ইসরায়েলে প্রবেশের পর রুশ-ইসরায়েলি ইতিহাসবিদ ও সাংবাদিক আর্তিয়োম কিরপিচেনকের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় উদ্বেগ বাড়ছে। তার অবস্থান ও আটকের বিষয়ে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ এখনো প্রকাশ্যে কোনো তথ্য দেয়নি। এদিকে রুশ দূতাবাস তার বিষয়ে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে জানতে চেয়েছে।
৫১ বছর বয়সী কিরপিচেনক রাশিয়া ও ইসরায়েল—দুই দেশের নাগরিক। মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ে লেখালেখির পাশাপাশি তিনি ইহুদিবাদ এবং ইসরায়েল সরকারের নীতি, বিশেষ করে ইরান ও ফিলিস্তিন-সংক্রান্ত নীতির কঠোর সমালোচক হিসেবে পরিচিত।
গত ২ আগস্ট আর্মেনিয়ার রাজধানী ইয়েরেভান থেকে একটি বিমানে করে তেল আবিবের বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর থেকেই তার কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানা গেছে। বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর সকাল ১০টা ৪১ মিনিটে পরিবারের কাছে তিনি সংক্ষিপ্ত একটি বার্তা পাঠিয়েছিলেন—‘পৌঁছেছি’। এরপর তার মুঠোফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আর কোনো কার্যক্রম দেখা যায়নি।
ইসরায়েলি পুলিশের বরাত দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিরপিচেনক পাসপোর্ট নিয়ন্ত্রণ পার হয়ে বিমানবন্দর থেকে বের হওয়ার প্রক্রিয়ায় ছিলেন। সহকর্মীরা জানিয়েছেন, একটি একাডেমিক সম্মেলনে অংশ নিতে তিনি ইসরায়েলে গিয়েছিলেন। তার ৮ আগস্ট দেশে ফেরার টিকিটও ছিল।
আটকের দাবি, তবে সরকারি নিশ্চিতকরণ নেই
কিরপিচেনক নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি প্রথমদিকে প্রকাশ্যে আনেন আন্তর্জাতিক বিষয়ক সাংবাদিক ওলেগ ইয়াসিনস্কি। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছিলেন, কয়েক দিন ধরে কিরপিচেনকের সঙ্গে কারও যোগাযোগ হচ্ছে না। পরে তিনি দাবি করেন, ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংস্থা শিন বেত তাকে আটক করেছে।
সাবেক রুশ সংসদ সদস্য ও সাংবাদিক দারিয়া মিতিনাও একই ধরনের দাবি করেছেন। তিনি জানান, কিরপিচেনককে তেল আবিবে শিন বেতের একটি আটককেন্দ্রে রাখা হয়েছে বলে তিনি জানতে পেরেছেন। তবে আটকের কারণ বা তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ আনা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
মিতিনা বলেন, কিরপিচেনক সাম্প্রতিক সময়ে তুরস্ক ও ইরানে বিভিন্ন গণমাধ্যম ও নাগরিক সংগঠনের সঙ্গে কাজ করছিলেন। তিনি নিয়মিত ইরান সফর করতেন এবং সেখানকার পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত লিখতেন। ইসরায়েলের দৃষ্টিতে ইরান শত্রু রাষ্ট্র হওয়ায় সেখানে ভ্রমণ কিরপিচেনকের ওপর নিরাপত্তা সংস্থার নজরদারি বাড়িয়ে থাকতে পারে বলে তিনি ধারণা করেন।
তার আইনজীবী হিসেবে ইন্না লেড কাজ করছেন বলেও মিতিনা জানিয়েছেন। তবে সম্ভাব্য অভিযোগ বা মামলার বিষয়ে বিস্তারিত কোনো তথ্য তিনি দেননি।
রাজনৈতিক নিপীড়নের অভিযোগ
কিরপিচেনকের নিখোঁজ হওয়ার পেছনে তার পেশাগত কর্মকাণ্ড ও রাজনৈতিক অবস্থানের ভূমিকা থাকতে পারে বলে মনে করছেন তার সহকর্মীরা।
সাংবাদিক ওলেগ ইয়াসিনস্কি বলেছেন, কিরপিচেনক ইসরায়েল সরকারের অভ্যন্তরীণ ও পররাষ্ট্রনীতির প্রকাশ্য সমালোচক। তিনি নিয়মিত তার অবস্থান নিয়ে লিখেছেন এবং কোনো কিছু গোপন করেননি। এ কারণে তার নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাকে রাজনৈতিক নিপীড়নের সঙ্গে যুক্ত করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে বলে ইয়াসিনস্কি মনে করেন।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ এখনো কোনো প্রকাশ্য মন্তব্য করেনি।
