করোনাভাইরাস মহামারির পর কর্মজীবনে দূর থেকে কাজের যে অভ্যাস তৈরি হয়েছিল, তা এখন অনেক প্রতিষ্ঠানে বদলে গেছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অফিসে ফেরার নীতিমালা ধীরে ধীরে স্থায়ী রূপ নেওয়ায় কর্মীদের মধ্যেও তৈরি হয়েছে নানা ধরনের নিজস্ব কর্মপদ্ধতি। কেউ সপ্তাহের পাঁচ দিনই অফিসে থাকতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন, কেউ সপ্তাহের মাঝামাঝি কয়েক দিন অফিসে যান, আবার কেউ প্রয়োজন ছাড়া অফিসে যাওয়ার পক্ষপাতী নন।
এই পরিবর্তিত কর্মপরিবেশে অফিসে যাওয়ার ধরনও যেন কর্মীদের আলাদা আলাদা পরিচয় তৈরি করেছে।
সপ্তাহের পাঁচ দিন অফিসে থাকা কর্মী
কিছু কর্মীর কাছে অফিস শুধু কাজের জায়গা নয়, বরং কর্মজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সান ফ্রান্সিসকোর প্রকৌশল ব্যবস্থাপক শাওহুয়া ঝৌ এমনই একজন।
দীর্ঘদিন দূর থেকে কাজ করার পর তিনি একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠানে যোগ দেন। প্রতিষ্ঠানটি কর্মীদের যতটা সম্ভব অফিসে আসতে উৎসাহিত করত। ঝৌ সেটিকে সপ্তাহে পাঁচ দিন অফিসে থাকার নির্দেশনা হিসেবে নিয়েছিলেন।
অন্য সহকর্মীরা সপ্তাহে তিন দিন অফিসে এলেও তিনি প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত অফিসে থাকতেন। ১৫ জনের একটি দলের ব্যবস্থাপক হিসেবে তিনি মনে করতেন, কর্মীরা অফিসে এসে যেন তাকে খুঁজে পান—এটা নিশ্চিত করা তার দায়িত্ব।
তার মতে, একজন ব্যবস্থাপক অফিসকে গুরুত্ব দিলে অন্য কর্মীরাও সেটিকে গুরুত্ব দেওয়ার বার্তা পান।
তবে শুধু প্রতিষ্ঠানের নীতি মেনে চলার জন্যই তিনি অফিসে যেতেন না। বাড়ির বসার ঘর থেকে কাজ করতে গিয়ে নিজেকে অনেক সময় আটকে থাকা মনে হতো। অফিসে তিনি বেশি জায়গা, ভালো খাবার ও কফির সুবিধা পেতেন। এমনকি বাড়ি থেকে অফিসে যাওয়ার ৩০ থেকে ৪০ মিনিটের পথও তার কাছে উপকারী ছিল। এই সময়টায় তিনি দিনের কাজ ও অগ্রাধিকার নিয়ে ভাবতে পারতেন।
ভোরে কাজ শুরু করা কর্মী
কেউ আবার দিনের শুরুতেই কাজ শেষ করার পথ বেছে নেন।
ব্যবসায়িক শিক্ষায় ভর্তি হওয়ার আগে গ্রিসেলদা রামোস এমন একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন, যেখানে কর্মীরা নিজেদের কাজের সময় বেছে নিতে পারতেন। তার সামনে সকাল ৭টা থেকে ১০টার মধ্যে কাজ শুরুর বিভিন্ন সুযোগ ছিল।
তিনি বেছে নেন সকাল ৭টা থেকে বিকেল ৩টার সময়সূচি।
মিয়ামির যানজটের কথা মাথায় রেখে এই সিদ্ধান্ত তার যাতায়াতের সময় অনেক কমিয়ে দেয়। সকাল ৭টায় বের হলে অফিসে পৌঁছাতে তার ১৫ থেকে ২০ মিনিট লাগত। কিন্তু সকাল ৯টার প্রচলিত সময়ে বের হলে একই পথ যেতে ৪৫ মিনিট থেকে এক ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লাগতে পারত।
তার অভিজ্ঞতায়, কাজের সময়ের সামান্য পরিবর্তনও ব্যক্তিগত জীবনের মানে বড় পার্থক্য তৈরি করতে পারে।
