পুরুষদের ট্যুর দ্য ফ্রান্স যেখানে অনেকটা একতরফা লড়াইয়ে শেষ হয়েছে, সেখানে নারীদের প্রতিযোগিতা ছিল পুরোপুরি ভিন্ন। নয় দিনের এই প্রতিযোগিতায় বারবার বদলেছে নেতৃত্ব, ভেঙে পড়েছেন গতবারের চ্যাম্পিয়ন, দেখা গেছে অবিশ্বাস্য এক পাহাড়ি পারফরম্যান্স। শেষ দিনের আগে শীর্ষ দুই প্রতিযোগীর ব্যবধান ছিল মাত্র ৮ সেকেন্ড। শেষ পর্যন্ত সেই উত্তেজনাপূর্ণ লড়াইয়ে জয় পেয়েছেন নেদারল্যান্ডসের দেমি ভোলেরিং।
ভোলেরিংয়ের এই জয় বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি প্রথম নারী সাইক্লিস্ট হিসেবে দ্বিতীয়বার ট্যুর দ্য ফ্রান্স ফেমসের শিরোপা জিতলেন।
শুরুতেই ভেঙে পড়েন গতবারের চ্যাম্পিয়ন
প্রতিযোগিতার শুরুতে সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসে গতবারের চ্যাম্পিয়ন পলিন ফেরাঁ-প্রেভোর কাছ থেকে। পাহাড়ি সাইক্লিংয়ে দীর্ঘদিনের দাপুটে এই ফরাসি তারকা এবার নিজের প্রত্যাশিত ছন্দে ছিলেন না। সময়ের বিপরীতে সাইকেল চালানোর পর্বে তার দুর্বলতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
এই ধরনের প্রতিযোগিতায় গতি ও বায়ু প্রতিরোধ কমানোর জন্য সাইক্লিস্টদের শরীরের অবস্থান, পোশাক ও সরঞ্জাম পর্যন্ত অত্যন্ত নিখুঁতভাবে প্রস্তুত করা হয়। কিন্তু ফেরাঁ-প্রেভোর অবস্থান ও হেলমেটের ব্যবস্থাপনা ছিল অনেকটাই অস্বস্তিকর। ফলে ওই পর্বেই তিনি প্রায় দুই মিনিট পিছিয়ে পড়েন। পরের পাহাড়ি ধাপেও সময় হারিয়ে তার শিরোপা ধরে রাখার সম্ভাবনা কার্যত শেষ হয়ে যায়।
ভঁতু পাহাড়ে অবিশ্বাস্য কীর্তি
ফেরাঁ-প্রেভোর ছন্দপতনের পর প্রতিযোগিতার দরজা খুলে যায় অন্যদের জন্য। ফ্রান্সের প্রোভঁস অঞ্চলের বিখ্যাত মঁ ভঁতু পাহাড়ি ধাপে সবার নজর কাড়েন পোল্যান্ডের কাসিয়া নেভিয়াদোমা-ফিনি।
তিনি একাই প্রতিদ্বন্দ্বীদের পেছনে ফেলে এগিয়ে যান। দেমি ভোলেরিং এবং তখনকার শীর্ষে থাকা মারলেন রেউসারকে ছাড়িয়ে তিনি শুধু ধাপটির জয়ই পাননি, সামগ্রিক প্রতিযোগিতার নেতৃত্বও দখল করেন।
সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় ছিল, মঁ ভঁতুতে নারীদের মধ্যে এ পর্যন্ত রেকর্ড হওয়া দ্রুততম আরোহণের সময় গড়েন নেভিয়াদোমা-ফিনি। ২০২৪ সালের ট্যুরজয়ী এই সাইক্লিস্ট এর আগে কোনো ধাপ জিততে পারেননি। এবার সেই ঘাটতিও পূরণ করেন তিনি।
৮ সেকেন্ডের ব্যবধান ঘিরে তুমুল বিতর্ক
পরের দিন থেকেই শুরু হয় নতুন নাটক। ভোলেরিংয়ের দলের সতীর্থ সেলিয়া জেরি একটি বাঁকে দ্রুত এগিয়ে গিয়ে নেভিয়াদোমা-ফিনির পথ আটকে দেওয়ার মতো অবস্থান নেন। এতে নেভিয়াদোমা-ফিনিকে গতি কমাতে হয়। সেই সুযোগে ভোলেরিং এগিয়ে যান।

