জাপানে ছোট ছোট ইজাকায়া—স্থানীয় ধাঁচের পানাহার ও খাবারের দোকান—এক কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। খাবার, বিদ্যুৎ, ভাড়া ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় একের পর এক ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে বদলে যাচ্ছে মানুষের বাইরে গিয়ে পানাহার ও আড্ডা দেওয়ার অভ্যাসও।
২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে জাপানে ১১৮টি ইজাকায়া ব্যবসা দেউলিয়া হয়েছে। ১৯৮৯ সালে তুলনামূলক হিসাব সংরক্ষণ শুরু হওয়ার পর জানুয়ারি থেকে জুন—এই ছয় মাসে এটিই সর্বোচ্চ সংখ্যা। দেউলিয়া হওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর ৯০ শতাংশের বেশি ছিল ১০ জনের কম কর্মী থাকা ছোট ব্যবসা।
খরচ বাড়ছে, কিন্তু দাম বাড়ানো কঠিন
টোকিওর কোতো এলাকায় কুরানোসুকে নামের একটি ছোট ইজাকায়ায় প্রায় ২০টির বেশি আসন রয়েছে। জুলাইয়ের শেষ দিকে শুক্রবার সন্ধ্যায় দোকানটি ক্রেতায় প্রায় পূর্ণ থাকলেও মালিক কাজুনোরি মাতসুবারার মুখে স্বস্তি নেই।
খাবার ও বিদ্যুতের খরচ দ্রুত বাড়ায় লাভের পরিমাণ কমে গেছে। করোনা মহামারির পর ক্রেতা ফিরলেও সেই তুলনায় মুনাফা দ্রুত ঘুরে দাঁড়ায়নি। পরিস্থিতি সামলাতে দোকানটি আগের তুলনায় খাবারের তালিকা প্রায় অর্ধেক করেছে। প্রায় ছয় মাস পরপর খাবারের দাম প্রায় ৫০ ইয়েন করে বাড়ানো হচ্ছে। উপকরণের দামের ওঠানামা সামলাতে প্রতিদিনের বিশেষ খাবারের ওপরও নির্ভরতা বাড়ছে।
কুরানোসুকের সবচেয়ে জনপ্রিয় খাবার খড়ের আগুনে ঝলসানো বনিটো মাছ। টোকিওর তোয়োসু পাইকারি বাজার থেকে মাছটি সংগ্রহ করা হয় এবং আদা ও কাঁচা পেঁয়াজ দিয়ে পরিবেশন করা হয়। প্রায় প্রতিটি ক্রেতাই খাবারটি অর্ডার করেন।
কিন্তু গত দুই থেকে তিন বছরে বনিটো মাছের পাইকারি দাম তিন থেকে চার গুণ বেড়েছে। আরও দাম বাড়ালে ক্রেতারা খাবারটি অর্ডার করা বন্ধ করে দিতে পারেন—এমন আশঙ্কায় মালিকও দোটানায় রয়েছেন।
একদিকে মূল্যবৃদ্ধি, অন্যদিকে ক্রেতার অভ্যাস বদল
ইজাকায়া ব্যবসার সংকট শুধু বাড়তি খরচের কারণে নয়। জাপানিদের পানাহারের অভ্যাসেও বড় পরিবর্তন এসেছে।
মাতসুবারার অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, করোনা মহামারির পর অফিসকেন্দ্রিক পানাহারের আয়োজন অনেকটাই ফিরে এলেও আগে জনপ্রিয় রাতের দ্বিতীয় ও তৃতীয় দফার আড্ডা এখন অনেক কমে গেছে। ফলে রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যে অতিরিক্ত আয় হতো, তার বড় অংশ আর হচ্ছে না।
টোকিও শোকো রিসার্চের ব্যবস্থাপক কেনজি গোটোর মতে, খাবার, বিদ্যুৎ ও ভাড়ার খরচ একসঙ্গে বাড়ছে। কিন্তু তীব্র প্রতিযোগিতার কারণে ব্যবসায়ীরা সেই বাড়তি খরচ পুরোপুরি ক্রেতার ওপর চাপিয়ে দিতে পারছেন না। ফলে লাভের হার কমে যাওয়াই দেউলিয়ার প্রধান কারণ হয়ে উঠেছে।
