দক্ষিণ কোরিয়ায় ভ্রমণ এখন আর শুধু রাজপ্রাসাদ দেখা, রাস্তার খাবার খাওয়া কিংবা ক্যাফেতে সময় কাটানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সৌন্দর্যচর্চা ও আধুনিক চিকিৎসার জন্যও দেশটিতে ছুটছেন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ। কোরিয়ার উন্নত চিকিৎসা প্রযুক্তি, দক্ষ চিকিৎসক এবং তুলনামূলক সাশ্রয়ী খরচ দেশটিকে চিকিৎসা পর্যটনের অন্যতম আকর্ষণীয় গন্তব্যে পরিণত করেছে।
তবে বিদেশি রোগীদের জন্য কোরিয়ায় চিকিৎসা নেওয়ার ক্ষেত্রে ভাষাগত সমস্যা, হাসপাতাল ব্যবস্থার সঙ্গে অপরিচিতি এবং উপযুক্ত চিকিৎসাকেন্দ্র খুঁজে পাওয়ার জটিলতা বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এই সমস্যাগুলো সহজ করতে কাজ করছে বৈশ্বিক চিকিৎসা-সহায়ক প্ল্যাটফর্ম রোম মেডিকেল।
চিকিৎসা পর্যটনে কোরিয়ার উত্থান
কোরিয়ার স্বাস্থ্য ও কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর দেশটিতে ২০ লাখ ১০ হাজার বিদেশি রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। ২০০৯ সালে বিদেশি রোগীদের তথ্য সংগ্রহ শুরু হওয়ার পর এটিই সর্বোচ্চ সংখ্যা।
বিশেষ করে কোরীয় সৌন্দর্যচর্চার বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়তা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ত্বকের চিকিৎসা, সৌন্দর্যচর্চা এবং বিভিন্ন আধুনিক চিকিৎসাসেবার জন্য বিদেশিদের আগ্রহও বেড়েছে।

কিন্তু কোরিয়ান ভাষা না জানা একজন বিদেশির জন্য নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসাকেন্দ্র খুঁজে নেওয়া সহজ নয়। রোম মেডিকেলের প্রতিষ্ঠাতা ক্রিস মোটজ নিজেও এমন সমস্যার মুখোমুখি হয়েছিলেন।
জাপানের টোকিওতে থাকার সময় সামান্য দাঁতের জরুরি সমস্যায় পড়ে ইংরেজিভাষী ভালো একজন দন্তচিকিৎসক খুঁজে পেতে তাকে বেশ সমস্যায় পড়তে হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই বিদেশিদের জন্য চিকিৎসাসেবা খুঁজে দেওয়া ও ব্যবস্থাপনার একটি সহজ প্ল্যাটফর্ম তৈরির চিন্তা আসে।
কীভাবে কাজ করে রোম
রোম মূলত ইংরেজিভাষী পর্যটক ও প্রবাসীদের সঙ্গে বাছাই করা হাসপাতাল ও চিকিৎসাকেন্দ্রের যোগাযোগ তৈরি করে। কোরিয়ায় কাজ শুরু করার আগে প্রতিষ্ঠানটির চিকিৎসা সমন্বয়কারীরা অংশীদার প্রতিটি চিকিৎসাকেন্দ্র পরিদর্শন করে সেবার মান যাচাই করেন এবং ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য নিয়মিত হালনাগাদ রাখেন।
রোগীর প্রয়োজনও এখানে গুরুত্ব পায়। কারও ত্বকের সমস্যা, কারও সাধারণ স্বাস্থ্য পরীক্ষা, আবার কারও স্বল্প সময়ের মধ্যে একাধিক সৌন্দর্যচিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে। রোগীর চাহিদা ও সময়ের সঙ্গে মিল রেখে চিকিৎসাকেন্দ্র বেছে নেওয়াই এই ব্যবস্থার অন্যতম লক্ষ্য।
