কাজ পরে করব—এই ছোট্ট অভ্যাসটি অনেকের কাছেই স্বাভাবিক মনে হতে পারে। কিন্তু নিয়মিত কাজ ফেলে রাখার অভ্যাস মানুষের আয়, মানসিক সুস্থতা, শারীরিক স্বাস্থ্যের পাশাপাশি আত্মবিশ্বাসেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। তবে আশার কথা হলো, এই অভ্যাস স্থায়ী কোনো সমস্যা নয়। কিছু সহজ মানসিক অনুশীলন, নিয়মিত শরীরচর্চা ও দৈনন্দিন জীবনে শৃঙ্খলা আনার মাধ্যমে কাজ ফেলে রাখার প্রবণতা অনেকটাই কমানো সম্ভব।
গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিয়মিত প্রয়োজনীয় কাজ পিছিয়ে দেন, তাদের ক্ষেত্রে জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। ২০১৩ সালের একটি গবেষণায় ২২ হাজারের বেশি মানুষকে কাজ ফেলে রাখার প্রবণতার ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হয়। সেখানে দেখা যায়, এই প্রবণতার মাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বার্ষিক আয়ের পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
কাজ পিছিয়ে দেওয়ার অভ্যাস শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। যারা নিয়মিত গুরুত্বপূর্ণ কাজ এড়িয়ে যান, তারা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিতেও দেরি করতে পারেন। সুইডেনের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের ওপর করা এক গবেষণায় দেখা যায়, যাদের মধ্যে কাজ ফেলে রাখার প্রবণতা বেশি, তাদের তীব্র ও দৈনন্দিন জীবন ব্যাহতকারী ব্যথায় ভোগার আশঙ্কাও বেশি।
মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব

কাজ জমিয়ে রাখার অভ্যাসের সঙ্গে উদ্বেগ, মানসিক চাপ ও একাকিত্বের সম্পর্কও পাওয়া গেছে। ২০২৫ সালে বিভিন্ন দেশের ৬৩ হাজারের বেশি মানুষকে নিয়ে ৮৮টি গবেষণার সমন্বিত বিশ্লেষণে দেখা যায়, নিয়মিত কাজ পিছিয়ে দেওয়ার সঙ্গে আত্মসম্মানবোধ কমে যাওয়ার সম্পর্ক রয়েছে। আর এই আত্মবিশ্বাসের ক্ষয় ভবিষ্যতে বিষণ্নতার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
অর্থাৎ, কোনো কাজ আজ না করে কাল করার অভ্যাস ধীরে ধীরে একটি চক্র তৈরি করতে পারে। কাজ জমতে থাকে, চাপ বাড়ে, নিজের ওপর আস্থা কমে এবং শেষ পর্যন্ত আরও বেশি কাজ পিছিয়ে দেওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়।
অভ্যাস বদলাতে পারে মানসিক অনুশীলন
তবে এই অভ্যাস থেকে বের হওয়ার পথও আছে। গবেষকেরা এমন একটি মানসিক অনুশীলনের কথা বলছেন, যেখানে প্রথমে নিজের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনের পর কী ভালো ফল পাওয়া যাবে, সেটি কল্পনা করতে হয়। এরপর সেই লক্ষ্যে পৌঁছানোর সবচেয়ে বড় বাধাটি চিহ্নিত করে তা মোকাবিলার জন্য একটি নির্দিষ্ট পরিকল্পনা করতে হয়।
২০২০ সালে দুটি পরীক্ষায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের এমন মানসিক অনুশীলন করানো হয়েছিল। লক্ষ্য ছিল রাতে নির্ধারিত সময়ে ঘুমাতে যাওয়ার অভ্যাস তৈরি করা। দেখা যায়, যারা এই অনুশীলন করেছিলেন, তারা অন্যদের তুলনায় প্রতি রাতে নির্ধারিত ঘুমের সময় থেকে প্রায় ৩৮ মিনিট কম দেরি করেছেন।

