আমেরিকার রাজনীতিতে বামপন্থার নতুন উত্থানকে অনেকেই সাময়িক রাজনৈতিক উত্তেজনা হিসেবে দেখছেন। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোকে দীর্ঘ ঐতিহাসিক পরিসরে দেখলে চিত্রটি ভিন্ন। নিউইয়র্ক সিটিতে জুন মাসে ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্টস অব আমেরিকা-ঘনিষ্ঠ প্রার্থীদের দুটি জয়, মিশিগানে আবদুল এল-সাইয়েদের সিনেট প্রাইমারিতে সাফল্য এবং উইসকনসিনের গভর্নর প্রাইমারিতে ডিএসএ সদস্য ফ্রান্সেসকা হংয়ের এগিয়ে থাকা—সব মিলিয়ে বোঝা যাচ্ছে, মার্কিন রাজনীতির বাম প্রান্ত আর প্রান্তিক অবস্থানে নেই।
এটি শুধু ডেমোক্রেটিক পার্টির ভেতরে কয়েকজন নতুন মুখের উত্থান নয়। এর মধ্য দিয়ে এমন একটি রাজনৈতিক প্রবণতা শক্তিশালী হচ্ছে, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আমেরিকান রাজনীতিতে দীর্ঘদিন অস্বাভাবিক বলে বিবেচিত হয়েছে। প্রশ্ন হলো, এই বামপন্থী উত্থান কি আমেরিকার প্রচলিত রাজনৈতিক কাঠামো থেকে বিচ্যুতি, নাকি দীর্ঘ বিরতির পর পুরোনো রাজনৈতিক বাস্তবতারই প্রত্যাবর্তন?
ইতিহাসের যে অধ্যায় আমেরিকা ভুলতে বসেছে
আজকের তরুণ আমেরিকানদের বড় অংশ সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন কিংবা বিশ শতকের কমিউনিস্ট শাসনব্যবস্থার অভিজ্ঞতা প্রত্যক্ষ করেনি। ফলে মার্কসবাদ বা সমাজতন্ত্র নিয়ে একসময় যে ঐতিহাসিক সংশয় ছিল, তা ক্রমেই দুর্বল হচ্ছে। রাজনৈতিক ভাষা ও স্লোগানে সমাজতন্ত্র এখন আর আগের মতো নিষিদ্ধ বা কলঙ্কিত কোনো ধারণা নয়।
এখানেই ইতিহাসের স্মৃতির সঙ্গে বর্তমান রাজনীতির সংঘাত তৈরি হচ্ছে।

সোভিয়েত ইউনিয়ন ও অন্যান্য মার্কসবাদী শাসনের ব্যর্থতা এবং মানবিক বিপর্যয় একসময় সমাজতান্ত্রিক রাজনৈতিক প্রকল্পের বিরুদ্ধে শক্তিশালী সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করেছিল। সোভিয়েত পতনের পর ফ্রান্সিস ফুকুইয়ামা যুক্তি দিয়েছিলেন, উদার গণতন্ত্র ও পুঁজিবাদ যেন আধুনিক রাজনৈতিক ব্যবস্থার বড় আদর্শিক প্রতিযোগিতায় চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করেছে। তাঁর বিশ্লেষণে, সামাজিক বৈষম্য দূর করার লক্ষ্যে রাষ্ট্রকে অতিরিক্ত শক্তিশালী করার প্রচেষ্টা শেষ পর্যন্ত ব্যক্তিস্বাধীনতার জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।
কিন্তু ইতিহাস কোনো স্থির সমাপ্তির জায়গায় থেমে থাকে না।
ফুকুইয়ামার ‘ইতিহাসের সমাপ্তি’ ধারণা যে স্থায়ী বাস্তবতা হয়ে ওঠেনি, তার অন্যতম প্রমাণ আজকের রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস। সোভিয়েত যুগের স্মৃতি যত দূরে সরে যাচ্ছে, সমাজতন্ত্রের পুরোনো নেতিবাচক ভাবমূর্তিও ততটা কার্যকর থাকছে না। নতুন প্রজন্ম সমাজতন্ত্রকে অনেক সময় বিশ শতকের রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের ইতিহাস হিসেবে নয়, বরং অর্থনৈতিক বৈষম্য, স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন ও সামাজিক নিরাপত্তার সংকট মোকাবিলার একটি সম্ভাব্য বিকল্প হিসেবে দেখছে।
আমেরিকার ‘ব্যতিক্রম’ কি শেষ হচ্ছে?
