১২:৪৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ০৯ অগাস্ট ২০২৬
ফ্রান্সে বছরে মদপানে ৪১ হাজার মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ৩ লাখ ৭ হাজার জাপানের ভিন্ন পথ: শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ নয়, নিরাপদ ব্যবহারের লড়াই সিলেটে বাস দুর্ঘটনায় ৯ মৃত্যু: তদন্তে ৫ সদস্যের কমিটি, দুই বাসের নিবন্ধন বাতিল অযোধ্যার রামমন্দিরে অনুদান কেলেঙ্কারি, প্রশ্নের মুখে মোদির গর্বের প্রকল্প ফল প্রকাশের আগে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি নিয়ে দুশ্চিন্তা? জেনে নিন ক্লিয়ারিংয়ের পুরো পথ ওজন কমানোর ওষুধ বদলে দিচ্ছে মদ্যপানের অভ্যাস, কারও কমছে নেশার টান বাবার মৃত্যুর শোকে মেসি মাঠের বাইরে, শেষ মুহূর্তের গোলে মন্টেরের কাছে হার মায়ামির শতকোটি ডলারের উত্তরাধিকারেও হতাশ হবেন তরুণেরা, হাতে আসবে সম্পদের ছোট অংশ ব্রাজিলে হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত, একই পরিবারের তিন পর্যটকসহ নিহত ৪ হরমুজ প্রণালি নিয়ে ইরান-ওমান সমঝোতা প্রায় চূড়ান্ত, তবে খুলবে না নৌপথ

ছোট্ট নুমব্যাট, বড় এক শিক্ষা

অস্ট্রেলিয়ার প্রকৃতি রক্ষার লড়াইয়ে নুমব্যাট এখন শুধু একটি প্রাণীর নাম নয়, বরং দীর্ঘদিনের সংরক্ষণ প্রচেষ্টার একটি জীবন্ত উদাহরণ। একসময় ড্রায়ান্দ্রা বনভূমিতে নুমব্যাটের সংখ্যা ছিল ৫০টিরও কম। এখন সেই সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়েছে। পুরো অস্ট্রেলিয়ায় প্রায় ৩ হাজার নুমব্যাট রয়েছে। ড্রায়ান্দ্রায় তাদের সংখ্যা প্রায় দশ গুণ বেড়েছে।

এই সাফল্যের পেছনে কয়েক দশকের পরিশ্রম রয়েছে। বিজ্ঞানী টনি ফ্রেন্ড আশির দশকে যখন ড্রায়ান্দ্রায় কাজ শুরু করেন, তখন নুমব্যাটের অবস্থা ছিল অত্যন্ত নাজুক। এরপর সংরক্ষণকর্মী, গবেষক, স্বেচ্ছাসেবী এবং চিড়িয়াখানার কর্মীরা একসঙ্গে কাজ করে প্রাণীটির সংখ্যা বাড়ানোর চেষ্টা চালিয়ে যান।

প্রতিবছর বসন্তকালে নুমব্যাটের ওপর বিশেষ নজরদারি চালানো হয়। তাদের প্রজনন মৌসুমে যখন ছোট নুমব্যাটগুলো গর্ত থেকে বেরিয়ে আসতে শুরু করে, তখন গবেষকেরা প্রতিদিন নির্দিষ্ট পথে গাড়ি চালিয়ে বনভূমি পর্যবেক্ষণ করেন। প্রতিটি নুমব্যাট কোথায় দেখা গেল, তার অবস্থান কত দূরে, রাস্তা থেকে তার দূরত্ব কত—এসব তথ্য নথিভুক্ত করা হয়। পরে সেই তথ্য ব্যবহার করে পুরো এলাকার নুমব্যাটের ঘনত্ব ও জনসংখ্যার স্বাস্থ্য সম্পর্কে ধারণা নেওয়া হয়।

একটি প্রাণীর সংখ্যা বাড়ছে কি না, শুধু চোখে দেখে বোঝা যায় না। তাই এই দীর্ঘমেয়াদি তথ্য সংগ্রহ সংরক্ষণ পরিকল্পনার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

শিকারি প্রাণীর বিরুদ্ধে নিরন্তর লড়াই

নুমব্যাটের সবচেয়ে বড় বিপদগুলোর একটি হলো বন্য বিড়াল ও শিয়াল। এসব প্রাণী নুমব্যাটসহ অস্ট্রেলিয়ার বহু স্থানীয় প্রাণী শিকার করে।

Sharon Jones/BBC A numbat on a blackened log licks its nose

ড্রায়ান্দ্রার বনপথে বন্য বিড়াল ও শিয়াল শনাক্ত করে বিষ প্রয়োগের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করার যন্ত্রও ব্যবহার করা হচ্ছে। এটি মনে করিয়ে দেয়, একটি প্রাণীকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য শুধু তার আবাসস্থল রক্ষা করাই যথেষ্ট নয়; তার প্রাকৃতিক পরিবেশে ঢুকে পড়া ক্ষতিকর বিদেশি প্রাণীর বিরুদ্ধেও নিয়মিত ব্যবস্থা নিতে হয়।

