক্ষা

ফিফা সভাপতির চতুর্থ মেয়াদে যাওয়ার পথ এখনো বন্ধ হয়ে যায়নি। বরং তার হাতে রয়েছে বিপুল সংখ্যক সমর্থনের প্রাথমিক হিসাব। কিন্তু বিশ্বকাপের অংশীদারত্ব বিক্রির বিতর্ক, নেতৃত্বের ধরন নিয়ে প্রশ্ন এবং রাজনীতির সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা—সব মিলিয়ে বিরোধিতার পরিমাণ বাড়ছে।

এই পরিস্থিতিতে এশিয়ার ৪৬ ভোট হয়ে উঠতে পারে নির্বাচনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমীকরণ।

ইউরোপ যদি ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেয় এবং আফ্রিকা যদি তাকে সমর্থন করে, তাহলে এশিয়ার দেশগুলোর সিদ্ধান্তই ভারসাম্য বদলে দিতে পারে। ফলে চতুর্থ মেয়াদে ফিফার সভাপতি হিসেবে ইনফান্তিনো থাকবেন কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর অনেকটাই লুকিয়ে আছে এশিয়ার ফুটবল প্রশাসনগুলোর ভোটে।

বিশ্ব ফুটবলের ক্ষমতার কেন্দ্রে এখন তাই একটি প্রশ্নই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—এশিয়া শেষ পর্যন্ত ইনফান্তিনোর পাশে থাকবে, নাকি পরিবর্তনের পক্ষে দাঁড়াবে?

ইনফান্তিনোর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে আগামী মাসগুলোতে এশিয়ার অবস্থানই হয়ে উঠতে পারে সবচেয়ে বড় সূচক।

জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর চতুর্থ মেয়াদ হয়তো কাগজে-কলমে প্রায় নিশ্চিত মনে হচ্ছে। কিন্তু ভোটের মাঠে এশিয়ার ৪৬টি ভোটের হিসাব এখনো অনেক কিছু বদলে দিতে পারে।

ইনফান্তিনোর ভাগ্য তাই শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত হতে পারে ইউরোপ বা আফ্রিকায় নয়—এশিয়ার ভোটকক্ষেই।