বিশ শতকে ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকার বহু দেশে শক্তিশালী সমাজতান্ত্রিক বা সমাজতন্ত্রঘনিষ্ঠ দল রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ শক্তি ছিল। যুক্তরাষ্ট্র ছিল এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। এখানে ডেমোক্রেটিক পার্টি দীর্ঘদিন শ্রমিক ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত ভোটারদের প্রতিনিধিত্ব করলেও বাজার অর্থনীতি ও পুঁজিবাদী কাঠামোকে মৌলিকভাবে প্রত্যাখ্যান করেনি।
সমাজবিজ্ঞানী সেমুর মার্টিন লিপসেট ও গ্যারি মার্কস এই বৈশিষ্ট্যকে আমেরিকান ‘ব্যতিক্রমবাদ’-এর অংশ হিসেবে দেখেছিলেন। কিন্তু সেই ব্যতিক্রম এখন আর আগের মতো নিশ্চিত নয়।
এর পেছনে শুধু বামপন্থার পরিবর্তন কাজ করছে না; ডানপন্থার রূপান্তরও গুরুত্বপূর্ণ। ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে রিপাবলিকান পার্টির রাজনৈতিক অবস্থান আমেরিকার পুরোনো মধ্যপন্থী রক্ষণশীল রাজনীতির সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রেই দূরত্ব তৈরি করেছে। উদারনৈতিক প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক রীতিনীতি ও প্রচলিত দলীয় কাঠামোর প্রতি ট্রাম্পপন্থী রাজনীতির সংশয় এবং আক্রমণাত্মক অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বের অন্যান্য দেশের তীব্র ডানপন্থী প্রবণতার কাছাকাছি নিয়ে গেছে।
এমন পরিস্থিতিতে ডেমোক্রেটিক পার্টি কেন আগের জায়গায় স্থির থাকবে—এই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে ডেমোক্রেটিক প্রতিরোধের বড় অংশ ছিল তীব্র দলীয় মেরুকরণ, রাশিয়া-সংক্রান্ত তদন্ত ও নানা রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রতত্ত্বকে ঘিরে সংঘাত। কিন্তু সেই প্রতিরোধে অনেক সময় মৌলিক নীতিগত পরিবর্তনের চেয়ে পুরোনো ডেমোক্রেটিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিরক্ষা বেশি স্পষ্ট ছিল।
বর্তমান বামপন্থী আন্দোলনের বৈশিষ্ট্য ভিন্ন। ডিএসএ-ঘনিষ্ঠ রাজনীতি ডেমোক্রেটিক পার্টিকে শুধু নির্বাচনী প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করতে চায় না; বরং দলটির নীতি ও রাজনৈতিক পরিচয়কেই বদলে দিতে চায়।
অর্থাৎ, রিপাবলিকান পার্টিকে ট্রাম্প যেভাবে নিজের রাজনৈতিক প্রকল্পের দিকে টেনে নিয়েছেন, ডিএসএ-ঘনিষ্ঠ বামপন্থীরাও ডেমোক্রেটিক পার্টির ক্ষেত্রে তেমন একটি পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে।
সমতার দাবি বনাম স্বাধীনতার প্রশ্ন
সমাজতন্ত্রের নতুন উত্থানকে শুধু অতীতের ব্যর্থতার পুনরাবৃত্তি হিসেবে দেখলে বর্তমান বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ অদৃশ্য থেকে যাবে। আজকের সমাজতন্ত্রীরা পুরোনো মার্কসবাদী ভাষা হুবহু ব্যবহার করছেন না। তারা নতুন অর্থনৈতিক বাস্তবতা, সম্পদের বৈষম্য, আবাসন ব্যয়, স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রীভবনের মতো বিষয় সামনে আনছেন।
তাই তাদের মোকাবিলা করতে হলে শুধু সোভিয়েত ইউনিয়নের ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দিলেই হবে না। বরং তাদের মূল রাজনৈতিক দাবিগুলোর সঙ্গে সরাসরি বিতর্কে যেতে হবে।