রুশ দূতাবাসের আনুষ্ঠানিক তৎপরতা
ইসরায়েলে নিযুক্ত রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত আনাতোলি ভিক্টোরভ জানিয়েছেন, কিরপিচেনকের কথিত আটকের খবর সম্পর্কে রুশ দূতাবাস অবগত। তার অবস্থান সম্পর্কে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে জানতে চাওয়া হয়েছে এবং পরিস্থিতি ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
তবে আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কিরপিচেনক দ্বৈত নাগরিক হওয়ায় তার ক্ষেত্রে রাশিয়ার কূটনৈতিক হস্তক্ষেপের সুযোগ সীমিত হতে পারে। ইসরায়েলের ভূখণ্ডে থাকা অবস্থায় দেশটির কর্তৃপক্ষ তাকে শুধু ইসরায়েলি নাগরিক হিসেবেই বিবেচনা করতে পারে।
কেন বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে
ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তা ও সন্ত্রাসবিরোধী কর্মকাণ্ডে শিন বেত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এ ধরনের মামলায় তদন্তের প্রাথমিক পর্যায়ে আটক, অভিযোগ এবং আদালতের কার্যক্রম সম্পর্কে তথ্য প্রকাশ না করার সুযোগ থাকে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আদালতের নির্দেশে তথ্য প্রকাশের ওপর নিষেধাজ্ঞাও থাকতে পারে।
তবে কিরপিচেনকের ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ প্রকাশ্যে আনা হয়নি। তিনি কোথায় আছেন, তাকে আটক করা হয়েছে কি না এবং আটক করা হয়ে থাকলে কী কারণে—এসব প্রশ্নেরও কোনো সরকারি উত্তর পাওয়া যায়নি।
ইসরায়েলেই পড়াশোনা, পরে সরকারের কঠোর সমালোচক
কিরপিচেনক রাশিয়ার একটি ইহুদি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৯০-এর দশকে তিনি ইসরায়েলে চলে যান। জেরুজালেমের হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন এবং ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীতেও দায়িত্ব পালন করেন। প্রায় ১৫ বছর পর তিনি আবার রাশিয়ায় ফিরে যান।
পরবর্তী সময়ে ইসরায়েল সরকারের নীতি ও গাজায় দেশটির সামরিক অভিযান নিয়ে তিনি সরব হয়ে ওঠেন। তার সাম্প্রতিক বই ‘ইসরায়েল: দ্য রোড টু ক্যাটাস্ট্রফি’-তে তিনি ইসরায়েলকে পশ্চিমা ধাঁচের একটি ‘ঔপনিবেশিক প্রকল্প’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ফিলিস্তিনিদের প্রতি ইসরায়েলের আচরণের সঙ্গে দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী শাসনব্যবস্থার তুলনাও করেছেন তিনি।
এতটা প্রকাশ্য সমালোচক হওয়া সত্ত্বেও কিরপিচেনক মনে করতেন, ইসরায়েলের নাগরিকত্ব ও পাসপোর্ট থাকায় দেশটিতে একাডেমিক ও পেশাগত কাজে যাতায়াত তার জন্য নিরাপদ হবে। কিন্তু বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর তার নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা এখন সেই নিরাপত্তা নিয়েই নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
তার অবস্থান সম্পর্কে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের নীরবতা এবং রুশ দূতাবাসের আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধানের মধ্যেও কিরপিচেনকের ভাগ্যে কী ঘটেছে, সে বিষয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো তথ্য সামনে আসেনি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















