কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে কথোপকথন এখন মানুষের দৈনন্দিন জীবনেরই অংশ। তথ্য জানতে, পরামর্শ নিতে, উৎসাহ পেতে, এমনকি মানসিক সঙ্গের প্রয়োজনেও অনেকে নির্ভর করছেন নানা ধরনের চ্যাটবটের ওপর। দ্রুত, আত্মবিশ্বাসী এবং বুদ্ধিদীপ্ত ভঙ্গিতে দেওয়া এসব উত্তর অনেক সময় এতটাই বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় যে, মানুষ নিজের বিচার-বুদ্ধি প্রয়োগের প্রয়োজনই অনুভব করেন না।
এই প্রবণতার বিরুদ্ধে একটু ভিন্ন ধরনের প্রতিবাদ নিয়ে হাজির হয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের টাকার ব্রায়ান্ট। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বদলে তিনি তৈরি করেছেন এমন এক ‘চ্যাটবট’, যার অন্য প্রান্তে কোনো যন্ত্র নয়, বসে আছেন একজন মানুষ—তিনি নিজেই।
সান ফ্রান্সিসকোর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-উন্মাদনার কেন্দ্রস্থলে সম্প্রতি দেখা যায় একটি বিলবোর্ড। সেখানে ‘চ্যাটটিজেবি’ নামের একটি সেবাকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাচালিত অগ্রণী কথোপকথন ব্যবস্থা হিসেবে প্রচার করা হয়। কিন্তু নামের আড়ালের গল্পটি ছিল একেবারেই আলাদা। এখানে ‘এআই’ বলতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নয়, বোঝানো হয়েছে ‘গড়পড়তা ব্যক্তি’। আর সেই ব্যক্তি হলেন ব্রায়ান্ট নিজেই।
যন্ত্রের বদলে একজন মানুষ
সাবেক গুগল কর্মী ব্রায়ান্ট মজা করে নিজের ব্যবস্থাকে বলেন ‘হাতে তৈরি মানবিক বুদ্ধিমত্তা’। প্রচলিত বৃহৎ ভাষাভিত্তিক মডেলের বদলে তিনি এটিকে আখ্যা দিয়েছেন ‘একক পরিচালিত বৃহৎ মানবিক অভিজ্ঞতা’ হিসেবে।
তার ভাষায়, এটি অনেকটা জনপ্রিয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কথোপকথন ব্যবস্থার মতো—তবে অপর প্রান্তে কোনো যন্ত্র নেই, আছেন তিনি নিজে, আর তিনি হয়তো আপনাকে ‘বাজে পরামর্শ’ও দিতে পারেন।
প্রথমে নিজের এই সেবার নাম ‘ব্যাডজিপিটি’ রাখার কথা ভেবেছিলেন ব্রায়ান্ট। কিন্তু সেই নামের ওয়েব ঠিকানা কেনা ছিল অত্যন্ত ব্যয়বহুল। শেষ পর্যন্ত নিজের নামের আদ্যক্ষর ব্যবহার করে তিনি তৈরি করেন ‘চ্যাটটিজেবি’।
এরপর শুরু হয় এক অদ্ভুত পরীক্ষা। হাজার হাজার মানুষের প্রশ্নের উত্তর তিনি নিজেই দিতে থাকেন। কোনো স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা নয়, কোনো ভাষাভিত্তিক যন্ত্র নয়—প্রতিটি প্রশ্নের পেছনে একজন মানুষ।
ভুল উত্তরও হতে পারে, ধীর উত্তরও
ব্রায়ান্টের সেবার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্যই হলো এর অস্বস্তিকর ধীরগতি এবং অনিশ্চয়তা। তিনি ব্যবহারকারীদের আগেই জানিয়ে দেন, তার উত্তর ধীর হবে, ভুলও হতে পারে। আবার কখনো সঠিকও হতে পারে, তবে তা হয়তো এতটাই রহস্যময় হবে যে বোঝাই কঠিন।
ইচ্ছাকৃতভাবেই তিনি এমন একটি অভিজ্ঞতা তৈরি করতে চান, যা দেখতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো হলেও ব্যবহারকারীকে স্বস্তিতে থাকতে দেবে না।
তার উদ্দেশ্য খুব সরল—কোনো স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা যখন অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে একটি যুক্তিসংগত উত্তর দেয়, তখন যেন মানুষ অন্তত একবার থেমে প্রশ্ন করেন, ‘উত্তরটি কি সত্যিই ঠিক?’