অস্ট্রেলিয়ায় বন্য বিড়াল প্রতিবছর আনুমানিক ৩০০ কোটি প্রাণী হত্যা করে বলে ধারণা করা হয়। ফলে নুমব্যাটের মতো ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণীর জন্য বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে।

মানুষের কর্মকাণ্ডে সংকুচিত হচ্ছে আবাসস্থল

প্রাণী বিলুপ্তির আরেকটি বড় কারণ হলো আবাসস্থল ধ্বংস। কৃষি, খনিজ উত্তোলন, কাঠশিল্প ও নগর উন্নয়নের জন্য অস্ট্রেলিয়ার বহু গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক এলাকা পরিষ্কার করা হয়েছে।

ফলে একসময় যে প্রাণীগুলো বিশাল এলাকায় বিচরণ করত, তারা এখন ছোট ছোট বিচ্ছিন্ন বনাঞ্চলে আটকে আছে। একেকটি ছোট আবাসস্থলের মধ্যে প্রাণীর সংখ্যা কমে গেলে তাদের প্রজনন ও জিনগত বৈচিত্র্যও ঝুঁকির মুখে পড়ে।

একটি এলাকায় কোনো বিপর্যয় ঘটলে কাছাকাছি অন্য এলাকায় পালিয়ে যাওয়ার সুযোগও অনেক সময় থাকে না। ফলে আগুন, রোগ, খরা, বন্যা কিংবা অতিরিক্ত তাপমাত্রার মতো একটি বিপদই কোনো ছোট জনগোষ্ঠীকে ধ্বংস করে দিতে পারে।

রোগও কেড়ে নিচ্ছে প্রাণের অস্তিত্ব

অস্ট্রেলিয়ার বন্যপ্রাণী সংকটে রোগের ভূমিকাও বড়।

কোয়ালাদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া ক্ল্যামিডিয়া তাদের অস্তিত্বকে দেশের বহু অঞ্চলে বিপন্ন করে তুলেছে। আবার ত্বকখেকো ছত্রাকজনিত রোগ ইতোমধ্যে অস্ট্রেলিয়ায় অন্তত সাতটি ব্যাঙের প্রজাতি বিলুপ্ত হওয়ার সঙ্গে যুক্ত।

Sharon Jones/BBC Dr Tony Friend in the field

অর্থাৎ শুধু শিকারি প্রাণী বা মানুষের তৈরি অবকাঠামো নয়, রোগও একেকটি প্রজাতির জন্য অস্তিত্বের হুমকি হয়ে উঠছে।

কিছু প্রাণীর ক্ষেত্রে বিজ্ঞানীরা রোগের চিকিৎসা বা প্রতিরোধের চেষ্টা করছেন। কিন্তু এই কাজ অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ। অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসা কোনো প্রাণীকে স্থায়ীভাবে নিরাপদ করে না; বরং বিলুপ্তি ঠেকানোর জন্য কিছু অতিরিক্ত সময় এনে দেয়।

জলবায়ু পরিবর্তনের কঠিন বাস্তবতা

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও অস্ট্রেলিয়ার প্রাণীদের ওপর ক্রমশ ভয়াবহ হয়ে উঠছে।

অতিরিক্ত তাপমাত্রায় দেশটির স্থানীয় উড়ন্ত শিয়ালজাতীয় প্রাণী হাজার হাজার করে গাছ থেকে পড়ে মারা যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। অতিরিক্ত গরম তাদের শরীরের স্বাভাবিক তাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ভেঙে দেয়।

কোনো প্রাণীর খাদ্য যদি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কমে যায়, তাহলেও তার অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়ে। আবার কোনো প্রজাতি যদি নির্দিষ্ট গাছ, জলাভূমি বা বনভূমির ওপর নির্ভরশীল হয় এবং সেই আবাসস্থল বদলে যায়, তাহলে তার টিকে থাকাও কঠিন হয়ে পড়ে।

প্রাকৃতিক দুর্যোগও এখন আরও বড় হুমকি হয়ে উঠছে। দাবানল, বন্যা ও চরম তাপপ্রবাহের মতো ঘটনা একসঙ্গে বড় সংখ্যক প্রাণীকে হত্যা করতে পারে।

সংরক্ষণে অর্থের সংকট

অস্ট্রেলিয়ায় পরিবেশ রক্ষার জন্য বহু মানুষ স্বেচ্ছায় কাজ করছেন। বেসরকারি দাতা ও বিভিন্ন সংস্থাও অর্থ দিচ্ছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, এত বড় সংকট মোকাবিলায় এই প্রচেষ্টা যথেষ্ট নয়।

সরকার প্রকৃতি সংরক্ষণে বছরে প্রায় ৭০০ কোটি অস্ট্রেলীয় ডলার ব্যয় করে। কিন্তু পরিবেশ সংরক্ষণকর্মীদের হিসাবে প্রয়োজন প্রায় ৩ হাজার ৩০০ কোটি অস্ট্রেলীয় ডলার।