সপ্তাহের মাঝামাঝি অফিসযোদ্ধা
আবার এমন কর্মীও আছেন যারা সপ্তাহের মাঝামাঝি কয়েক দিন অফিসে গিয়ে কাজ করতে সবচেয়ে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।
ইয়ান অ্যান্টোনফের দল মঙ্গলবার ও বৃহস্পতিবার অফিসে যাওয়ার পরিকল্পনা করলেও তিনি বুধবারও অফিসে যান। নিউইয়র্কের একটি যৌথ কর্মস্থল থেকে তিনি মঙ্গলবার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত কাজ করেন।
অফিসে যাওয়ার আগে ব্যায়াম করাও তার দিনের অংশ। এরপর সকাল ৯টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত কাজ করেন।
জনসংযোগের মতো পেশায় সহকর্মীদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা ও হঠাৎ কোনো ধারণা নিয়ে কথা বলার সুযোগকে তিনি গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন। একসঙ্গে দুপুরের খাবার খাওয়ার সময় কাজের আলোচনা থেকে শুরু করে বিনোদনজগতের নানা বিষয়েও কথাবার্তা হয়।
তার মতে, সামনাসামনি কথা বলার এই স্বাভাবিক পরিবেশ অনলাইন বার্তা বা ভার্চুয়াল বৈঠকের মাধ্যমে পুরোপুরি পাওয়া যায় না।
তবে সপ্তাহে তিন দিনই তার কাছে আদর্শ। সোমবার ও শুক্রবার বাড়ি থেকে কাজ করার সুযোগ থাকায় তিনি দৌড়ের দলে যেতে পারেন, বিভিন্ন জায়গা থেকে কাজ করতে পারেন এবং পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতে পারেন।
মাসে কয়েক দিনের অফিস পর্যটক
কিছু কর্মীর জন্য অফিসে যাওয়াটা নিয়মিত অভ্যাস নয়, বরং নির্দিষ্ট প্রয়োজনের অংশ।
ম্যাসাচুসেটসের হিসাবরক্ষক স্টিফেন নাপোলিতানোকে মাসে দুই থেকে আট দিন অফিসে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। তিনি সহজ একটি নিয়ম বেছে নিয়েছেন—দুই সপ্তাহে এক বুধবার অফিসে যাওয়া।
এই দিনে তার দলের অন্যরাও সাধারণত অফিসে থাকেন। ফলে বৈঠক করা, সহকর্মীদের সঙ্গে দেখা করা এবং যেসব কাজ সামনাসামনি করা সহজ, সেগুলো ওই দিনেই শেষ করেন।
যানজট এড়াতে তিনি সকাল ৭টার দিকে অফিসে পৌঁছান এবং বিকেল ৪টার দিকে বের হন। তার অভিজ্ঞতায়, মাত্র এক ঘণ্টা দেরিতে বের হলেই যাতায়াতের সময় প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যেতে পারে।
এর বাইরে নিয়মিত অফিসে যাওয়ার বিশেষ প্রয়োজন তিনি দেখেন না।
অফিসে থেকেও একা থাকা কর্মী
অফিসে যাওয়া মানেই যে সহকর্মীদের সঙ্গে সারাক্ষণ মেলামেশা করতে হবে, এমন নয়।
পল ক্রকেট এমন একজন কর্মী, যিনি প্রতিষ্ঠানের অফিসে ফেরার নীতির কারণে সপ্তাহে তিন দিন অফিসে যান। শুরুতে তিনি সপ্তাহে দুই দিন যেতেন। পরে প্রতিষ্ঠানের অনুরোধে তা তিন দিনে বাড়িয়েছেন।
তবে অফিসে গিয়েও দিনের বেশির ভাগ সময় তিনি একটি ব্যক্তিগত কক্ষে একাই কাজ করেন।
তার দলের সাত-আটজন কর্মীর অধিকাংশই দূর থেকে কাজ করেন। ফলে অফিসে গেলেও সহকর্মীদের সঙ্গে সরাসরি কাজ করার সুযোগ খুব বেশি হয় না। তবু অফিসে যাওয়াটা তার কাছে পুরোপুরি অর্থহীন নয়।