এই ভাবনাই তাকে মানুষের মধ্যে ‘চিন্তার আত্মসমর্পণ’ সম্পর্কে সচেতন করতে উদ্বুদ্ধ করেছে।
মসৃণ কথার চ্যাটবট, কমছে প্রশ্ন করার অভ্যাস
বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা এমন একটি প্রবণতার কথা বলেছেন, যেখানে মানুষ নিজের বিচার-বিশ্লেষণের বদলে চ্যাটবটের ওপর অতিরিক্ত আস্থা রাখতে শুরু করেন। ব্রায়ান্টের আশঙ্কা, দ্রুত এবং আত্মবিশ্বাসী ভাষায় দেওয়া উত্তর মানুষকে ধীরে ধীরে নিজের চিন্তাশক্তি ব্যবহারে অনাগ্রহী করে তুলছে।
তার মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যখন উত্তর দেওয়ার আগে কিছুক্ষণ ‘ভাবছে’—এমন দৃশ্য দেখায়, তারপর অক্ষর ধরে ধরে আত্মবিশ্বাসী ভাষায় উত্তর হাজির করে, তখন অনেকেই আর সেই তথ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলেন না।
অথচ চ্যাটবটের উত্তর ভুল, অসম্পূর্ণ কিংবা বিভ্রান্তিকর হতে পারে।
এই জায়গাটিতেই ব্রায়ান্ট মানুষের দৃষ্টি ফেরাতে চান মানুষের নিজের বুদ্ধির দিকে।
হাস্যরসের আড়ালে বড় প্রশ্ন
চ্যাটটিজেবি ব্যবহারকারীদের প্রশ্নের উত্তর দেয় নানা বিষয়ে—বাড়ির দেয়ালে কোন রঙ ভালো লাগবে, আত্মবিশ্বাসের সংকট কীভাবে সামলানো যায়, এমনকি কর-সংক্রান্ত প্রশ্নও আসে তার কাছে।
এক ব্যবহারকারী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার সেবার প্রশংসা করে লিখেছেন, এটি জনপ্রিয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার চ্যাটবটের চেয়েও অনেক বেশি মজার ও আকর্ষণীয়।
আরেকজন মন্তব্য করেছেন, ‘কোনো নোট নেই। চমৎকার।’
ব্রায়ান্টের সবচেয়ে বড় সাফল্য হয়তো এখানেই—মানুষকে হাসাতে হাসাতে তিনি তাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে করিয়ে দিচ্ছেন।
বিলবোর্ড কেনার পেছনেও প্রতিবাদ
সান ফ্রান্সিসকোর মতো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-প্রযুক্তির কেন্দ্রস্থলে একটি বিলবোর্ড কেনার অর্থ কম নয়। ব্রায়ান্ট জানিয়েছেন, এ জন্য তাকে নিজের সঞ্চয় থেকে যথেষ্ট অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে।
কেন এমন করলেন—এই প্রশ্নের উত্তরও দিয়েছেন তিনি। তার ইচ্ছা ছিল, শহরের রাস্তায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠানের প্রচার করা অন্তত একটি বিলবোর্ড যেন কম থাকে।
তার কাছে এটি শুধু একটি মজার প্রচারণা নয়; বরং প্রযুক্তিনির্ভর জীবনে মানুষের নিজস্ব চিন্তাশক্তিকে ফিরিয়ে আনার একটি ছোট্ট প্রচেষ্টা।
একার উদ্যোগ থেকে মানুষের প্রকল্প
চাহিদা এতটাই বেড়ে গেছে যে একপর্যায়ে ব্রায়ান্টের সেবায় প্রশ্নের চাপ সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে। ব্যবহারকারীদের তখন জানানো হয়, ‘সাইট চাপের মধ্যে, গড়পড়তা ব্যক্তিও চাপের মধ্যে।’
তবে এখানেই থামতে চান না ব্রায়ান্ট। ভবিষ্যতে তিনি এক ব্যক্তির এই প্রশ্নোত্তর ব্যবস্থাকে একটি বৃহত্তর সামাজিক প্রকল্পে পরিণত করতে চান।
তার বার্তাটি আসলে প্রযুক্তিবিরোধী নয়। বরং প্রযুক্তি ব্যবহারের সময় মানুষ যেন নিজের বিবেক, যুক্তি ও বিচার-বুদ্ধিকে পাশে রাখেন—সেটিই তিনি মনে করিয়ে দিতে চাইছেন।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যতই দ্রুত, স্মার্ট ও সাবলীল হয়ে উঠুক, শেষ সিদ্ধান্তটি মানুষেরই। আর সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে এক মুহূর্ত থেমে প্রশ্ন করাই হয়তো এখন সবচেয়ে জরুরি—‘চ্যাটবট যা বলছে, তা কি সত্যিই ঠিক?’
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে তাই হয়তো সবচেয়ে প্রয়োজনীয় নতুন প্রযুক্তি কোনো যন্ত্র নয়; বরং মানুষের নিজের চিন্তা করার ক্ষমতা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















