যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের নতুন চেয়ারম্যান কেভিন ওয়ারশ দায়িত্ব নেওয়ার পর মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে তাঁর নীতির অন্যতম প্রধান বিষয় হিসেবে তুলে ধরেছেন। কিন্তু আগামী এক মাসে প্রকাশিত হতে যাওয়া দুটি মূল্যস্ফীতির প্রতিবেদনই এখন তাঁর নেতৃত্বের জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব তথ্যের ওপর নির্ভর করতে পারে সেপ্টেম্বর মাসে সুদের হার বাড়ানো হবে, নাকি বর্তমান অবস্থানই বজায় রাখা হবে।
বুধবার প্রকাশিত হওয়ার কথা জুলাই মাসের ভোক্তা মূল্যসূচকের তথ্য। সেখানে মূল্যস্ফীতি প্রত্যাশার চেয়ে কম হলে ওয়ারশের ওপর চাপ কিছুটা কমবে। একই সঙ্গে ফেডের নীতিনির্ধারকেরাও স্বস্তি পাবেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি সম্পর্কে তাঁদের সাম্প্রতিক পূর্বাভাস পুরোপুরি ভুল হয়নি। কিন্তু মূল্যস্ফীতির হার বেশি হলে ওয়ারশকে কথার বদলে বাস্তব পদক্ষেপের মাধ্যমে দেখাতে হতে পারে যে তিনি মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতে কঠোর হতে প্রস্তুত।
দুই প্রতিবেদনের দিকে সবার নজর
জুলাইয়ের ভোক্তা মূল্যসূচকের তথ্য পরে ফেডের পছন্দের মূল্যস্ফীতি পরিমাপকেও প্রভাবিত করবে, যা চলতি মাসের শেষ দিকে প্রকাশিত হওয়ার কথা। অর্থনীতিবিদদের ধারণা, খাদ্য ও জ্বালানির দাম বাদ দিয়ে মূল ভোক্তা মূল্য জুলাইয়ে মাসিক হিসাবে শূন্য দশমিক ২ শতাংশ বাড়তে পারে।
মাসিক মূল্যবৃদ্ধি শূন্য দশমিক ২ শতাংশ বা তার নিচে থাকলে তা মূল্যস্ফীতি ধীরে ধীরে ফেডের নির্ধারিত ২ শতাংশ লক্ষ্যের দিকে ফেরার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। কিন্তু এর চেয়ে বেশি হলে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হতে পারে। ফেডের পছন্দের সূচকে জুনে মূল মূল্যস্ফীতি ছিল ৩ দশমিক ৩ শতাংশ, যা এক বছর আগে ছিল ২ দশমিক ৮ শতাংশ।
দুটি মাসিক প্রতিবেদনের গুরুত্ব অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার পেছনে রয়েছে কয়েকটি কারণ। ফেডের কয়েকজন কর্মকর্তা জুনে প্রকাশিত পূর্বাভাস ও পরবর্তী বক্তব্যে বলেছিলেন, আরও কঠোর নীতি গ্রহণ ছাড়াই মূল্যস্ফীতি শেষ পর্যন্ত ২ শতাংশ লক্ষ্যে ফিরে আসবে।
তাঁদের ধারণা ছিল, শুল্কের কারণে একবার পণ্যের দাম বাড়লেও সেই প্রভাব ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাবে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত কমলে অপরিশোধিত তেলের দামও কমবে বলে তাঁরা আশা করেছিলেন।
কিন্তু বাস্তবে এসব চাপ পুরোপুরি দূর হয়নি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন আরেকটি সমস্যা—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তি অবকাঠামো সম্প্রসারণের কারণে প্রযুক্তি সরঞ্জাম ও সফটওয়্যারের দাম বেড়ে যাওয়া। আগামী দুই মাসের তথ্য দেখাবে, ফেডের কর্মকর্তারা তাঁদের আগের মূল্যস্ফীতি পূর্বাভাস এখনো কতটা জোর দিয়ে সমর্থন করতে পারেন।
ওয়ারশের বক্তব্য নিয়েও প্রশ্ন
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে নিজের প্রধান নীতি হিসেবে সামনে আনার কারণে ওয়ারশের ওপর প্রত্যাশাও অনেক বেশি। গত মাসে ফেড প্রত্যাশিতভাবেই সুদের হার অপরিবর্তিত রেখেছিল। কিন্তু সিদ্ধান্তের পর সংবাদ সম্মেলনে ওয়ারশের ব্যাখ্যা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বরং বিভ্রান্তি তৈরি করে।
তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, মূল্যস্ফীতি কমতে না চাইলে সুদের হার বাড়ানোই কি সমাধান হতে পারে? ওয়ারশ বলেন, উচ্চ সুদের হার সমাধানের অংশ হতে পারে, তবে সেটিই হয়তো প্রধান সমাধান নয়। তিনি ইঙ্গিত দেন, বন্ডের সুদের হার বেড়ে যাওয়ায় ফেডের কিছু কাজ ইতোমধ্যে হয়ে গেছে। এমনকি ফেডের মূল্যস্ফীতির লক্ষ্য কীভাবে নির্ধারণ করা হবে, সেটিও নতুন করে ভাবার ইঙ্গিত দেন তিনি।
তাঁর এই বক্তব্যে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়—মূল্যস্ফীতি মোকাবিলায় ওয়ারশ কি বাস্তব পদক্ষেপ নেবেন, নাকি কঠোর বক্তব্য দিয়েই পরিস্থিতি সামলাতে চান?
