কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই আগের যেকোনো সাধারণ প্রযুক্তির তুলনায় অনেক দ্রুত বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে। বাষ্পীয় ইঞ্জিন নিম্নআয়ের দেশগুলোতে পৌঁছাতে প্রায় ৮০ বছর, বিদ্যুৎ ৪০ বছর এবং ইন্টারনেট প্রায় ২০ বছর সময় নিলেও এআইয়ের বিস্তার ঘটছে নজিরবিহীন গতিতে। চ্যাটজিপিটি চালুর মাত্র ছয় মাসের মধ্যে এর বৈশ্বিক ব্যবহারের অর্ধেক এসেছে মধ্যম আয়ের দেশগুলো থেকে।
বিশ্বব্যাংকের ‘ওয়ার্ল্ড ডেভেলপমেন্ট রিপোর্ট ২০২৬: দ্য প্রমিজ অব আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই দ্রুত বিস্তার উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য ঐতিহাসিক সুযোগ তৈরি করেছে। এআই এমন দক্ষতা ও বিশেষজ্ঞ জ্ঞান সহজলভ্য করতে পারে, যার ঘাটতি বহু দেশে দীর্ঘদিনের। ফলে কয়েক দশক ধরে সমাধান না হওয়া জটিল সমস্যার ক্ষেত্রেও দ্রুত অগ্রগতি সম্ভব।
দশকে শতবর্ষের অগ্রগতির সম্ভাবনা
বিশ্বব্যাংকের মতে, এআই ইতোমধ্যে শুধু তথ্য বা পূর্বাভাস দেওয়ার পর্যায়ে নেই। এটি এখন কনটেন্ট তৈরি থেকে শুরু করে জটিল কাজ স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পাদনের সক্ষমতা অর্জন করছে। উন্নয়নের ক্ষেত্রে এআই কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে মানুষের সক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে এর ভূমিকা, উন্নত এআই প্রযুক্তির উৎপাদনে কেন্দ্রীভূত নিয়ন্ত্রণ এবং প্রয়োজনীয় সহায়ক অবকাঠামোর ওপর।
এআই এমন অনেক জ্ঞানভিত্তিক কাজ করতে পারে, যেগুলোর জন্য সাধারণত বিশেষজ্ঞ মানুষের প্রয়োজন হয়। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে যেখানে দক্ষ বিশেষজ্ঞের ঘাটতি রয়েছে, সেখানে এআই মানুষের সক্ষমতার পরিপূরক হিসেবে কাজ করতে পারে। কৃষিতে এর সুফল ইতোমধ্যে দেখা যাচ্ছে। এআইনির্ভর আবহাওয়ার পূর্বাভাস কৃষকদের উৎপাদনসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত আরও কার্যকর করতে সহায়তা করছে।
তবে প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ অল্প কয়েকটি দেশ ও প্রতিষ্ঠানের হাতে কেন্দ্রীভূত হওয়ায় নির্ভরতার ঝুঁকিও রয়েছে। সবচেয়ে উন্নত এআই মডেল, সেগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় চিপ এবং ডেটা সেন্টারের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে সীমিতসংখ্যক কোম্পানি। তবে এই কেন্দ্রীভবনের একটি সুবিধাও রয়েছে—উন্নয়নশীল দেশগুলোকে শুরু থেকে বিপুল অর্থ ব্যয় করে নিজস্ব উন্নত এআই ব্যবস্থা তৈরি করতে হচ্ছে না; বিদ্যমান মডেল নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী মানিয়ে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
স্থানীয় বাস্তবতায় এআই ব্যবহারের গুরুত্ব
বিশ্বব্যাংক বলছে, উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য শুধু এআই গ্রহণ করাই যথেষ্ট নয়; স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে প্রযুক্তিকে মানিয়ে নেওয়াই সবচেয়ে বেশি সুফল দিতে পারে। উচ্চআয়ের দেশের তথ্য ও পরিস্থিতি দিয়ে প্রশিক্ষিত কোনো এআই ব্যবস্থা অন্য দেশের সামাজিক রীতি, অর্থনৈতিক বাস্তবতা বা মানুষের প্রয়োজনের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।
