ভারতে ইংরেজির অবস্থান নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। ইংরেজি কি ভারতের নিজস্ব ভাষা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে—ভারতের সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক একটি পর্যবেক্ষণের পর এই প্রশ্নটি আবার সামনে এসেছে। তবে বিষয়টিকে ইংরেজি বনাম ভারতীয় ভাষার দ্বন্দ্ব হিসেবে দেখলে ভারতের ভাষাগত বাস্তবতাকে পুরোপুরি বোঝা সম্ভব নয়। হিন্দি, তামিল, তেলুগু, ওড়িয়া, কন্নড় বা মারাঠির বিকাশের জন্য ইংরেজিকে অস্বীকার করার প্রয়োজন নেই। বরং ভারতের ভাষাগত বৈচিত্র্য টিকিয়ে রাখার সবচেয়ে কার্যকর পথ হলো বহুভাষিকতাকে আরও শক্তিশালী করা।
ঐতিহাসিক অর্থে ইংরেজি সংস্কৃত বা তামিলের মতো ভারতের আদি ভাষা নয়। কিন্তু দুই শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে ভারতীয় সমাজে ব্যবহৃত হতে হতে ইংরেজি এমন একটি রূপ পেয়েছে, যা আজকের ভারতের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
ঔপনিবেশিক ভাষা, পরে ভারতীয়দের ভাষা
ভারতে ইংরেজির আগমন ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের সঙ্গে সম্পর্কিত—এটি অস্বীকার করার উপায় নেই। প্রশাসন, বাণিজ্য, ধর্মপ্রচার এবং ব্রিটিশদের কথিত সভ্যতা বিস্তারের কাজে ইংরেজিকে ব্যবহার করা হয়েছিল। শুরুর দিকে এই ভাষা নিঃসন্দেহে সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থ রক্ষার হাতিয়ার ছিল।
কিন্তু কোনো ভাষার পরিচয় কেবল তার আগমনের ইতিহাস দিয়ে চিরস্থায়ীভাবে নির্ধারিত হয় না। যারা ভাষাটি ব্যবহার করে, তারাই সময়ের সঙ্গে সেই ভাষাকে নতুন অর্থ ও নতুন পরিচয় দেয়। ভারতীয়রা ইংরেজিকে নিজেদের মতো করে গ্রহণ করেছে, বদলে দিয়েছে এবং ঔপনিবেশিক উদ্দেশ্যের পরিবর্তে ভারতীয় চিন্তা, জাতীয়তাবাদ ও সামাজিক পরিবর্তনের কাজে ব্যবহার করেছে।
উনিশ শতকের শুরুতেই ইংরেজি ভারতীয় রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ভাবনা প্রকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে ওঠে। ১৮২৩ সালে রাজা রামমোহন রায় ও তাঁর সহযোগীরা কলকাতায় ভারতীয় ভাষার সংবাদপত্রের স্বাধীনতার পক্ষে ইংরেজিতে গুরুত্বপূর্ণ আবেদন জানিয়েছিলেন। পরে দাদাভাই নওরোজি ইংরেজিতেই তাঁর বিখ্যাত ‘সম্পদ নিষ্কাশন তত্ত্ব’ তুলে ধরে ব্রিটিশ শাসনের অর্থনৈতিক শোষণকে বিশ্বের সামনে ব্যাখ্যা করেন।
স্বামী বিবেকানন্দও ১৮৯৭ সালে মাদ্রাজে তাঁর বিখ্যাত ‘আমার কর্মপরিকল্পনা’ বক্তৃতার মাধ্যমে শিক্ষিত ভারতীয় সমাজের কাছে ইংরেজিতে নিজের ভাবনা তুলে ধরেছিলেন। মহাত্মা গান্ধীও ভারতীয় চিন্তা ও আদর্শকে দেশ ও বিশ্বের বৃহত্তর পরিসরে পৌঁছে দিতে ইংরেজিকে ব্যবহার করেছেন।
তাই ভারতে ইংরেজির অবস্থান অস্বীকার করা মানে বহু প্রজন্মের ভারতীয়ের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অবদানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশকে উপেক্ষা করা।
স্বাধীনতার পরেও ইংরেজির জায়গা
স্বাধীনতার পর ভারত ইংরেজিকে পুরোপুরি পরিত্যাগ করেনি। ভাষা নিয়ে গণপরিষদের বিতর্কে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। হিন্দিকে কেন্দ্রের সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি সরকারি কাজের জন্য ইংরেজির ব্যবহারও বহাল রাখা হয়।