বাজারে বাড়ছে অস্বস্তি
বিশ্লেষকদের একটি অংশ অবশ্য মনে করেন, গত মাসে সুদের হার অপরিবর্তিত রাখার পেছনে ফেডের যথেষ্ট কারণ ছিল। উৎপাদনশীলতার তুলনায় শ্রম ব্যয় ধীরে বাড়ছে, ফলে সামগ্রিকভাবে পণ্যের দাম হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি কম। একই সঙ্গে শুল্কজনিত মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবও ধীরে ধীরে কমে আসছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এ ছাড়া পদ্ধতিগত কিছু পরিবর্তনের কারণে সেপ্টেম্বরে ফেডের পছন্দের সূচকে মূল মূল্যস্ফীতির হিসাব কিছুটা কমে আসতে পারে।
তবে ওয়ারশের বক্তব্যের পর ৩০ বছর মেয়াদি মার্কিন সরকারি বন্ডের সুদের হার বেড়ে যায় এবং তা আর আগের অবস্থায় ফেরেনি। এর অর্থ হতে পারে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজন হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কার্যকর পদক্ষেপ নেবে কি না, তা নিয়ে বাজারে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
বিএনপি পারিবাসের প্রধান মার্কিন অর্থনীতিবিদ জেমস এগেলহফের মতে, নীতিনির্ধারণী বৈঠকের সময় এমন বাজার প্রতিক্রিয়া অস্বাভাবিক। তাঁর ভাষায়, এটি ওয়ারশের নেতৃত্বাধীন ফেড সম্পর্কে বাজারের ধারণায় আরও মৌলিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিতে পারে।
কঠোর অবস্থানের কথা বলেই কি নিজের পথ কঠিন করেছেন ওয়ারশ?
পিমকোর সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ পল ম্যাককলি মনে করেন, ওয়ারশ যদি নীতির সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা না দিয়ে বড় বড় নীতিগত বক্তব্যের ওপর নির্ভর করেন, তাহলে শেষ পর্যন্ত তাঁর ওপর পদক্ষেপ নেওয়ার চাপ আরও বাড়তে পারে।
গত মাসের বৈঠকের পর ১৯ জন নীতিনির্ধারকের মধ্যে ১০ জন প্রকাশ্যে কথা বলেছেন। তাঁদের মধ্যে ভোটাধিকার থাকা ১২ জনের অর্ধেকও নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন। অথচ ওয়ারশ নিজে তাঁদের অনেকের মতো বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেননি।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে অন্তত ছয়জন ভোটাধিকারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ইঙ্গিত দিয়েছেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে না এলে তাঁরা ভবিষ্যতে সুদের হার বাড়ানোর পক্ষে যেতে পারেন। এর মধ্যে তিনজন গত মাসেই সুদের হার বাড়ানোর পক্ষে ভিন্নমত দিয়েছিলেন।
ওয়ারশের অবস্থান নিয়ে কেউ কেউ আরও একটি প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি কি মনে করেন, কঠোর বক্তব্যের মাধ্যমে সুদের হার বাড়ানোর প্রয়োজন কিছুটা পিছিয়ে দেওয়া সম্ভব? নাকি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সরাসরি বিরোধ এড়াতে তিনি সুদের হার বাড়ানোর প্রয়োজনকে কম গুরুত্ব দিচ্ছেন? ট্রাম্পই ওয়ারশকে ফেডের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন এবং তিনি দীর্ঘদিন ধরে কম সুদের হার রাখার দাবি জানিয়ে আসছেন।
তবে ওয়ারশকে যারা কাছ থেকে চেনেন, তাঁরা এই দুই ব্যাখ্যাই প্রত্যাখ্যান করেছেন।
জ্যাকসন হোলে ব্যাখ্যা দিতে পারেন ওয়ারশ
গত মাসের সংবাদ সম্মেলন ঘিরে যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে, সেটি ওয়ারশকে হয়তো চলতি মাসের শেষ দিকে কানসাস সিটি ফেডের বার্ষিক সম্মেলনে ব্যাখ্যা করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াইওমিং অঙ্গরাজ্যের জ্যাকসন হোলে অনুষ্ঠিত ওই সম্মেলন হতে পারে তাঁর জন্য নিজের নীতিগত অবস্থান পরিষ্কার করার গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।
সাবেক ফেড ভাইস চেয়ারম্যান ডোনাল্ড কোহনের মতে, বাজারের প্রতিক্রিয়া যতটা ভয়াবহ বলে কেউ কেউ তুলে ধরছেন, বাস্তবে পরিস্থিতি হয়তো ততটা খারাপ নয়। তবে তিনি সতর্ক করেছেন, সংবাদ সম্মেলনের পর দীর্ঘমেয়াদি সুদের হার বেড়ে যাওয়া এবং স্বল্পমেয়াদি সুদের হার কমে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি ফেডের জন্য কাঙ্ক্ষিত নয়।
