২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ দিনগুলোর একটি। সন্ত্রাসী হামলায় নিউইয়র্কসহ দেশজুড়ে যখন আতঙ্ক, অনিশ্চয়তা আর শোক ছড়িয়ে পড়েছিল, তখন সেই ঘটনার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অভিঘাত মানুষের জীবনে নানা রকমভাবে থেকে যায়। কারও কাছে তা হারানোর স্মৃতি, কারও কাছে ভয়, আবার কারও কাছে মানুষের প্রতি মানুষের দায়িত্ববোধের নতুন উপলব্ধি।
নাট্যপরিচালক ক্রিস্টোফার অ্যাশলির কাছেও ৯/১১ এমনই এক অভিজ্ঞতা। সেই দিনের স্মৃতি শুধু ভয় বা আতঙ্কের সঙ্গে জড়িয়ে নেই; বরং বহু বছর পর একটি মঞ্চনাটক পরিচালনার মধ্য দিয়ে তিনি সেই পুরোনো অনুভূতিগুলোর মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ পান। তাঁর ভাষায়, শিল্পের মাধ্যমে সেই অভিজ্ঞতাকে নতুন করে দেখা তাঁর জন্য এক ধরনের নিরাময়ের পথ হয়ে উঠেছিল।
৯/১১-এর দিন অ্যাশলি একটি নাটকের মহড়ার প্রথম দিন পরিচালনা করছিলেন। নাটকটির নাম ছিল ‘ওয়ান্ডার অব দ্য ওয়ার্ল্ড’। পরিস্থিতির কারণে সেদিনের মহড়া বাতিল করা হয়। পরের দিনের মহড়াও হয়নি। এরপর তিনি নিউইয়র্কের ওয়েস্ট ভিলেজের নিজের বাড়ির দিকে হেঁটে রওনা হন।
সেই রাতের একটি ঘটনা আজও তাঁর মনে স্পষ্ট। তিনি জানান, অত্যন্ত মাতাল এক ব্যক্তি তাঁর সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল এবং তাঁকে জিজ্ঞেস করছিলেন, তিনি ইরাকি কি না। লোকটি বারবার তাঁর পথ আটকে দিচ্ছিল। অ্যাশলি সরে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। একপর্যায়ে ওই ব্যক্তি তাঁকে ঘুষি মারতে উদ্যত হলে অ্যাশলিও তাঁকে মুখে ঘুষি মারেন।
অ্যাশলি পরে উপলব্ধি করেন, ভয়াবহ বা আঘাতজনক পরিস্থিতির মধ্যে মানুষ সবসময় নিজের সবচেয়ে সংযত বা আদর্শ আচরণ করতে পারে না। তাঁর মতে, মানুষ অনেক সময় এমন অভিজ্ঞতার পর নিজের জীবন নিয়ে এগিয়ে যায়। কিন্তু সেই অভিজ্ঞতার গভীরে থাকা অনুভূতিগুলো সবসময় হারিয়ে যায় না।
বহু বছর পর ‘কাম ফ্রম অ্যাওয়ে’ নামের একটি সংগীতনাট্য পরিচালনা করতে গিয়ে তিনি আবার সেই অনুভূতিগুলোর কাছে ফিরে যাওয়ার সুযোগ পান। নাটকটির গল্প ৯/১১-এর পর কানাডার নিউফাউন্ডল্যান্ডের গান্ডার শহরে আটকে পড়া ৩৮টি বিমানের যাত্রীদের ঘিরে। সন্ত্রাসী হামলার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের আকাশসীমা বন্ধ হয়ে গেলে এসব বিমান অন্যত্র সরিয়ে দেওয়া হয়। হাজারো অপরিচিত মানুষ হঠাৎ করে গান্ডারে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন।
সেই পরিস্থিতিতে গান্ডারের স্থানীয় বাসিন্দারা অপরিচিত মানুষদের নিজেদের ঘর, খাবার ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তার সেই সময়ে মানবিকতার এই উদাহরণই হয়ে ওঠে নাটকটির কেন্দ্রীয় বিষয়।
অ্যাশলির কাছে এই গল্প শুধু একটি নাটকের বিষয়বস্তু ছিল না। তিনি মনে করেন, গান্ডারের মানুষের আচরণ তাঁকে ৯/১১-এর অভিজ্ঞতাকে অন্য একটি দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে সাহায্য করেছে। ভয়াবহতার স্মৃতির পাশাপাশি তিনি মানুষের পারস্পরিক সহমর্মিতা, দায়িত্ববোধ ও সংযোগের শক্তিকেও নতুন করে উপলব্ধি করেন।
