১৯৯৩ সালে মুক্তি পাওয়া ‘জুরাসিক পার্ক’ সিনেমা বিলুপ্ত ডাইনোসরের প্রতি মানুষের আগ্রহ যেমন বাড়িয়েছিল, তেমনি সাপ, গিরগিটি, ইগুয়ানা ও নানা ধরনের সরীসৃপ পালনের প্রতিও তৈরি করেছিল নতুন আকর্ষণ। কিন্তু এসব প্রাণীকে ঘিরে গড়ে ওঠা বিশাল বাণিজ্যের আড়ালে যে চোরাচালান, মাদক ব্যবসা, অর্থের লোভ ও সংঘবদ্ধ অপরাধের জগৎ রয়েছে, সেটিই এবার উঠে এসেছে নতুন তথ্যচিত্র ‘মনস্টার্স অব গড’-এ।
এইচবিও ম্যাক্সে প্রকাশিত পাঁচ পর্বের তথ্যচিত্রটি নির্মাণ করেছেন এমি পুরস্কারজয়ী নির্মাতা এরিক গুড ও চলচ্চিত্র নির্মাতা জেরেমি ম্যাকব্রাইড। তাঁদের নতুন কাজটি সরীসৃপ চোরাচালানের এমন এক জগতের দরজা খুলে দেয়, যেখানে অপরাধী আর আইনপ্রয়োগকারী—কাকে ‘ভালো’ আর কাকে ‘খারাপ’ বলা হবে, তা অনেক সময় স্পষ্ট থাকে না।
সরীসৃপের বাজার থেকে আন্তর্জাতিক অপরাধ
তথ্যচিত্রটির গল্পের ভিত্তি ২০০৮ সালের সত্য ঘটনা অবলম্বনে লেখা বই ‘দ্য লিজার্ড কিং’। এতে দেখানো হয়েছে, কীভাবে ১৯৬০-এর দশকে হ্যাঙ্ক মল্ট নামের এক পনির বিক্রেতা সরীসৃপের ব্যবসায় ঢুকে পড়েন।
মল্ট বিরল সরীসৃপের তালিকা তৈরি করে বিভিন্ন চিড়িয়াখানায় পাঠাতেন। তখন চিড়িয়াখানাগুলোও বুঝতে শুরু করেছিল যে বিরল প্রাণী সংগ্রহের বিপুল বাণিজ্যিক সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে মল্টের ব্যবসা দ্রুত বড় হতে থাকে।
কিন্তু একই সঙ্গে মার্কিন বন্যপ্রাণী কর্তৃপক্ষ আশঙ্কা করতে শুরু করে, এই বাণিজ্য স্থানীয় প্রাণী ও পরিবেশব্যবস্থার ওপর ভয়াবহ প্রভাব ফেলতে পারে।
১৯৭৭ সালে মল্টের বিরুদ্ধে ২০০টিরও বেশি চোরাচালানের অভিযোগ আনা হয়। শেষ পর্যন্ত তিনি মাত্র ৯০ দিন কারাগারে ছিলেন। তবে তাঁর মামলা সরীসৃপ ব্যবসার অন্ধকার দিকটি প্রকাশ্যে এনে দেয়।
এক শহরে এক ‘লিজার্ড কিং’
মল্টের পর তাঁর শিষ্য টমি ক্রাচফিল্ড সরীসৃপ ব্যবসার অন্যতম বড় নাম হয়ে ওঠেন। বিরল প্রাণীর সন্ধানে তিনি নিজের উপার্জনের প্রায় সব অর্থই আবার ব্যবসায় বিনিয়োগ করতেন।
এরপর ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ যায় রে ভ্যান নস্ট্র্যান্ডের হাতে। তিনি বিরল প্রাণীর চেয়ে সাধারণ প্রজাতিকে বিপুল পরিমাণে কেনাবেচার দিকে বেশি মনোযোগ দেন।
পরে তাঁর সঙ্গে যুক্ত হন মারিও তাব্রুয়ে। তিনি সরীসৃপ চোরাচালানের পাশাপাশি মাদক পাচারের সঙ্গেও জড়িত ছিলেন। তাঁদের মাধ্যমে অপরাধ জগতের সঙ্গে সরীসৃপ পাচারের সম্পর্ক আরও গভীর হয়।