ঘরেই খাবার ও পানীয়ের দিকে ঝুঁকছেন অনেকে
সরকারের নতুন নীতিও ছোট ইজাকায়াগুলোর জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সরকার আগামী এপ্রিল থেকে দুই বছরের জন্য খাদ্যপণ্যের ভোগকর ৮ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ করার পরিকল্পনা করছে।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, এতে সুপারমার্কেট থেকে প্রস্তুত খাবার কিনে বাড়িতে বসেই খাওয়া ও পান করার প্রবণতা আরও বাড়তে পারে। একবার ঘরে বসে পানাহারের অভ্যাস তৈরি হয়ে গেলে মানুষকে আবার নিয়মিত বাইরে ফিরিয়ে আনা কঠিন হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বড় রেস্তোরাঁ ও দ্রুত খাবারের দোকানের প্রতিযোগিতা। বড় প্রতিষ্ঠানগুলোও এখন ইজাকায়ার আদলে খাবার ও পানীয় পরিবেশন করছে। ফলে ছোট স্বাধীন দোকানগুলোর ওপর চাপ আরও বাড়ছে।

বড় প্রতিষ্ঠান টিকে যাচ্ছে, ছোটরা পিছিয়ে
জাপানের বাজার বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ফুজি কেইজাইয়ের হিসাবে, ইজাকায়া ও কাঠকয়লায় ঝলসানো খাবারের বাজার ২০৩৫ সালে প্রায় ১ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ইয়েনে নেমে আসতে পারে। ২০১৯ সালের তুলনায় যা প্রায় ৩১ শতাংশ কম।
অন্যদিকে হ্যামবার্গার, রামেন ও চলন্ত বেল্টে পরিবেশিত সুশির মতো দ্রুত খাবারের বাজার ২০৩৫ সালে ৫ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ইয়েনে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। একই সময়ের তুলনায় এটি প্রায় ৫৮ শতাংশ বেশি।
বড় রেস্তোরাঁ প্রতিষ্ঠানগুলো অবশ্য তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থানে রয়েছে। সরবরাহব্যবস্থার উন্নতি, পণ্য পরিবহনে দক্ষতা ও প্রযুক্তির ব্যবহার করে তারা বাড়তি খরচের চাপ সামলাতে পারছে। মোবাইল অর্ডার, আগাম আসন সংরক্ষণ এবং ক্রেতার তথ্য বিশ্লেষণের মতো প্রযুক্তি ব্যবহার করে কর্মী নিয়োগ ও পরিচালন ব্যয়ও নিয়ন্ত্রণ করছে তারা।
ছোট ইজাকায়াগুলোর অনেকের পক্ষেই এ ধরনের প্রযুক্তিতে বড় বিনিয়োগ করা সম্ভব নয়।
শুধু সস্তা খাবার নয়, অভিজ্ঞতাও চাইছেন ক্রেতারা
তবে সংকটের মধ্যেও ইজাকায়ার জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। মূল্যবৃদ্ধির কারণে মানুষের পারিবারিক ব্যয় চাপে পড়ায় ক্রেতারা এখন কোথায় অর্থ খরচ করবেন, সে বিষয়ে আগের চেয়ে বেশি সচেতন।
একসময় কম দাম, রেলস্টেশনের কাছে অবস্থান এবং নির্দিষ্ট মূল্যে যত খুশি পানাহারের সুযোগ ছিল ক্রেতা আকর্ষণের প্রধান কারণ। এখন অনেকেই খুঁজছেন আলাদা স্বাদের খাবার, স্থানীয় পানীয়, আন্তরিক সেবা এবং স্মরণীয় পরিবেশ।