তার ভাষায়, অফিসে উপস্থিত থাকলে কাজ এবং প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নিজের সংযোগটা কিছুটা বেশি অনুভব করেন।
দূর থেকে কাজের পক্ষে চলে যাওয়া কর্মী
অন্যদিকে এমন কর্মীও আছেন, যারা একসময় অফিসে কাজ করতে পছন্দ করলেও এখন আর সহজে অফিসে ফিরতে চান না।
ডেভিন বোদ্রোর মতো কর্মীরা মহামারির আগে কাজ ও ব্যক্তিগত জীবনকে আলাদা রাখতে অফিসকেই আদর্শ জায়গা মনে করতেন। অফিসে ছিল একাধিক পর্দা, ভালো কর্মটেবিল এবং কাজের জন্য আলাদা পরিবেশ।
কিন্তু মহামারির সময় প্রতিষ্ঠান কর্মীদের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেয়। ধীরে ধীরে বাড়ি থেকেই কাজের অভ্যাস তৈরি হয়। এরপর আর অফিসে ফিরে যাওয়ার আগ্রহ তৈরি হয়নি।
দূর থেকে কাজ করার ফলে সহকর্মীদের সঙ্গে হঠাৎ দেখা হওয়া বা স্বাভাবিক আলাপের সুযোগ কমেছে—এমন অসুবিধা তিনি স্বীকার করেন। কিন্তু এর বিনিময়ে ব্যক্তিগত জীবনে পাওয়া স্বাধীনতাকে তিনি বেশি মূল্য দেন।
আগে দুপুরের বিরতিতে বাড়িতে থাকা অসুস্থ কুকুরটির খোঁজ নিতে তাকে অফিস থেকে দ্রুত বাড়ি যেতে হতো, আবার কাজে ফিরতে হতো। এখন দূর থেকে কাজ করায় এমন পরিস্থিতি সামলানো অনেক সহজ।
বাড়িতে কোনো মেরামতের কাজ হলে কয়েক ঘণ্টার অপেক্ষার সময় নিয়েও তাকে অফিসে উপস্থিত থাকার চিন্তা করতে হয় না। এমনকি শুক্রবার রাত ১১টায় কোনো কাজের ধারণা মাথায় এলে তিনি চাইলে সঙ্গে সঙ্গে কম্পিউটার খুলে কাজ শুরু করতে পারেন।
তার বিশ্বাস, কর্মী যদি ভালো ফলাফল দিতে পারেন, তাহলে প্রতিদিন অফিসে উপস্থিত থাকা নিয়ে প্রতিষ্ঠানের সন্দেহ করার কারণ কমে যায়।
অফিসে ফেরার নীতির নতুন বাস্তবতা
অফিসে ফেরার নীতি এখন আর শুধু সপ্তাহে কত দিন কর্মী অফিসে থাকছেন—এই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই। বরং কর্মীরা নিজেদের কাজের ধরন, যাতায়াতের সময়, পরিবার, ব্যক্তিগত পছন্দ এবং উৎপাদনশীলতার সঙ্গে মিলিয়ে আলাদা আলাদা রুটিন তৈরি করছেন।
কারও কাছে প্রতিদিন অফিসে থাকা আত্মবিশ্বাস ও নেতৃত্বের প্রতীক। কারও কাছে সপ্তাহের মাঝামাঝি কয়েক দিন অফিসে যাওয়াই সবচেয়ে কার্যকর। কেউ আবার মাসে কয়েক দিন অফিসে গিয়ে প্রয়োজনীয় কাজ সেরে নিতে চান। আর অনেকের কাছে বাড়ি থেকেই ভালো ফলাফল দেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থাৎ অফিসে ফেরার যুগে কর্মীদের জন্য একটিমাত্র আদর্শ ব্যবস্থা নেই। বরং কর্মীভেদে তৈরি হচ্ছে ভিন্ন ভিন্ন কর্মজীবনের ছন্দ।
আপনি কোন ধরনের অফিসকর্মী—সপ্তাহে পাঁচ দিন অফিসে থাকা কর্মী, ভোরে কাজ শুরু করা কর্মী, সপ্তাহের মাঝামাঝি অফিসযোদ্ধা, মাসে কয়েক দিনের অফিস পর্যটক, অফিসে থেকেও একা থাকা কর্মী, নাকি পুরোপুরি দূর থেকে কাজের পক্ষে চলে যাওয়া কর্মী?
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















