সিঙ্গাপুরের জাতীয় দিবস উদযাপনের এবারের আয়োজন যেন হয়ে উঠেছিল দেশটির ইতিহাস, সংস্কৃতি, সমুদ্রভিত্তিক ঐতিহ্য ও জনপ্রিয় সংস্কৃতির এক আবেগঘন যাত্রা। জাতীয় স্টেডিয়ামে আয়োজিত বর্ণিল অনুষ্ঠানে একদিকে উঠে এসেছে সিঙ্গাপুরের প্রাচীন সামুদ্রিক জনগোষ্ঠী ‘ওরাং লাউত’-এর জীবন ও ঐতিহ্য, অন্যদিকে ফিরে এসেছে স্বাধীনতার পরের দশকগুলোর টেলিভিশন, গান, খেলাধুলা ও জাতীয় প্রচারণার স্মৃতি।
অনুষ্ঠানের তৃতীয় পর্বে ‘সীমা পেরিয়ে আমাদের আকার’ ভাবনায় সিঙ্গাপুরের সামুদ্রিক অতীতকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। ওরাং লাউত শিল্পী আসনিদা দাউদ শক্তিশালী কণ্ঠে পরিবেশন করেন ‘আওক দিকো’ গানটি। ওরাং লাউত ভাষায় যার অর্থ ‘হ্যাঁ, অবশ্যই’। গানটি সিঙ্গাপুরের সমুদ্রনির্ভর আদিবাসী জনগোষ্ঠী এবং দেশটির ভূমি ও সাগরের দীর্ঘ সম্পর্ককে স্মরণ করিয়ে দেয়।
সমুদ্রের সঙ্গে গড়ে ওঠা এক পুরোনো পরিচয়
ওরাং লাউত শব্দের অর্থ মালয় ভাষায় ‘সমুদ্রের মানুষ’। একসময় সিঙ্গাপুরের দক্ষিণাঞ্চলীয় দ্বীপপুঞ্জ ও উপকূলীয় এলাকায় তাদের বসবাস ছিল। মাছ ধরা, বাণিজ্য ও উপকূলকেন্দ্রিক জীবনযাপন ছিল তাদের অস্তিত্বের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সাগর ছিল তাদের জীবিকা, চলাচল এবং সামাজিক পরিচয়ের কেন্দ্র।
জাতীয় দিবসের অনুষ্ঠানে সেই ইতিহাসকে আধুনিক মঞ্চে তুলে ধরতে আসনিদা দাউদের সঙ্গে অংশ নেন বিপুলসংখ্যক শিল্পী ও বাদ্যযন্ত্রী। সোকা গাক্কাই সিঙ্গাপুরের প্রায় ৭০০ পরিবেশকও এই পর্বে অংশ নেন।
মঞ্চে দেখা যায় স্থানীয় প্রাণবৈচিত্র্যের প্রতীক হিসেবে তৈরি নানা পুতুল। ছিল মালয়ান ট্যাপির ও মাউসডিয়ারের মতো প্রাণী। এরপর মঞ্চে আসে সিঙ্গাপুরের জলসীমায় পাওয়া সামুদ্রিক প্রাণীর প্রতিকৃতি—ডুগং ও কচ্ছপ। তাদের উপস্থিতি যেন দর্শকদের নিয়ে যায় সিঙ্গাপুরের স্থলভূমি থেকে সমুদ্রের গভীর ইতিহাসে।
এরপর ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের কর্ণাটক ধারার শিল্পী সুশমা সোমা সিঙ্গাপুরকে উৎসর্গ করে একটি বিশেষ সংগীত পরিবেশন করেন। সামুদ্রিক ঐতিহ্য, স্থানীয় প্রাণবৈচিত্র্য এবং বিভিন্ন সংস্কৃতির সংগীত—সব মিলিয়ে এই পর্বে সিঙ্গাপুরের বহুমাত্রিক পরিচয় ফুটে ওঠে।
ছয় অধ্যায়ে ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ভবিষ্যতের গল্প
জাতীয় দিবসের পুরো আয়োজন সাজানো হয়েছিল ছয়টি অধ্যায়ে। এর মূল ভাবনা ছিল সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে একসঙ্গে নতুন উচ্চতায় পৌঁছানো।
চতুর্থ অধ্যায় ‘সময়কে ছাড়িয়ে’ দর্শকদের ফিরিয়ে নেয় সিঙ্গাপুরের ষাটের দশকে। তখন দেশটিতে টেলিভিশন সম্প্রচার মাত্র শুরু হয়েছে। সেই সময় থেকে স্বাধীনতার পরবর্তী কয়েক দশকে টেলিভিশন, বিনোদন, গান, খেলাধুলা ও জনসচেতনতামূলক প্রচারণা কীভাবে সিঙ্গাপুরের মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে, তা তুলে ধরা হয় অনুষ্ঠানে।
সত্তরের দশকের ফুটবল ম্যাচের দৃশ্য থেকে শুরু করে আশির দশকের জনপ্রিয় চীনা ধারাবাহিক ‘দ্য অ্যাওয়েকেনিং’—সবই ফিরে আসে মঞ্চে। নব্বইয়ের দশকের বহুল জনপ্রিয় হাস্যরসাত্মক ধারাবাহিক ‘ফুয়া চু কাং পিটিই লিমিটেড’-এর স্মৃতিও দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে।

