আকাশে কয়েক মিনিটের এক বিরল দৃশ্য দেখার জন্য কেউ গাড়ি চালিয়ে পাড়ি দিচ্ছেন হাজার কিলোমিটার, কেউ উড়োজাহাজে ছুটছেন দূর দ্বীপে। কারও হাতে অত্যাধুনিক ক্যামেরা, কারও সঙ্গে বিশেষ দূরবীন, আবার কেউ সঙ্গে নিয়েছেন শিবির করার সরঞ্জাম। লক্ষ্য একটাই—বিরল পূর্ণ সূর্যগ্রহণ নিজের চোখে দেখা এবং সম্ভব হলে সেই মুহূর্ত ক্যামেরায় ধরে রাখা।
বুধবার ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে দিনের বেলাতেই নেমে আসবে অস্বাভাবিক অন্ধকার। চাঁদ সূর্যের সামনে এসে সাময়িকভাবে সূর্যের আলো ঢেকে দেবে এবং পৃথিবীর ওপর ছড়িয়ে পড়বে তার ছায়া। অনেকের কাছে এটি জীবনে একবার দেখা সুযোগ। তবে সূর্যগ্রহণ অনুসরণকারীদের কাছে এমন ঘটনা যেন এক ধরনের নেশা।
ইংল্যান্ড থেকে স্পেনে দুই দিনের যাত্রা
চেশায়ারের বাসিন্দা মার্ক গ্রিফিথস সেই নেশারই এক উদাহরণ। দুটি উন্নত মানের ক্যামেরা, বিশেষায়িত দূরবীন ও একটি আকাশচিত্র ধারণের যন্ত্র সঙ্গে নিয়ে তিনি ইংল্যান্ড থেকে স্পেনের গালিসিয়ায় ছুটেছেন। সূর্যগ্রহণ দেখার জন্য গালিসিয়া ইউরোপের অন্যতম ভালো স্থান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
দুই দিন ধরে গাড়ি চালিয়ে ফ্রান্স পেরিয়ে স্পেনে পৌঁছেছেন তিনি। মাঝপথে বোর্দোতে কয়েক ঘণ্টা থেমে রাতের আকাশের ছবি তুলেছেন এবং সামান্য বিশ্রাম নিয়েছেন। ফলে দীর্ঘ যাত্রার পর তিনি বেশ ঘুমবঞ্চিত।
ছয় বছর আগে তার এই শখের শুরু। তখন উত্তর আলো দেখার আশায় শেটল্যান্ডে গিয়েছিলেন। কিন্তু খারাপ আবহাওয়ার কারণে তেমন কিছুই দেখতে পারেননি। তবু সেই হতাশা তাকে থামাতে পারেনি। বরং এরপর থেকে আকাশের অসাধারণ দৃশ্য দেখার আকর্ষণ আরও বেড়েছে।
উত্তর আলো দেখতে তিনি নিয়মিত আইসল্যান্ডে যান এবং সেখানে পর্যটকদের দলও নিয়ে যান। এ ছাড়া বিভিন্ন ধরনের মেরুজ্যোতি, সূর্যগ্রহণ এবং সমুদ্রের জীবজ্যোতির্ময় দৃশ্য ক্যামেরায় ধারণ করেছেন। তবে এবারের ঘটনাটি তার জন্য বিশেষ—এটাই তার প্রথম পূর্ণ সূর্যগ্রহণ।
গ্রিফিথসের ভাষায়, একবার দেখার পর তার আরও দেখতে ইচ্ছা হয়েছে। সূর্যগ্রহণপ্রেমীদের কাছে ইউরোপের ২৫ বছরেরও বেশি সময় পর দেখা এই পূর্ণ সূর্যগ্রহণ যেন ফুটবলপ্রেমীদের কাছে বিশ্বকাপের মতো।
আইসল্যান্ডে ছুটছেন নিউইয়র্কের দম্পতি
যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের সামান্থা ফিলিপস-ব্রাউন ও তার স্বামী গ্রেগরি এবার সূর্যগ্রহণ দেখতে উড়াল দিয়েছেন আইসল্যান্ডে। সেখানে পৌঁছে তারা একটি চলমান আবাসন ভাড়া করেছেন, যাতে প্রত্যন্ত এলাকায় গিয়ে গ্রহণ দেখা যায়।
২০২৩ সালে নিজেদের বাড়ির কাছাকাছি প্রথম সূর্যগ্রহণ দেখার পরই তাদের মনে হয়, এমন অভিজ্ঞতা আবারও পাওয়া দরকার। তাই এবারের যাত্রার জন্য এক বছরেরও বেশি সময় আগে উড়োজাহাজের টিকিট ও চলমান আবাসনের ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন তারা।
সামান্থা মনে করেন, প্রথমবারের অভিজ্ঞতাটি ছিল অবিশ্বাস্য। সূর্য ধীরে ধীরে অন্ধকার হয়ে আসা এবং একই সময়ে পাখিদের হঠাৎ ডাক বন্ধ করে দেওয়া—সব মিলিয়ে মুহূর্তটি ছিল অত্যন্ত অদ্ভুত ও বিস্ময়কর।
গ্রেগরির ভাবনায় আবার উঠে আসে বহু শতাব্দী আগের মানুষের কথা। আইসল্যান্ডের প্রথম দিকের বসতি স্থাপনকারীরা যখন এমন দৃশ্য দেখেছিলেন, তখন এর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা তাদের জানা ছিল না। ফলে হঠাৎ দিনের আলো হারিয়ে যাওয়া তাদের কাছে কতটা ভয়ংকর ও রহস্যময় মনে হয়েছিল, তা সহজেই অনুমান করা যায়।
গ্রহণের পথ ধরেই এগোচ্ছেন পর্যটকেরা
পূর্ণ সূর্যগ্রহণের ছায়ার পথ সাইবেরিয়ার প্রান্ত থেকে শুরু হয়ে আর্কটিক মহাসাগর অতিক্রম করবে। এরপর তা গ্রিনল্যান্ড ও আইসল্যান্ডের কিছু অংশের ওপর দিয়ে এগিয়ে উত্তর স্পেনে পৌঁছাবে এবং শেষ হবে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে। ইউরোপের আরও বিস্তৃত এলাকায় অবশ্য আংশিক সূর্যগ্রহণ দেখা যাবে।
যারা পূর্ণ গ্রহণের পথে থাকবেন, তাদের জন্য সবচেয়ে নাটকীয় মুহূর্তটি স্থায়ী হবে মাত্র কয়েক মিনিট। তবু সেই কয়েক মিনিটের জন্যই অনেকে মহাদেশ পাড়ি দিচ্ছেন।
সামান্থা ও গ্রেগরি আইসল্যান্ডের পূর্বাঞ্চলে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, হাঁটাহাঁটি করছেন এবং প্রকৃতির মধ্যে সময় কাটাচ্ছেন। এরপর তারা পশ্চিম দিকে এগিয়ে গিয়ে ওয়েস্টফিয়র্ডস উপদ্বীপে এমন একটি জায়গা খুঁজবেন, যেখান থেকে পূর্ণ গ্রহণ দেখা সম্ভব।
অতিরিক্ত মানুষের ভিড় ঠেকাতে কিছু সড়ক বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে—এমন কথাও তারা শুনেছেন। তাই ভিড় শুরু হওয়ার আগেই কয়েক দিন আগে সেখানে পৌঁছানোর পরিকল্পনা করেছেন সামান্থা।
১৯৯৯ সালের স্মৃতি ফিরিয়ে আনছেন বাবা-ছেলে