Courtesy WA DBCA A feral cat holding a small mammal in its mouth

তাদের যুক্তি, জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এখন বিনিয়োগ না করলে ভবিষ্যতে ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি হবে। কারণ প্রকৃতি ধ্বংস হলে তার প্রভাব শুধু বন্যপ্রাণীর ওপর পড়ে না; কৃষি, খাদ্য উৎপাদন, পর্যটন, পানি, অর্থনীতি ও মানুষের জীবনযাত্রার ওপরও পড়ে।

অন্যদিকে খনি, নিবিড় কৃষি ও জ্বালানির মতো খাতে এখনো বিপুল সরকারি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে বলে পরিবেশকর্মীদের অভিযোগ। তাদের একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, প্রকৃতির জন্য ইতিবাচক সংরক্ষণে সরকার যে এক ডলার ব্যয় করছে, প্রকৃতির ক্ষতি করে এমন ভর্তুকিতে তার প্রায় ২৬ গুণ অর্থ ব্যয় হচ্ছে।

সরকার অবশ্য এই হিসাব নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে।

রাজনৈতিক সদিচ্ছাই বড় প্রশ্ন

অস্ট্রেলিয়ায় পরিবেশ রক্ষা মূলত রাজ্যগুলোর দায়িত্ব হলেও জাতীয় গুরুত্বের বিষয়গুলোতে কেন্দ্রীয় সরকারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

২০২২ সালে ক্ষমতায় আসা লেবার সরকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তাদের আমলে নতুন কোনো প্রজাতি বিলুপ্ত হবে না। পরিবেশ সুরক্ষাকে তারা রাজনৈতিক কর্মসূচির গুরুত্বপূর্ণ অংশ করার কথাও বলেছে।

সরকার কার্বন নিঃসরণ কমাতে পদক্ষেপ নিয়েছে, নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প বাড়িয়েছে এবং কিছু বিপন্ন স্তন্যপায়ী প্রাণীকে বিলুপ্তির কিনারা থেকে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে সাফল্য পেয়েছে।

গত বছর পরিবেশ আইনেও বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়। এটিকে এক প্রজন্মের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশগত সংস্কার হিসেবে প্রশংসা করা হয়েছিল।

কিন্তু বিশেষজ্ঞদের অনেকে মনে করছেন, আইন পরিবর্তন করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। নতুন আইন বাস্তবে কীভাবে প্রয়োগ করা হবে, সেই কাঠামো এখনো পুরোপুরি কার্যকর হয়নি।

তাদের মতে, অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে বড় সমস্যা নতুন আইন তৈরি করা নয়; বরং বিদ্যমান আইন প্রয়োগ করার মতো রাজনৈতিক শক্তি ও সদিচ্ছা তৈরি করা।

Sharon Jones/BBC Carnaby's Black Cockatoo flock

অর্থনীতি বনাম পরিবেশের দ্বন্দ্ব

অস্ট্রেলিয়ার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির বড় অংশ এসেছে প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহার করে। খনিজ, কৃষি ও অন্যান্য সম্পদনির্ভর শিল্প এখনো দেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।

তাই পরিবেশ রক্ষার সিদ্ধান্ত যখন কোনো শিল্পের অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে সংঘর্ষে যায়, তখন রাজনৈতিক চাপ তৈরি হয়।

তাসমানিয়ায় সামুদ্রিক চাষশিল্প রক্ষার জন্য সরকার আইন পাস করার সময়ও এমন বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। পরিবেশবিদদের আশঙ্কা ছিল, এর ফলে বিপন্ন মজিয়ান স্কেট নামের এক ধরনের সামুদ্রিক প্রাণীর অস্তিত্ব আরও ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

এই ঘটনা দেখিয়েছে, অর্থনৈতিক স্বার্থের সামনে পরিবেশগত সিদ্ধান্ত কতটা দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।

অস্ট্রেলিয়ার সাবেক দীর্ঘদিনের পরিবেশমন্ত্রী রবার্ট হিলও স্বীকার করেছেন, গত তিন দশকের বিভিন্ন সরকার প্রকৃতি রক্ষায় যথেষ্ট করতে পারেনি। এমনকি তার নিজের সরকারও আরও বেশি করতে পারত বলে তিনি মনে করেন।

তার মতে, সরকার পরিবেশ রক্ষা করতে চাইলেও অর্থনৈতিক স্বার্থের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর মতো রাজনৈতিক শক্তি না থাকলে সেই আকাঙ্ক্ষা বাস্তবে রূপ পায় না।

প্রকৃতি রক্ষা মানে ভবিষ্যৎ অর্থনীতিকেও রক্ষা করা

পরিবেশবিদদের যুক্তি হলো, প্রকৃতি রক্ষাকে অর্থনীতির বিপরীত শক্তি হিসেবে দেখা ভুল।

সুস্থ পরিবেশ ছাড়া খাদ্য উৎপাদন, কৃষি, পর্যটন, নির্মাণ ও বহু শিল্প দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে পারে না। বন, নদী, সমুদ্র, মাটি ও প্রাণী—সব মিলেই একটি দেশের প্রাকৃতিক ভিত্তি তৈরি করে।

জীববৈচিত্র্যের কোনো একটি অংশ হারিয়ে গেলে তার প্রভাব কখন কোথায় গিয়ে পড়বে, তা সবসময় আগে থেকে বোঝা সম্ভব নয়।

