বৈজ্ঞানিক গবেষণায় প্রাণী ব্যবহার নিয়ে আমেরিকায় দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক চলছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই বিতর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে। প্রাণীর ওপর বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা বন্ধ বা কমানোর দাবিতে এখন ডেমোক্র্যাট, রিপাবলিকান, প্রগতিশীল, রক্ষণশীল, স্বাধীনতাবাদী এমনকি ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’পন্থীদেরও অনেককে একই অবস্থানে দেখা যাচ্ছে।
বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রাণী গবেষণাগারগুলো। এর মধ্যে ওরেগন ন্যাশনাল প্রাইমেট রিসার্চ সেন্টার অন্যতম বড় প্রতিষ্ঠান। পোর্টল্যান্ডের পশ্চিমে অবস্থিত এই গবেষণাকেন্দ্রে প্রায় পাঁচ হাজার বানর রয়েছে। সেখানে ম্যালেরিয়া, এইচআইভি, স্মৃতিভ্রংশ ও বন্ধ্যত্বসহ বিভিন্ন রোগ নিয়ে গবেষণা করা হয়।
ম্যালেরিয়ার টিকা তৈরির চেষ্টা
ওরেগনের এই কেন্দ্রে প্রায় এক দশক ধরে ম্যালেরিয়া নিয়ে কাজ করছেন রোগ প্রতিরোধবিজ্ঞানী ব্র্যান্ডন ওয়াইল্ডার। মশাবাহিত এই রোগে প্রতিবছর পাঁচ লাখের বেশি মানুষ মারা যায়।
ওয়াইল্ডার স্বীকার করেন, খাঁচায় থাকা প্রাণী দেখতে কারও ভালো লাগে না। কিন্তু তাঁর মতে, মানুষের জীবন রক্ষার সম্ভাবনা বিবেচনায় নিয়ে এই গবেষণার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
চলতি বছরের শুরুতে ম্যালেরিয়ার বিরুদ্ধে মানুষের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা কীভাবে কাজ করে, সে বিষয়ে তাঁর গবেষণার একটি অংশ বিশ্বখ্যাত বৈজ্ঞানিক সাময়িকী ‘নেচার’-এ প্রকাশের জন্য গৃহীত হয়। এই গবেষণা ভবিষ্যতে ম্যালেরিয়ার একটি সর্বজনীন টিকা তৈরিতে সহায়তা করতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
কিন্তু এমন গবেষণাই এখন যুক্তরাষ্ট্রে প্রবল রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপের মুখে পড়েছে।
ডান-বাম দুই পক্ষই এখন একমত
দীর্ঘদিন প্রাণীর ওপর গবেষণার বিরোধিতা মূলত বামপন্থী রাজনৈতিক ও প্রাণী অধিকারকর্মীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। এখন সেই অবস্থার বড় পরিবর্তন হয়েছে।
রক্ষণশীলদের মধ্যেও প্রাণী গবেষণার বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রচার শুরু হয়েছে। রিপাবলিকান রাজনৈতিক কর্মী অ্যান্থনি বেলোত্তির নেতৃত্বাধীন ‘হোয়াইট কোট ওয়েস্ট’ নামের সংগঠন প্রাণী গবেষণাকে সরকারি অর্থের অপচয় হিসেবে তুলে ধরছে।
সংগঠনটি দাবি করছে, প্রাণীর ওপর পরিচালিত অনেক গবেষণায় বিপুল সরকারি অর্থ ব্যয় হচ্ছে, অথচ এসব গবেষণার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
এই প্রচারে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ ডানপন্থী কর্মী লরা লুমারও সরব হয়েছেন। প্রাণীর ওপর বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা চালানো গবেষকদের তিনি অত্যন্ত কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেছেন। তাঁর দাবি, কিছু পরীক্ষার বিবরণ শুনে ট্রাম্পও সেগুলোকে অত্যন্ত নিন্দনীয় বলে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন।
সরকারি গবেষণাগারেও চাপ
যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য ও মানবসেবা বিভাগের নেতৃত্বে থাকা রবার্ট এফ কেনেডি জুনিয়র প্রাণীর ওপর গবেষণা বন্ধ করার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। দেশটির সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত সাতটি বড় বানর গবেষণাকেন্দ্রের বিরুদ্ধেও তিনি সমালোচনা করেছেন।
এর মধ্যে ওরেগনের গবেষণাকেন্দ্রটি বন্ধ করে প্রাণীদের জন্য আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত করার একটি পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছিল। তবে বিপুল ব্যয়ের কারণে শেষ পর্যন্ত সেই পরিকল্পনা বাতিল করা হয়।
এর পরিবর্তে কেন্দ্রটি ধীরে ধীরে বানরনির্ভর গবেষণা কমিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রও এইচআইভি গবেষণায় ব্যবহৃত একটি বানর গবেষণাগার বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছে।
অবাক করার বিষয় হলো, বিজ্ঞান গবেষণায় সরকারি অর্থ কমানোর অন্যান্য উদ্যোগের বিরোধিতা করলেও প্রাণী গবেষণা কমানোর বিষয়ে ডেমোক্র্যাটদের অনেকেই তেমন আপত্তি তুলছেন না।

প্রযুক্তি কি প্রাণীর বিকল্প হতে পারবে?