পরে নেভিয়াদোমা-ফিনি আবার ভোলেরিংকে ধরার চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত ব্যবধান কমাতে পারেননি। দিনের শেষে তিনি মাত্র ৮ সেকেন্ডের ব্যবধানে হলুদ জার্সি হারান।
ফিনিশ লাইনে পৌঁছে ক্ষুব্ধ নেভিয়াদোমা-ফিনি জেরির কৌশলকে শিশুসুলভ বলে মন্তব্য করেন। এরপর তিনি সরাসরি জেরির সঙ্গে কথা বলে জানতে চান, কেন এমনভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতার পথ আটকে দেওয়া হয়েছিল।
সাইক্লিং দুনিয়ায় ২৪ ঘণ্টার উত্তেজনা
ঘটনাটি দ্রুতই সাইক্লিং অঙ্গনে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে ঘটনার নানা ভিডিও। কেউ এটিকে বিপজ্জনক ও অন্যায্য কৌশল বলেছেন, কেউ আবার বলেছেন, প্রতিযোগিতামূলক সাইক্লিংয়ে এমন কৌশল খেলারই অংশ।
এই বিতর্কে প্রতিযোগীদের কৌশল, নিরাপত্তা ও খেলোয়াড়সুলভ আচরণ—সবকিছু নিয়েই প্রশ্ন ওঠে। তবে অনলাইনে জেরিকে যারা হুমকি দিয়েছেন, তাদের আচরণের কঠোর সমালোচনা হয়েছে। প্রতিযোগিতার উত্তেজনা নিয়ে বিতর্ক হতে পারে, কিন্তু কোনো খেলোয়াড়কে হুমকি দেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়।

শেষ দিনে শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ ভোলেরিংয়ের
সব বিতর্কের শেষ উত্তরটি অবশ্য দিয়েছেন ভোলেরিং নিজেই। ফ্রান্সের নিস শহরে সমুদ্রতীরবর্তী শেষ ধাপে গুরুত্বপূর্ণ চূড়ান্ত আরোহনে তিনি নেভিয়াদোমা-ফিনিকে পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যান।
শেষ পর্যন্ত ভোলেরিং জয় নিশ্চিত করেন। দ্বিতীয় হন নেভিয়াদোমা-ফিনি। প্রতিযোগিতা শেষে দুজনের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ আলিঙ্গনও হয়। ভোলেরিং তার সতীর্থ জেরির পাশে দাঁড়ালেও শেষ পর্যন্ত উত্তেজনার বদলে শান্তির বার্তাই সামনে আসে।
নেভিয়াদোমা-ফিনি বলেন, তাদের কেউই আর বিরোধ চান না। এক সপ্তাহের টানটান উত্তেজনার পর শেষটাও তাই হয় সৌহার্দ্যপূর্ণ।
প্রতিযোগিতা শেষে ক্লান্ত সাইক্লিস্টরা নেমে যান সমুদ্রতীরে। কেউ কেউ ভূমধ্যসাগরের পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে শরীর ও মন ঠান্ডা করেন। কয়েক দিনের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা, বিতর্ক, আবেগ ও রুদ্ধশ্বাস লড়াই শেষে পর্দা নামে এবারের নারীদের ট্যুর দ্য ফ্রান্সে।
দেমি ভোলেরিং শুধু শিরোপাই জেতেননি, প্রমাণ করেছেন কেন তিনিই এবারের প্রতিযোগিতার সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিযোগী ছিলেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