কোনো একটি উদ্ভিদ ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ ওষুধের উপাদান হতে পারত। কোনো একটি প্রাণীর জিন কৃষির জন্য উপকারী হতে পারত। কোনো একটি জীব জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর নতুন বৈজ্ঞানিক পথ দেখাতে পারত।

প্রজাতি একবার বিলুপ্ত হয়ে গেলে সেই সম্ভাবনাও চিরতরে হারিয়ে যায়।

Graphic illustration of the map of Australia showing the remaining numbat habitats

নুমব্যাটের সাফল্য, কিন্তু লড়াই এখনো শেষ নয়

নুমব্যাটের সংখ্যা বাড়ার খবর তাই আনন্দের। আন্তর্জাতিক বিপন্ন তালিকায় তাদের অবস্থার উন্নতি সংরক্ষণকর্মীদের বহু বছরের শ্রমের স্বীকৃতি।

ড্রায়ান্দ্রায় কয়েক ঘণ্টা খোঁজার পর যখন একের পর এক নুমব্যাটের দেখা মিলল, তখন গবেষক ও স্বেচ্ছাসেবীদের আনন্দ ছিল স্পষ্ট। এমনকি দুটি জোড়া শাবকও দেখা যায়।

সেই বছরের পূর্ণ গণনাও ছিল অন্যতম সফল।

কিন্তু দীর্ঘদিনের সংরক্ষণকর্মী টনি ফ্রেন্ডের সতর্কতা ছিল স্পষ্ট—নুমব্যাট এখনো পুরোপুরি নিরাপদ নয়।

কারণ তালিকা থেকে কোনো প্রাণীকে সরিয়ে নেওয়া মানেই তার ভবিষ্যৎ নিশ্চিত হয়ে যাওয়া নয়।

ওয়য়লি বা ব্রাশ-টেইলড বেটংয়ের ঘটনাই তার উদাহরণ। এই প্রাণীর সংখ্যা একসময় কিছুটা বেড়েছিল। ফলে তাকে বিপন্ন তালিকা থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু প্রায় এক দশক পর পরিস্থিতি আবার খারাপ হয় এবং প্রাণীটিকে আরও খারাপ অবস্থায় নতুন করে বিপন্ন তালিকায় যুক্ত করতে হয়।

নুমব্যাটের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটতে পারে।

তাই সংরক্ষণকর্মীদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হলো—একটি প্রাণীর অবস্থা ভালো হয়েছে বলেই কাজ বন্ধ করে দেওয়া যাবে না।

নুমব্যাটকে টিকিয়ে রাখতে হলে বন্য বিড়াল ও শিয়ালের মতো শিকারি নিয়ন্ত্রণ, আবাসস্থল রক্ষা, প্রজনন কর্মসূচি, জিনগত বৈচিত্র্য বজায় রাখা এবং নিয়মিত পর্যবেক্ষণ চালিয়ে যেতে হবে।

প্রকৃতির জন্য অর্থায়নও দীর্ঘমেয়াদি হতে হবে।

Courtesy Perth Zoo Vicki Power with Tony Friend, who is holding a numbat in his hands at the Perth Zoo in the 1980s

আশার আলোকে ধরে রাখার দায়িত্ব মানুষের

অস্ট্রেলিয়ার সামনে এখন এক কঠিন বাস্তবতা। একদিকে দেশটির প্রকৃতি পৃথিবীর সবচেয়ে অনন্য জীববৈচিত্র্যের আবাসস্থল। অন্যদিকে সেই প্রকৃতিই দ্রুত সংকুচিত হচ্ছে।

নুমব্যাট দেখিয়েছে, মানুষের পরিকল্পিত ও ধারাবাহিক প্রচেষ্টা কোনো প্রজাতিকে বিলুপ্তির কিনারা থেকে ফিরিয়ে আনতে পারে।

কিন্তু নুমব্যাটের গল্প একই সঙ্গে সতর্ক করে দেয়—সংরক্ষণে সামান্য সাফল্য এলেই লড়াই শেষ হয় না।

বিজ্ঞানীরা জানেন কী কী কারণে প্রাণীরা বিলুপ্ত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে তারা এটাও জানেন, কীভাবে সেই প্রাণীদের রক্ষা করা যায়। প্রয়োজন শুধু সেই জ্ঞানকে বাস্তব পদক্ষেপে রূপ দেওয়া।

আজ নুমব্যাটের সংখ্যা বাড়ছে। আগামীকাল অন্য কোনো বিপন্ন প্রাণীকেও হয়তো একইভাবে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।

কিন্তু তার জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, পর্যাপ্ত অর্থ, শক্তিশালী আইন, কঠোর প্রয়োগ এবং মানুষের দীর্ঘমেয়াদি অঙ্গীকার।

অস্ট্রেলিয়ার নুমব্যাট তাই শুধু একটি প্রাণীর ফিরে আসার গল্প নয়। এটি প্রমাণ যে প্রকৃতি পুরোপুরি হারিয়ে যাওয়ার আগেই মানুষ চাইলে তাকে কিছুটা হলেও ফিরিয়ে আনতে পারে।

