০৩:৩৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২৬
অভিবাসন অভিযানে বর্ণবিদ্বেষের অভিযোগ, মার্কিন এজেন্টদের বিরুদ্ধে গুরুতর তথ্য তীব্র তাপপ্রবাহ ও বিদ্যুৎ বিপর্যয়ে বিশ্বজুড়ে বাড়ছে অর্থনৈতিক ক্ষতি ট্রাম্পকে হত্যার হুমকি: ইসরায়েলি গোয়েন্দা তথ্যে ‘কম আস্থা’ ছিল সিআইএর, তবু বদলানো হয় বিমান বিদ্যুৎমন্ত্রী বললেন, লোডশেডিং কমানোর সুযোগ নেই; গ্যাস সংকটে শিল্পে উৎপাদন ক্ষতি ৪০ শতাংশ বই বাছাইয়ে মানুষের রুচিই কেন এখনো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার চাপে স্মার্টফোন থেকে গাড়ি—সবখানেই মেমোরি চিপের সংকট ১৫০ বছরেও ম্লান হয়নি বায়রয়থ উৎসবের মোহ, ওয়াগনারের সুরে আজও তীর্থযাত্রা টেনিসের ইতিহাসে রেনে রিচার্ডস: পথ দেখানো এক নারীর উত্তরাধিকার নিয়ে নতুন বিতর্ক ট্রাম্পকে বাঁচাতে এয়ার ফোর্স ওয়ানে থাকা সাংবাদিক-সরকারি কর্মকর্তারাই কি ‘অজান্তের ঢাল’? আমেরিকার লোকচক্ষুর আড়ালে থাকা ছয় বিস্ময়, যেখানে প্রকৃতি এখনো নির্জন ও দুর্দান্ত

টেনিসের ইতিহাসে রেনে রিচার্ডস: পথ দেখানো এক নারীর উত্তরাধিকার নিয়ে নতুন বিতর্ক

প্রায় পাঁচ দশক আগে টেনিসের মাঠে যে লড়াই নতুন এক ইতিহাসের জন্ম দিয়েছিল, আজ সেই ইতিহাসই আবার ফিরে এসেছে তীব্র বিতর্কের কেন্দ্রে। রেনে রিচার্ডস—যিনি একসময় রিচার্ড রাসকিন নামে পরিচিত ছিলেন—নারী টেনিসে অংশ নেওয়ার অধিকার আদায় করে খেলাধুলার জগতে আলোড়ন তুলেছিলেন। কিন্তু জীবনের শেষ প্রান্তে এসে খেলাধুলায় রূপান্তরকামী নারীদের অংশগ্রহণ নিয়ে তাঁর নিজের অবস্থান বদলে গেছে। আর সেই বৈপরীত্যই তাঁকে নিয়ে লেখা নতুন জীবনীকে আরও আলোচিত করে তুলেছে।

জুলি ক্লিগম্যানের লেখা ‘ফাইন্ডিং রেনে রিচার্ডস’ বইয়ে উঠে এসেছে রিচার্ডসের শৈশব, চিকিৎসক হিসেবে সাফল্য, টেনিসজীবন, লিঙ্গপরিচয় নিয়ে দীর্ঘ সংগ্রাম এবং ১৯৭৭ সালের ঐতিহাসিক আইনি লড়াই। বইটি প্রকাশের আগেই রিচার্ডসের জীবন ও উত্তরাধিকার নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

আদালতের লড়াই থেকে ইতিহাসের পাতায়

১৯৩৪ সালে নিউইয়র্কে জন্ম নেওয়া রিচার্ড রাসকিন ছোটবেলা থেকেই ছিলেন অসাধারণ মেধাবী ও ক্রীড়াপ্রতিভাধর। স্কুলে খেলেছেন বেসবল ও টেনিস। ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে টেনিস দলের অধিনায়কও হন। পরে চিকিৎসাশাস্ত্র পড়েন এবং চক্ষুবিদ্যায় বিশেষজ্ঞ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।

কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনে চলছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক সংগ্রাম। নারী পোশাক পরার আকাঙ্ক্ষা এবং নিজের পরিচয় নিয়ে দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্ব তাঁকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করেছিল। এই পরিচয় বোঝার ও গ্রহণ করার পথ ছিল দীর্ঘ এবং কঠিন।

শেষ পর্যন্ত অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে লিঙ্গান্তরের পর তিনি নতুন নাম নেন রেনে। এরপর ক্যালিফোর্নিয়ায় নতুন জীবন শুরু করেন। তখন থেকেই তিনি শুধু একজন চিকিৎসক নন, টেনিসেরও এক ব্যতিক্রমী চরিত্র হয়ে ওঠেন।

১৯৭৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের টেনিস কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে তাঁর আইনি লড়াই তাঁকে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত করে তোলে। নারী বিভাগে খেলতে তাঁর যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল। আদালতের রায়ের মাধ্যমে তিনি নারী টেনিসে অংশ নেওয়ার সুযোগ পান এবং ওই বছরের যুক্তরাষ্ট্র ওপেনে খেলেন।

একক প্রতিযোগিতায় প্রথম পর্বেই হেরে গেলেও দ্বৈত প্রতিযোগিতায় তিনি ফাইনালে পৌঁছেছিলেন। পরবর্তী সময়ে তাঁর সর্বোচ্চ র‌্যাঙ্কিং ছিল ২০ নম্বর। অর্থাৎ তিনি নারী টেনিসে আধিপত্য বিস্তার করেননি, কিন্তু তাঁর উপস্থিতি খেলাধুলার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ দরজা খুলে দিয়েছিল।

চিকিৎসক রেনে, টেনিস খেলোয়াড় রেনে

রিচার্ডসের জীবন শুধু টেনিসের গল্প নয়। তিনি ছিলেন একজন সফল চক্ষুবিশেষজ্ঞও। নিউইয়র্কের চিকিৎসাজগতে তাঁর দক্ষতার সুনাম ছিল। তাঁর রোগীদের মধ্যে পরিচিত শিল্পী, লেখক ও গণমাধ্যমকর্মীরাও ছিলেন।

একটি মজার ঘটনা তাঁর চিকিৎসকসত্তার দক্ষতার পরিচয় দেয়। সম্প্রচারক কিথ ওলবারম্যান একবার চোখের সমস্যায় পড়লে জানতে পারেন, নিউইয়র্কের অন্যতম সেরা চক্ষু বিশেষজ্ঞ রেনে রিচার্ডস। রিচার্ডস মাত্র কয়েক মিনিটে একটি সাধারণ ছোট আলো ব্যবহার করে তাঁর সমস্যার সমাধান করে দেন।

এই ঘটনাই যেন রিচার্ডসের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে—তিনি কেবল পরিচয় ও বিতর্কের মানুষ ছিলেন না; নিজের পেশাতেও ছিলেন অত্যন্ত দক্ষ।

শৈশব থেকেই পরিচয়ের সংকট

জীবনীতে রিচার্ডসের শৈশবের নানা কঠিন অভিজ্ঞতার কথাও উঠে এসেছে। কুইন্সে তাঁর মা স্যাডি ছিলেন মনোবিশ্লেষণবিদ এবং বাবা ডেভিড ছিলেন অস্থিবিদ্যার চিকিৎসক। পরিবারে তাঁর ক্রীড়াগত সাফল্যকে গুরুত্ব দেওয়া হলেও তাঁর ভেতরের পরিচয়সংক্রান্ত সংকট নিয়ে খোলামেলা আলোচনা খুব একটা হয়নি।

বড় বোন জোসেফিনের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কও ছিল জটিল। ছোটবেলায় তাঁকে নিয়ে নানা ধরনের উপহাস ও মানসিক নির্যাতনের ঘটনা তাঁর স্মৃতিতে গভীর প্রভাব ফেলেছিল।

