সুদানের রাজধানী খার্তুমে এখন আর আগের সেই কোলাহল নেই। একসময় লাখো মানুষের ব্যস্ততায় মুখর থাকা শহরটির বহু রাস্তা আজ নীরব। কোথাও ধ্বংসপ্রাপ্ত ভবন, কোথাও পোড়া গাড়ি, কোথাও যুদ্ধের ক্ষতচিহ্ন। রাত নামলে বহু এলাকা ডুবে যায় অন্ধকারে। তিন বছরের বেশি সময় ধরে চলা সংঘাত রাজধানীকে এমন এক অবস্থায় নিয়ে গেছে, যেখানে যুদ্ধ থামলেও তার ধ্বংসের ছাপ বহু বছর থেকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
২০২৩ সালের ১৫ এপ্রিল সুদানের সেনাবাহিনী ও দ্রুত সহায়তা বাহিনীর মধ্যে সংঘাত শুরু হয়। শুরুতে রাজধানীর বড় অংশ নিয়ন্ত্রণে নেয় দ্রুত সহায়তা বাহিনী। প্রায় দুই বছর পর সেনাবাহিনী খার্তুম পুনর্দখল করে। কিন্তু রাজধানী পুনরুদ্ধার করলেও পুরো দেশের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি তারা।
যুদ্ধের ভয়াবহতায় প্রায় ৫০ লাখ মানুষ খার্তুম ছেড়ে পালিয়েছিলেন। পুরো সুদানে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখে পৌঁছেছে। ফলে এটি শুধু সুদানের রাজনৈতিক বা সামরিক সংকট নয়, বরং চলতি শতাব্দীর সবচেয়ে বড় মানবিক বিপর্যয়গুলোর একটি।
খার্তুমে ফিরছে মানুষ, ফিরছে না স্বাভাবিক জীবন
সেনাবাহিনী রাজধানীর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর আনুমানিক ২০ লাখ মানুষ ধীরে ধীরে নিজেদের বাড়িতে ফিরেছেন। কিছু এলাকায় পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ আংশিকভাবে চালু হয়েছে। স্কুল, হাসপাতাল ও সরকারি দপ্তরের কিছু কার্যক্রমও আবার শুরু হয়েছে।
কিন্তু শহরের পুনর্গঠন এখনো অনেক দূরের পথ। গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ভবন, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ বহু স্থাপনা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। অভিজাত এলাকার অনেক বাড়িঘর লুট হয়েছে। অসংখ্য পরিবার এখনো নিজেদের পুরোনো ঘরে ফিরতে পারেনি।
শহরের বিভিন্ন জায়গায় পড়ে আছে অবিস্ফোরিত গোলাবারুদ। এখন পর্যন্ত প্রায় ৪০ হাজার এমন বিস্ফোরক শনাক্ত করা হয়েছে। অথচ রাজধানীর মাত্র এক শতাংশ এলাকা নিরাপদভাবে পরিষ্কার করা সম্ভব হয়েছে। ফলে ঘরে ফেরা মানুষের জন্যও যুদ্ধের ঝুঁকি পুরোপুরি শেষ হয়নি।
দারফুরে ভয়াবহতার নতুন অধ্যায়
খার্তুম পুনর্দখলের পর সেনাবাহিনী কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে গেলেও দারফুরে দ্রুত সহায়তা বাহিনী শক্ত অবস্থান ধরে রেখেছে।
২০২৫ সালের অক্টোবরে দীর্ঘ অবরোধের পর দারফুরের রাজধানী এল ফাশের দ্রুত সহায়তা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। ওই সময় ব্যাপক হত্যাকাণ্ড ঘটে। জাতিসংঘের তদন্তকারীরা ঘটনাটিতে গণহত্যার বৈশিষ্ট্য থাকার কথা জানিয়েছিলেন।
এর ফলে দারফুরের বিশাল অংশ এখনো দ্রুত সহায়তা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে। অঞ্চলটি সুদানের ভবিষ্যৎ যুদ্ধের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হয়ে আছে।
সেনাবাহিনীর সাম্প্রতিক অগ্রগতি
সাম্প্রতিক সময়ে অবশ্য পরিস্থিতি কিছুটা বদলেছে। সেনাবাহিনী ইথিওপিয়া সীমান্তের কাছে কুরমুক পুনর্দখল করেছে। এরপর খার্তুম থেকে উত্তর কর্দোফানের গুরুত্বপূর্ণ শহর এল-ওবেইদের দিকে যাওয়া কয়েকটি শহর ও সড়ক নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে।
এল-ওবেইদ এখন সেনাবাহিনীর হাতে থাকলেও দ্রুত সহায়তা বাহিনীর অবস্থান ঘিরে রয়েছে শহরটিকে। সেখানে নতুন করে বড় ধরনের হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে—এমন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ড্রোন হামলা ও সশস্ত্র আক্রমণের কারণে হাজারো মানুষ আবারও ঘর ছেড়ে পালিয়েছেন।
বিদেশি শক্তির অস্ত্রেই কি দীর্ঘ হচ্ছে যুদ্ধ?
