এনভিডিয়ার সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী জেনসেন হুয়াং গত মাসে টোকিও সফরে গিয়ে যে জায়গায় সবচেয়ে বেশি নজর কাড়েন, সেটি কোনো চিপ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান বা ভিডিও গেম কোম্পানি নয়; বরং সাধারণ মানুষের জনপ্রিয় খাবারের দোকান ইয়াকিটন সানকিচি। জাপানের ঐতিহ্যবাহী ইজাকায়া ধরনের এই ছোট খাবারের দোকানে তাঁর উপস্থিতি এখন ব্যবসাটির নতুন করে আলোচনায় আসার কারণ হয়ে উঠেছে।
হুয়াংয়ের পছন্দের সাধারণ খাবারের দোকান
ইজাকায়াকে অনেক সময় জাপানি পানশালা বলা হলেও এটি মূলত পাড়া-মহল্লার বার ও ছোট খাবারের রেস্তোরাঁর এক ধরনের মিশ্র রূপ। এখানে সহজ-সরল খাবার, পানীয় এবং অনানুষ্ঠানিক পরিবেশে বন্ধু, সহকর্মী বা পরিচিতদের আড্ডা দেওয়ার সুযোগ থাকে। ছোট মালিকানাধীন দোকান থেকে শুরু করে বড় জাতীয় চেইন—দুই ধরনের ব্যবসাই এই খাতে রয়েছে।
হুয়াং এর আগেও সিউল ও তাইপের এমন সাধারণ খাবারের দোকানে যাওয়ার জন্য পরিচিত। একবার গুরুত্বপূর্ণ চিপ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে তিনি এমন একটি রেস্তোরাঁয় খাবার ও পানীয় বাবদ প্রায় ৩ লাখ ইয়েন খরচ করেছিলেন বলে প্রতিবেদন রয়েছে।
টোকিওর ইয়াকিটন সানকিচিতে তাঁর সফরের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সেখানে ভক্তদের ভিড় বেড়ে যায়। দোকানটি অতিরিক্ত চাপের কারণে ধীরগতির সেবার জন্য গ্রাহকদের কাছে ক্ষমাও চেয়েছে।
দীর্ঘ সংকটে ইজাকায়া শিল্প
হুয়াংয়ের সফর ইজাকায়া খাতের জন্য ইতিবাচক প্রচার এনে দিলেও সামগ্রিক চিত্র অনেক কঠিন। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেই জাপানে ১১৮টি ইজাকায়া ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেছে। কোভিড-১৯ মহামারির ধাক্কা কাটিয়ে ওঠার আগেই খাতটি জ্বালানি, শ্রম ও কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধির সম্মুখীন হয়।
২০১৯ সালের তুলনায় ইজাকায়া খাতের আকার এখন প্রায় ১৫ শতাংশ ছোট। ২০২৪ সাল পর্যন্ত টানা ১৩ বছর ইজাকায়ার সংখ্যা কমেছে। তরুণ প্রজন্মের মধ্যে আগের তুলনায় মদ্যপানের প্রবণতা কমে আসা এবং কর্মক্ষেত্রে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বাধ্যতামূলক পানাহারের পুরোনো সংস্কৃতি দুর্বল হয়ে পড়াও এই পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত।
এমন পরিস্থিতিতে একসময় খাতটির অন্যতম বড় নাম ওয়াতামি ব্যবসার দিক পরিবর্তন করে জাপানে সাবওয়ের পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান কিনে নেয়। প্রতিষ্ঠানটি এখন ফাস্টফুড ব্যবসা সম্প্রসারণের দিকে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে।

দেউলিয়াতেও টিকে আছে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান
তবে ইজাকায়া শিল্পের জন্য এখনই শেষ ঘণ্টা বাজেনি। বরং খাতটি দুর্বল ও শক্তিশালী ব্যবসায় ভাগ হয়ে নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করছে। এর উদাহরণ তোরিকিজোকু। একসময় মুদ্রাস্ফীতির বিপরীত অর্থনৈতিক পরিবেশে এই ইয়াকিতোরি চেইন মাত্র ২৮০ ইয়েন দামে খাবার ও পানীয় দেওয়ার ব্যবসায়িক মডেল গড়ে তুলেছিল। তিন দশকেরও বেশি সময় পর ২০১৭ সালে সেই মডেল ভেঙে পড়ে। মহামারির পর প্রতিষ্ঠানটি আরও তিন দফা দাম বাড়িয়েছে।
তবুও গ্রাহক হারায়নি তোরিকিজোকু। বরং বিক্রি ও গ্রাহক—দুটিই বাড়ছে। অনেক এলাকায় সন্ধ্যার সময় সেখানে আসন পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। সহযোগী একটি ব্র্যান্ডসহ জাপানে তাদের ইয়াকিতোরি দোকানের সংখ্যা এখন ১ হাজারের বেশি।
নতুন গ্রাহক, নতুন কৌশল
দীর্ঘদিন সস্তা শ্রম ও উপকরণের ওপর নির্ভর করে মাঝারি মানের ইজাকায়াও টিকে ছিল। কিন্তু মূল্যস্ফীতি সেই পুরোনো ব্যবসায়িক মডেলকে চাপে ফেলেছে। যারা গ্রাহককে বাড়তি মূল্য দেওয়ার মতো কিছু দিতে পারছে না, তাদের টিকে থাকা কঠিন হয়ে উঠছে।
এর বিপরীতে বিশেষায়িত খাবারের দোকান ও নতুন ধরনের ইজাকায়া দ্রুত বাড়ছে। ইয়াতাইজুশির মতো সুশিভিত্তিক চেইন এবং কুশিকাতসু তানাকার মতো ভাজা কাবাবের প্রতিষ্ঠান সম্প্রসারণ করছে। নতুন প্রজন্মের পছন্দ অনুযায়ী আকর্ষণীয় খাবার, পানীয় ও অভিজ্ঞতা তৈরি করা হচ্ছে। পর্যটকদের জন্য ঐতিহ্যবাহী জাপানি অভিজ্ঞতা, ডিজিটাল মেনু এবং বিদেশি কর্মী নিয়োগও বাড়ছে।
দেউলিয়া বাড়লেও ২০২৫ সালে বড় চেইনের পরিচালিত ইজাকায়ার সংখ্যা ১৩ বছরের মধ্যে প্রথমবার বেড়েছে। অর্থাৎ দীর্ঘ পতনের পর খাতটি হয়তো ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ানোর পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে।
জেনসেন হুয়াংয়ের সফরের পর ইয়াকিটন সানকিচি সাময়িকভাবে ৪ হাজার ৫০০ ইয়েনে ১০ পদে ‘জেনসেন হুয়াং কোর্স’ চালু করেছিল। এতে ছিল ছয়টি শূকরের কাবাব, রামেন এবং দুই ঘণ্টার সীমাহীন পানীয়। পরে মেনু থেকে হুয়াংয়ের নাম সরিয়ে নেওয়া হয়। তবে তাঁর সফর যে জাপানের পুরোনো ইজাকায়া সংস্কৃতিকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে, তা স্পষ্ট।
গিয়ারয়েড রিডি, ব্লুমবার্গ ওপিনিয়ন কলামিস্ট; জাপান ও দুই কোরিয়া নিয়ে লেখেন।
জাপানের ইজাকায়া শিল্প মহামারি, মূল্যস্ফীতি ও বদলে যাওয়া পানীয় সংস্কৃতির চাপে সংকুচিত হলেও নতুন প্রজন্ম, পর্যটক ও বিশেষায়িত ব্যবসাকে কেন্দ্র করে ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