আরেক গ্রহণপ্রেমী অ্যান্ড্রু উইলস এবার স্ত্রী ও ৯০ বছর বয়সী বাবাকে নিয়ে যাচ্ছেন স্পেনের মায়োর্কা দ্বীপে। এই যাত্রার সঙ্গে জড়িয়ে আছে পারিবারিক এক পুরোনো স্মৃতিও।
১৯৯৯ সালে ইউরোপের সর্বশেষ পূর্ণ সূর্যগ্রহণ তারা বাবা-ছেলে একসঙ্গে দেখেছিলেন কর্নওয়ালের সেন্ট অ্যাগনেস বীকন থেকে। সেদিন আকাশ মেঘলা থাকায় গ্রহণের পুরো দৃশ্য দেখা যায়নি। তবে সমুদ্রের ওপর ছায়া দ্রুত এগিয়ে আসার বদলে আলো কমে যাওয়া এবং অন্ধকারের মতো অনুভূতি তাদের মনে গভীর ছাপ ফেলেছিল।
এবার মায়োর্কায় আকাশ পরিষ্কার থাকবে—এমন আশা করছেন অ্যান্ড্রু। দ্বীপটির পশ্চিমাঞ্চলের আন্দ্রাইচ শহরের কাছে একটি ভিলা ভাড়া করেছেন তারা। কাছাকাছি সমুদ্রের দিকে খোলা একটি জায়গাও বেছে রেখেছেন, যেখান থেকে গ্রহণ দেখার পরিকল্পনা রয়েছে।
তাদের অবস্থান পূর্ণ গ্রহণের পথের মধ্যে পড়লেও সূর্য তখন দিগন্তের বেশ নিচে থাকবে। ৯০ বছর বয়সী বাবার কথা মাথায় রেখে সঙ্গে কয়েকটি বসার চেয়ারও নেওয়ার পরিকল্পনা করেছেন তারা।
মায়োর্কা ও মেনোর্কা হবে স্থলভাগের শেষ কয়েকটি স্থান, যেখান থেকে সূর্য ডুবে যাওয়ার আগে পূর্ণ গ্রহণ দেখা সম্ভব হবে।
কয়েক মিনিটের অন্ধকারে মহাবিশ্বের বিস্ময়
অ্যান্ড্রুর কাছে সূর্যগ্রহণ শুধু একটি মহাজাগতিক দৃশ্য নয়, পৃথিবীতে মানুষের অস্তিত্বের বিরল সৌভাগ্যেরও স্মারক।
সূর্য চাঁদের তুলনায় প্রায় ৪০০ গুণ বড়। আবার চাঁদ পৃথিবীর তুলনায় প্রায় ৪০০ গুণ কাছে। এই আপাত কাকতালীয় অনুপাতের কারণেই চাঁদ যখন পৃথিবী ও সূর্যের মাঝখানে চলে আসে, তখন আকাশে সূর্যের ওপর প্রায় নিখুঁত ছায়া তৈরি হয়।
এই দৃশ্য তাকে জ্যোতির্বিজ্ঞানী কার্ল সাগানের পৃথিবী ও মহাবিশ্ব নিয়ে ভাবনার কথা মনে করিয়ে দেয়। বিশাল মহাবিশ্বের তুলনায় মানুষ ও পৃথিবী কতটা ক্ষুদ্র—তবু এই পৃথিবীতেই এমন অসাধারণ মহাজাগতিক দৃশ্য দেখার সুযোগ পাওয়া যায়।
সূর্যগ্রহণের স্থায়িত্ব হয়তো মাত্র কয়েক মিনিট। কিন্তু সেই অল্প সময়ের অভিজ্ঞতার জন্যই পৃথিবীর নানা প্রান্তের মানুষ হাজার হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিচ্ছেন। কারও কাছে এটি ছবি তোলার সুযোগ, কারও কাছে বৈজ্ঞানিক বিস্ময়, আবার কারও কাছে জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় একটি মুহূর্ত।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