সুদানের যুদ্ধের পেছনে শুধু অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াই নেই। আঞ্চলিক শক্তিগুলোর স্বার্থও এতে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।
দ্রুত সহায়তা বাহিনীর সঙ্গে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা রয়েছে। অন্যদিকে সুদানের সেনাবাহিনী তুরস্ক, মিসর, সৌদি আরব ও কাতারের কাছ থেকে বিভিন্ন ধরনের সহায়তা পেয়েছে।
ড্রোন ও আধুনিক অস্ত্র যুদ্ধের ধরনও বদলে দিয়েছে। আগে যেখানে নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চল যুদ্ধের বাইরে থাকার সুযোগ পেত, এখন দূরপাল্লার ড্রোন হামলার কারণে নিরাপদ এলাকা কমে যাচ্ছে।
লোহিত সাগর কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
সুদানের দীর্ঘ উপকূল লোহিত সাগরের পাশে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনের জন্য এই অঞ্চল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ইরান ও উপসাগরীয় শক্তিগুলোর মধ্যকার উত্তেজনা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সুদানের লোহিত সাগর উপকূলের কৌশলগত গুরুত্বও বেড়েছে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও মিসর—তিন দেশই এই অঞ্চলে নিজেদের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থ নিয়ে গভীরভাবে চিন্তিত।
ফলে সুদানের যুদ্ধ শুধু খার্তুম বা দারফুরের নিয়ন্ত্রণের লড়াই নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে গেছে লোহিত সাগরের আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্যও।

শান্তি আলোচনার পথ কেন বন্ধ?
সুদানে যুদ্ধ বন্ধের জন্য যুক্তরাষ্ট্র, মিসর, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতকে নিয়ে একটি চারদেশীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু দেশগুলোর নিজেদের মধ্যেই সুদান নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে।
সৌদি আরব ও মিসর সুদানের সেনাবাহিনীকে রাষ্ট্রের বৈধ কাঠামোর অংশ হিসেবে দেখে। অন্যদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত সেনাবাহিনীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ইসলামপন্থী শক্তির সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন নিয়ে উদ্বিগ্ন।
এই অবস্থায় দুই পক্ষকে একই আলোচনার টেবিলে বসানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
যুদ্ধের সবচেয়ে বড় শিকার সাধারণ মানুষ
সুদানের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতারা ক্ষমতা নিয়ে লড়াই করলেও এর সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছে সাধারণ মানুষ।
কোস্তির কাছে একটি শরণার্থী শিবিরে হাজার হাজার মানুষ অস্থায়ী তাঁবুতে বসবাস করছেন। কেউ বোমা হামলা থেকে পালিয়ে এসেছেন, কেউ হারিয়েছেন ঘরবাড়ি, কেউ স্বজন। খাদ্য, চিকিৎসা ও নিরাপত্তার অভাব তাদের জীবনকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
শিবিরে থাকা এক পরিবারের চার বছরের শিশুও সম্প্রতি মারা গেছে বলে জানা গেছে। এমন ঘটনা যুদ্ধের প্রকৃত মানবিক মূল্যকে সামনে নিয়ে আসে।
সামনে কি আরও দীর্ঘ যুদ্ধ?
সুদানে অন্তত ১৫০টি সশস্ত্র গোষ্ঠী সংঘাতে জড়িয়ে আছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাদের অনেকেই জাতিগত, আঞ্চলিক বা স্থানীয় স্বার্থে লড়াই করছে।
ফলে সেনাবাহিনী ও দ্রুত সহায়তা বাহিনীর মধ্যে কোনো সমঝোতা হলেও সব অস্ত্রধারী গোষ্ঠীকে যুদ্ধ থামাতে রাজি করানো কঠিন হবে।
বর্ষাকালে সাধারণত যুদ্ধ কিছুটা ধীর হয়ে আসার সুযোগ থাকে। কিন্তু আবহাওয়ার পরিবর্তন ও বৃষ্টিপাত কমে গেলে সেই সাময়িক বিরতিও নাও আসতে পারে। একই সময়ে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হলে খাদ্য সংকট আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
সুদানের সবচেয়ে বড় ভয় তাই শুধু যুদ্ধের আরেকটি বছর নয়। ভয় হলো—যুদ্ধ যেন মানুষের কাছে স্বাভাবিক জীবনের অংশ হয়ে যায়।
খার্তুমের নীরব রাস্তা, ধ্বংসপ্রাপ্ত ভবন, অবিস্ফোরিত গোলাবারুদ এবং শরণার্থী শিবিরে বসবাস করা পরিবারগুলো মনে করিয়ে দিচ্ছে, সামরিক বিজয় মানেই শান্তি নয়। যুদ্ধ থামাতে হলে শুধু অস্ত্রের ব্যবহার বন্ধ করাই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন রাজনৈতিক সমঝোতা, বিদেশি শক্তিগুলোর স্বার্থের সমন্বয় এবং সাধারণ মানুষের নিরাপদ ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা।
Sarakhon Report 



