তবে সেই সুযোগ সীমিত।

কারণ একটি প্রাণী একবার পৃথিবী থেকে চিরতরে হারিয়ে গেলে তাকে ফিরিয়ে আনার কোনো সহজ পথ থাকে না।

নুমব্যাটের ফিরে আসা তাই আনন্দের খবর, কিন্তু একই সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার জন্য একটি বড় সতর্কবার্তাও—বাঁচানোর মতো সময় এখনো আছে, তবে আর সময় নষ্ট করার সুযোগ নেই।

Getty Images Aerial shot of salmon ponds off Bruny Island Tasmania

 

Sharon Jones/BBC Search for the numbat in the wild

জনপ্রিয় সংবাদ

ফ্রান্সে বছরে মদপানে ৪১ হাজার মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ৩ লাখ ৭ হাজার

ছোট্ট নুমব্যাট, বড় এক শিক্ষা

১১:২২:২৪ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৯ অগাস্ট ২০২৬

অস্ট্রেলিয়ার প্রকৃতি রক্ষার লড়াইয়ে নুমব্যাট এখন শুধু একটি প্রাণীর নাম নয়, বরং দীর্ঘদিনের সংরক্ষণ প্রচেষ্টার একটি জীবন্ত উদাহরণ। একসময় ড্রায়ান্দ্রা বনভূমিতে নুমব্যাটের সংখ্যা ছিল ৫০টিরও কম। এখন সেই সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়েছে। পুরো অস্ট্রেলিয়ায় প্রায় ৩ হাজার নুমব্যাট রয়েছে। ড্রায়ান্দ্রায় তাদের সংখ্যা প্রায় দশ গুণ বেড়েছে।

এই সাফল্যের পেছনে কয়েক দশকের পরিশ্রম রয়েছে। বিজ্ঞানী টনি ফ্রেন্ড আশির দশকে যখন ড্রায়ান্দ্রায় কাজ শুরু করেন, তখন নুমব্যাটের অবস্থা ছিল অত্যন্ত নাজুক। এরপর সংরক্ষণকর্মী, গবেষক, স্বেচ্ছাসেবী এবং চিড়িয়াখানার কর্মীরা একসঙ্গে কাজ করে প্রাণীটির সংখ্যা বাড়ানোর চেষ্টা চালিয়ে যান।

প্রতিবছর বসন্তকালে নুমব্যাটের ওপর বিশেষ নজরদারি চালানো হয়। তাদের প্রজনন মৌসুমে যখন ছোট নুমব্যাটগুলো গর্ত থেকে বেরিয়ে আসতে শুরু করে, তখন গবেষকেরা প্রতিদিন নির্দিষ্ট পথে গাড়ি চালিয়ে বনভূমি পর্যবেক্ষণ করেন। প্রতিটি নুমব্যাট কোথায় দেখা গেল, তার অবস্থান কত দূরে, রাস্তা থেকে তার দূরত্ব কত—এসব তথ্য নথিভুক্ত করা হয়। পরে সেই তথ্য ব্যবহার করে পুরো এলাকার নুমব্যাটের ঘনত্ব ও জনসংখ্যার স্বাস্থ্য সম্পর্কে ধারণা নেওয়া হয়।

একটি প্রাণীর সংখ্যা বাড়ছে কি না, শুধু চোখে দেখে বোঝা যায় না। তাই এই দীর্ঘমেয়াদি তথ্য সংগ্রহ সংরক্ষণ পরিকল্পনার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

শিকারি প্রাণীর বিরুদ্ধে নিরন্তর লড়াই

নুমব্যাটের সবচেয়ে বড় বিপদগুলোর একটি হলো বন্য বিড়াল ও শিয়াল। এসব প্রাণী নুমব্যাটসহ অস্ট্রেলিয়ার বহু স্থানীয় প্রাণী শিকার করে।

Sharon Jones/BBC A numbat on a blackened log licks its nose

ড্রায়ান্দ্রার বনপথে বন্য বিড়াল ও শিয়াল শনাক্ত করে বিষ প্রয়োগের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করার যন্ত্রও ব্যবহার করা হচ্ছে। এটি মনে করিয়ে দেয়, একটি প্রাণীকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য শুধু তার আবাসস্থল রক্ষা করাই যথেষ্ট নয়; তার প্রাকৃতিক পরিবেশে ঢুকে পড়া ক্ষতিকর বিদেশি প্রাণীর বিরুদ্ধেও নিয়মিত ব্যবস্থা নিতে হয়।

অস্ট্রেলিয়ায় বন্য বিড়াল প্রতিবছর আনুমানিক ৩০০ কোটি প্রাণী হত্যা করে বলে ধারণা করা হয়। ফলে নুমব্যাটের মতো ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণীর জন্য বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে।

মানুষের কর্মকাণ্ডে সংকুচিত হচ্ছে আবাসস্থল

প্রাণী বিলুপ্তির আরেকটি বড় কারণ হলো আবাসস্থল ধ্বংস। কৃষি, খনিজ উত্তোলন, কাঠশিল্প ও নগর উন্নয়নের জন্য অস্ট্রেলিয়ার বহু গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক এলাকা পরিষ্কার করা হয়েছে।

