আফ্রিকার প্রযুক্তি দুনিয়ায় দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে চীনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি। কম খরচ, উন্মুক্ত ব্যবহারের সুযোগ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী প্রযুক্তিকে নিজেদের মতো করে বদলে নেওয়ার সুবিধার কারণে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ও নির্মাতারা ক্রমেই চীনা এআই মডেলের দিকে ঝুঁকছেন। এতে দীর্ঘদিনের মার্কিন প্রযুক্তি-আধিপত্যের সামনে নতুন প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে চীনের অবস্থান আরও শক্ত হচ্ছে।
উগান্ডার প্রযুক্তি উদ্যোক্তা আর্নেস্ট মওয়েবাজের অভিজ্ঞতাই এর বড় উদাহরণ। নিজের দেশের অসংখ্য স্থানীয় ভাষায় কৃষি-সংক্রান্ত তথ্য পৌঁছে দেওয়ার জন্য তিনি একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ব্যবস্থা তৈরি করছিলেন। সে সময় তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের বিভিন্ন এআই মডেল পরীক্ষা করেন। শেষ পর্যন্ত চীনা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান আলিবাবার একটি মডেলকে তিনি বেশি কার্যকর হিসেবে পান।
মওয়েবাজের তৈরি ব্যবস্থা স্থানীয় ভাষায় কৃষকদের আবহাওয়ার খবর ও ফসলের পরামর্শ দিতে ব্যবহৃত হচ্ছে। তার মতে, উগান্ডার বহু ভাষা বোঝার ক্ষেত্রে আলিবাবার মডেল মেটা বা গুগলের প্রযুক্তির চেয়েও ভালো ফল দিয়েছে। একই সঙ্গে এর খরচ কম এবং নিজেদের তথ্য ব্যবহার করে মডেলটিকে প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তন করার সুযোগও রয়েছে।
কম খরচই বড় আকর্ষণ

আফ্রিকার অনেক দেশের প্রযুক্তি খাত এখনো সীমিত অর্থ ও কম্পিউটিং সক্ষমতার মধ্যে কাজ করে। ফলে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির চেয়ে কম খরচে প্রয়োজনীয় কাজ ভালোভাবে সম্পন্ন করতে পারে—এমন ব্যবস্থা তাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
চীনা অনেক এআই মডেল উন্মুক্তভাবে নামিয়ে ব্যবহার ও পরিবর্তন করা যায়। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় কিছু এআই প্রতিষ্ঠান তাদের মডেল নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থায় রাখে এবং ব্যবহারকারীদের বিভিন্ন ধরনের ফি দিতে হয়। ফলে আফ্রিকার ছোট প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে চীনা মডেল তুলনামূলকভাবে বেশি আকর্ষণীয়।
নাইরোবির প্রযুক্তি উদ্যোক্তা মোসেস কেমিবারোর ভাষায়, স্কুলে সন্তান পৌঁছে দেওয়ার জন্য অত্যন্ত দামি গাড়ি ব্যবহারের প্রয়োজন নেই, সাধারণ গাড়িতেই যদি একই কাজ হয়। তার হিসাবে অবকাঠামোসহ সামগ্রিক ব্যয়ের ক্ষেত্রে চীনা মডেল কখনো কখনো মার্কিন প্রযুক্তির তুলনায় ৯০ শতাংশ পর্যন্ত সাশ্রয়ী হতে পারে।
আফ্রিকার নানা দেশে বিস্তার
কেনিয়ায় উদ্যোক্তারা চীনা এআই ব্যবহার করে আইনি ও ব্যবসায়িক সেবা সহজ করছেন। নাইজেরিয়ায় তৈরি হচ্ছে মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষামূলক প্রযুক্তি। ঘানায় স্থানীয় ব্যবহারকারীদের জন্য তৈরি হচ্ছে কথোপকথনভিত্তিক এআই ব্যবস্থা।
চীনা উন্মুক্ত এআই মডেলের ব্যবহার গত এক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিভিন্ন এআই মডেল ব্যবহারের একটি বড় অনলাইন প্ল্যাটফর্মের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সেখানে চীনা উন্মুক্ত মডেলের ব্যবহার মোট ব্যবহারের প্রায় অর্ধেকের কাছাকাছি পৌঁছেছে। এক বছর আগে এই হার ছিল ২৫ শতাংশেরও কম।
এআই-সংক্রান্ত আরেকটি বড় তথ্যভান্ডারে সবচেয়ে বেশি নামানো ২৫টি উন্মুক্ত মডেলের মধ্যে ১৯টিই চীনা প্রতিষ্ঠানের তৈরি।

