যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ভেতরে ক্রমেই জোরালো হচ্ছে প্রতিষ্ঠিত নেতৃত্বের বিরুদ্ধে অসন্তোষ। দলীয় নেতৃত্ব প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক ক্ষমতা মোকাবিলায় যথেষ্ট কঠোর নয়—এমন ধারণা থেকে অনেক ভোটার এখন অপেক্ষাকৃত নতুন, বামঘেঁষা ও প্রতিষ্ঠাবিরোধী প্রার্থীদের দিকে ঝুঁকছেন। এই প্রবণতা আগামী মধ্যবর্তী নির্বাচন এবং ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে দলটির রাজনৈতিক চরিত্রে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
এই পরিস্থিতির সঙ্গে অনেকেই ২০০৯-১০ সালের রিপাবলিকান পার্টির ‘টি পার্টি’ আন্দোলনের মিল খুঁজে পাচ্ছেন। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার প্রশাসনের বিরুদ্ধে রিপাবলিকান ভোটারদের ক্ষোভ থেকেই ওই আন্দোলনের উত্থান হয়েছিল। পরে সেই আন্দোলন রিপাবলিকান পার্টিকে আমূল বদলে দেয় এবং শেষ পর্যন্ত ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো প্রতিষ্ঠাবিরোধী নেতার উত্থানের পথ তৈরি করে।
টি পার্টি কীভাবে বদলে দিয়েছিল রিপাবলিকান পার্টিকে
২০০৯ সালের আর্থিক সংকটের পর ওবামা প্রশাসনের নীতির বিরুদ্ধে রিপাবলিকানদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়তে থাকে। বিশেষ করে সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যসেবা আইন ঠেকাতে দলীয় নেতৃত্ব যথেষ্ট শক্ত অবস্থান নিতে পারেনি—এমন অভিযোগ ছিল তৃণমূল ভোটারদের।
২০১০ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে সেই ক্ষোভ বড় রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়। রিপাবলিকানরা প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করে। মার্কো রুবিও ও র্যান্ড পলের মতো নতুন মুখও এই ঢেউয়ে রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী হয়ে ওঠেন। প্রতিনিধি পরিষদে ৮৭ জন নতুন রিপাবলিকান সদস্য নির্বাচিত হন।
এরপর ২০১২ সালের নির্বাচনে দলীয় প্রতিষ্ঠানের পছন্দের প্রার্থী মিট রমনি পরাজিত হলে অসন্তোষ আরও বাড়ে। প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতা ব্যবহারের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে তৎকালীন রিপাবলিকান নেতৃত্বের ব্যর্থতা ভোটারদের হতাশ করে।
এই পরিবেশই পরে ট্রাম্পের উত্থানের জন্য অনুকূল হয়ে ওঠে।

ট্রাম্পের উত্থানের সঙ্গে মিল কোথায়
ট্রাম্প নিজেকে প্রতিষ্ঠিত রাজনীতির বিরুদ্ধে একজন বিদ্রোহী হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। বৈদেশিক হস্তক্ষেপ, মুক্ত বাণিজ্য এবং প্রচলিত অভিবাসন নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার পাশাপাশি তিনি নিজেকে এমন একজন নেতা হিসেবে উপস্থাপন করেন, যিনি রাজনৈতিক রীতিনীতি নিয়ে খুব একটা ভাবেন না।
তার কথাবার্তাও ছিল প্রচলিত রাজনীতিকদের তুলনায় অনেক বেশি আক্রমণাত্মক। প্রতিপক্ষ, এমনকি সংবাদমাধ্যমকেও প্রকাশ্যে আক্রমণ করতে তিনি দ্বিধা করতেন না। ভোটারদের কাছে এই আচরণই তাকে একজন ‘লড়াকু’ নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
ডেমোক্র্যাটিক পার্টির বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে এখানেই মিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে।
ডেমোক্র্যাটদের মধ্যেও প্রতিষ্ঠাবিরোধী ঢেউ
ডেমোক্র্যাট ভোটারদের একটি বড় অংশ এখন মনে করছেন, দলীয় নেতৃত্ব ট্রাম্পের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে যথেষ্ট কার্যকরভাবে দাঁড়াতে পারছে না। গত বছর এক জরিপে ৬৭ শতাংশ ডেমোক্র্যাট ভোটার নিজেদের দল নিয়ে হতাশার কথা জানিয়েছিলেন। ২০২১ সালে এই হার ছিল ৪৮ শতাংশ।
এই হতাশা প্রতিষ্ঠাবিরোধী প্রার্থীদের জনপ্রিয়তা বাড়িয়ে দিচ্ছে। ২০২৫ সালে নিউইয়র্কের মেয়র নির্বাচনে জোহরান মামদানির জয় এই প্রবণতাকে আরও দৃশ্যমান করে। এরপর দেশের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে তুলনামূলক নতুন ও প্রতিষ্ঠাবিরোধী প্রার্থীরা ডেমোক্র্যাটদের প্রাথমিক নির্বাচনে ভালো ফল করতে শুরু করেন।
মিশিগানে আবদুল এল-সায়েদ আরও প্রতিষ্ঠিত প্রতিদ্বন্দ্বীদের পেছনে ফেলে সিনেটের মনোনয়ন পান। মেইনে গ্রাহাম প্ল্যাটনারও রিপাবলিকান সিনেটর সুসান কলিন্সের বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রচারণা চালাচ্ছিলেন, যদিও পরে যৌন নিপীড়নের অভিযোগের মধ্যে তিনি প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেন।

ধনীদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ, স্বাস্থ্যসেবায় জোর
এই নতুন প্রজন্মের ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের বক্তব্যে কয়েকটি বিষয় বারবার সামনে আসছে। তারা ধনকুবেরদের প্রভাব, প্রতিষ্ঠিত রাজনীতিকদের ভূমিকা এবং রিপাবলিকানদের নীতির সমালোচনা করছেন।
নীতিগতভাবেও অনেকের মধ্যে সম্পদের পুনর্বণ্টন এবং সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার মতো বিষয়গুলোর প্রতি জোরালো আগ্রহ দেখা যাচ্ছে।
ডেমোক্র্যাট ভোটারদের মধ্যে দলকে দুর্বল ও অকার্যকর মনে করার প্রবণতাও বাড়ছে। ২০২৫ সালের একটি উন্মুক্ত প্রশ্নের জরিপে দলকে বর্ণনা করতে গিয়ে অনেক ভোটার ‘দুর্বল’ বা ‘অকার্যকর’ ধরনের শব্দ ব্যবহার করেছিলেন।
এমনকি দল ক্ষমতায় থাকার সময়ও অনেক ডেমোক্র্যাট ভোটার মনে করতেন, দল সেই ক্ষমতা যথেষ্ট কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারেনি।
আপসের রাজনীতিতে অনাস্থা
ডেমোক্র্যাটদের একাংশ এখন আপসের রাজনীতিতেও বিরক্ত। তাদের যুক্তি, প্রতিপক্ষ যদি কোনো সমঝোতায় না আসে, তাহলে নিজেদের পক্ষ কেন একতরফাভাবে নিয়ম মেনে চলবে?
এই মনোভাব দলীয় নেতৃত্বের বিরুদ্ধেও ক্ষোভ বাড়াচ্ছে। সিনেটের সংখ্যালঘু নেতা চাক শুমারের বিরুদ্ধেও ডেমোক্র্যাটদের একটি অংশ অসন্তুষ্ট হয়ে উঠেছেন। ২০২৫ সালের বসন্তে সরকার সচল রাখার পক্ষে তার ভোট এবং একই বছরের নভেম্বরে আট ডেমোক্র্যাট সিনেটরের আরেকটি সরকারি অচলাবস্থা শেষ করার সিদ্ধান্তকে অনেক দলীয় ভোটার অতিরিক্ত ছাড় হিসেবে দেখেছিলেন।
ফলে দলের তৃণমূল পর্যায়ে এখন পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা স্পষ্ট।
২০২৮-এ নতুন নেতৃত্বের সম্ভাবনা

এই পরিস্থিতিতে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ভেতর থেকে নতুন ধরনের নেতৃত্ব উঠে আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
নিউইয়র্কের প্রতিনিধি আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্টেজ এমন সম্ভাব্য মুখগুলোর একজন। গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রের অন্যতম পরিচিত প্রবক্তা হিসেবে তিনি দীর্ঘদিন ধরেই প্রচলিত রাজনৈতিক কাঠামোর বাইরে থাকা ভোটারদের কাছে জনপ্রিয়।
অবশ্য গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রের সঙ্গে নিজেদের পরিচয় দেওয়া নেতাদের পছন্দ করেন মাত্র প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ডেমোক্র্যাট। তবু দলীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি অসন্তোষ, ট্রাম্পের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের দাবি এবং নতুন প্রার্থীদের সাফল্য মিলিয়ে পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে, যেখানে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রচলিত কাঠামো বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
বদলে যেতে পারে ডেমোক্র্যাটদের রাজনৈতিক পরিচয়
রিপাবলিকান পার্টির ক্ষেত্রে টি পার্টি আন্দোলন ছিল একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের সূচনা। সেই আন্দোলন প্রতিষ্ঠিত নেতৃত্বের প্রতি তৃণমূলের অনাস্থাকে শক্তিশালী করেছিল এবং কয়েক বছর পর ট্রাম্পের উত্থানের জন্য রাজনৈতিক ভিত্তি তৈরি করেছিল।
ডেমোক্র্যাটদের ক্ষেত্রেও এখন একই ধরনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে কি না, সেটিই বড় প্রশ্ন। আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন এবং ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সেই প্রশ্নের উত্তর অনেকটাই স্পষ্ট করে দিতে পারে।
দলীয় নেতৃত্ব যদি ভোটারদের ক্ষোভ সামাল দিতে ব্যর্থ হয় এবং প্রতিষ্ঠাবিরোধী প্রার্থীরা ধারাবাহিকভাবে সাফল্য পান, তাহলে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির নেতৃত্ব, নীতি ও রাজনৈতিক ভাষা—সবকিছুতেই বড় পরিবর্তন আসতে পারে। এমনকি দলটির ভেতর থেকেই উঠে আসতে পারে এমন কোনো নেতা, যিনি প্রচলিত রাজনীতির সীমারেখা ভেঙে সরাসরি ক্ষমতার লড়াইয়ে নামবেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