কখনও কখনও বিরল ও বিষাক্ত সরীসৃপকে মাদকের চালানের সঙ্গে লুকিয়ে পাঠানো হতো। এতে একদিকে প্রাণীগুলোকে পাচার করা যেত, অন্যদিকে চালান পরীক্ষা করার সময় কর্মকর্তাদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করা হতো।
‘প্রাণী পাচারের পাবলো এসকোবার’
সরীসৃপ চোরাচালানের জগতে সবচেয়ে আলোচিত নামগুলোর একটি মালয়েশিয়ার আনসন ওয়ং। তাঁর বিরুদ্ধে এশিয়ার ক্ষমতাধর পরিবার ও অপরাধজগতের সঙ্গে সম্পর্ক থাকার অভিযোগও ওঠে।
তথ্যচিত্রে এই চোরাচালানকারীদের জীবনের শেষ অধ্যায়ও তুলে ধরা হয়েছে। তাঁদের কেউ বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছেন, কেউ আবার নিজেদের অতীতের অপরাধের স্মৃতি নিয়ে বসে আছেন।
রে ভ্যান নস্ট্র্যান্ড তথ্যচিত্রটির নির্মাণকাজ চলার সময় প্রায় ৮০ বছর বয়সে মারা যান। তিনি তখন স্মৃতিভ্রংশের সঙ্গে লড়াই করছিলেন। নির্মাতারা তাঁর দুর্বল অবস্থাকেও গল্পের অংশ করেছেন সহানুভূতির সঙ্গে।
অপরাধীদের গল্প, কিন্তু প্রাণীদের জন্য আরও বড় বিপদ
‘মনস্টার্স অব গড’-এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক শুধু চোরাচালানকারীদের গল্প নয়। এর মাধ্যমে দেখানো হয়েছে, অবৈধ বাণিজ্য কীভাবে সরীসৃপের স্বাভাবিক জনসংখ্যাকে ধ্বংস করছে এবং কিছু প্রজাতিকে বিলুপ্তির কিনারায় ঠেলে দিচ্ছে।
চোরাচালানের বাজারে মারা যাওয়া প্রাণীকেও অনেক সময় ব্যবসার স্বাভাবিক ক্ষতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। তথ্যচিত্রে এমন ঘটনার বর্ণনা দর্শকদের নাড়া দিতে পারে।
নির্মাতারা ক্যামেরা নিয়ে প্রাণীদের খুব কাছাকাছি গেছেন—তাদের চোখ, মুখ, আঁশ ও শরীরের বিভিন্ন অংশকে এমনভাবে দেখানো হয়েছে, যাতে দর্শকের কাছে এসব প্রাণী শুধু বাণিজ্যিক পণ্য না থেকে সংরক্ষণের প্রয়োজনীয় জীব হিসেবে ধরা দেয়।
মাদক ব্যবসায়ীও সরীসৃপের কামড়ে বিপদে
মারিও তাব্রুয়ে, যিনি মাদক ও সংঘবদ্ধ অপরাধের মামলায় দীর্ঘ কারাদণ্ড পেয়েছিলেন, তথ্যচিত্রের শুটিংয়ের সময় একটি গিলা মনস্টারের কামড়ে প্রায় মৃত্যুর মুখে পড়েছিলেন।
গিলা মনস্টার যুক্তরাষ্ট্রের একমাত্র বিষধর গিরগিটি। আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, এই প্রাণীর বিষে থাকা একটি যৌগ পরবর্তীকালে এমন ওষুধ তৈরির গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, যা বর্তমানে ওজন নিয়ন্ত্রণ ও ডায়াবেটিস চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়।
অর্থাৎ যে বিষ মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে পারে, তারই একটি উপাদান আবার মানুষের জীবন রক্ষায় কাজে লাগছে।
আইনপ্রয়োগকারীরাও কি পুরোপুরি নির্দোষ?