ওয়েবসাইটে প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে আবেদন করার পর সাধারণত ২৪ ঘণ্টার মধ্যে একজন প্রতিনিধি যোগাযোগ করেন। এরপর অনুমোদিত চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শের সময় নির্ধারণ করা হয়। পরীক্ষার আগে উপবাসের মতো প্রয়োজনীয় প্রস্তুতির বিষয়েও রোগীকে মনে করিয়ে দেওয়া হয়।
বিদেশি রোগীদের জন্য সরাসরি অনুবাদ সেবার ব্যবস্থাও রয়েছে।
সৌন্দর্যচিকিৎসায় আধুনিক প্রযুক্তি
বিদেশিদের জন্য উপযোগী চিকিৎসাকেন্দ্র হিসেবে রোম দুটি প্রতিষ্ঠানকে সামনে এনেছে—বিউটি ব্লসম ক্লিনিক এবং মেডিওন মেডিকেল সেন্টার। দুটিই সিউলের হাপজিয়ং স্টেশনের কাছে একই ভবনে অবস্থিত। একই ভবনে ইংরেজিভাষী সেবাসহ একটি ওষুধের দোকান রয়েছে। আশপাশে কোরিয়ার জনপ্রিয় সৌন্দর্যপণ্যের দোকানও রয়েছে।

বিউটি ব্লসম ক্লিনিকে প্রবেশের পর ইংরেজিভাষী কর্মী রোগীকে স্বাগত জানান এবং নির্ধারিত চিকিৎসার তথ্য নিশ্চিত করেন। বিদেশিদের পাসপোর্ট সঙ্গে রাখতে হয়। কোরিয়ায় বসবাসকারী বিদেশিরা আবাসিক পরিচয়পত্র ব্যবহার করতে পারেন।
ত্বকের সমস্যার প্রাথমিক ধারণা পেতে সেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ত্বক বিশ্লেষণের ব্যবস্থাও রয়েছে। এরপর চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ রোগীর প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যক্তিগত পরামর্শ দেন।
এই প্রতিবেদকের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয় এক ধরনের অস্ত্রোপচারবিহীন ত্বক টানটান করার প্রযুক্তি, যেখানে বেতার তরঙ্গের মাধ্যমে কোলাজেন তৈরির প্রক্রিয়াকে সক্রিয় করা হয় এবং ত্বক দৃঢ় করা হয়।
ক্লিনিকটির প্রধান চিকিৎসক লি গন-হো বলেন, কোরীয় সংস্কৃতির বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়তা দেশটির সৌন্দর্যশিল্পকে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত করতে বড় ভূমিকা রেখেছে। তবে কোরিয়ায় সৌন্দর্যপ্রযুক্তি, প্রসাধনী ও ত্বকের চিকিৎসা নিয়ে গবেষণা ও উন্নয়ন বহু বছর ধরেই চলছে।
কোরিয়ায় তৈরি ওই আধুনিক যন্ত্রে শীতলীকরণ প্রযুক্তি থাকায় চিকিৎসার সময় অস্বস্তি তুলনামূলক কম হয়। পুরো প্রক্রিয়ায় এক ঘণ্টার কিছু বেশি সময় লাগে। চিকিৎসক নিয়মিত রোগীর স্বস্তির বিষয়টি নিশ্চিত করেন এবং ইংরেজিভাষী কর্মী চিকিৎসার আগে ও পরে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেন।
ইংরেজির পাশাপাশি ম্যান্ডারিন ও ক্যান্টনিজ ভাষাভাষী বিদেশিদের জন্যও সহায়তার ব্যবস্থা রয়েছে।
এক ছাদের নিচে পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্য পরীক্ষা