‘কাম ফ্রম অ্যাওয়ে’-এর গল্পের পেছনেও রয়েছে বাস্তব অনুসন্ধানের ইতিহাস। ২০১১ সালে নাটকটির লেখক ডেভিড হেইন ও আইরিন স্যাঙ্কফ গান্ডারে ৯/১১-এর দশম বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে যান। সেখানে ওই হামলার পর গান্ডারে সরিয়ে নেওয়া বিমানের যাত্রী ও সংশ্লিষ্ট অনেক মানুষের পুনর্মিলন হয়েছিল।
লেখকদ্বয় ভেবেছিলেন, অনুষ্ঠানে কয়েক দিন থাকবেন। কিন্তু স্থানীয় মানুষদের গল্প, অভিজ্ঞতা ও স্মৃতির প্রতি আগ্রহ তাঁদের সেখানে দীর্ঘ সময় থাকতে বাধ্য করে। শেষ পর্যন্ত কয়েক দিনের সফর পরিণত হয় কয়েক সপ্তাহের অনুসন্ধানে।
গান্ডারের তৎকালীন মেয়র ক্লদ এলিয়ট বিষয়টি নিয়ে রসিকতা করে বলতেন, ‘তোমরা কি স্যান্ডউইচ বানানো নিয়ে একটি সংগীতনাট্য তৈরি করছ?’ কিন্তু সেই সাধারণ স্যান্ডউইচ, খাবার ভাগ করে দেওয়া কিংবা অপরিচিত মানুষকে আশ্রয় দেওয়ার ঘটনাগুলোর মধ্যেই লুকিয়ে ছিল বড় একটি মানবিক গল্প—সংকটের মুহূর্তে একজন মানুষ আরেকজন মানুষের পাশে কতটা দাঁড়াতে পারে।
অ্যাশলির কাছে সেই গল্পের গুরুত্ব আজ আরও বেড়েছে। তাঁর মতে, বর্তমান পৃথিবীতে মানুষকে বিভক্ত করার মতো বিষয় অনেক বেশি। ফলে ৯/১১-এর পর গান্ডারের মানুষ যেভাবে সম্পূর্ণ অপরিচিতদের নিজেদের দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন, তা আজ অনেকের কাছেই প্রায় অবিশ্বাস্য বা কল্পকাহিনির মতো মনে হতে পারে।
কিন্তু ‘কাম ফ্রম অ্যাওয়ে’ সেই মানবিকতার কথাই মনে করিয়ে দেয়। মঞ্চে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এবং অ্যাপল টিভিতে এই গল্প উপস্থাপনের অভিজ্ঞতা অ্যাশলিকে নিজের পুরোনো অনুভূতিগুলোর দিকে ফিরে তাকানোর সুযোগ দিয়েছে। তাঁর কাছে সেটি কেবল একটি সৃজনশীল কাজ ছিল না; ব্যক্তিগতভাবে তা হয়ে উঠেছিল নিরাময়েরও একটি পথ।
৯/১১-এর ২৫ বছর পরও সেই প্রশ্নটি প্রাসঙ্গিক—ভয়, বিভাজন ও অনিশ্চয়তার সময়ে মানুষ কি একে অপরের পাশে দাঁড়াবে? অ্যাশলির বক্তব্যে ‘কাম ফ্রম অ্যাওয়ে’ সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজে মানবিক সম্পর্কের মধ্য দিয়ে।
পৃথিবী বদলাচ্ছে, পরিস্থিতি বদলাচ্ছে, মানুষের মধ্যে বিভাজনের কারণও বদলাচ্ছে। কিন্তু নাটকটির মূল বার্তা একই রয়ে গেছে—অন্য মানুষের প্রতি আমাদের দায়িত্ব আছে। একজন অপরিচিত মানুষও প্রয়োজনের মুহূর্তে আমাদের দায়িত্বের অংশ হয়ে উঠতে পারেন। আর মানবিকতা, দয়া ও পারস্পরিক সংযোগের মূল্য কোনো সংকটের সময়েই হারিয়ে যায় না।
অ্যাশলির উপলব্ধিতে, ২৫ বছর আগে যদি আরও বেশি মানুষ গান্ডারের বাসিন্দাদের মতো ভাবতেন—‘এই মানুষগুলো এখন আমার সমস্যা, আমার দায়িত্ব। আজই তাদের সঙ্গে আমার প্রথম দেখা হলেও আমি তাদের দেখভাল করব’—তাহলে পৃথিবী হয়তো অন্যরকম হতে পারত।
শিল্প কখনও কখনও অতীতের ক্ষত মুছে দিতে পারে না, কিন্তু সেই ক্ষতের দিকে নতুন করে তাকানোর সুযোগ তৈরি করতে পারে। অ্যাশলির কাছে ‘কাম ফ্রম অ্যাওয়ে’ তেমনই একটি শিল্পকর্ম—যেখানে ৯/১১-এর ভয়াবহ স্মৃতির পাশাপাশি উঠে এসেছে অপরিচিত মানুষের প্রতি দায়িত্ব, সহমর্মিতা এবং একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর শক্তি।