ফলে একসময় যে প্রাণীগুলো বিশাল এলাকায় বিচরণ করত, তারা এখন ছোট ছোট বিচ্ছিন্ন বনাঞ্চলে আটকে আছে। একেকটি ছোট আবাসস্থলের মধ্যে প্রাণীর সংখ্যা কমে গেলে তাদের প্রজনন ও জিনগত বৈচিত্র্যও ঝুঁকির মুখে পড়ে।

একটি এলাকায় কোনো বিপর্যয় ঘটলে কাছাকাছি অন্য এলাকায় পালিয়ে যাওয়ার সুযোগও অনেক সময় থাকে না। ফলে আগুন, রোগ, খরা, বন্যা কিংবা অতিরিক্ত তাপমাত্রার মতো একটি বিপদই কোনো ছোট জনগোষ্ঠীকে ধ্বংস করে দিতে পারে।

রোগও কেড়ে নিচ্ছে প্রাণের অস্তিত্ব

অস্ট্রেলিয়ার বন্যপ্রাণী সংকটে রোগের ভূমিকাও বড়।

কোয়ালাদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া ক্ল্যামিডিয়া তাদের অস্তিত্বকে দেশের বহু অঞ্চলে বিপন্ন করে তুলেছে। আবার ত্বকখেকো ছত্রাকজনিত রোগ ইতোমধ্যে অস্ট্রেলিয়ায় অন্তত সাতটি ব্যাঙের প্রজাতি বিলুপ্ত হওয়ার সঙ্গে যুক্ত।

Sharon Jones/BBC Dr Tony Friend in the field

অর্থাৎ শুধু শিকারি প্রাণী বা মানুষের তৈরি অবকাঠামো নয়, রোগও একেকটি প্রজাতির জন্য অস্তিত্বের হুমকি হয়ে উঠছে।

কিছু প্রাণীর ক্ষেত্রে বিজ্ঞানীরা রোগের চিকিৎসা বা প্রতিরোধের চেষ্টা করছেন। কিন্তু এই কাজ অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ। অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসা কোনো প্রাণীকে স্থায়ীভাবে নিরাপদ করে না; বরং বিলুপ্তি ঠেকানোর জন্য কিছু অতিরিক্ত সময় এনে দেয়।

জলবায়ু পরিবর্তনের কঠিন বাস্তবতা

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও অস্ট্রেলিয়ার প্রাণীদের ওপর ক্রমশ ভয়াবহ হয়ে উঠছে।

অতিরিক্ত তাপমাত্রায় দেশটির স্থানীয় উড়ন্ত শিয়ালজাতীয় প্রাণী হাজার হাজার করে গাছ থেকে পড়ে মারা যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। অতিরিক্ত গরম তাদের শরীরের স্বাভাবিক তাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ভেঙে দেয়।

কোনো প্রাণীর খাদ্য যদি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কমে যায়, তাহলেও তার অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়ে। আবার কোনো প্রজাতি যদি নির্দিষ্ট গাছ, জলাভূমি বা বনভূমির ওপর নির্ভরশীল হয় এবং সেই আবাসস্থল বদলে যায়, তাহলে তার টিকে থাকাও কঠিন হয়ে পড়ে।

প্রাকৃতিক দুর্যোগও এখন আরও বড় হুমকি হয়ে উঠছে। দাবানল, বন্যা ও চরম তাপপ্রবাহের মতো ঘটনা একসঙ্গে বড় সংখ্যক প্রাণীকে হত্যা করতে পারে।

সংরক্ষণে অর্থের সংকট

অস্ট্রেলিয়ায় পরিবেশ রক্ষার জন্য বহু মানুষ স্বেচ্ছায় কাজ করছেন। বেসরকারি দাতা ও বিভিন্ন সংস্থাও অর্থ দিচ্ছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, এত বড় সংকট মোকাবিলায় এই প্রচেষ্টা যথেষ্ট নয়।

সরকার প্রকৃতি সংরক্ষণে বছরে প্রায় ৭০০ কোটি অস্ট্রেলীয় ডলার ব্যয় করে। কিন্তু পরিবেশ সংরক্ষণকর্মীদের হিসাবে প্রয়োজন প্রায় ৩ হাজার ৩০০ কোটি অস্ট্রেলীয় ডলার।

Courtesy WA DBCA A feral cat holding a small mammal in its mouth

তাদের যুক্তি, জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এখন বিনিয়োগ না করলে ভবিষ্যতে ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি হবে। কারণ প্রকৃতি ধ্বংস হলে তার প্রভাব শুধু বন্যপ্রাণীর ওপর পড়ে না; কৃষি, খাদ্য উৎপাদন, পর্যটন, পানি, অর্থনীতি ও মানুষের জীবনযাত্রার ওপরও পড়ে।

অন্যদিকে খনি, নিবিড় কৃষি ও জ্বালানির মতো খাতে এখনো বিপুল সরকারি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে বলে পরিবেশকর্মীদের অভিযোগ। তাদের একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, প্রকৃতির জন্য ইতিবাচক সংরক্ষণে সরকার যে এক ডলার ব্যয় করছে, প্রকৃতির ক্ষতি করে এমন ভর্তুকিতে তার প্রায় ২৬ গুণ অর্থ ব্যয় হচ্ছে।

