কিয়েভে পৌঁছালে প্রথম দেখায় মনে হতে পারে, এটি ইউরোপের অন্য যেকোনো ব্যস্ত রাজধানীর মতোই একটি শহর। ট্রাম চলছে, বাজারে ফুল বিক্রি হচ্ছে, দোকানপাট খোলা, মানুষ নিজেদের দৈনন্দিন কাজকর্মে ব্যস্ত। কিন্তু একটু এগোলেই সেই স্বাভাবিকতার আবরণ সরে যায়। ধ্বংস হয়ে যাওয়া আবাসিক ভবন, ক্ষতিগ্রস্ত বিপণিবিতান কিংবা ছাদহীন রেস্তোরাঁ মনে করিয়ে দেয়—ইউক্রেন এখনো একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের মধ্যে রয়েছে।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে আমার প্রথম আন্তর্জাতিক সফরে কিয়েভে গিয়ে এই বাস্তবতা আরও স্পষ্টভাবে দেখেছি। পোল্যান্ড থেকে রাতের ট্রেনে ইউক্রেনের দিকে যাওয়ার সময়ই রুশ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চলছিল। বুধবারের হামলায় ১৭ জন নিহত এবং ৪০ জনের বেশি আহত হন। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোর মধ্যে সেটি ছিল অন্যতম ভয়াবহ রাত।
তারপরও ইউক্রেনীয়রা জীবন থামিয়ে দেয়নি। যুদ্ধের মধ্যেও তারা কাজে যাচ্ছে, সন্তানদের দেখাশোনা করছে, ব্যবসা চালাচ্ছে এবং দেশের প্রতিরক্ষায় অংশ নিচ্ছে। তাদের দৃঢ়তা অসাধারণ। অথচ তারা নিজেরাই এটিকে বীরত্ব বলে মনে করে না। তাদের বক্তব্য, বেঁচে থাকার এবং দেশ রক্ষার জন্য এগিয়ে যাওয়া ছাড়া তাদের আর কোনো পথ নেই।
কিন্তু এই লড়াই ইউক্রেনের একার হতে পারে না।
শীতকে বারবার যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে রাশিয়া
ইউক্রেনের জন্য শীত এখন কেবল একটি ঋতু নয়; এটি যুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত পর্যায়। তাপমাত্রা কমতে শুরু করলেই রাশিয়া বিদ্যুৎকেন্দ্র, উপকেন্দ্র এবং তাপ সরবরাহ ব্যবস্থার মতো অবকাঠামোতে হামলা বাড়ানোর চেষ্টা করে। লক্ষ্য শুধু বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করা নয়। এর মাধ্যমে সাধারণ মানুষের জীবনকে আরও কঠিন করে তোলা, হাসপাতালের কার্যক্রম ব্যাহত করা এবং প্রতিরক্ষা শিল্পের উৎপাদন সক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করার চেষ্টা করা হয়।
অন্ধকার ও ঠান্ডার মধ্যে একটি দেশের জনগণকে দীর্ঘদিন আটকে রাখা গেলে তাদের মনোবল ভেঙে দেওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হয়। তাই আসন্ন শীতের প্রস্তুতি শুরু করতে হবে এখনই। হামলা শুরু হওয়ার পর প্রতিক্রিয়া দেখালে অনেক দেরি হয়ে যেতে পারে।
ইউক্রেন ইতোমধ্যেই যুদ্ধক্ষেত্রে অসাধারণ উদ্ভাবনী সক্ষমতার পরিচয় দিয়েছে। বিশেষ করে ড্রোন প্রযুক্তির ব্যবহার আধুনিক যুদ্ধের ধরন বদলে দেওয়ার মতো সম্ভাবনা দেখিয়েছে। রাশিয়াও যুদ্ধের শুরুতে যে দ্রুত সাফল্যের প্রত্যাশা করেছিল, তা পূরণ করতে পারেনি। কিয়েভ দখলের উদ্দেশ্যে পাঠানো রুশ ট্যাংকগুলোর একটি অংশ এখন ইউক্রেনের প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
তবে এই সাফল্যকে চূড়ান্ত ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।
ইউক্রেনীয়রা জানে, শীত পরিস্থিতির গতিপথ বদলে দিতে পারে। তাই শহর, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো এবং সাধারণ মানুষকে রুশ ক্ষেপণাস্ত্র থেকে রক্ষা করার সক্ষমতা বাড়ানো এখন সবচেয়ে জরুরি কাজগুলোর একটি।
বিশেষ করে প্রয়োজন আরও শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।
প্রতিশ্রুতি নয়, প্রয়োজন বাস্তব সামরিক সক্ষমতা
ব্রিটেনের পক্ষ থেকে ইউক্রেনের প্রতি সমর্থন কোনো একটি সরকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। বরিস জনসন থেকে শুরু করে কিয়ার স্টারমার পর্যন্ত ব্রিটেনের বিভিন্ন সরকারই ইউক্রেনের পাশে থাকার অঙ্গীকার করেছে। এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে।