সমতার আকাঙ্ক্ষা শক্তিশালী রাজনৈতিক আবেগ। কিন্তু সমাজে সমতা প্রতিষ্ঠার জন্য রাষ্ট্রের ক্ষমতা কতদূর বাড়ানো হবে, ব্যক্তিস্বাধীনতার সীমা কোথায় থাকবে এবং মানুষের উদ্যোগ, সৃজনশীলতা ও ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষার জায়গা কতটা অক্ষুণ্ণ থাকবে—এসব প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সমাজতান্ত্রিক রাজনৈতিক প্রকল্পের সমালোচকেরা দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছেন, ফলাফলের সমতা নিশ্চিত করতে গিয়ে রাষ্ট্র যদি ব্যক্তির স্বাধীন সিদ্ধান্ত ও বৈচিত্র্যকে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ করে, তাহলে শেষ পর্যন্ত এমন একটি সমাজ তৈরি হতে পারে যেখানে সমতার পাশাপাশি স্বাধীনতা ও সৃজনশীলতার পরিসর সংকুচিত হয়।
এ কারণেই বর্তমান বামপন্থার উত্থানকে হালকা করে দেখার সুযোগ নেই।

ইতিহাসের সমাপ্তি নয়, নতুন রাজনৈতিক সংঘাত
আজকের আমেরিকায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন সম্ভবত সমাজতন্ত্রের জনপ্রিয়তা নিজে নয়; বরং এই ধারণার ফিরে আসা যে রাজনীতির মৌলিক প্রশ্নগুলোর উত্তর নিয়ে আবারও গভীর মতাদর্শিক সংঘাত হতে পারে।
শীতল যুদ্ধের অবসানের পর দীর্ঘ সময় ধরে আমেরিকার রাজনীতিতে বাজার অর্থনীতি, সাংবিধানিক গণতন্ত্র ও উদারনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মৌলিক কাঠামো নিয়ে বড় ধরনের দ্বন্দ্ব ছিল না। দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য ছিল, কিন্তু রাজনৈতিক ব্যবস্থার ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলতেন তুলনামূলক কম মানুষ।
সেই সময় হয়তো ছিল একটি ঐতিহাসিক বিরতি।
এখন সেই বিরতি শেষ হচ্ছে। একদিকে ট্রাম্পপন্থী রাজনীতির উত্থান, অন্যদিকে সমাজতান্ত্রিক প্রবণতার বিস্তার—দুই প্রান্তের শক্তিশালী হয়ে ওঠা একই বৃহত্তর পরিবর্তনের অংশ হতে পারে। প্রচলিত রাজনৈতিক মধ্যপন্থা যখন মানুষের ক্ষোভ, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও প্রতিষ্ঠানের প্রতি অবিশ্বাস সামাল দিতে ব্যর্থ হয়, তখন রাজনীতির প্রান্তিক ধারণাগুলো কেন্দ্রের দিকে এগিয়ে আসে।
ফলে আমেরিকার সামনে এখন পুরোনো প্রশ্নগুলো নতুনভাবে ফিরে এসেছে—রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য কী, স্বাধীনতার সীমা কোথায়, সমতার অর্থ কী এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বৈধতা কোন ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে থাকবে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর কেবল অতীতের স্মৃতি দিয়ে দেওয়া যাবে না। পুঁজিবাদ ও সাংবিধানিক গণতন্ত্র যদি টিকে থাকতে চায়, তবে তাদের নিজেদের কার্যকারিতা, ন্যায়সংগততা এবং মানুষের স্বাধীনতার প্রতি অঙ্গীকার নতুন করে প্রমাণ করতে হবে।
‘ইতিহাসের সমাপ্তি’ হয়তো কখনোই হয়নি। ইতিহাস কেবল কিছু সময়ের জন্য নীরব ছিল। এখন তার পুরোনো আদর্শিক দ্বন্দ্বগুলো নতুন ভাষা, নতুন প্রজন্ম এবং নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে আবার সামনে আসছে।
জেসন উইলিক 



















