অভিনয়জীবনের শুরু থেকেই আলোচনার কেন্দ্রে র্যাচেল জেগলার। কখনো অসাধারণ অভিনয়ের জন্য প্রশংসা, কখনো জাতিগত পরিচয় নিয়ে বিদ্বেষপূর্ণ আক্রমণ, আবার কখনো রাজনৈতিক মতামত ও জনপ্রিয় চরিত্রের অভিনয় নিয়ে তীব্র বিতর্ক—সব মিলিয়ে মাত্র ২৫ বছর বয়সেই নানা অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে তাকে। তবে এসবের কোনোটিই তাকে নির্দিষ্ট কোনো ছাঁচে আটকে রাখতে পারেনি।
বরং একের পর এক নতুন চরিত্র ও কাজের মাধ্যমে নিজের অভিনয়ক্ষমতার পরিসর আরও বড় করছেন জেগলার। ২০২৬ সালের লরেন্স অলিভিয়ে পুরস্কারে সংগীতনাটকে সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার পাওয়ার পর এখন তার সামনে আরও বড় মঞ্চ—ব্রডওয়ে।
পুরস্কারটি পাওয়ার মুহূর্তটিও ছিল কিছুটা অপ্রত্যাশিত। ২০২৬ সালের লরেন্স অলিভিয়ে অ্যাওয়ার্ডসে সংগীতনাটকে সেরা অভিনেত্রীর বিজয়ী হিসেবে তার নাম ঘোষণা করার সময় ভেনেসা উইলিয়ামস প্রচলিত ‘বিজয়ী হলেন…’ ধরনের ঘোষণা দেননি। বরং সরাসরি বলেন, ‘র্যাচেল, এখানে চলে এসো।’ ফলে জেগলার প্রথমে বুঝতেই পারেননি যে পুরস্কারটি তিনি জিতেছেন।
তার সবচেয়ে কাছের বন্ধু তখন তাকে মঞ্চে উঠে যেতে বলেন। পরে জেগলার সেই মুহূর্তকে স্মরণ করে বলেন, ঘটনাটি ছিল একেবারেই অবিশ্বাস্য।
ইভা পেরনের চরিত্রে জীবনের অন্যতম সেরা অর্জন
জেগলার যে অভিনয়ের জন্য অলিভিয়ে পুরস্কার জিতেছেন, সেটি ছিল জেমি লয়েড পরিচালিত ‘ইভিটা’ নাটকে আর্জেন্টিনার সাবেক ফার্স্ট লেডি ইভা পেরনের চরিত্র। লন্ডনের লন্ডন প্যালাডিয়ামে ১২ সপ্তাহ ধরে এই চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি।
তার নিজের ভাষায়, এই প্রযোজনা এবং যাদের সঙ্গে তিনি কাজ করেছেন, সেটিই তার অভিনয়জীবনের সবচেয়ে গর্বের অর্জনগুলোর একটি। লন্ডনে কাটানো ওই সময়কে তিনি এমন এক গ্রীষ্ম হিসেবে দেখেন, যার চেয়ে ভালো অভিজ্ঞতা একজন শিল্পী খুব কমই কল্পনা করতে পারেন।
এবার সেই সফল চরিত্রকে নিউইয়র্কের ব্রডওয়ে মঞ্চে নিয়ে যাচ্ছেন জেগলার। ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ‘ইভিটা’র ব্রডওয়ে প্রদর্শনীর প্রস্তুতি শুরু হওয়ার কথা। ফলে লন্ডনের প্রশংসিত মঞ্চসাফল্যের পর এবার তার সামনে অপেক্ষা করছে আরও বড় আন্তর্জাতিক দর্শক।
‘স্নো হোয়াইট’ থেকে পাওয়া কঠিন শিক্ষা
ব্রডওয়ের পাশাপাশি জেগলার আবারও বড় পর্দায় ফিরছেন। ২০২৫ সালে ডিজনির সরাসরি অভিনয়ের ‘স্নো হোয়াইট’ ছবিতে অভিনয়ের পর এবার নতুন চলচ্চিত্র নিয়ে সামনে আসছেন তিনি।
‘স্নো হোয়াইট’ ছিল তার জন্য একই সঙ্গে বড় সুযোগ ও কঠিন অভিজ্ঞতা। ছবিটি মুক্তির আগে ও পরে নানা ধরনের বিতর্ক তৈরি হয়। এর মধ্যে ছিল তার কলম্বিয়ান বংশোদ্ভূত পরিচয় নিয়ে বর্ণবাদী আক্রমণ, ১৯৩৭ সালের অ্যানিমেটেড ছবির সঙ্গে নতুন সংস্করণের তুলনা এবং জেগলারের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে উত্তপ্ত আলোচনা।
তীব্র সমালোচনা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের চাপের সেই সময় সম্পর্কে জেগলারের উপলব্ধি এখন অনেক বেশি পরিণত।
তার মতে, বিশেষ করে বিনোদন জগতের নারীদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বুঝতে হবে—সব মানুষকে কখনোই সন্তুষ্ট করা সম্ভব নয়। নিজের কাজ থেকে তৃপ্তি পাওয়া, ভালো মানুষের সঙ্গে ভালো কাজ করা এবং নিজের সর্বোচ্চটা দেওয়াই মূল বিষয়। এর বাইরে যে সমালোচনা বা বিতর্ক তৈরি হয়, সেগুলোকে তিনি এখন অনেকটাই ‘শব্দ’ হিসেবে দেখেন।