রেস্তোরাঁ বিশ্লেষক দাইসুকে মিওয়ার মতে, মানুষ ইজাকায়া থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে—বিষয়টি এমন নয়। বরং চাহিদার ধরন বদলে গেছে। এখন অনেকেই নির্দিষ্ট কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে একটি জায়গা বেছে নিচ্ছেন।
বিদেশি পর্যটকদের আচরণও ছোট ইজাকায়াগুলোর ভবিষ্যতের একটি সম্ভাব্য দিক দেখাচ্ছে। তারা অনেক সময় কম দামের চেয়ে অভিজ্ঞতা, স্থানীয় খাবার, ছোট ও ঘনিষ্ঠ পরিবেশ এবং কর্মীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগকে বেশি গুরুত্ব দেন।
ছোট জায়গার মধ্যেই নতুন আকর্ষণ
টোকিওর শিবুয়া স্টেশনের কাছে নোনবেই ইয়োকোচো এলাকায় মাত্র ছয়টি আসনের একটি ছোট পানাহারের দোকানে গিয়েছিলেন অস্ট্রেলীয় সাংবাদিক গ্যারি জুভেলিন।
তার ভাষায়, অস্ট্রেলিয়ায় বড় রেস্তোরাঁ অনেক আছে, কিন্তু এমন জায়গা নেই।
অতি ছোট জায়গাটিতে একসঙ্গে বসলে মালিকের সঙ্গে কথা বলা কিংবা পাশের অপরিচিত মানুষের সঙ্গে আলাপ হওয়া প্রায় অনিবার্য। আর এই ঘনিষ্ঠতাই জায়গাটির বিশেষ আকর্ষণ।
জুভেলিনের মতে, ছোট হওয়াটাই এখানকার সৌন্দর্য। বিষয়টি শুধু খাবার বা পানীয়ের নয়; মানুষের সঙ্গে কথা বলা এবং পরিবেশ উপভোগ করাও এর বড় অংশ।

তরুণদের কাছেও ফিরছে পুরোনো আড্ডার জায়গা
নোনবেই ইয়োকোচোর মতো জায়গাগুলো বহু দশক ধরে কর্মজীবী মধ্যবয়সী পুরুষদের অফিস শেষে আড্ডা ও পানাহারের স্থান হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু এখন সেখানে তরুণ জাপানিদের উপস্থিতিও বাড়ছে।
পুরোনো সময়ের আবহ, ঘনিষ্ঠ পরিবেশ এবং একধরনের হারিয়ে যাওয়া সামাজিক যোগাযোগের সুযোগ তরুণদের আকৃষ্ট করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ঘরে বসে কাজ এবং সরাসরি মানুষের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ কমে যাওয়ার পর এই ধরনের জায়গা নতুন অর্থ পাচ্ছে।
নোনবেই ইয়োকোচোর একটি ইজাকায়ার মালিক কোইচিরো মিকুরিয়ার মতে, একসময় তরুণরা এমন জায়গায় ঢুকতেই ভয় পেতেন। এখন পরিস্থিতি বদলেছে। অফিসকেন্দ্রিক পানাহারের আয়োজন হয়তো কমেছে, কিন্তু মানুষের একে অন্যের সঙ্গে কথা বলার ইচ্ছা হারিয়ে যায়নি।
জাপানের ইজাকায়া শিল্পের বর্তমান সংকট তাই শুধু ব্যবসা বন্ধ হওয়ার গল্প নয়। এটি একই সঙ্গে দেশটির বদলে যাওয়া সামাজিক জীবন, পানাহারের অভ্যাস এবং মানুষের অবসর কাটানোর ধরনকেও তুলে ধরছে। বড় প্রতিষ্ঠানগুলো প্রযুক্তি ও দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে টিকে থাকার পথ খুঁজলেও ছোট ইজাকায়াগুলোর সামনে হয়তো আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে তাদের নিজস্ব স্বাদ, পরিবেশ এবং মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরির ক্ষমতা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















