ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোকে ঘিরে বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে। ইউরোপ, উত্তর ও মধ্য আমেরিকা এবং এশিয়ার ফুটবল নিয়ন্ত্রক তিন সংস্থা—উয়েফা, কনকাকাফ ও এএফসি—যৌথ চিঠিতে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, ফুটবল কোনো একক ব্যক্তির সম্পত্তি নয়।
ইনফান্তিনো সম্প্রতি ফিফার বিভিন্ন প্রতিযোগিতা, এমনকি বিশ্বকাপেও বেসরকারি বিনিয়োগ আনার একটি পরিকল্পনা করেছিলেন। তবে পরিকল্পনাটি প্রকাশের কয়েক দিনের মধ্যেই ব্যাপক সমালোচনার মুখে তা প্রত্যাহার করতে হয়। এরপর থেকেই ফিফা সভাপতির বিরুদ্ধে সমালোচনা আরও জোরালো হয়েছে।
তিন মহাদেশের সংস্থার সরব অবস্থান
সোমবার প্রকাশিত যৌথ চিঠিতে উয়েফা, কনকাকাফ ও এএফসি মূলত বোঝাতে চেয়েছে, গত এক দশকে ফুটবলের যে অগ্রগতি হয়েছে, সেটিকে কোনো একজন ব্যক্তির কৃতিত্ব হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
চিঠিতে বলা হয়েছে, গত এক দশকে ফুটবলের বিকাশ ও অগ্রগতি বাস্তব। তবে এই অগ্রগতি কখনোই কোনো একজন ব্যক্তির একক প্রচেষ্টার ফল ছিল না।
ইনফান্তিনোর বেসরকারি বিনিয়োগ পরিকল্পনার বিরোধিতায় তিন সংস্থাই আগে থেকেই সোচ্চার ছিল। পরিকল্পনাটি স্থগিত হওয়ার পরও তাদের অবস্থানে কোনো পরিবর্তন আসেনি।
বিশ্বকাপ বয়কটের হুমকিতে পিছু হটেন ইনফান্তিনো
ইনফান্তিনোর পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে বিশ্বকাপ বয়কট করার হুমকি দিয়েছিল উয়েফা। এমনটি হলে বিশ্বকাপ থেকে স্পেনের মতো বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দল এবং ২০২৬ সালের সেমিফাইনালিস্ট ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের মতো দলও বাদ পড়ার সম্ভাবনা তৈরি হতো।
এই হুমকিকে ইনফান্তিনোর পরিকল্পনা প্রত্যাহারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর আগে যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডায় অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের সফল আয়োজনের পর ইনফান্তিনো আগামী নির্বাচনে প্রায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জিতবেন বলেই ধারণা করা হচ্ছিল।
চতুর্থ মেয়াদে বড় চ্যালেঞ্জ
৫৬ বছর বয়সী সুইস নাগরিক ইনফান্তিনো প্রায় ১০ বছর ধরে ফিফার সভাপতির দায়িত্বে রয়েছেন। আগামী মার্চে মরক্কোর রাবাতে ফিফা সভাপতি নির্বাচনে তিনি চতুর্থ ও শেষ মেয়াদের জন্য প্রার্থী হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। প্রার্থীদের আগামী ১৮ নভেম্বরের মধ্যে নিজেদের প্রার্থিতা ঘোষণা করতে হবে।
তবে এবার তার সামনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। কনকাকাফ সভাপতি ভিক্টর মন্টাগ্লিয়ানি সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন।
সমর্থন থাকলেও পরিস্থিতি আগের মতো নেই
ইনফান্তিনো আফ্রিকান ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থার সমর্থন পেয়েছেন। দক্ষিণ আমেরিকার ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থাও মোটের ওপর তার প্রতি সমর্থনশীল। এ ছাড়া কনকাকাফের কয়েকটি পক্ষ, মেক্সিকো এবং এএফসির সদস্য কুয়েত ও ২০২২ বিশ্বকাপের আয়োজক কাতারের কাছ থেকেও তিনি সমর্থন পেয়েছেন। কাতারে ইনফান্তিনোর একটি বাড়িও রয়েছে।
তবে মহাদেশীয় সংস্থাগুলো নির্বাচনে কোনো একক ব্লক হিসেবে ভোট দেয় না। ফলে এখন পর্যন্ত পাওয়া সমর্থনকে চূড়ান্ত নির্বাচনী সমীকরণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
গত সপ্তাহে মরক্কোয় ইনফান্তিনো নিজেই একটি জরুরি বৈঠক ডেকে ফিফার জ্যেষ্ঠ পরিচালকদের কাছ থেকে ‘পূর্ণ সমর্থন’ পাওয়ার দাবি করেছিলেন। কিন্তু উয়েফা, কনকাকাফ ও এএফসির যৌথ অবস্থান দেখিয়ে দিয়েছে, সেই সমর্থনই সবকিছু নয়।
ফুটবল কোনো ব্যক্তির একক সম্পত্তি নয়
তিন সংস্থার যৌথ চিঠির সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা হলো—ফুটবলের ভবিষ্যৎ কোনো একজন ব্যক্তির সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করতে পারে না।
বেসরকারি বিনিয়োগ পরিকল্পনা ঘিরে সৃষ্ট বিতর্ক শুধু একটি প্রস্তাব প্রত্যাহারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। বরং এটি ফিফার নেতৃত্ব, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধরন এবং ফুটবলের আন্তর্জাতিক প্রশাসনে বিভিন্ন মহাদেশীয় সংস্থার ভূমিকা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
আগামী মার্চের নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসবে, ইনফান্তিনোর নেতৃত্ব নিয়ে এই বিরোধ আরও প্রকাশ্য রূপ নিতে পারে। ফলে ফিফার সভাপতির চতুর্থ মেয়াদের পথ এবার আগের তুলনায় অনেক বেশি কঠিন হতে পারে।
বিশ্ব ফুটবলের নেতৃত্ব নিয়ে নতুন টানাপোড়েনই এখন সামনে। ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে তিন মহাদেশীয় সংস্থার যৌথ অবস্থান আগামী ফিফা নির্বাচনকে কতটা বদলে দেয়, সেটিই দেখার বিষয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