কৈশোর ও তারুণ্যে নিজের পরিচয়কে বোঝার চেষ্টা করতে গিয়ে রিচার্ডস দীর্ঘ সময় মানসিক বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে যান। এমনকি নারী পোশাক পরার আকাঙ্ক্ষা থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখার চেষ্টাও করেছিলেন।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি বুঝতে পারেন, নিজের সত্যিকারের পরিচয় থেকে পালিয়ে থাকা সম্ভব নয়।

নতুন পরিচয়ের পথে কঠিন যাত্রা

বিয়ে, পরিবার, চিকিৎসাশিক্ষা, নৌবাহিনীতে চাকরি—জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে রিচার্ডস নিজেকে পুরুষ পরিচয়ের মধ্যেই ধরে রাখার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু সেই জীবন তাঁর ভেতরের দ্বন্দ্ব দূর করতে পারেনি।

শেষ পর্যন্ত অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেন তিনি। এর পরই রিচার্ড থেকে রেনে হয়ে ওঠার নতুন অধ্যায় শুরু হয়।

‘রেনে’ নামের অর্থও তাঁর কাছে ছিল তাৎপর্যপূর্ণ—নতুন করে জন্ম নেওয়া। ক্যালিফোর্নিয়ায় গিয়ে তিনি নিজের নতুন পরিচয়কে কেন্দ্র করে জীবন সাজান। খুব দ্রুতই তিনি যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম পরিচিত রূপান্তরকামী ব্যক্তি হয়ে ওঠেন।

এক সময়ের প্রতীক, আজকের বিতর্কিত কণ্ঠ

রিচার্ডসের জীবনের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য সম্ভবত এখানেই। যে নারী নিজে নারী টেনিসে অংশ নেওয়ার অধিকার আদায়ের জন্য আদালতে লড়েছিলেন, পরবর্তী জীবনে তিনিই বলেছেন, পুরুষ বয়ঃসন্ধির মধ্য দিয়ে যাওয়া রূপান্তরকামী নারীদের নারী দলের খেলায় অংশ নেওয়া উচিত নয়।

এই অবস্থান তাঁর জীবনীকার জুলি ক্লিগম্যানকে বিস্মিত করেছে। ক্লিগম্যান নিজেও রূপান্তরকামী ও অ-বাইনারি পরিচয়ের মানুষ। ফলে রিচার্ডসের অতীত সংগ্রাম এবং বর্তমান মতাদর্শের মধ্যে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে, তা বইটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।

টেনিস কিংবদন্তি মার্টিনা নাভ্রাতিলোভাও নারী ক্রীড়ায় পুরুষ হিসেবে বয়ঃসন্ধি পার হওয়া খেলোয়াড়দের অংশগ্রহণের বিরোধিতা করেছেন। ফলে রিচার্ডসের বর্তমান অবস্থান তাঁকে আরও বৃহত্তর একটি বিতর্কের অংশ করে তুলেছে।

নিজের উত্তরাধিকার নিয়েও প্রশ্ন

রিচার্ডস নিজেও তাঁর পুরোনো আইনি লড়াই নিয়ে এখন অনুতপ্ত। প্রায় অর্ধশতাব্দী আগে যে মামলা তাঁকে ইতিহাসে স্থান দিয়েছিল, পরবর্তী সময়ে সেই লড়াইয়ের ফলাফল নিয়ে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি বদলে গেছে।

এই পরিবর্তনই প্রশ্ন তুলছে—একজন ঐতিহাসিক পথিকৃৎ কি তাঁর নিজের তৈরি ইতিহাসের সঙ্গে পরবর্তী জীবনে দ্বিমত পোষণ করতে পারেন?

জীবনীকারের দৃষ্টিতে উত্তরটি সহজ নয়। রিচার্ডস একই সঙ্গে একজন পথপ্রদর্শক, দক্ষ চিকিৎসক, সফল ক্রীড়াবিদ এবং নিজের সময় ও অভিজ্ঞতার দ্বারা গড়ে ওঠা একজন জটিল মানুষ।

তাঁর জীবনকে শুধু একটি পরিচয়ের প্রতীক হিসেবে দেখলে সেই জটিলতা হারিয়ে যায়।

টেনিস কি সত্যিই বদলে গিয়েছিল?