এ কারণে স্থানীয় ভাষা, জীবনযাত্রা ও মানুষের সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে এআই সমাধান তৈরি করা জরুরি। উদাহরণ হিসেবে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যারা পড়তে পারেন না বা স্মার্টফোন কেনার সামর্থ্য রাখেন না, তাদের জন্য সাধারণ মোবাইল ফোনে ভয়েস কলের মাধ্যমে এআইভিত্তিক পরামর্শ পৌঁছে দেওয়া যেতে পারে।
তবে সবচেয়ে উন্নত এআই মডেল নিজস্বভাবে তৈরি করা উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য অত্যন্ত ব্যয়বহুল। এর জন্য উন্নত চিপ, বড় ডেটা সেন্টার, বিপুল প্রশিক্ষণ-ডেটা এবং বিশ্বমানের গবেষক প্রয়োজন। তাই অধিকাংশ উন্নয়নশীল দেশের জন্য নিকট ভবিষ্যতে নিজেদের ফ্রন্টিয়ার এআই মডেল তৈরি করা বাস্তবসম্মত লক্ষ্য নয়।

বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট ও শিক্ষায় বিনিয়োগ জরুরি
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে সরকারকে এআইয়ের সক্ষমতা কাজে লাগাতে একই সঙ্গে সহায়ক, ব্যবহারকারী ও নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা পালনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সাশ্রয়ী কম্পিউটিং সুবিধা, যৌথ ডেটা অবকাঠামো, নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট এআই ব্যবহারের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
এর পাশাপাশি মানসম্মত শিক্ষা ব্যবস্থা এবং শক্তিশালী ব্যবসায়িক পরিবেশ প্রয়োজন, যাতে এআইভিত্তিক নতুন উদ্যোগগুলো অর্থায়ন পায় এবং নতুন ধারণা পরীক্ষার সুযোগ তৈরি হয়।
সরকার নিজেও কৃষি সম্প্রসারণ, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ জনসেবায় এআই ব্যবহার করে কার্যকর প্রযুক্তি পরীক্ষা, মূল্যায়ন ও বিস্তৃত করতে পারে। একই সঙ্গে নিরাপদ ও বিশ্বাসযোগ্য এআই নিশ্চিত করতে শিল্পখাতের স্বেচ্ছামূলক মানদণ্ডকে প্রাথমিক ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করার পরামর্শ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। যেখানে বিদ্যমান আইন মানুষের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হবে, সেখানে ক্ষতিকর বা অনিরাপদ এআই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে এমন নীতি তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যা অপ্রয়োজনীয় বাধা সৃষ্টি করবে না।
বিশ্বব্যাংকের বার্তা হলো, উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এআইয়ের সবচেয়ে বড় সুযোগ অত্যাধুনিক প্রযুক্তি তৈরির প্রতিযোগিতায় নামা নয়; বরং বিদ্যমান প্রযুক্তিকে স্থানীয় প্রয়োজনের সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে দক্ষতা, জনসেবা ও উৎপাদনশীলতা বাড়ানো। সঠিক অবকাঠামো, দক্ষতা ও নীতিগত প্রস্তুতি থাকলে এআই এমন অগ্রগতি এনে দিতে পারে, যা অন্যথায় অর্জন করতে এক শতাব্দীও লেগে যেতে পারত।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে এআইয়ের দ্রুত বিস্তারকে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য ঐতিহাসিক সুযোগ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। স্থানীয় প্রয়োজন অনুযায়ী এআই ব্যবহার, দক্ষতা উন্নয়ন এবং নির্ভরযোগ্য অবকাঠামো গড়ে তোলার মাধ্যমে এই প্রযুক্তি উন্নয়নের গতি বহুগুণ বাড়াতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