চীনের পুরোনো প্রযুক্তি অবকাঠামো এখন নতুন শক্তি
আফ্রিকায় চীনের প্রযুক্তিগত প্রভাব অবশ্য নতুন নয়। গত দুই দশকে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো আফ্রিকার টেলিযোগাযোগ অবকাঠামো গড়ে তোলা, সড়ক নির্মাণ এবং তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থায় বড় ভূমিকা রেখেছে।
কেনিয়ার বিখ্যাত মোবাইল আর্থিক সেবা ব্যবস্থাও চীনা প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল। এই দীর্ঘদিনের প্রযুক্তিগত সম্পর্ক এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিস্তারের জন্য চীনকে বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে।
নাইরোবির দক্ষিণ-পূর্বে গড়ে ওঠা কনজা টেকনোপলিস তার অন্যতম উদাহরণ। একসময় এটিকে কেনিয়ার ‘সিলিকন ভ্যালি’ হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। প্রকল্পটির একটি তথ্যকেন্দ্র চীনা ঋণে অর্থায়িত এবং হুয়াওয়ের মাধ্যমে নির্মিত। সেখানে সরকারি কাজে কম্পিউটিং সুবিধা দেওয়া হচ্ছে।
এই অবকাঠামোর সঙ্গে এখন চীনা এআই প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রযুক্তিও যুক্ত হচ্ছে। এমনকি টেলিযোগাযোগ জালিয়াতি মোকাবিলায় চীনা এআই প্রযুক্তি ব্যবহারের একটি প্রকল্পও নেওয়া হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের দুর্বলতার সুযোগ
উন্নত চিপ পাওয়ার ক্ষেত্রে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘদিন ধরে সীমাবদ্ধতার মুখে ছিল। তাই বিপুল অর্থ খরচ করে মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতা করার পরিবর্তে তারা অনেক ক্ষেত্রে নিজেদের এআই মডেল উন্মুক্ত করে দেওয়ার কৌশল নেয়।