রিচার্ডসের নারী টেনিসে অংশগ্রহণ নিয়ে ১৯৭০-এর দশকে ব্যাপক বিতর্ক হয়েছিল। আশঙ্কা ছিল, তাঁর অংশগ্রহণ নারী টেনিসের প্রতিযোগিতামূলক ভারসাম্য নষ্ট করবে।

কিন্তু বাস্তব ফলাফল ছিল অনেক বেশি সাধারণ। তিনি নারী টেনিসে অংশ নিয়েছিলেন, কিছু উল্লেখযোগ্য সাফল্যও পেয়েছিলেন, কিন্তু খেলাটির ওপর কোনো দীর্ঘমেয়াদি ধ্বংসাত্মক প্রভাব পড়েনি।

ওলবারম্যানের মতে, রিচার্ডসের অংশগ্রহণকে ঘিরে সে সময় যতটা ভয় ও উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল, বাস্তবে বিষয়টি ততটা বড় হয়ে ওঠেনি।

এই পর্যবেক্ষণই বর্তমান বিতর্কের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ কয়েক দশক আগের একটি ঘটনা আজকের খেলাধুলা ও লিঙ্গপরিচয় নিয়ে চলমান উত্তপ্ত আলোচনায় নতুন অর্থ পাচ্ছে।

কেন হারিয়ে গেল তাঁর উত্তরাধিকার?

রিচার্ডস একসময় যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে পরিচিত রূপান্তরকামী ব্যক্তিদের একজন ছিলেন। পরে তাঁর পরিচিতিকে ছাড়িয়ে যান ক্যাটলিন জেনারসহ অন্যরা। ফলে কয়েক দশকের মধ্যেই রিচার্ডসের নাম সাধারণ মানুষের স্মৃতি থেকে অনেকটাই আড়ালে চলে যায়।

জুলি ক্লিগম্যানের বই সেই বিস্মৃত ইতিহাসকে আবার সামনে আনতে চাইছে।

রিচার্ডসের জীবন মনে করিয়ে দেয়, সামাজিক পরিবর্তনের ইতিহাস কখনো সরলরেখায় এগোয় না। একজন মানুষ কোনো সময়ে যে পরিবর্তনের প্রতীক হয়ে ওঠেন, পরবর্তী জীবনে তাঁর নিজের মতামত সেই পরিবর্তনের সঙ্গেই বিরোধে দাঁড়াতে পারে।

ইতিহাসের মানুষ, শুধু প্রতীক নন

রেনে রিচার্ডসের জীবন তাই কেবল টেনিসের একটি পুরোনো বিতর্ক নয়। এটি ব্যক্তিগত পরিচয়, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা, খেলাধুলা, চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং সময়ের সঙ্গে মানুষের চিন্তার পরিবর্তনের এক জটিল কাহিনি।

১৯৭৭ সালের আদালতের লড়াই তাঁকে ইতিহাসে জায়গা দিয়েছিল। টেনিসের মাঠে তাঁর উপস্থিতি বহু মানুষের কাছে ছিল নজিরবিহীন। আবার জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে তাঁর নিজের বক্তব্যই সেই পুরোনো ইতিহাসকে নতুন প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছে।

সম্ভবত এখানেই রেনে রিচার্ডসের গল্পের সবচেয়ে বড় তাৎপর্য। তিনি কোনো নিখুঁত প্রতীক নন। তিনি একজন বাস্তব মানুষ—যিনি নিজের পরিচয়ের জন্য লড়েছেন, সাফল্য পেয়েছেন, বিতর্কের মুখোমুখি হয়েছেন এবং সময়ের সঙ্গে নিজের কিছু মতও বদলেছেন।

আর সেই কারণেই তাঁর উত্তরাধিকার আজও আলোচনার দাবি রাখে।

 