সরকার অবশ্য এই হিসাব নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে।

রাজনৈতিক সদিচ্ছাই বড় প্রশ্ন

অস্ট্রেলিয়ায় পরিবেশ রক্ষা মূলত রাজ্যগুলোর দায়িত্ব হলেও জাতীয় গুরুত্বের বিষয়গুলোতে কেন্দ্রীয় সরকারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

২০২২ সালে ক্ষমতায় আসা লেবার সরকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তাদের আমলে নতুন কোনো প্রজাতি বিলুপ্ত হবে না। পরিবেশ সুরক্ষাকে তারা রাজনৈতিক কর্মসূচির গুরুত্বপূর্ণ অংশ করার কথাও বলেছে।

সরকার কার্বন নিঃসরণ কমাতে পদক্ষেপ নিয়েছে, নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প বাড়িয়েছে এবং কিছু বিপন্ন স্তন্যপায়ী প্রাণীকে বিলুপ্তির কিনারা থেকে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে সাফল্য পেয়েছে।

গত বছর পরিবেশ আইনেও বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়। এটিকে এক প্রজন্মের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশগত সংস্কার হিসেবে প্রশংসা করা হয়েছিল।

কিন্তু বিশেষজ্ঞদের অনেকে মনে করছেন, আইন পরিবর্তন করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। নতুন আইন বাস্তবে কীভাবে প্রয়োগ করা হবে, সেই কাঠামো এখনো পুরোপুরি কার্যকর হয়নি।

তাদের মতে, অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে বড় সমস্যা নতুন আইন তৈরি করা নয়; বরং বিদ্যমান আইন প্রয়োগ করার মতো রাজনৈতিক শক্তি ও সদিচ্ছা তৈরি করা।

Sharon Jones/BBC Carnaby's Black Cockatoo flock

অর্থনীতি বনাম পরিবেশের দ্বন্দ্ব

অস্ট্রেলিয়ার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির বড় অংশ এসেছে প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহার করে। খনিজ, কৃষি ও অন্যান্য সম্পদনির্ভর শিল্প এখনো দেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।

তাই পরিবেশ রক্ষার সিদ্ধান্ত যখন কোনো শিল্পের অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে সংঘর্ষে যায়, তখন রাজনৈতিক চাপ তৈরি হয়।

তাসমানিয়ায় সামুদ্রিক চাষশিল্প রক্ষার জন্য সরকার আইন পাস করার সময়ও এমন বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। পরিবেশবিদদের আশঙ্কা ছিল, এর ফলে বিপন্ন মজিয়ান স্কেট নামের এক ধরনের সামুদ্রিক প্রাণীর অস্তিত্ব আরও ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

এই ঘটনা দেখিয়েছে, অর্থনৈতিক স্বার্থের সামনে পরিবেশগত সিদ্ধান্ত কতটা দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।

অস্ট্রেলিয়ার সাবেক দীর্ঘদিনের পরিবেশমন্ত্রী রবার্ট হিলও স্বীকার করেছেন, গত তিন দশকের বিভিন্ন সরকার প্রকৃতি রক্ষায় যথেষ্ট করতে পারেনি। এমনকি তার নিজের সরকারও আরও বেশি করতে পারত বলে তিনি মনে করেন।

তার মতে, সরকার পরিবেশ রক্ষা করতে চাইলেও অর্থনৈতিক স্বার্থের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর মতো রাজনৈতিক শক্তি না থাকলে সেই আকাঙ্ক্ষা বাস্তবে রূপ পায় না।

প্রকৃতি রক্ষা মানে ভবিষ্যৎ অর্থনীতিকেও রক্ষা করা

পরিবেশবিদদের যুক্তি হলো, প্রকৃতি রক্ষাকে অর্থনীতির বিপরীত শক্তি হিসেবে দেখা ভুল।

সুস্থ পরিবেশ ছাড়া খাদ্য উৎপাদন, কৃষি, পর্যটন, নির্মাণ ও বহু শিল্প দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে পারে না। বন, নদী, সমুদ্র, মাটি ও প্রাণী—সব মিলেই একটি দেশের প্রাকৃতিক ভিত্তি তৈরি করে।

জীববৈচিত্র্যের কোনো একটি অংশ হারিয়ে গেলে তার প্রভাব কখন কোথায় গিয়ে পড়বে, তা সবসময় আগে থেকে বোঝা সম্ভব নয়।

কোনো একটি উদ্ভিদ ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ ওষুধের উপাদান হতে পারত। কোনো একটি প্রাণীর জিন কৃষির জন্য উপকারী হতে পারত। কোনো একটি জীব জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর নতুন বৈজ্ঞানিক পথ দেখাতে পারত।

প্রজাতি একবার বিলুপ্ত হয়ে গেলে সেই সম্ভাবনাও চিরতরে হারিয়ে যায়।

Graphic illustration of the map of Australia showing the remaining numbat habitats