এরপর কয়েক দশকে ইংরেজি ভারতের শিক্ষা, প্রশাসন, আইনসভা, নির্বাহী বিভাগ ও বিচারব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভাষায় পরিণত হয়েছে। একই সঙ্গে ভারতীয় সাহিত্যেও ইংরেজি নিজের একটি স্বতন্ত্র জায়গা তৈরি করেছে।
ভারতীয় সাহিত্যচর্চার অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠান সাহিত্য অকাদেমি ইংরেজিকেও ভারতীয় সাহিত্যের একটি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং ইংরেজিতে রচিত ভারতীয় সাহিত্যকে পুরস্কৃত করেছে। আর. কে. নারায়ণ, মুল্ক রাজ আনন্দ, অমিতাভ ঘোষ থেকে বিক্রম শেঠ—অসংখ্য ভারতীয় লেখক প্রমাণ করেছেন, ইংরেজির মাধ্যমেও ভারতীয় জীবন, সংস্কৃতি, অনুভূতি ও বাস্তবতাকে গভীরভাবে প্রকাশ করা সম্ভব।
আকাঙ্ক্ষার ভাষা হয়ে উঠেছে ইংরেজি
অনেক সময় বলা হয়, ভারতের অল্পসংখ্যক মানুষ ইংরেজি ব্যবহার করেন। বাস্তবতা অবশ্য এত সরল নয়। ২০১১ সালের জনগণনা অনুযায়ী প্রায় ১২ কোটি ৯০ লাখ ভারতীয় ইংরেজিকে প্রথম, দ্বিতীয় অথবা তৃতীয় ভাষা হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। এর মধ্যে প্রায় ২ লাখ ৬০ হাজার মানুষ ইংরেজিকে মাতৃভাষা হিসেবে জানিয়েছিলেন। প্রায় ৮ কোটি ৩০ লাখ মানুষ এটিকে দ্বিতীয় ভাষা এবং প্রায় ৪ কোটি ৬০ লাখ মানুষ তৃতীয় ভাষা হিসেবে ব্যবহার করতেন।
ইংরেজি-মাধ্যম শিক্ষার দ্রুত বিস্তারের কারণে বর্তমানে কার্যকরভাবে ইংরেজি বোঝেন বা ব্যবহার করেন—এমন ভারতীয়ের সংখ্যা আরও অনেক বেড়েছে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা। এই বাস্তবতা দেখায়, ভারতের একটি বড় অংশের কাছে ইংরেজি শুধু যোগাযোগের ভাষা নয়, বরং শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক অগ্রগতির আকাঙ্ক্ষার ভাষাও।
ভারতের মানুষ শিক্ষার পেছনে বিপুল সময় ও অর্থ বিনিয়োগ করেন। কেন্দ্রীয় মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের অধিভুক্ত প্রায় ৩১ হাজার বিদ্যালয়ে প্রধানত ইংরেজির মাধ্যমে শিক্ষা দেওয়া হয়। একইভাবে ভারতীয় বিদ্যালয় সনদ পরীক্ষার কাউন্সিলসহ সমপর্যায়ের অন্যান্য শিক্ষা বোর্ডের অধিভুক্ত প্রায় ৩ হাজার বিদ্যালয়েও ইংরেজি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষামাধ্যম।
দেশের শীর্ষস্থানীয় উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর বড় অংশেও ইংরেজিই প্রধান শিক্ষার মাধ্যম। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, চিকিৎসা, ব্যবসা, প্রশাসনসহ বহু পেশাগত ক্ষেত্রে বিশ্বে ভারতের সঙ্গে যোগাযোগের অন্যতম প্রধান মাধ্যমও ইংরেজি।
ভারতীয় ইংরেজির নিজস্ব পরিচয়
ভারত শুধু ইংরেজি গ্রহণ করেনি; ইংরেজিকেও ভারতীয় করে তুলেছে। লেখক রাজা রাও ১৯৩৮ সালে তাঁর ‘কান্থাপুরা’ উপন্যাসের ভূমিকায় ভারতীয় ইংরেজির সম্ভাবনা নিয়ে লিখেছিলেন। তাঁর ধারণা ছিল, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়া যেমন নিজেদের স্বতন্ত্র ইংরেজি গড়ে তুলেছে, ভারতও তেমন একটি নিজস্ব ইংরেজি তৈরি করবে।
সময়ের সঙ্গে সেই ধারণাই বাস্তবে পরিণত হয়েছে। ভারতীয় ইংরেজির নিজস্ব উচ্চারণ, শব্দভাণ্ডার, বাগধারা ও প্রকাশভঙ্গি তৈরি হয়েছে। এতে ভারতের সামাজিক বাস্তবতা ও সাংস্কৃতিক সংবেদনশীলতার প্রতিফলন রয়েছে। একই সঙ্গে এটি বিশ্বের বৃহত্তর ইংরেজি ভাষাগোষ্ঠীর অংশ।