জনপ্রিয় সংবাদ

অভিবাসন অভিযানে বর্ণবিদ্বেষের অভিযোগ, মার্কিন এজেন্টদের বিরুদ্ধে গুরুতর তথ্য

টেনিসের ইতিহাসে রেনে রিচার্ডস: পথ দেখানো এক নারীর উত্তরাধিকার নিয়ে নতুন বিতর্ক

০২:৫২:৩৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২৬

প্রায় পাঁচ দশক আগে টেনিসের মাঠে যে লড়াই নতুন এক ইতিহাসের জন্ম দিয়েছিল, আজ সেই ইতিহাসই আবার ফিরে এসেছে তীব্র বিতর্কের কেন্দ্রে। রেনে রিচার্ডস—যিনি একসময় রিচার্ড রাসকিন নামে পরিচিত ছিলেন—নারী টেনিসে অংশ নেওয়ার অধিকার আদায় করে খেলাধুলার জগতে আলোড়ন তুলেছিলেন। কিন্তু জীবনের শেষ প্রান্তে এসে খেলাধুলায় রূপান্তরকামী নারীদের অংশগ্রহণ নিয়ে তাঁর নিজের অবস্থান বদলে গেছে। আর সেই বৈপরীত্যই তাঁকে নিয়ে লেখা নতুন জীবনীকে আরও আলোচিত করে তুলেছে।

জুলি ক্লিগম্যানের লেখা ‘ফাইন্ডিং রেনে রিচার্ডস’ বইয়ে উঠে এসেছে রিচার্ডসের শৈশব, চিকিৎসক হিসেবে সাফল্য, টেনিসজীবন, লিঙ্গপরিচয় নিয়ে দীর্ঘ সংগ্রাম এবং ১৯৭৭ সালের ঐতিহাসিক আইনি লড়াই। বইটি প্রকাশের আগেই রিচার্ডসের জীবন ও উত্তরাধিকার নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

আদালতের লড়াই থেকে ইতিহাসের পাতায়

১৯৩৪ সালে নিউইয়র্কে জন্ম নেওয়া রিচার্ড রাসকিন ছোটবেলা থেকেই ছিলেন অসাধারণ মেধাবী ও ক্রীড়াপ্রতিভাধর। স্কুলে খেলেছেন বেসবল ও টেনিস। ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে টেনিস দলের অধিনায়কও হন। পরে চিকিৎসাশাস্ত্র পড়েন এবং চক্ষুবিদ্যায় বিশেষজ্ঞ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।

কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনে চলছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক সংগ্রাম। নারী পোশাক পরার আকাঙ্ক্ষা এবং নিজের পরিচয় নিয়ে দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্ব তাঁকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করেছিল। এই পরিচয় বোঝার ও গ্রহণ করার পথ ছিল দীর্ঘ এবং কঠিন।

শেষ পর্যন্ত অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে লিঙ্গান্তরের পর তিনি নতুন নাম নেন রেনে। এরপর ক্যালিফোর্নিয়ায় নতুন জীবন শুরু করেন। তখন থেকেই তিনি শুধু একজন চিকিৎসক নন, টেনিসেরও এক ব্যতিক্রমী চরিত্র হয়ে ওঠেন।

১৯৭৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের টেনিস কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে তাঁর আইনি লড়াই তাঁকে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত করে তোলে। নারী বিভাগে খেলতে তাঁর যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল। আদালতের রায়ের মাধ্যমে তিনি নারী টেনিসে অংশ নেওয়ার সুযোগ পান এবং ওই বছরের যুক্তরাষ্ট্র ওপেনে খেলেন।

একক প্রতিযোগিতায় প্রথম পর্বেই হেরে গেলেও দ্বৈত প্রতিযোগিতায় তিনি ফাইনালে পৌঁছেছিলেন। পরবর্তী সময়ে তাঁর সর্বোচ্চ র‌্যাঙ্কিং ছিল ২০ নম্বর। অর্থাৎ তিনি নারী টেনিসে আধিপত্য বিস্তার করেননি, কিন্তু তাঁর উপস্থিতি খেলাধুলার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ দরজা খুলে দিয়েছিল।

