মাত্র ২৬ বছর বয়সেই থেমে গেল সিডনি টোউলের জীবন। বিরল পিত্তনালির ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার পরও তিনি অসুস্থতাকে নিজের জীবনের একমাত্র পরিচয় হতে দেননি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের চিকিৎসা, ভয়, একাকিত্ব, আনন্দ, ভ্রমণ এবং প্রতিদিনের ছোট ছোট সুখের মুহূর্ত তুলে ধরে তিনি লাখো মানুষকে মনে করিয়ে দিয়েছিলেন—কঠিন অসুস্থতার মধ্যেও জীবনকে ভালোবাসা যায়।
ক্যানসার ধরা পড়ার পর বদলে যায় জীবন
২০২৩ সালে সিডনি টোউলের বয়স ছিল মাত্র ২৩ বছর। ডার্টমাউথ কলেজ থেকে পড়াশোনা শেষ করে তিনি লস অ্যাঞ্জেলেসে বসবাস করছিলেন। দূরবর্তী কর্মব্যবস্থায় বিপণনের চাকরি, সমুদ্রসৈকতে সার্ফিং এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্বাভাবিক তরুণ জীবনের নানা মুহূর্ত ভাগ করে নেওয়াই ছিল তাঁর দিনযাপনের অংশ।
হঠাৎ পেটে একটি অস্বাভাবিক ফোলা এবং জ্বালাপোড়ার অনুভূতি তাঁকে জরুরি চিকিৎসাকেন্দ্রে যেতে বাধ্য করে। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জানা যায়, তিনি পিত্তনালির বিরল ক্যানসারে আক্রান্ত। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই রোগকে কোল্যাঞ্জিওকার্সিনোমা বলা হয়।

অসুস্থতাকেই বানিয়েছিলেন মানুষের কাছে পৌঁছানোর মাধ্যম
ক্যানসার ধরা পড়ার পর সিডনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের জীবন নিয়ে নিয়মিত ভিডিও প্রকাশ করতে শুরু করেন। ধীরে ধীরে তাঁর অনুসারীর সংখ্যা ১০ লাখেরও বেশি হয়ে যায়।
তাঁর ভিডিওতে যেমন ছিল কেমোথেরাপির কঠিন সময়, হাসপাতালের বিছানা ও চিকিৎসার ক্লান্তি, তেমনি ছিল স্পেনে পাহাড়ে হাঁটার দৃশ্য, পোশাকের ভিডিও, নাচ, ভ্রমণ এবং দৈনন্দিন জীবনের নানা আনন্দ।
কখনো কেমোথেরাপির সময় চুল পড়ে যাওয়া ঠেকাতে মায়ের সঙ্গে মাথায় বরফের প্যাক জড়িয়ে বসেছেন। আবার চিকিৎসকের অনুমতি পাওয়ার পর অস্ত্রোপচারের পরই একা ইউরোপ ভ্রমণে বেরিয়ে পড়েছেন।
অসুস্থতার ভয়কে আড়াল না করে তিনি বরং দেখিয়েছেন, একজন ক্যানসার রোগীও স্বাভাবিক জীবনের স্বপ্ন দেখতে পারেন।
‘ক্যানসার রোগীকে দেখতে কেমন হওয়া উচিত’—প্রশ্ন তুলেছিলেন তিনি
সিডনির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের উপস্থিতি শুধু নিজের গল্প বলার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি মানুষের দীর্ঘদিনের একটি ধারণাকে প্রশ্ন করেছিলেন—গুরুতর অসুস্থ একজন মানুষকে সবসময় কি বিষণ্ন, দুর্বল কিংবা মৃত্যুভয়ে ভেঙে পড়া অবস্থাতেই দেখা যাবে?

তিনি দেখিয়েছেন, ক্যানসারের চিকিৎসা চললেও কেউ ভ্রমণ করতে পারেন, সাজতে পারেন, নাচতে পারেন, বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাতে পারেন এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখতে পারেন।
একটি ভিডিওতে তিনি দর্শকদের জীবন উপভোগ করার কথা বলেছিলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, প্রিয় খাবার কিনে খাওয়া, পছন্দের সিনেমা দেখা এবং জীবনের ভালো-মন্দ—দুটোকেই গ্রহণ করা দরকার। কারণ জীবনে খারাপ কিছু ঘটলেই পুরো জীবন খারাপ হয়ে যায় না।
আনন্দের আড়ালেও ছিল গভীর একাকিত্ব
তবে সিডনির জীবন কেবল হাসি আর ভ্রমণের গল্প ছিল না। ক্যানসারের সঙ্গে লড়াইয়ের কঠিন মানসিক দিকও তিনি প্রকাশ্যে তুলে ধরতেন।
তাঁর বয়সী অন্য তরুণরা যখন ক্যারিয়ার গড়ছিলেন, সম্পর্ক তৈরি করছিলেন এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করছিলেন, তখন তাঁকে লড়তে হচ্ছিল জীবন-মৃত্যুর অনিশ্চয়তার সঙ্গে।
এক ভিডিওতে তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন, যখন আপনার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হয়ে দাঁড়ায় কেমোথেরাপি, তখন নতুন মানুষের সঙ্গে স্বাভাবিক কথোপকথন শুরু করবেন কীভাবে?
এই প্রশ্নের মধ্যেই ফুটে উঠেছিল তরুণ বয়সে ক্যানসারের সঙ্গে বেঁচে থাকার এক গভীর নিঃসঙ্গতা।
অনলাইনে শুরু হয়েছিল ভয়াবহ হয়রানি