তথ্যচিত্রটির সবচেয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্ন এখানেই।
সরীসৃপ পাচারকারীদের ধরতে গিয়ে কিছু সরকারি কর্মকর্তা কখনও কখনও অপরাধীদের কাছ থেকে তথ্য নেওয়ার জন্য তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছেন। কেউ কেউ আবার নিজেরাই সেই বাণিজ্যের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েছেন বলে তথ্যচিত্রে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
ফলে সময়ের সঙ্গে দর্শকের কাছে ভালো মানুষ ও খারাপ মানুষের পার্থক্যও অস্পষ্ট হয়ে ওঠে।
এরিক গুডের ভাষায়, বিষয়টি এমন এক নৈতিক অন্ধকারের দিকে যায়, যেখানে অপরাধীদের ধরতে গিয়ে আইনপ্রয়োগকারীরাও কখনও কখনও সেই অন্ধকারের খুব কাছাকাছি চলে আসেন।
চিড়িয়াখানা কি সমস্যার অংশ, নাকি সমাধান?
তথ্যচিত্রটি চিড়িয়াখানা নিয়েও একটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বন্দ্ব তুলে ধরে।
একদিকে বিরল সরীসৃপ প্রদর্শনের মাধ্যমে চিড়িয়াখানাগুলো এমন এক বাজার তৈরি করতে সাহায্য করেছে, যা পরবর্তী সময়ে প্রাণী চোরাচালানকে উৎসাহিত করেছে।
অন্যদিকে চিড়িয়াখানা না থাকলে মানুষ এসব প্রাণীকে কাছ থেকে দেখার এবং তাদের সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা বোঝার সুযোগও কম পেত।
নির্মাতাদের মতে, চোরাচালানের এই অদ্ভুত প্রভাবের কারণে অনেক চিড়িয়াখানা এখন প্রাণী আমদানির জায়গা থেকে সংরক্ষণের কেন্দ্র হয়ে উঠছে। আগে যেখানে প্রাণী আনা হতো, এখন কিছু ক্ষেত্রে বিপন্ন প্রজাতি সংরক্ষণ করে ভবিষ্যতে তাদের প্রকৃত পরিবেশে ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
‘টাইগার কিং’-এর মতো আরেক সাংস্কৃতিক বিস্ফোরণ?
এরিক গুড এর আগে ‘টাইগার কিং’-এর মাধ্যমে ব্যক্তিগত চিড়িয়াখানা ও বন্যপ্রাণীপ্রেমীদের অদ্ভুত জগত দর্শকের সামনে তুলে ধরে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন।
‘মনস্টার্স অব গড’-এও রয়েছে সেই পরিচিত উপাদান—অদ্ভুত চরিত্র, অপরাধ, বিপুল অর্থ, প্রাণী, বিশ্বাসঘাতকতা এবং এমন সব ঘটনা যা অবিশ্বাস্য মনে হলেও বাস্তব।
তবে নির্মাতারা শুধু চমক দেখাতে চাননি। তাঁদের লক্ষ্য দর্শককে বিনোদনের পাশাপাশি বন্যপ্রাণী পাচারের ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতন করা।
শেষ পর্যন্ত ‘মনস্টার্স অব গড’ যেন ‘জুরাসিক পার্ক’-এর বাস্তব জীবনের এক অন্ধকার সতর্কবার্তা—প্রাণীর প্রতি মানুষের মুগ্ধতা যখন সীমা ছাড়িয়ে লোভ ও ক্ষমতার খেলায় পরিণত হয়, তখন সবচেয়ে ভয়ংকর দানবটি প্রাণী নয়, মানুষই হয়ে ওঠে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