চিকিৎসক রেনে, টেনিস খেলোয়াড় রেনে

রিচার্ডসের জীবন শুধু টেনিসের গল্প নয়। তিনি ছিলেন একজন সফল চক্ষুবিশেষজ্ঞও। নিউইয়র্কের চিকিৎসাজগতে তাঁর দক্ষতার সুনাম ছিল। তাঁর রোগীদের মধ্যে পরিচিত শিল্পী, লেখক ও গণমাধ্যমকর্মীরাও ছিলেন।

একটি মজার ঘটনা তাঁর চিকিৎসকসত্তার দক্ষতার পরিচয় দেয়। সম্প্রচারক কিথ ওলবারম্যান একবার চোখের সমস্যায় পড়লে জানতে পারেন, নিউইয়র্কের অন্যতম সেরা চক্ষু বিশেষজ্ঞ রেনে রিচার্ডস। রিচার্ডস মাত্র কয়েক মিনিটে একটি সাধারণ ছোট আলো ব্যবহার করে তাঁর সমস্যার সমাধান করে দেন।

এই ঘটনাই যেন রিচার্ডসের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে—তিনি কেবল পরিচয় ও বিতর্কের মানুষ ছিলেন না; নিজের পেশাতেও ছিলেন অত্যন্ত দক্ষ।

শৈশব থেকেই পরিচয়ের সংকট

জীবনীতে রিচার্ডসের শৈশবের নানা কঠিন অভিজ্ঞতার কথাও উঠে এসেছে। কুইন্সে তাঁর মা স্যাডি ছিলেন মনোবিশ্লেষণবিদ এবং বাবা ডেভিড ছিলেন অস্থিবিদ্যার চিকিৎসক। পরিবারে তাঁর ক্রীড়াগত সাফল্যকে গুরুত্ব দেওয়া হলেও তাঁর ভেতরের পরিচয়সংক্রান্ত সংকট নিয়ে খোলামেলা আলোচনা খুব একটা হয়নি।

বড় বোন জোসেফিনের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কও ছিল জটিল। ছোটবেলায় তাঁকে নিয়ে নানা ধরনের উপহাস ও মানসিক নির্যাতনের ঘটনা তাঁর স্মৃতিতে গভীর প্রভাব ফেলেছিল।

কৈশোর ও তারুণ্যে নিজের পরিচয়কে বোঝার চেষ্টা করতে গিয়ে রিচার্ডস দীর্ঘ সময় মানসিক বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে যান। এমনকি নারী পোশাক পরার আকাঙ্ক্ষা থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখার চেষ্টাও করেছিলেন।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি বুঝতে পারেন, নিজের সত্যিকারের পরিচয় থেকে পালিয়ে থাকা সম্ভব নয়।

নতুন পরিচয়ের পথে কঠিন যাত্রা

বিয়ে, পরিবার, চিকিৎসাশিক্ষা, নৌবাহিনীতে চাকরি—জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে রিচার্ডস নিজেকে পুরুষ পরিচয়ের মধ্যেই ধরে রাখার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু সেই জীবন তাঁর ভেতরের দ্বন্দ্ব দূর করতে পারেনি।

শেষ পর্যন্ত অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেন তিনি। এর পরই রিচার্ড থেকে রেনে হয়ে ওঠার নতুন অধ্যায় শুরু হয়।

‘রেনে’ নামের অর্থও তাঁর কাছে ছিল তাৎপর্যপূর্ণ—নতুন করে জন্ম নেওয়া। ক্যালিফোর্নিয়ায় গিয়ে তিনি নিজের নতুন পরিচয়কে কেন্দ্র করে জীবন সাজান। খুব দ্রুতই তিনি যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম পরিচিত রূপান্তরকামী ব্যক্তি হয়ে ওঠেন।