সিডনির জনপ্রিয়তার পাশাপাশি তাঁকে সহ্য করতে হয়েছে ভয়াবহ অনলাইন হয়রানি। ২০২৪ সালে তাঁর লিভারে ক্যানসার আবার ফিরে আসে। চিকিৎসার জন্য তিনি নিউইয়র্কে চলে যান।
সেই সময় কিছু অনলাইন ব্যবহারকারী তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করতে শুরু করে। তাঁরা তাঁর পোশাক, চেহারা, চুল, শরীরের পরিবর্তন এবং অসুস্থতার বিভিন্ন বিষয় বিশ্লেষণ করে তাঁকে মিথ্যাবাদী প্রমাণের চেষ্টা চালায়।
কেউ কেউ তাঁর চিকিৎসা-সংক্রান্ত তথ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলে, আবার কেউ তাঁর সঙ্গে কাজ করা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে যোগাযোগ করে সহযোগিতা বন্ধ করার আহ্বান জানায়। এমনকি তাঁর চিকিৎসকদের কাছেও বেনামি বার্তা পাঠানো হয়েছিল।
এসব আক্রমণ সিডনিকে গভীরভাবে কষ্ট দিয়েছিল। কিন্তু তিনি প্রকাশ্যে সেই ষড়যন্ত্রতত্ত্বে জড়িতদের সঙ্গে বিতর্কে যাননি। বরং ভিডিও তৈরি করে যেতে থাকেন।
তিনি একসময় বলেছিলেন, ক্যানসারের সঙ্গে বেঁচে থাকা অন্যদের ধারণার চেয়ে ভিন্ন হতে পারে—এ কারণেই কেউ রাগ করলে তার জন্য তিনি দুঃখিত।
শেষ সময়েও জীবনকে বেছে নিয়েছিলেন
২০২৬ সালের শুরুতে তাঁর শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হয়। পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, তিনি জীবনের শেষ পর্যায়ে বিশেষ পরিচর্যায় ছিলেন।

বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ড অঙ্গরাজ্যের বেথেসডায় জাতীয় স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যুর কারণ ছিল শরীরের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়া পিত্তনালির ক্যানসারের জটিলতা।
মৃত্যুর সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ২৬ বছর।
‘জীবন ছোট’—এই কথাটিই বারবার মনে করতেন
সিডনির ভাই অস্টিন টোউল জানিয়েছেন, জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়ে ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের গল্প বলার সাহস ছিল তাঁর। তিনি মানুষকে বোঝাতে চেয়েছিলেন যে ভালো না থাকাও স্বাভাবিক।
নিউইয়র্কে চিকিৎসার জন্য যাওয়ার সময়ও সিডনি নিজের স্বপ্নের কথা ভুলে যাননি। তিনি বলেছিলেন, বহুদিন ধরেই নিউইয়র্ক শহরে বসবাস করার ইচ্ছা ছিল তাঁর। আর জীবন যে কতটা ছোট, অসুস্থতার কারণে তিনি তা বারবার মনে করতেন।
লস অ্যাঞ্জেলেসের বন্ধুদের ছেড়ে আসার কষ্টের মধ্যেও তিনি একটি পুরোনো উপলব্ধিকে আঁকড়ে ধরেছিলেন—কোনো জায়গা বা মানুষকে বিদায় জানাতে কষ্ট হচ্ছে মানে সেখানে ভালোবাসার মতো কিছু ছিল।
সিডনির জীবন তাই শুধু ক্যানসারের সঙ্গে লড়াইয়ের গল্প নয়। এটি এমন এক তরুণীর গল্প, যিনি মৃত্যুর আশঙ্কার মধ্যেও জীবনকে দেখতে চেয়েছিলেন তার পূর্ণ রঙে। তাঁর ভিডিও হয়তো অনেকের কাছে নিছক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিষয় ছিল, কিন্তু তাঁর জন্য সেগুলো হয়ে উঠেছিল বেঁচে থাকার এক ধরনের ডায়েরি—যেখানে ভয় ছিল, কান্না ছিল, আবার ছিল ভ্রমণ, হাসি, ভালোবাসা এবং আশাবাদও।
শেষ পর্যন্ত তাঁর সবচেয়ে বড় বার্তাটি হয়তো ছিল খুব সহজ—জীবন সবসময় সুন্দর হবে না, কিন্তু কঠিন সময়ের মধ্যেও সুন্দর মুহূর্ত খুঁজে নেওয়া যায়।



