তবে শুধু রাজনৈতিক সমর্থন যথেষ্ট নয়। ক্ষেপণাস্ত্র যখন একটি শহরের দিকে ছুটে আসে, তখন বিবৃতি নয়—প্রয়োজন এমন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যা সেই হামলা ঠেকাতে পারে।
আমার দায়িত্ব তাই পরিষ্কার। ইউক্রেনের প্রয়োজনীয় কোনো সক্ষমতা ব্রিটেনের হাতে থাকলে তা সরবরাহ করতে হবে। আর কোনো সক্ষমতা আমাদের হাতে না থাকলে মিত্রদের সঙ্গে সমন্বয় করে সেটি সংগ্রহের ব্যবস্থা করতে হবে।
এ ক্ষেত্রে আকাশ প্রতিরক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
ইউক্রেন ডিফেন্স কনট্যাক্ট গ্রুপের সঙ্গে প্রায় ৫০টি দেশ যুক্ত। জার্মান প্রতিরক্ষামন্ত্রী বরিস পিস্টোরিয়াসের সঙ্গে এই উদ্যোগে কাজ করতে গিয়ে আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত একটি বিষয়—মিত্রদের রাজনৈতিক সদিচ্ছাকে বাস্তব সামরিক সক্ষমতায় পরিণত করা।
অর্থাৎ ইউক্রেনের কী প্রয়োজন, কোথায় ঘাটতি রয়েছে, কোন দেশ কী দিতে পারে এবং সেই সহায়তা কীভাবে দ্রুত পৌঁছে দেওয়া যায়—এসব প্রশ্নের উত্তর শীত শুরু হওয়ার আগেই নিশ্চিত করতে হবে।
ইউক্রেনকে সহায়তা করার নৈতিক ও কৌশলগত কারণ
ইউক্রেনের যুদ্ধকে শুধু দুটি দেশের মধ্যকার সংঘাত হিসেবে দেখা ভুল হবে। এটি একই সঙ্গে একটি বৃহত্তর প্রশ্নের পরীক্ষা—একটি শক্তিশালী দেশ কি সামরিক শক্তি ব্যবহার করে প্রতিবেশী একটি স্বাধীন দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে পারবে?
এই প্রশ্নের উত্তর ইউরোপের আগামী কয়েক দশকের নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করবে।
রাশিয়ার চাপ ও উসকানি শুধু ইউক্রেনের ভূখণ্ডে সীমাবদ্ধ নয়। ইউরোপের বিভিন্ন দেশের আকাশসীমা, সাইবার জগত এবং সমুদ্রাঞ্চলেও রুশ তৎপরতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। অবশ্যই এগুলোর মাত্রা ইউক্রেনীয়দের ওপর চালানো ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সঙ্গে তুলনীয় নয়। কিন্তু একটি বিষয় একই—চাপ প্রয়োগের সুযোগ তৈরি হলে তা আরও বাড়তে পারে।
তাই ইউক্রেনকে সমর্থন করা কোনো দান বা মানবিক অনুদানের বিষয় নয়। এটি ইউরোপের নিজস্ব নিরাপত্তার প্রশ্ন। একই সঙ্গে এটি সেই নীতির প্রতিরক্ষা, যেখানে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র নিজের ভবিষ্যৎ নিজেই নির্ধারণ করার অধিকার রাখে।
এই শতাব্দী শেষ পর্যন্ত কোন মূল্যবোধ দ্বারা পরিচালিত হবে—স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র, নাকি শক্তি ও কর্তৃত্ববাদ—ইউক্রেনের যুদ্ধ সেই প্রশ্নের অন্যতম বড় পরীক্ষা।
ইউরোপের অপেক্ষা করার সুযোগ নেই
কিয়েভ ছাড়ার সময়ও আমি জানতাম, রুশ হামলা আবার শুরু হবে। ইউক্রেনীয়দের প্রয়োজনও তখন পরিষ্কার ছিল। এখন দায়িত্ব তাদের মিত্রদের।
শীত আসার পর নতুন করে প্রস্তুতি নেওয়ার পরিবর্তে তার আগেই প্রয়োজনীয় অস্ত্র, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং অন্যান্য সামরিক সক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে।
ইউক্রেনের প্রতি ব্রিটেনের সমর্থন অবিচল থাকতে হবে। একই সঙ্গে ইউরোপের অন্য মিত্রদেরও তাদের প্রতিশ্রুতিকে বাস্তব সহায়তায় রূপ দিতে হবে।
কারণ ইউক্রেন শুধু নিজের ভূখণ্ড রক্ষার জন্য লড়ছে না। তারা এমন একটি নীতির পক্ষে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে আগ্রাসন দিয়ে কোনো স্বাধীন দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা যায় না।
এই লড়াইয়ে কথার চেয়ে কার্যকর পদক্ষেপই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আর আসন্ন শীতের আগে সেই পদক্ষেপ নেওয়ার সময় এখনই।
লেখক ঃ ওয়েস স্ট্রিটিং, ব্রিটিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী
ওয়েস স্ট্রিটিং 



