নুমব্যাটের সাফল্য, কিন্তু লড়াই এখনো শেষ নয়

নুমব্যাটের সংখ্যা বাড়ার খবর তাই আনন্দের। আন্তর্জাতিক বিপন্ন তালিকায় তাদের অবস্থার উন্নতি সংরক্ষণকর্মীদের বহু বছরের শ্রমের স্বীকৃতি।

ড্রায়ান্দ্রায় কয়েক ঘণ্টা খোঁজার পর যখন একের পর এক নুমব্যাটের দেখা মিলল, তখন গবেষক ও স্বেচ্ছাসেবীদের আনন্দ ছিল স্পষ্ট। এমনকি দুটি জোড়া শাবকও দেখা যায়।

সেই বছরের পূর্ণ গণনাও ছিল অন্যতম সফল।

কিন্তু দীর্ঘদিনের সংরক্ষণকর্মী টনি ফ্রেন্ডের সতর্কতা ছিল স্পষ্ট—নুমব্যাট এখনো পুরোপুরি নিরাপদ নয়।

কারণ তালিকা থেকে কোনো প্রাণীকে সরিয়ে নেওয়া মানেই তার ভবিষ্যৎ নিশ্চিত হয়ে যাওয়া নয়।

ওয়য়লি বা ব্রাশ-টেইলড বেটংয়ের ঘটনাই তার উদাহরণ। এই প্রাণীর সংখ্যা একসময় কিছুটা বেড়েছিল। ফলে তাকে বিপন্ন তালিকা থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু প্রায় এক দশক পর পরিস্থিতি আবার খারাপ হয় এবং প্রাণীটিকে আরও খারাপ অবস্থায় নতুন করে বিপন্ন তালিকায় যুক্ত করতে হয়।

নুমব্যাটের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটতে পারে।

তাই সংরক্ষণকর্মীদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হলো—একটি প্রাণীর অবস্থা ভালো হয়েছে বলেই কাজ বন্ধ করে দেওয়া যাবে না।

নুমব্যাটকে টিকিয়ে রাখতে হলে বন্য বিড়াল ও শিয়ালের মতো শিকারি নিয়ন্ত্রণ, আবাসস্থল রক্ষা, প্রজনন কর্মসূচি, জিনগত বৈচিত্র্য বজায় রাখা এবং নিয়মিত পর্যবেক্ষণ চালিয়ে যেতে হবে।

প্রকৃতির জন্য অর্থায়নও দীর্ঘমেয়াদি হতে হবে।

Courtesy Perth Zoo Vicki Power with Tony Friend, who is holding a numbat in his hands at the Perth Zoo in the 1980s

আশার আলোকে ধরে রাখার দায়িত্ব মানুষের

অস্ট্রেলিয়ার সামনে এখন এক কঠিন বাস্তবতা। একদিকে দেশটির প্রকৃতি পৃথিবীর সবচেয়ে অনন্য জীববৈচিত্র্যের আবাসস্থল। অন্যদিকে সেই প্রকৃতিই দ্রুত সংকুচিত হচ্ছে।

নুমব্যাট দেখিয়েছে, মানুষের পরিকল্পিত ও ধারাবাহিক প্রচেষ্টা কোনো প্রজাতিকে বিলুপ্তির কিনারা থেকে ফিরিয়ে আনতে পারে।

কিন্তু নুমব্যাটের গল্প একই সঙ্গে সতর্ক করে দেয়—সংরক্ষণে সামান্য সাফল্য এলেই লড়াই শেষ হয় না।

বিজ্ঞানীরা জানেন কী কী কারণে প্রাণীরা বিলুপ্ত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে তারা এটাও জানেন, কীভাবে সেই প্রাণীদের রক্ষা করা যায়। প্রয়োজন শুধু সেই জ্ঞানকে বাস্তব পদক্ষেপে রূপ দেওয়া।

আজ নুমব্যাটের সংখ্যা বাড়ছে। আগামীকাল অন্য কোনো বিপন্ন প্রাণীকেও হয়তো একইভাবে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।

কিন্তু তার জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, পর্যাপ্ত অর্থ, শক্তিশালী আইন, কঠোর প্রয়োগ এবং মানুষের দীর্ঘমেয়াদি অঙ্গীকার।

অস্ট্রেলিয়ার নুমব্যাট তাই শুধু একটি প্রাণীর ফিরে আসার গল্প নয়। এটি প্রমাণ যে প্রকৃতি পুরোপুরি হারিয়ে যাওয়ার আগেই মানুষ চাইলে তাকে কিছুটা হলেও ফিরিয়ে আনতে পারে।

তবে সেই সুযোগ সীমিত।

কারণ একটি প্রাণী একবার পৃথিবী থেকে চিরতরে হারিয়ে গেলে তাকে ফিরিয়ে আনার কোনো সহজ পথ থাকে না।

নুমব্যাটের ফিরে আসা তাই আনন্দের খবর, কিন্তু একই সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার জন্য একটি বড় সতর্কবার্তাও—বাঁচানোর মতো সময় এখনো আছে, তবে আর সময় নষ্ট করার সুযোগ নেই।

Getty Images Aerial shot of salmon ponds off Bruny Island Tasmania

 

Sharon Jones/BBC Search for the numbat in the wild