শুরুতে এই কৌশলকে খুব সফল মনে হয়নি। কিন্তু পরে চীনা প্রযুক্তিতে দ্রুত অগ্রগতি আসে। ২০২৪ সালের শেষ দিকে ডিপসিকের একটি মডেল তুলনামূলকভাবে কম খরচে শীর্ষস্থানীয় এআই মডেলগুলোর কাছাকাছি সক্ষমতা দেখায়। পরে আরও কিছু চীনা প্রতিষ্ঠান কোড লেখা ও অন্যান্য জটিল কাজে সক্ষম শক্তিশালী মডেল নিয়ে আসে।
মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি অংশ উন্মুক্ত মডেল থেকে সরে গিয়ে নিয়ন্ত্রিত বা বন্ধ ব্যবস্থার দিকে বেশি মনোযোগ দেওয়ায় চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো বড় একটি সুযোগ পায়।
আফ্রিকার উদ্যোক্তারা দুই শক্তির মাঝখানে
আফ্রিকার প্রযুক্তি উদ্যোক্তারা অবশ্য পুরোপুরি চীনমুখী হয়ে যাননি। অনেক ক্ষেত্রেই তারা কাজের ধরন অনুযায়ী চীনা ও মার্কিন—দুই ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করছেন।
নাইরোবির একটি ব্যাংকিং সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠানের প্রধান কামাল বুধাভট্টি সম্প্রতি মার্কিন প্রযুক্তি ব্যবহার করে নিজের প্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তি ব্যবস্থা নতুন করে সাজিয়েছেন। এতে মাত্র ১০ জনের একটি দল এমন কাজ অর্ধেক সময়ে শেষ করেছে, যার জন্য আগে প্রায় ১০০ জন কর্মীর প্রয়োজন হতো। তবে খরচ ছিল বেশি।
একই সময়ে হুয়াওয়ে তাকে চীনা প্রযুক্তি ব্যবহারে আকৃষ্ট করতে এক বছরের বিনা মূল্যের কম্পিউটিং সুবিধাসহ নানা প্রণোদনার প্রস্তাব দিয়েছে। ফলে উদ্যোক্তাদের সামনে এখন শুধু প্রযুক্তির সক্ষমতা নয়, খরচ, নির্ভরযোগ্যতা ও দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণ—সবকিছু বিবেচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তথ্যনিরাপত্তা ও রাজনৈতিক ঝুঁকিও আছে
চীনা এআইয়ের দ্রুত প্রসারের মধ্যেও উদ্বেগ রয়েছে। তথ্য কোথায় যাচ্ছে, চীনা সরকারের সঙ্গে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক কতটা ঘনিষ্ঠ এবং ভবিষ্যতে কোনো প্রযুক্তি হঠাৎ বন্ধ বা পরিবর্তন হয়ে গেলে কী হবে—এসব প্রশ্ন সামনে আসছে।
উগান্ডার মওয়েবাজও এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন। তার তৈরি একটি কথোপকথনভিত্তিক এআই ব্যবস্থাকে চীন নিয়ে কিছু প্রশ্ন করা হলে সেটি দেশটির রাজনৈতিক ব্যবস্থা সম্পর্কে বিতর্কিত উত্তর দেয় এবং উগান্ডায় চীনের অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন এড়িয়ে যায়। বিষয়টি তাকে উদ্বিগ্ন করে।
এরপর তিনি স্মার্টফোন ব্যবহারকারীদের জন্য নতুন পণ্য তৈরিতে গুগলের উন্মুক্ত মডেল ব্যবহারের দিকে ঝুঁকেছেন। তার মতে, বৈশ্বিক ভূরাজনীতির ভুল দিকের ওপর প্রযুক্তিগতভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়া উচিত নয়।
মার্কিন প্রযুক্তির শক্তিও এখনো অটুট
চীনা মডেলের জনপ্রিয়তা বাড়লেও আফ্রিকার প্রযুক্তি বাজারে মার্কিন প্রতিষ্ঠানের প্রভাব এখনো ব্যাপক। কেনিয়ার একটি বড় গৃহস্থালি পণ্য নির্মাতা প্রতিষ্ঠান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে কাগজ ও ই-মেইলে আসা ক্রয়াদেশ প্রক্রিয়াকরণের সময় কয়েক ঘণ্টা থেকে ১০ মিনিটেরও কমিয়ে এনেছে।
এই ব্যবস্থায় মার্কিন এআই মডেল ব্যবহার করা হয়েছে। কারণ নির্ভুলতা ও নির্ভরযোগ্যতাকে সেখানে খরচের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

তবে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোও আফ্রিকার উদ্যোক্তাদের আকৃষ্ট করতে সক্রিয়ভাবে যোগাযোগ করছে। কেনিয়ার একটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তাদের চীনা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে এআই ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। প্রযুক্তিটি তখন প্রত্যাশিত মাত্রায় নির্ভুল না হলেও এই ধরনের সরাসরি যোগাযোগ উদ্যোক্তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে।
বদলে যাচ্ছে বৈশ্বিক এআই প্রতিযোগিতা
আফ্রিকার অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা এখন আর একতরফা নয়। যুক্তরাষ্ট্র এখনো উন্নত প্রযুক্তি, নির্ভুলতা ও জটিল কাজের ক্ষেত্রে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। অন্যদিকে চীন কম খরচ, উন্মুক্ত মডেল, স্থানীয় প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তনের সুযোগ এবং আগ্রাসী প্রযুক্তি সহযোগিতার মাধ্যমে দ্রুত বাজার দখল করছে।
আফ্রিকার প্রযুক্তি উদ্যোক্তাদের কাছে শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে একটি প্রশ্ন—প্রযুক্তিটি কোথায় তৈরি হয়েছে, সেটি নয়; বরং সীমিত অর্থ ও অবকাঠামোর মধ্যে সেটি কতটা কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে।
এ কারণেই আফ্রিকা এখন চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। আগামী দিনে বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রযুক্তি পছন্দ কোন দিকে যাবে, আফ্রিকার এই অভিজ্ঞতা তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দিতে পারে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় আফ্রিকায় চীনের উত্থান এখন আর শুধু প্রযুক্তির গল্প নয়; এটি অর্থনীতি, ভূরাজনীতি, তথ্যনিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ প্রযুক্তি-নির্ভরতারও গল্প।





সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















