মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, সমুদ্রপথে হামলার আশঙ্কা এবং গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে জ্বালানি পরিবহনের ঝুঁকি—সব মিলিয়ে বিশ্বজুড়ে তেল পাইপলাইনে নতুন করে বিনিয়োগের ঢেউ শুরু হয়েছে। জ্বালানি সরবরাহকে নিরাপদ রাখতে এবং হরমুজ প্রণালির মতো সংকটপূর্ণ পথ এড়াতে বিভিন্ন দেশ ও তেল কোম্পানি দীর্ঘ পাইপলাইন নির্মাণে বড় অঙ্কের অর্থ ঢালছে।
যুদ্ধ থেকেই পাইপলাইন তৈরির পুরোনো শিক্ষা
মধ্যপ্রাচ্যের কয়েক দশকের সংঘাতের পেছনে তেল পরিবহনের নিরাপদ বিকল্প পথ তৈরির একটি দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের পর সুয়েজ খাল বন্ধ হয়ে গেলে মিসর ও উপসাগরীয় দেশগুলো লোহিত সাগরকে ভূমধ্যসাগরের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা করে। পরে ১৯৭৪ সালে নির্মাণ শুরু হয় সুয়েজ-মেডিটেরেনিয়ান বা সামেড পাইপলাইনের। ১৯৭৭ সালে এটি চালু হয়।
এরপর সৌদি আরবের বিশাল তেলক্ষেত্র থেকে লোহিত সাগরের উপকূলে তেল পৌঁছে দিতে আরেকটি বড় পাইপলাইন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ইরান-ইরাক যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর সেই প্রকল্পের কাজ আরও দ্রুত এগিয়ে যায়। ১৯৮১ সালে চালু হওয়া এই পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইন আজও সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বর্তমানে হরমুজ প্রণালিতে জটিলতা তৈরি হওয়ায় এসব বিকল্প স্থলপথের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। সৌদি আরবের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি আরামকোও জানিয়েছে, তাদের কৌশলগত অবকাঠামো যুদ্ধের ধাক্কা সামলাতে সহায়তা করেছে।
নতুন পাইপলাইনের দিকে মধ্যপ্রাচ্যের নজর
এখন মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো আরও বেশি পাইপলাইন নির্মাণে আগ্রহী। সংযুক্ত আরব আমিরাত বিদ্যমান হাবশান-ফুজাইরা পাইপলাইনের পাশে নতুন লাইন নির্মাণ করে পরিবহন সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে।
ইরাক থেকে সিরিয়া পর্যন্ত একটি পুরোনো পাইপলাইন উন্নয়নের পরিকল্পনাও সামনে এসেছে। একই সঙ্গে ইরাক থেকে সিরিয়া ও তুরস্ক পর্যন্ত নতুন পাইপলাইন তৈরির সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করছে আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানিগুলো। সৌদি আরবের আরামকোও নতুন বিনিয়োগের সুযোগ খুঁজছে।
তবে এই প্রবণতা শুধু মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তেল উৎপাদন বাড়ার পাশাপাশি নিরাপদ পরিবহন নিশ্চিত করতে নতুন পাইপলাইন নির্মাণের পরিকল্পনা হচ্ছে।
বিশ্বজুড়ে হাজার হাজার কিলোমিটার পাইপলাইন
বর্তমানে বিশ্বে প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার কিলোমিটার তেল পাইপলাইনের বিশাল নেটওয়ার্ক রয়েছে। এর বাইরে প্রায় ১২ হাজার ৩০০ কিলোমিটার তেল পাইপলাইন নির্মাণাধীন এবং আরও প্রায় ২০ হাজার ১০০ কিলোমিটার নির্মাণের প্রস্তাব রয়েছে।
এর কিছু প্রকল্পের লক্ষ্য গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ বা সংকীর্ণ নৌপথ এড়িয়ে জ্বালানি পরিবহন করা। আবার কিছু পাইপলাইন তৈরি হচ্ছে নতুন তেলক্ষেত্র থেকে বাজারে জ্বালানি পৌঁছে দিতে।
আর্জেন্টিনায় দ্রুত বাড়তে থাকা তেল উৎপাদনের কেন্দ্র ভাকা মুয়ের্তা থেকে আটলান্টিক উপকূলে তেল পৌঁছে দিতে প্রায় ৪৪০ কিলোমিটার পাইপলাইন নির্মাণ চলছে। পূর্ব আফ্রিকায় উগান্ডার অভ্যন্তরীণ তেলক্ষেত্র থেকে তানজানিয়ার উপকূল পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার ৪৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ পাইপলাইন তৈরির কাজও এগোচ্ছে।
ব্যয়বহুল হলেও পাইপলাইন কেন এত গুরুত্বপূর্ণ
বড় ব্যাসের একটি পাইপলাইন দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ১০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন করা সম্ভব। এমন পাইপলাইন নির্মাণে প্রতি কিলোমিটারে গড়ে প্রায় ৫০ লাখ ডলার খরচ হতে পারে। ফলে ১ হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ একটি প্রকল্পে ব্যয় দাঁড়াতে পারে প্রায় ৫০০ কোটি ডলার।