প্রাণী গবেষণা কমানোর পক্ষে সবচেয়ে বড় যুক্তিগুলোর একটি হলো নতুন প্রযুক্তি ইতোমধ্যে অনেক ক্ষেত্রে বিকল্প তৈরি করছে।
এর মধ্যে রয়েছে মানুষের অঙ্গের ক্ষুদ্র কৃত্রিম সংস্করণ, পরীক্ষাগারে তৈরি ত্রিমাত্রিক মানব টিস্যু এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক বিভিন্ন মডেল। এসব প্রযুক্তির মাধ্যমে মানুষের শরীরে রোগ ও ওষুধের প্রভাব সম্পর্কে আরও নির্ভুল তথ্য পাওয়া সম্ভব বলে সমর্থকদের দাবি।
কিন্তু অনেক বিজ্ঞানী এই যুক্তির সঙ্গে একমত নন।
তাদের মতে, একটি জীবন্ত প্রাণীর শরীরে বিভিন্ন অঙ্গ একে অপরের সঙ্গে যেভাবে কাজ করে, তা কৃত্রিমভাবে তৈরি কোনো একক মডেল এখনো পুরোপুরি অনুকরণ করতে পারে না।
২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল একাডেমিজ অব সায়েন্সেস, ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড মেডিসিনও জানিয়েছিল, নতুন প্রযুক্তিগুলো এখনো জীবন্ত প্রাণীর শরীরে একাধিক অঙ্গের পারস্পরিক সম্পর্ক পুরোপুরি পুনর্নির্মাণ করতে পারে না।
ফলে প্রাণী গবেষণার সম্পূর্ণ বিকল্প হিসেবে এসব প্রযুক্তিকে এখনই ব্যবহার করা সম্ভব কি না, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
চীনে উল্টো চিত্র
যুক্তরাষ্ট্রে যখন প্রাণী গবেষণা কমানোর চাপ বাড়ছে, তখন চীনের পরিস্থিতি অনেকটাই ভিন্ন।
চীনের গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং দ্রুত সম্প্রসারিত জৈবপ্রযুক্তি শিল্প বিপুলসংখ্যক বানর কিনছে। ফলে বিশ্ববাজারে গবেষণার জন্য ব্যবহৃত বানরের দামও বেড়ে গেছে।
এতে যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞানীদের একটি অংশ আশঙ্কা করছেন, প্রাণী গবেষণা বন্ধ বা সীমিত করা হলে দেশটি বৈজ্ঞানিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে পারে।
বিশেষ করে নতুন ওষুধ, টিকা এবং জটিল রোগ নিয়ে গবেষণায় এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিজ্ঞানীদের মধ্যে বাড়ছে উদ্বেগ
ওরেগনের গবেষণাকেন্দ্রে এরই মধ্যে কর্মী সংকট দেখা দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ার পর অন্তত ১৫ জন কর্মী চাকরি ছেড়েছেন। তাদের মধ্যে কয়েকজন উচ্চপর্যায়ের বিজ্ঞানী ও পশুচিকিৎসকও রয়েছেন।

নতুন গবেষক নিয়োগও কঠিন হয়ে পড়েছে। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের অন্য ছয়টি জাতীয় পর্যায়ের বানর গবেষণাকেন্দ্রও প্রায় পূর্ণ সক্ষমতায় কাজ করছে।
ফলে ওরেগনের গবেষণা অন্য কোথাও সরিয়ে নেওয়াও সহজ নয়।
কিছু মার্কিন বিজ্ঞানী ইতোমধ্যে বিদেশে যাওয়ার সুযোগ খুঁজছেন। ওয়াইল্ডারও নেদারল্যান্ডসে কাজের একটি প্রস্তাব পেয়েছেন।
গবেষণা বন্ধের চাপ কতটা দীর্ঘমেয়াদি?
প্রাণী গবেষণার বিরোধীরা বলছেন, বিজ্ঞানীদের ভয় দেখানো তাদের উদ্দেশ্য নয়। তবে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা দরকার, যাতে গবেষকেরা বুঝতে পারেন প্রাণীর ওপর গবেষণা চালানো যুক্তরাষ্ট্রে ভবিষ্যতে আর সহজ হবে না।
সমালোচকদের আশঙ্কা, এই ধরনের চাপের ফলে শুধু প্রাণী গবেষণাই নয়, গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা গবেষণাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
অন্যদিকে প্রাণী অধিকারকর্মীদের যুক্তি, মানুষের চিকিৎসার উন্নতির জন্য প্রাণীদের কষ্ট দেওয়া নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয় এবং আধুনিক প্রযুক্তি এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুরোনো গবেষণাপদ্ধতি থেকে বেরিয়ে আসা উচিত।
সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রাণী গবেষণা নিয়ে বিতর্ক এখন আর শুধু বিজ্ঞানী ও প্রাণী অধিকারকর্মীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি পরিণত হয়েছে বড় ধরনের রাজনৈতিক ও নীতিগত প্রশ্নে। আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—মানুষের চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতির জন্য প্রাণী গবেষণা কতটা প্রয়োজন, এবং আধুনিক প্রযুক্তি তার বিকল্প হয়ে উঠতে পারবে কি না।
প্রাণী গবেষণা নিয়ে আমেরিকার নতুন রাজনৈতিক ঐক্য এখন দেশটির বিজ্ঞান ও চিকিৎসাব্যবস্থার ভবিষ্যতের ওপরও বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
প্রাণী গবেষণা নিয়ে আমেরিকায় রাজনৈতিক ঐক্য তৈরি হলেও বিজ্ঞানীরা বলছেন, বিকল্প প্রযুক্তি এখনো সব ক্ষেত্রে প্রাণীর গবেষণার জায়গা নিতে পারেনি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















