ভারতীয় সংগীতের জগতে উষা উত্থুপ এমন এক নাম, যাঁর কণ্ঠকে কোনো প্রচলিত ছাঁচে বাঁধা যায় না। তাঁর গলার স্বর একসময় অনেকের কাছে ছিল অচেনা ও ব্যতিক্রমী। কিন্তু সেই ভিন্নতাই শেষ পর্যন্ত তাঁকে দিয়েছে স্বতন্ত্র পরিচয়। পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে গান গেয়ে চলা ৭৮ বছর বয়সী এই কিংবদন্তি শিল্পী এখন আবার নতুন প্রজন্মের কাছে তুমুল জনপ্রিয়।
‘ধুরন্ধর’ ছবিতে তাঁর বহু পুরোনো গান ‘রম্ভা হো’-এর নতুন সংস্করণ জনপ্রিয় হওয়ার পর নতুন করে আলোচনায় এসেছেন উষা উত্থুপ। তরুণ প্রজন্ম শুধু নতুন করে গানটি শুনছে না, ফিরে যাচ্ছে তাঁর পুরোনো গানগুলোর কাছেও। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও নতুন প্রজন্মের সংগীতচর্চায় তাঁর কণ্ঠ যেন আবারও নতুন জীবন পেয়েছে।
উষা উত্থুপের কাছে বিষয়টি আনন্দের হলেও বিস্ময়ের নয়। তাঁর বিশ্বাস, সংগীত ও জীবন—দুটিই চক্রাকারে ফিরে আসে। সময়ের সঙ্গে কোনো সৃষ্টির মূল্য কমে যায় না; বরং সময়ই কখনো কখনো একটি গানকে নতুন করে মানুষের সামনে তুলে ধরে।
৫৭ বছরের গানের যাত্রা
উষা উত্থুপ জানিয়েছেন, তিনি ৫৭ বছর ধরে গান গাইছেন। এর মধ্যে ‘রম্ভা হো’ গানটি গাওয়ারও প্রায় ৪০ বছর হয়ে গেছে। এত বছর পর সেই গান আবার এমন আলোড়ন তুলবে, তা তিনি নিজেও ভাবেননি।
কখনো কখনো মঞ্চে তাঁকে গানটি দুবার পর্যন্ত গাইতে হয়। দর্শকদের এমন ভালোবাসায় তিনি অভিভূত। তাঁর মতে, মানুষ শেষ পর্যন্ত মৌলিক সৃষ্টিকেই ভালোবাসে। তাঁর নিজের সংগীতজীবনেও মৌলিকত্ব ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
উষার ভাষায়, গান সব সময় গায়কের চেয়ে বড়। একজন শিল্পী চলে যেতে পারেন, কিন্তু একটি ভালো গান সময়ের সীমা পেরিয়ে মানুষের মধ্যে বেঁচে থাকে।
যে কণ্ঠ একসময় ছিল ‘অদ্ভুত’
উষা উত্থুপ যখন সংগীতজগতে যাত্রা শুরু করেন, তখন তাঁর কণ্ঠ ছিল প্রচলিত নারী কণ্ঠের ধারণার সম্পূর্ণ বিপরীত। সাধারণত নারীকণ্ঠকে উচ্চস্বরের ও কোমল হওয়ার প্রত্যাশা করা হতো। সেখানে উষার গলা ছিল ভারী ও গভীর। এমনকি কেউ কেউ তাঁর কণ্ঠকে পুরুষের কণ্ঠের সঙ্গেও তুলনা করতেন।
তবে তিনি কখনো নিজের কণ্ঠ বদলানোর চেষ্টা করেননি। বরং নিজের স্বাভাবিক কণ্ঠকেই শক্তিতে পরিণত করেছেন।
