হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ও জাহাজ চলাচল নিয়ে ওমানের সঙ্গে ইরানের সমঝোতা প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। তবে শুধু এই সমঝোতা হলেই গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ খুলে দেওয়া হবে না বলে জানিয়েছে তেহরান। ইরানের দাবি, প্রণালি দিয়ে স্বাভাবিকভাবে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল শুরু করতে হলে যুক্তরাষ্ট্রকেও বেশ কিছু শর্ত পূরণ করতে হবে।
এদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়ার সময় ইরান একটি জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। একই সময়ে ওমান জানিয়েছে, প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ব্যবস্থা নিয়ে ইরানের সঙ্গে তাদের আলোচনা ইতিবাচক ও গঠনমূলকভাবে এগোচ্ছে।
হরমুজ প্রণালি ইরান ও ওমানকে আলাদা করেছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হিসেবে পরিচিত এই প্রণালি ঘিরে সমঝোতাকে চলমান যুদ্ধের অবসানের বৃহত্তর উদ্যোগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে হামলার পর যুদ্ধ শুরু হয়। এরপর তেহরান বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রপ্তানি পথটির ওপর কার্যত কঠোর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে।
সমঝোতা হলেও প্রণালি খুলতে যুক্তরাষ্ট্রের শর্ত মানতে হবে

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি বলেছেন, হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে নতুন একটি নৌপথ চালুর বিষয়ে ইরান ও ওমান একটি সমঝোতার খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। তবে শুধু ইরান-ওমান সমঝোতার ভিত্তিতে প্রণালি খুলে দেওয়া হবে না।
তিনি বলেন, প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়টি আরও কিছু শর্তের ওপর নির্ভর করছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইরানকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়টিও রয়েছে।
ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থার সচিব মোহাম্মদ বাকের জোলকদর আরও কয়েকটি শর্তের কথা জানিয়েছেন। তার মধ্যে রয়েছে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের হুমকি বন্ধ করা, ইরান ও তার লেবানন, ফিলিস্তিন, ইয়েমেন ও ইরাকের মিত্রদের বিরুদ্ধে আগ্রাসন বন্ধ করা, ইরানের ওপর অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া এবং ইরানের জব্দ করা সম্পদ মুক্ত করে দেওয়া।
ওমানের সঙ্গে আলোচনা ইতিবাচক
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ে ইরানের সঙ্গে আলোচনা ইতিবাচক ও গঠনমূলকভাবে এগোচ্ছে বলে জানিয়েছে ওমান। একই সঙ্গে প্রণালির মধ্য দিয়ে চলাচলকারী জাহাজে ধারাবাহিক হামলার ঘটনাকে নিন্দা জানিয়েছে দেশটি। তবে হামলার জন্য কোনো পক্ষকে সরাসরি দায়ী করেনি ওমান।
ওমানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, আলোচনার অগ্রগতি যাতে কোনো কর্মকাণ্ডের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকে সব পক্ষকে সতর্ক থাকতে হবে। আলোচনায় সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের স্বার্থ বিবেচনায় নেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছে দেশটি।
আরাকচি জানিয়েছেন, এর আগে হরমুজ প্রণালিতে যে পদ্ধতিতে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হতো, তা এখন তেহরানের কাছে আর গ্রহণযোগ্য নয়। স্থায়ী নৌপথ নির্ধারণের প্রযুক্তিগত ও আইনি বিষয়গুলো সমাধান না হওয়া পর্যন্ত ওমানের সঙ্গে একটি অস্থায়ী নৌপথ নিয়ে আলোচনা চলছে।
‘চুক্তির জন্য এখনই সবচেয়ে ভালো সময়’
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, সমঝোতায় পৌঁছানোর জন্য বর্তমান সময়টিই সবচেয়ে উপযুক্ত।
ইরানের সংবাদ সংস্থাগুলোকে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, দেশের ভেতরে এখন ঐক্য, শক্তি ও সংহতি রয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এই যুদ্ধে ইরান নিজেদের বিজয়ী ও শক্তিশালী অবস্থানে মনে করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে ইরান উপসাগরীয় দেশগুলো ও জর্ডানে থাকা মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালিতে চলাচলকারী জাহাজগুলোকেও লক্ষ্যবস্তু করেছে।
যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস পরিবহনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই সরু জলপথ দিয়ে যাতায়াত করত। ফলে প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হওয়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে।
হরমুজে আবারও জাহাজে হামলার অভিযোগ
সংযুক্ত আরব আমিরাত জানিয়েছে, দেশটির রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি জাহাজ হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়ার সময় ইরান সেটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। সর্বশেষ হামলায় কোনো ব্যক্তি আহত হননি বলে জানানো হয়েছে।
যুক্তরাজ্যের সামুদ্রিক বাণিজ্য পর্যবেক্ষণ সংস্থাও জানিয়েছে, একটি জাহাজ অজ্ঞাত কোনো নিক্ষিপ্ত বস্তুর আঘাতে আগুন ধরে যাওয়ার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। আগুন নিভিয়ে ফেলা সম্ভব হয়েছে এবং পরিবেশের ওপর কোনো প্রভাব পড়ার খবর পাওয়া যায়নি।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে ইরানি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