পাহাড়ি বা দুর্গম এলাকা অতিক্রম করতে হলে ব্যয় আরও কয়েক গুণ বেড়ে যেতে পারে। তারপরও পাইপলাইনের বিকল্প সব সময় অর্থনৈতিকভাবে কার্যকর নয়।
স্থলপথে একই দূরত্বে ট্রাক বা রেলপথে তেল পরিবহনের খরচ সাধারণত পাইপলাইনের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি। সমুদ্রপথে পরিবহন তুলনামূলকভাবে সস্তা হলেও যুদ্ধ, হামলা বা নৌপথ বন্ধ হয়ে গেলে সেই ব্যবস্থাও অনিরাপদ হয়ে পড়ে।
তেল উৎপাদনের পর সেটি যদি বাজারে পৌঁছানো না যায়, তাহলে তার অর্থনৈতিক মূল্য দ্রুত কমে যায়। ফলে সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখার জন্য বিকল্প পাইপলাইনকে অনেক দেশ এখন কৌশলগত বিনিয়োগ হিসেবে দেখছে।

বিনিয়োগকারীদের কাছেও পাইপলাইন আকর্ষণীয়
পাইপলাইন নির্মাণে বড় অঙ্কের অর্থ লাগলেও বিনিয়োগকারীদের জন্য এটি দীর্ঘমেয়াদি ও তুলনামূলক স্থিতিশীল আয়ের উৎস হতে পারে। অনেক পাইপলাইন চুক্তিতে এমন ব্যবস্থা থাকে, যেখানে গ্রাহককে নির্দিষ্ট পরিমাণ তেল পরিবহনের জন্য অর্থ দিতে হয়। তেল কম পরিবহন হলেও নির্ধারিত অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থা থাকায় পাইপলাইন মালিকেরা নিয়মিত আয় পান।
এই কারণেই অবকাঠামোভিত্তিক বিনিয়োগকারীদের কাছে পাইপলাইন আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল কোম্পানিগুলোও পাইপলাইনের অংশীদারত্ব বিক্রি করে আগাম অর্থ সংগ্রহ করছে, কিন্তু পরিচালনার নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখছে।
সৌদি আরবের আরামকো গত কয়েক বছরে এ ধরনের চুক্তির মাধ্যমে প্রায় ৪ হাজার কোটি ডলার সংগ্রহ করেছে। অন্যদিকে অবকাঠামো বিনিয়োগ তহবিলগুলোর সম্পদও দ্রুত বেড়েছে।
নির্মাণে বড় বাধা রয়েছে
তবে নতুন পাইপলাইন নির্মাণ সহজ নয়। পরিবেশগত অনুমোদন, জমি অধিগ্রহণ, সরকারি অনুমতি, নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক জটিলতা প্রকল্পকে দীর্ঘায়িত করতে পারে।
একাধিক দেশের সীমান্ত অতিক্রম করা পাইপলাইন আরও ঝুঁকিপূর্ণ। প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক বিরোধ দেখা দিলে কয়েক হাজার কোটি ডলারের অবকাঠামো থাকলেও তেল পরিবহন বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
গত কয়েক বছরে বিপুল দৈর্ঘ্যের বেশ কিছু পাইপলাইন প্রকল্প বাতিল বা স্থগিত হয়েছে। পরিবেশগত উদ্বেগের কারণে কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রস্তাবিত কিস্টোন এক্সএল পাইপলাইনও শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি। ইরান, পাকিস্তান ও ভারতকে যুক্ত করার একটি গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্পও দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক জটিলতায় আটকে আছে।
সংঘাত বাড়লেও পাইপলাইনের চাহিদা কমছে না
সীমান্ত পেরিয়ে যাওয়া পাইপলাইনগুলোর আরেকটি বড় দুর্বলতা হলো রাজনৈতিক সংঘাত। অতীতে ইরাকের তেল সৌদি আরব হয়ে পরিবহনের একটি পাইপলাইন উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় বন্ধ হয়ে যায়। সিরিয়ার মধ্য দিয়ে যাওয়া আরেকটি পথও আঞ্চলিক যুদ্ধের কারণে বন্ধ হয়েছিল।
তারপরও বিশ্বে পাইপলাইনের গুরুত্ব বাড়ছে। লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রান্তে বাব আল-মান্দাব প্রণালির নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দেওয়ার পর সৌদি আরবকে বিকল্প পথ ব্যবহার করতে হয়েছে। পূর্বাঞ্চল থেকে আসা তেল ট্যাংকারে করে লোহিত সাগরের দিকে এনে সামেড পাইপলাইনের মাধ্যমে ভূমধ্যসাগরে পাঠানোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
কিন্তু সামেড পাইপলাইনও প্রায় পূর্ণ সক্ষমতায় চলছে। ফলে বিশ্বজুড়ে নিরাপদ ও বিকল্প জ্বালানি পরিবহন ব্যবস্থার চাহিদা আরও বাড়তে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথের নিরাপত্তা এবং বিশ্বজুড়ে তেলের সরবরাহ নিশ্চিত করার প্রয়োজন—এই তিনটি কারণ একসঙ্গে কাজ করছে। ফলে আগামী দিনে পাইপলাইন শুধু তেল পরিবহনের অবকাঠামো নয়, বরং বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হয়ে উঠতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