শুধু সৌন্দর্যচর্চা নয়, কোরিয়ায় বিদেশিদের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্য পরীক্ষার আগ্রহও বাড়ছে। মেডিওন মেডিকেল সেন্টার রোগ প্রতিরোধের ওপর গুরুত্ব দিয়ে সমন্বিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার ব্যবস্থা করেছে।
কেন্দ্রটির অন্যতম আকর্ষণ হলো পুরো শরীরের চৌম্বকীয় অনুরণন চিত্র তৈরির আধুনিক যন্ত্র। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী চিকিৎসক পার্ক ওয়ন-জিয়ং জার্মানির সিমেন্সের সঙ্গে মিলে এই প্রযুক্তি উন্নয়নে কাজ করেছেন।

তার মতে, উন্নত প্রযুক্তি, দ্রুত ফলাফল, মানসম্মত চিকিৎসা এবং রোগীবান্ধব পরিবেশ কোরিয়াকে বিদেশি রোগীদের কাছে আকর্ষণীয় করে তুলেছে। একই সঙ্গে অন্যান্য উন্নত দেশের তুলনায় তুলনামূলক সাশ্রয়ী খরচও কোরিয়ার অন্যতম শক্তি।
বিদেশি রোগীদের জন্য মেডিওনে ইংরেজিভাষী নার্স ও সহায়ক কর্মী পুরো পরীক্ষার সময় পাশে থাকেন। প্রথমে ইংরেজিতে স্বাস্থ্য-ইতিহাসের তথ্য নেওয়া হয়। এরপর রক্তচাপসহ বিভিন্ন শারীরিক পরীক্ষা, হৃদ্যন্ত্রের পরীক্ষা, এক্স-রে, রক্ত ও প্রস্রাবের পরীক্ষা করা হয়।
পুরো স্বাস্থ্য পরীক্ষায় প্রায় দুই ঘণ্টা সময় লাগে। এর মধ্যে পুরো শরীরের চৌম্বকীয় অনুরণন পরীক্ষা করতে প্রায় ৫০ মিনিট লাগে। পরীক্ষার পর চিকিৎসক প্রাথমিকভাবে ফলাফল মূল্যায়ন করেন। বিস্তারিত ফলাফল সাধারণত এক সপ্তাহের মধ্যে ই-মেইলে পাঠানো হয়। এর সঙ্গে প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা পরামর্শ, জীবনযাপন ও খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তনের সুপারিশও দেওয়া হয়।
বিদেশিদের জন্য চিকিৎসা আরও সহজ করার লক্ষ্য
বিদেশি রোগীদের জন্য কোরিয়ার চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোর অভিজ্ঞতা সবসময় একরকম নয়। তবে রোমের বাছাই করা বিউটি ব্লসম ও মেডিওনে পুরো প্রক্রিয়াটি তুলনামূলক সহজ ও স্বচ্ছভাবে পরিচালিত হচ্ছে।
ভাষা না জানা রোগীর প্রশ্নের উত্তর দেন ইংরেজিভাষী কর্মীরা। চিকিৎসকরাও চিকিৎসার পদ্ধতি ও পরীক্ষার ফলাফল সহজভাবে ব্যাখ্যা করেন।
রোম মেডিকেলের প্রতিষ্ঠাতা ক্রিস মোটজের লক্ষ্য, বিদেশিদের জন্য কোরিয়ার স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের পুরো অভিজ্ঞতাকে যতটা সম্ভব ঝামেলামুক্ত করা। অংশীদার চিকিৎসাকেন্দ্রগুলো আগে থেকেই যাচাই করে তাদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব গড়ে তুলছে প্রতিষ্ঠানটি।
কোরিয়ার চিকিৎসা পর্যটন যত দ্রুত বাড়ছে, ততই বিদেশি রোগীদের জন্য ভাষা, তথ্য ও চিকিৎসাকেন্দ্র নির্বাচনের সহায়তার প্রয়োজনও বাড়ছে। এই বাস্তবতায় রোমের মতো সেবা বিদেশিদের জন্য কোরিয়ার আধুনিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার দরজা আরও সহজে খুলে দিতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