আরও বড় বিষয় হলো, গত মাসের ধাক্কা এখনো সামাল দেওয়া সম্ভব। কারণ সেটি ছিল প্রথম ঘটনা। কিন্তু সেপ্টেম্বর মাসে বিনিয়োগকারীরা সুদের হার বাড়ানোর আশা করার পরও যদি ফেড কোনো পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে গত মাসের মতো বাজার প্রতিক্রিয়া আবারও দেখা দিতে পারে।
তথ্যনির্ভর নীতি নিয়ে ওয়ারশের নিজস্ব দর্শন
ফেডের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ওয়ারশ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যোগাযোগ কৌশলও বদলাতে চান। তাঁর ধারণা, কোন পরিস্থিতিতে ফেড পদক্ষেপ নেবে তা আগে থেকেই বাজারকে বিস্তারিত জানিয়ে দিলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাত অনেকটা বাঁধা পড়ে যায়।
তাঁর মতে, কম নির্দেশনা দিলে বিনিয়োগকারীরা অর্থনীতির প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে নিজেদের মূল্যায়ন আরও পরিষ্কারভাবে করতে পারে। কিন্তু এই কৌশলেরও মূল্য আছে বলে মনে করেন ডোনাল্ড কোহন।
কারণ কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি নিজের চিন্তাভাবনা ও নীতির যুক্তি স্পষ্টভাবে না জানায়, তাহলে পরবর্তী সময়ে বোঝা কঠিন হয়ে যায় যে বাস্তব অর্থনৈতিক তথ্য তার পূর্বাভাসকে সমর্থন করছে কি না।
সেপ্টেম্বরের সিদ্ধান্তে বড় চাপ
জুলাই ও আগস্ট—দুই মাসের মূল্যস্ফীতির তথ্য যদি প্রত্যাশার চেয়ে শক্তিশালী হয়, তাহলে ওয়ারশ কঠিন এক সিদ্ধান্তের মুখে পড়বেন। তাঁকে হয়তো সুদের হার বাড়াতে হবে, নয়তো অপরিবর্তিত রেখে আরও কয়েকজন নীতিনির্ধারকের ভিন্নমত মেনে নিতে হবে।
ফেড যদি তখনও সুদের হার না বাড়ায়, তাহলে গত মাসে তৈরি হওয়া সন্দেহ দূর করা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
অন্যদিকে মূল্যস্ফীতির তথ্য যদি নরম থাকে, তাহলে পরিস্থিতি অনেকটাই সহজ হয়ে যাবে। সুদের হার বাড়ানোর পক্ষে থাকা কর্মকর্তাদের যুক্তি দুর্বল হবে এবং ওয়ারশ সাম্প্রতিক তথ্যের চাপ ছাড়াই জ্যাকসন হোলের সম্মেলনে নিজের নীতিগত দর্শন ব্যাখ্যা করার সুযোগ পাবেন।
এখানেই তৈরি হয়েছে বড় এক বৈপরীত্য। ওয়ারশ নিজেই মনে করেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি কোনো একটি মাসের অর্থনৈতিক তথ্যের ওপর নির্ভর করা উচিত নয়। অথচ তাঁর নেতৃত্বের প্রথম দিকেই দুটি মাসিক মূল্যস্ফীতি প্রতিবেদন এতটাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে যে, সেগুলোই এখন ফেডের সেপ্টেম্বরের সিদ্ধান্তের গতিপথ নির্ধারণ করতে পারে।
ফেড অতীতে অনেক সময় সুদের হার পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দিয়েছে এবং তাতে বড় কোনো সমস্যা হয়নি। কারণ বিনিয়োগকারীরা বুঝতেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক কী করছে এবং কেন করছে। কিন্তু নতুন চেয়ারম্যানের নীতির দিকনির্দেশনা যখন এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয়, তখন সেই সুরক্ষাও হয়তো থাকছে না।
সেপ্টেম্বরের পর ফেডের পরবর্তী বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে মধ্যবর্তী নির্বাচনের মাত্র কয়েক দিন আগে। এমন সময়ে কর্মকর্তারা প্রথমবারের মতো সুদের হার বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিতে রাজনৈতিক ও বাজারগত নানা চাপ বিবেচনা করতে পারেন। ফলে সেপ্টেম্বরের সিদ্ধান্ত পিছিয়ে গেলে তা কার্যত ডিসেম্বর পর্যন্ত গড়াতে পারে।
অর্থাৎ আগামী চার মাসের অর্থনৈতিক নীতির ভিত্তি দাঁড়িয়ে যেতে পারে এমন একটি মূল্যস্ফীতি পূর্বাভাসের ওপর, যেটি ফেডের কর্মকর্তারাই এখন রক্ষা করতে গিয়ে চাপের মুখে পড়েছেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