যুক্তরাষ্ট্রও সমঝোতার অপেক্ষায়
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন বারবার ইঙ্গিত দিয়ে আসছে যে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার বিষয়ে সমঝোতা খুব কাছাকাছি। তবে এর আগে প্রতিবারই ইরান আলোচনা চলার বিষয়টি অস্বীকার করেছে।
শুক্রবার এক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছিলেন, ইরান ও ওমানের মধ্যে শিগগিরই একটি সমঝোতা হতে পারে বলে ওয়াশিংটন আশা করছে। সেই সমঝোতার ফলে স্বাভাবিক তেল পরিবহন আবার শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ওই কর্মকর্তা আরও জানান, বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল বাধাহীনভাবে পুনরায় চালুর ঘোষণা দেওয়া হলে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোর ওপর আরোপ করা অবরোধ তুলে নেবে। তবে ইরান নিজেদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করছে কি না, তার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপও সম্পৃক্ত থাকবে।
৩০টির বেশি জাহাজকে মানবিক সহায়তার জন্য যেতে দেওয়া হয়েছে
মার্কিন কেন্দ্রীয় কমান্ড জানিয়েছে, বর্তমান অবরোধ শুরু হওয়ার পর মানবিক সহায়তা নিয়ে ৩০টির বেশি জাহাজকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
তবে একই সময়ে ৫৩টি জাহাজকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে, দুটি জাহাজকে অচল করে দেওয়া হয়েছে এবং আরও দুটি জাহাজে মার্কিন বাহিনী উঠে তল্লাশি চালিয়েছে বলে জানিয়েছে মার্কিন কেন্দ্রীয় কমান্ড।
ইরানে যুদ্ধ শুরুর পর খাদ্য ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম দ্রুত বেড়েছে। শনিবার এক সংবাদ সম্মেলনে পেজেশকিয়ান মৌলিক পণ্য আমদানিতে সৃষ্ট সমস্যার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করেছেন।
তবে মানবিক সহায়তার জন্য কোনো বিশেষ ছাড় দেওয়া হয়েছে কি না, সে বিষয়ে তিনি কিছু বলেননি।

ইরানের বিপ্লবী গার্ডেরও স্পষ্ট অবস্থান
ইরানের বিপ্লবী গার্ডও জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া ইরান-ওমান আলোচনার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত নয়। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রণালি খুলতে হলে ওয়াশিংটনকে প্রথমে ইরানের শর্ত মেনে নিতে হবে।
বিপ্লবী গার্ডের মুখপাত্র হোসেইন মোহেব্বি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যখনই ইরানের শর্ত মেনে নেবে, তখনই হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া হবে।
ইরানকে প্রণালিতে নিয়ন্ত্রণ দেওয়ার প্রস্তাব নিয়ে বিতর্ক
চলতি সপ্তাহে ইরান ও ওমানের মধ্যে আলোচনার সম্ভাব্য একটি সমঝোতা নিয়ে নতুন তথ্য সামনে আসে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর বরাত দিয়ে জানা যায়, প্রস্তাবিত সমঝোতার আওতায় উপসাগরে প্রবেশকারী জাহাজগুলোর ওপর ইরানকে কিছুটা নিয়ন্ত্রণ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে।
এটি ইরানের জন্য এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় ছাড়গুলোর একটি হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
তবে মার্কিন কর্মকর্তারা বারবার বলে আসছেন, বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি বাণিজ্যপথের প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা ইরানকে দেওয়ার বিষয়ে তারা কখনোই সম্মত হবে না। সর্বশেষ প্রস্তাবের কাঠামো পরিবর্তন করা হয়েছে কি না, তা অবশ্য স্পষ্ট নয়।

জ্বালানি বাজারে বাড়ছে চাপ
চলমান সংঘাতকে কাজে লাগিয়ে ইরান তেলবাহী জাহাজের কাছ থেকে মাশুল আদায় শুরু করেছে। পাশাপাশি অনুমতি ছাড়া হরমুজ প্রণালি অতিক্রমের চেষ্টা করা জাহাজে হামলার ঘটনাও ঘটেছে।
এসব কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে জ্বালানি দামের ওপর। একই সঙ্গে বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বেড়েছে।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস পরিবহন হওয়ায় এই জলপথ নিয়ে ইরান, ওমান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যে কোনো সমঝোতা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে ইরানের সাম্প্রতিক বক্তব্য অনুযায়ী, ওমানের সঙ্গে চুক্তি হলেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বড় কয়েকটি বিষয়ে সমাধান না হওয়া পর্যন্ত প্রণালি পুরোপুরি উন্মুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা নেই।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