তিনি শুরু থেকেই মূলত নাইটক্লাব ও রেস্তোরাঁয় গান গাইতেন। চলচ্চিত্রের নেপথ্য কণ্ঠশিল্পী হওয়ার দৌড়ে তিনি কখনো ছিলেন না। সরাসরি মঞ্চে তাঁর গান শুনেই একসময় চলচ্চিত্রে গান গাওয়ার সুযোগ আসে।
তাঁর মতে, শ্রোতারা তাঁর কণ্ঠের ভিন্নতাকেই ভালোবেসেছিলেন। আর সেই গ্রহণযোগ্যতাই তাঁকে আজকের জায়গায় পৌঁছে দিয়েছে।

সংগীত না শেখার ‘সীমাবদ্ধতাই’ হলো শক্তি
অবাক করার মতো বিষয় হলো, উষা উত্থুপ প্রথাগতভাবে সংগীতের কোনো স্বরলিপি শেখেননি। জীবনের অভিজ্ঞতাকেই তিনি নিজের সবচেয়ে বড় শিক্ষক হিসেবে মনে করেন।
তাঁর বক্তব্য, জীবনের বিদ্যালয়ে যে শিক্ষা পাওয়া যায়, তা অন্য কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে পাওয়া সম্ভব নয়। সংগীতের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না নেওয়ার জন্য তাঁর কোনো আক্ষেপও নেই।
বরং তাঁর ধারণা, প্রথাগত শিক্ষা নিলে হয়তো তিনি একটি নির্দিষ্ট ছাঁচে আটকে যেতেন। আর বিভিন্ন ধরনের সংগীত নিয়ে তাঁর যে স্বতন্ত্র পথচলা, সেটি তখন কঠিন হয়ে উঠতে পারত।
অর্থাৎ যে বিষয়টি একসময় সীমাবদ্ধতা বলে মনে হতে পারত, সেটিই শেষ পর্যন্ত তাঁর শক্তিতে পরিণত হয়েছে।
শ্রোতাই তাঁর সবচেয়ে বড় নেশা
মঞ্চে উষা উত্থুপের প্রাণবন্ত উপস্থিতি তাঁর গানের মতোই বিখ্যাত। গান গাওয়ার পাশাপাশি রসিকতা করা, দর্শকদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলা এবং নিজের স্বভাবসুলভ হাস্যরস দিয়ে পরিবেশকে প্রাণবন্ত করে তোলাই তাঁর বিশেষত্ব।
তিনি বলেন, প্রথম দিন থেকেই তিনি মঞ্চে নিজের মতো করে থাকতে চেয়েছেন। দর্শকদের হাসানো, আনন্দ দেওয়া এবং তাঁদের সঙ্গে নিজের অনুভূতি ভাগ করে নেওয়াই তাঁর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
দর্শকের করতালিই তাঁর কাছে এক ধরনের নেশা। তিনি মনে করেন, মঞ্চ ও শ্রোতাদের ছাড়া তাঁর সংগীতজীবন অসম্পূর্ণ।
মঞ্চের অসংখ্য স্মৃতি
দীর্ঘ ক্যারিয়ারে অসংখ্য স্মরণীয় মুহূর্ত জমেছে উষা উত্থুপের ঝুলিতে। সম্প্রতি ‘আনন্দম’ নামে একটি অনুষ্ঠানে তিনি ভজন পরিবেশন করেন। অনেকেই অবাক হয়েছিলেন—উষা উত্থুপকে এমন অনুষ্ঠানে দেখা যাবে কেন?