জাতীয় প্রচারণার পুরোনো কিছু চরিত্রও ফিরে আসে। ‘সিংগা দ্য কাইন্ডনেস লায়ন’ এবং ‘টিমি দ্য প্রোডাক্টিভিটি বি’-এর মতো পরিচিত প্রতীক দর্শকদের মনে করিয়ে দেয় সিঙ্গাপুরের সামাজিক মূল্যবোধ ও রাষ্ট্রীয় প্রচারণার দীর্ঘ পথচলার কথা।
পুরোনো গানেও ফিরে আসে হারানো সময়
শুধু দৃশ্য নয়, সংগীতের মাধ্যমেও দর্শকদের অতীতে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। শিজি লিম, নাজিপ আলি ও উদয়া সুন্দরীর মতো শিল্পীরা পরিবেশন করেন জনপ্রিয় পুরোনো গান। শহরের চাঁদের আলো নিয়ে জনপ্রিয় স্থানীয় গান থেকে শুরু করে ‘ভাসান্থাম’-এর পুলিশ নাটকের পরিচিত গানের সুর—সব মিলিয়ে জাতীয় স্টেডিয়াম হয়ে ওঠে এক বিশাল স্মৃতির মঞ্চ।
শিশুদের তথ্য ও শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান ‘মাত ইয়োইয়ো’-এর চরিত্র, বিভিন্ন জাতীয় প্রচারণার প্রতীক, সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনসের কর্মী এবং পিপলস অ্যাসোসিয়েশনের তিন শতাধিক পরিবেশকও এই আয়োজনে অংশ নেন।
অভিনেতা নাজিপ আলি একটি গাড়িতে করে জাতীয় স্টেডিয়ামে প্রবেশ করেন এবং নিজের ১৯৯৫ সালে প্রকাশিত প্রথম অ্যালবামের গান ‘রেন-তাক ওনিক’ পরিবেশন করেন। সেই পরিবেশনাও দর্শকদের কাছে হয়ে ওঠে পুরোনো দিনের সঙ্গে নতুন সময়ের এক সেতুবন্ধন।
ফুয়া চু কাং ফিরতেই দর্শকদের উচ্ছ্বাস
অনুষ্ঠানের সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্তগুলোর একটি ছিল জনপ্রিয় চরিত্র ফুয়া চু কাংয়ের প্রত্যাবর্তন। অভিনেতা গার্মিট সিং আবারও সেই পরিচিত চরিত্রে হাজির হলে দর্শকদের মধ্যে তৈরি হয় ব্যাপক নস্টালজিয়া।
৬১ বছর বয়সী আলভিন খু বলেন, অতীতের অনুষ্ঠান, গান ও প্রচারণাগুলো দেখে তিনি বুঝতে পেরেছেন, সিঙ্গাপুর কতটা দীর্ঘ পথ পেরিয়ে আজকের অবস্থানে পৌঁছেছে।
২৯ বছর বয়সী মানবসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তা লো সুই শিনের কাছেও ফুয়া চু কাংয়ের উপস্থিতি ছিল বিশেষ স্মৃতিময়। চরিত্রটি দেখেই তার মনে পড়ে যায় সেই বিখ্যাত সংলাপ—‘ডোন্ট প্লে প্লে’। তার আক্ষেপ, অনুষ্ঠানটি এখন আর প্রচারিত হয় না।
সামুদ্রিক প্রাণীর বিশাল পুতুলগুলোকেও তিনি প্রশংসা করেন। তার কাছে মনে হয়েছে, ডুগং ও কচ্ছপের উপস্থিতির কারণে দর্শকরা যেন সত্যিই সমুদ্রের ভেতর চলে গিয়েছিলেন।
অতীতকে স্মরণ করে ভবিষ্যতের পথে
সিঙ্গাপুরের এবারের জাতীয় দিবসের আয়োজন তাই শুধু একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ছিল না। এটি ছিল একটি দেশের আত্মপরিচয়কে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার প্রয়াস।
ওরাং লাউতের সমুদ্রনির্ভর জীবন থেকে শুরু করে আধুনিক সিঙ্গাপুরের নগরসভ্যতা, ষাটের দশকের প্রথম টেলিভিশন সম্প্রচার থেকে নব্বইয়ের দশকের জনপ্রিয় চরিত্র, পুরোনো গান থেকে আজকের বর্ণিল মঞ্চ—সবকিছু মিলিয়ে অনুষ্ঠানটি দেখিয়েছে কীভাবে একটি জাতির ইতিহাস তার মানুষের স্মৃতিতে বেঁচে থাকে।
অতীতকে ভুলে নয়, বরং সেই স্মৃতিকে সঙ্গে নিয়েই ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাওয়ার বার্তাই যেন এবারের জাতীয় দিবসের আয়োজনের সবচেয়ে বড় সাফল্য।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