শরীরচর্চাতেও মিলছে সুফল
কাজ ফেলে রাখার প্রবণতা কমাতে শরীরচর্চারও ভূমিকা থাকতে পারে। চলতি বছরের মার্চে চীনে ৭৭ জন কিশোরের ওপর একটি গবেষণা করা হয়। তাদের একাংশকে শক্তিবর্ধক ব্যায়াম, একাংশকে উচ্চমাত্রার বিরতিভিত্তিক ব্যায়াম এবং অন্যদের দুই ধরনের ব্যায়ামের সমন্বিত কর্মসূচিতে রাখা হয়।
১২ সপ্তাহ পর তিন ধরনের ব্যায়ামেই কাজ পিছিয়ে দেওয়ার প্রবণতায় উল্লেখযোগ্য হ্রাস দেখা যায়। এর আগে চীনের ৫৬৪ জন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীকে নিয়ে করা আরেক গবেষণাতেও দেখা হয়েছিল, যারা বেশি সক্রিয়ভাবে শরীরচর্চা করেন, তারা তুলনামূলকভাবে কম কাজ ফেলে রাখেন।
গবেষকদের ধারণা, শরীরচর্চার মাধ্যমে কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলার অভিজ্ঞতা মানুষের মধ্যে নিজের সক্ষমতা সম্পর্কে আত্মবিশ্বাস তৈরি করতে পারে। সেই আত্মবিশ্বাস কাজ শুরু করার আগ্রহ ও প্রেরণাও বাড়ায়।
ঘুম ও দৈনন্দিন অভ্যাসও গুরুত্বপূর্ণ
খাবার ও অন্যান্য দৈনন্দিন অভ্যাসের সঙ্গেও কাজ ফেলে রাখার প্রবণতার সম্পর্ক থাকতে পারে। ইতালির বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের ওপর করা ২০২৪ সালের এক গবেষণায় দেখা যায়, যারা নিয়মিত সকালের নাশতা বাদ দেন, অতিরিক্ত মদ্যপান করেন কিংবা ঠিকমতো ঘুমান না, তাদের মধ্যে কাজ পিছিয়ে দেওয়ার প্রবণতা বেশি।

তবে গবেষকেরা সতর্ক করে বলেছেন, এসব অভ্যাস সরাসরি কাজ ফেলে রাখার কারণ—এমন নিশ্চিত প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। বরং উল্টোভাবে কাজ ফেলে রাখার কারণেও কেউ নাশতা বাদ দিতে বা দেরিতে ঘুমাতে যেতে পারেন।
এখন পর্যন্ত কাজ ফেলে রাখার প্রবণতার জন্য নির্দিষ্ট কোনো ওষুধ নেই। তবে মনোযোগ ও নির্বাহী মানসিক দক্ষতার সমস্যায় ভোগা কিছু মানুষের ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট চিকিৎসা-ওষুধ নিয়ে গবেষণায় কাজ শুরু করার সক্ষমতা বাড়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে। তবে এটি সাধারণভাবে কাজ ফেলে রাখার চিকিৎসা হিসেবে ব্যবহারের প্রমাণ নয়।
মুঠোফোন বাড়িয়ে দিচ্ছে বিভ্রান্তি
আধুনিক জীবনে কাজ পিছিয়ে দেওয়ার সুযোগও বেড়েছে। ঘরে বসে কাজ করার ফলে অনেক সময় সরাসরি তদারকি থাকে না। তার ওপর মুঠোফোনে রয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিনোদন ও নানা ধরনের অবিরাম আকর্ষণ।
২০২২ সালে প্রকাশিত একটি পর্যালোচনায় ১৮টি গবেষণার প্রতিটিতেই অতিরিক্ত মুঠোফোন ব্যবহারের সঙ্গে কাজ পিছিয়ে দেওয়ার সম্পর্ক পাওয়া যায়। বিশেষ করে রাতে মুঠোফোনে দীর্ঘ সময় কাটানো ঘুমের সময় পিছিয়ে দেয়। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে মস্তিষ্কের পরিকল্পনা, মনোযোগ ও আত্মনিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দুর্বল হতে পারে। ফলে পরদিন আবার কাজ ফেলে রাখার প্রবণতা বাড়ে।
সব মিলিয়ে, কাজ পিছিয়ে দেওয়া শুধু অলসতার বিষয় নয়। এটি আয়, স্বাস্থ্য, মানসিক সুস্থতা, আত্মবিশ্বাস এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তবে নিয়মিত শরীরচর্চা, পর্যাপ্ত ঘুম, মুঠোফোনের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ এবং কাজ শুরু করার আগে বাধাগুলো চিহ্নিত করে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা করলে এই অভ্যাস ধীরে ধীরে বদলানো সম্ভব।
কাজ পরে করব—এই কথাটি যতবার বলা হয়, ততবারই সময়ের কাছে কিছু না কিছু হারিয়ে যায়। তাই পরিবর্তনের সবচেয়ে ভালো সময় হলো এখনই।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