‘ওয়েস্ট সাইড স্টোরি’ থেকে পরিচিতি
জেগলারের চলচ্চিত্রজীবনের বড় মোড় আসে স্টিভেন স্পিলবার্গের ‘ওয়েস্ট সাইড স্টোরি’ দিয়ে। সেখানে তিনি পুয়ের্তো রিকান চরিত্র মারিয়ার ভূমিকায় অভিনয় করেন।
কিন্তু এই চরিত্র নিয়েও তাকে পরিচয় ও জাতিগত উপস্থাপনা নিয়ে নানা ধরনের সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছিল। কখনো তাকে বলা হয়েছে, তিনি একটি পরিচয়ের জন্য যথেষ্ট নন; আবার অন্য ক্ষেত্রে তার পরিচয়কে ঘিরে অতিরিক্ত প্রত্যাশার চাপ তৈরি হয়েছে।
তারপরও জেগলার মনে করেন, ‘ওয়েস্ট সাইড স্টোরি’ তার জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অভিজ্ঞতা। ছবিটির জন্য তিনি ২০ বছর বয়সেই গোল্ডেন গ্লোব পুরস্কার পান।
‘স্নো হোয়াইট’-এর অভিজ্ঞতাকেও তিনি নেতিবাচক হিসেবে দেখেন না। নিজের অভিনয় নিয়ে তিনি গর্বিত এবং পুরো অভিজ্ঞতাকে তার কাছে গভীরভাবে শেখার একটি সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করেন।
সামনে একাধিক নতুন ছবি
এখন জেগলারের সামনে রয়েছে বেশ কয়েকটি নতুন চলচ্চিত্র। এর মধ্যে রয়েছে স্বাধীন ধারার নাট্য-কমেডি ‘শি গেটস ইট ফ্রম মি’, মনস্তাত্ত্বিক থ্রিলার ‘এনডিএ’ এবং লিন-ম্যানুয়েল মিরান্ডা পরিচালিত ‘অক্টেট’।
নতুন কাজ বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে এবার তার একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যও রয়েছে। জেগলার জানিয়েছেন, চলতি বছরে তার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য ছিল নারী ও লাতিনো শিল্পীদের সঙ্গে কাজ করা।
তার কাছে বিষয়টি শুধু নিজের ক্যারিয়ার এগিয়ে নেওয়ার নয়। বরং এমন শিল্পী ও নির্মাতাদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করাও গুরুত্বপূর্ণ, যারা অতীতে বিনোদনশিল্পে যথেষ্ট সুযোগ বা প্রতিনিধিত্ব পাননি।
তার প্রত্যাশা, নতুন চলচ্চিত্রগুলো শুধু তার নিজের জন্য নয়, যাদের সঙ্গে তিনি কাজ করেছেন তাদের জন্যও নতুন দরজা খুলে দেবে।
কোনো একটি পরিচয়ের মধ্যে আটকে থাকতে চান না
জেগলারের বক্তব্যে সবচেয়ে স্পষ্ট যে বিষয়টি উঠে আসে, তা হলো—তিনি কোনো নির্দিষ্ট পরিচয় বা চরিত্রের ছকে নিজেকে আটকে রাখতে চান না।
তার পছন্দ এমন চরিত্র, যারা পুরোপুরি মানুষ—যাদের ভালো দিক যেমন আছে, তেমনি দুর্বলতা, জটিলতা ও অসম্পূর্ণতাও আছে। তার কাছে মানুষের সৌন্দর্য কেবল তার ভালো গুণে নয়; তার ত্রুটি ও বৈপরীত্যও সেই মানুষটির পরিচয়ের অংশ।
এই দৃষ্টিভঙ্গিই সম্ভবত জেগলারের সাম্প্রতিক ক্যারিয়ারকে সবচেয়ে ভালোভাবে ব্যাখ্যা করে। ‘ওয়েস্ট সাইড স্টোরি’র মারিয়া, ‘স্নো হোয়াইট’-এর রাজকন্যা কিংবা ‘ইভিটা’র ইভা পেরন—প্রতিটি চরিত্রই আলাদা। আর প্রতিটি চরিত্রের মধ্য দিয়ে তিনি নিজের অভিনয়ের নতুন দিক সামনে আনতে চাইছেন।
২৫ বছর বয়সেই পুরস্কার, বিশ্বজুড়ে পরিচিতি, তীব্র সমালোচনা এবং বড় মঞ্চে সাফল্যের অভিজ্ঞতা পাওয়া জেগলার এখন যেন নিজের ক্যারিয়ারের নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করছেন। লন্ডনের প্যালাডিয়াম থেকে নিউইয়র্কের ব্রডওয়ে, আর সেখান থেকে একের পর এক চলচ্চিত্র—সব মিলিয়ে সামনে তার পথ আরও বিস্তৃত।
সমালোচনা ও বিতর্ক তার ক্যারিয়ারের অংশ হয়ে থাকলেও জেগলার এখন স্পষ্টতই অন্য বার্তা দিতে চাইছেন—কোনো শিল্পীকে একটি পরিচয়, একটি বিতর্ক কিংবা একটি চরিত্র দিয়ে পুরোপুরি সংজ্ঞায়িত করা যায় না।