কবি ভি. কে. গোককের ‘ইংরেজি শব্দ’ কবিতায় দূরদেশ থেকে আসা ইংরেজি শব্দকে এমন বীজের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে, যা ভারতীয় মাটিতে এসে নতুন জীবন লাভ করে। এই উপমাটি তাৎপর্যপূর্ণ। একটি ভাষা বিদেশ থেকে এলেও মানুষের ব্যবহারে তা নতুন অর্থ, নতুন অনুভূতি ও নতুন সাংস্কৃতিক পরিচয় পেতে পারে।
এ. কে. রামানুজনের কবিতাতেও দেখা যায়, ইংরেজি ভারতীয় পুরাণ, দর্শন ও ভক্তির ভাব প্রকাশের স্বাভাবিক মাধ্যম হয়ে উঠেছে। অর্থাৎ ভাষার পরিচয় কেবল তার জন্মস্থান দিয়ে নির্ধারিত হয় না; যারা ভাষাটিকে নিজেদের জীবন ও সংস্কৃতির অংশ করে নেয়, তারাই শেষ পর্যন্ত ভাষাটির নতুন পরিচয় নির্মাণ করে।

বহুভাষিক ভারতেই ইংরেজির অবস্থান
ভারতের ইতিহাস কখনো একভাষিক ছিল না। মানুষ ঘরে ও পরিবারের মধ্যে মাতৃভাষা ব্যবহার করেছে, আবার প্রয়োজন অনুযায়ী অন্য ভাষাতেও দক্ষতার সঙ্গে কথা বলেছে। ফলে ইংরেজিকে হিন্দি, তামিল বা অন্য কোনো ভারতীয় ভাষার প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই।
বরং ইংরেজি এমন একটি সেতুভাষা, যার মাধ্যমে ভারতের এক ভাষাভাষী জনগোষ্ঠী অন্য ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর সঙ্গে এবং একই সঙ্গে বিশ্বের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে।
ভারতের ভাষানীতির লক্ষ্য তাই কোনো একটি ভাষাকে অন্য ভাষার বিরুদ্ধে দাঁড় করানো হওয়া উচিত নয়। হিন্দি, তামিল, বাংলা, তেলুগু, কন্নড়, মারাঠি কিংবা অন্য ভারতীয় ভাষার বিকাশ যেমন প্রয়োজন, তেমনি ইংরেজির ব্যবহারিক ও শিক্ষাগত সক্ষমতাও ধরে রাখা প্রয়োজন।
আদি ভাষা নয়, তবু ভারতেরই ভাষা
ইংরেজি আদৌ ভারতের আদি ভাষা কি না—প্রশ্নটির উত্তর স্পষ্ট। ঐতিহাসিক অর্থে ইংরেজি ভারতের আদি ভাষা নয়। কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো, দীর্ঘ ইতিহাস, সাহিত্য, সংবিধান, প্রশাসন, শিক্ষা এবং কোটি কোটি মানুষের দৈনন্দিন ব্যবহারের মধ্য দিয়ে ইংরেজি আধুনিক ভারতের একটি নিজস্ব ভাষিক বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে।
ইংরেজি আর ঔপনিবেশিক শাসকদের ভাষা হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই। ভারতীয়রা এটিকে নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী বদলে নিয়েছে। ভারতীয়রা ইংরেজিতে নিজেদের ইতিহাস, স্বপ্ন, সাহিত্য, রাজনীতি, সংস্কৃতি ও পরিচয় প্রকাশ করছে।
তাই ভারতীয় ইংরেজিকে কেবল বিদেশি ভাষা হিসেবে দেখলে এর বর্তমান বাস্তবতাকে অস্বীকার করা হবে। ইংরেজি আজ ভারতের বহু ভাষার একটি—যে ভাষায় ভারতীয়রা নিজেদের কল্পনা করে, নিজেদের কথা বলে এবং বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে। ভারতীয় ইংরেজি এখন ভারতেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাষিক পরিচয়।
ভারতে ইংরেজির অবস্থান নিয়ে বিতর্কটি আসলে কোনো ভাষাকে বেছে নেওয়ার প্রশ্ন নয়; বরং বহুভাষিক ভারতের শক্তিকে কীভাবে আরও সমৃদ্ধ করা যায়, সেই প্রশ্ন।
ভারতে ইংরেজির অবস্থান ও ভারতীয় ইংরেজির বিকাশ
ভারতে ইংরেজি আর শুধু ঔপনিবেশিক শাসনের স্মৃতি নয়; শিক্ষা, সাহিত্য, প্রশাসন ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগে ব্যবহারের মধ্য দিয়ে এটি আধুনিক ভারতীয় সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ভাষায় পরিণত হয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