কিন্তু তিনি ‘রঘুপতি রাঘব রাজা রাম’ গেয়ে দর্শকদের কাছ থেকে দাঁড়িয়ে সম্মাননা পান। সেই মুহূর্ত তাঁর কাছে ছিল অসাধারণ।
কলকাতার পার্ক স্ট্রিটের ট্রিঙ্কাসে ফিরে গিয়ে পূর্ণ দর্শকাসনের সামনে গান গাওয়ার স্মৃতিও তাঁর কাছে বিশেষ। পূর্ণ হল তাঁর মধ্যে এখনও বাড়তি উত্তেজনা তৈরি করে।
তবে জীবনের সবচেয়ে বিশেষ স্মৃতিগুলোর মধ্যে তিনি উল্লেখ করেছেন নেলসন ম্যান্ডেলার সঙ্গে সাক্ষাতের কথা। ভ্যাটিকানেও তিনি গান গেয়েছেন। মাদার তেরেসাকে সন্ত হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার অনুষ্ঠানে গান গাওয়ার সুযোগও পেয়েছেন তিনি।
![]()
আধুনিক গান, ঐতিহ্যবাহী সাজ
উষা উত্থুপের গান আধুনিকতার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হলেও তাঁর পোশাক ও সাজে বরাবরই ভারতীয় ঐতিহ্যের ছাপ স্পষ্ট।
এটি অবশ্য পরিকল্পিত কোনো কৌশল ছিল না। ছোট বয়সেই গান শুরু করেছিলেন তিনি। মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে আসায় হাতের কাছে যা থাকত, সেটিই পরতেন। তবে পোশাকের প্রতি তাঁর রুচি ছিল বরাবরই আলাদা।
নিজেই পোশাক তৈরি ও সেলাই করতে পছন্দ করতেন। একটি হলুদ শাড়ি থাকলে তার সঙ্গে মানানসই হলুদ ব্যাগও রাখতেন।
এখনও তিনি সাধারণ জীবনযাপন পছন্দ করেন। দামি কাঞ্জিভরম শাড়ি পরলেও করোনাভাইরাস মহামারির পর থেকে নিজের জন্য একটি শাড়িও কেনেননি বলে জানিয়েছেন।
নিজের মতো থাকাই সাফল্যের রহস্য
প্রচলিত ধারার সঙ্গে না মেলাকে উষা উত্থুপ কখনো ব্যর্থতা হিসেবে দেখেননি। তাঁর দর্শন খুব সহজ—নিজের পথে এগিয়ে যেতে হবে।
চলচ্চিত্রে তাঁর কণ্ঠের জন্য হয়তো অনেক সুযোগ আসেনি। কিন্তু তাতে তিনি হতাশ হননি। কারণ তিনি জানেন, তাঁর নিজের একটি পথ তৈরি হয়েছে।
দর্শকদের হাসানো, তাঁদের সঙ্গে প্রার্থনা করা, তাঁদের আনন্দের অংশ হওয়া—এই স্বপ্নগুলোই তিনি ছোটবেলা থেকে দেখেছেন। আর সেই স্বপ্ন পূরণ হয়েছে বলেই তিনি নিজেকে সুখী মনে করেন।
‘রম্ভা হো’-এর মতো গান, বিভিন্ন ভাষায় অসংখ্য জনপ্রিয় গান এবং কয়েক দশকের মঞ্চজীবন তাঁর কাছে যথেষ্ট। তাই না-পাওয়ার কোনো আক্ষেপ নেই তাঁর।
আগামী ১৫ আগস্ট দুবাইয়ের কোকা-কোলা অ্যারেনায় ‘থালাম বিটস’ অনুষ্ঠানে আবারও মঞ্চে উঠবেন উষা উত্থুপ। তাঁর সঙ্গে থাকবেন বেনি দয়াল ও বহু ধরনের সংগীত পরিবেশনকারী ব্যান্ড থাইক্কুডাম ব্রিজ।
নতুন প্রজন্মের উচ্ছ্বাস আর পুরোনো শ্রোতাদের ভালোবাসা—দুই প্রজন্মের এই মিলনেই যেন আরও একবার প্রমাণিত হচ্ছে, সত্যিকারের গান সময়ের কাছে হার মানে না। আর উষা উত্থুপের জীবন যেন সেই কথারই জীবন্ত উদাহরণ—গান বড়, গায়ক তার চেয়েও নয়; গানই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি দিন বেঁচে থাকে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