এক সময়ের প্রতীক, আজকের বিতর্কিত কণ্ঠ

রিচার্ডসের জীবনের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য সম্ভবত এখানেই। যে নারী নিজে নারী টেনিসে অংশ নেওয়ার অধিকার আদায়ের জন্য আদালতে লড়েছিলেন, পরবর্তী জীবনে তিনিই বলেছেন, পুরুষ বয়ঃসন্ধির মধ্য দিয়ে যাওয়া রূপান্তরকামী নারীদের নারী দলের খেলায় অংশ নেওয়া উচিত নয়।

এই অবস্থান তাঁর জীবনীকার জুলি ক্লিগম্যানকে বিস্মিত করেছে। ক্লিগম্যান নিজেও রূপান্তরকামী ও অ-বাইনারি পরিচয়ের মানুষ। ফলে রিচার্ডসের অতীত সংগ্রাম এবং বর্তমান মতাদর্শের মধ্যে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে, তা বইটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।

টেনিস কিংবদন্তি মার্টিনা নাভ্রাতিলোভাও নারী ক্রীড়ায় পুরুষ হিসেবে বয়ঃসন্ধি পার হওয়া খেলোয়াড়দের অংশগ্রহণের বিরোধিতা করেছেন। ফলে রিচার্ডসের বর্তমান অবস্থান তাঁকে আরও বৃহত্তর একটি বিতর্কের অংশ করে তুলেছে।

নিজের উত্তরাধিকার নিয়েও প্রশ্ন

রিচার্ডস নিজেও তাঁর পুরোনো আইনি লড়াই নিয়ে এখন অনুতপ্ত। প্রায় অর্ধশতাব্দী আগে যে মামলা তাঁকে ইতিহাসে স্থান দিয়েছিল, পরবর্তী সময়ে সেই লড়াইয়ের ফলাফল নিয়ে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি বদলে গেছে।

এই পরিবর্তনই প্রশ্ন তুলছে—একজন ঐতিহাসিক পথিকৃৎ কি তাঁর নিজের তৈরি ইতিহাসের সঙ্গে পরবর্তী জীবনে দ্বিমত পোষণ করতে পারেন?

জীবনীকারের দৃষ্টিতে উত্তরটি সহজ নয়। রিচার্ডস একই সঙ্গে একজন পথপ্রদর্শক, দক্ষ চিকিৎসক, সফল ক্রীড়াবিদ এবং নিজের সময় ও অভিজ্ঞতার দ্বারা গড়ে ওঠা একজন জটিল মানুষ।

তাঁর জীবনকে শুধু একটি পরিচয়ের প্রতীক হিসেবে দেখলে সেই জটিলতা হারিয়ে যায়।

টেনিস কি সত্যিই বদলে গিয়েছিল?

রিচার্ডসের নারী টেনিসে অংশগ্রহণ নিয়ে ১৯৭০-এর দশকে ব্যাপক বিতর্ক হয়েছিল। আশঙ্কা ছিল, তাঁর অংশগ্রহণ নারী টেনিসের প্রতিযোগিতামূলক ভারসাম্য নষ্ট করবে।

কিন্তু বাস্তব ফলাফল ছিল অনেক বেশি সাধারণ। তিনি নারী টেনিসে অংশ নিয়েছিলেন, কিছু উল্লেখযোগ্য সাফল্যও পেয়েছিলেন, কিন্তু খেলাটির ওপর কোনো দীর্ঘমেয়াদি ধ্বংসাত্মক প্রভাব পড়েনি।

ওলবারম্যানের মতে, রিচার্ডসের অংশগ্রহণকে ঘিরে সে সময় যতটা ভয় ও উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল, বাস্তবে বিষয়টি ততটা বড় হয়ে ওঠেনি।

এই পর্যবেক্ষণই বর্তমান বিতর্কের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ কয়েক দশক আগের একটি ঘটনা আজকের খেলাধুলা ও লিঙ্গপরিচয় নিয়ে চলমান উত্তপ্ত আলোচনায় নতুন অর্থ পাচ্ছে।

কেন হারিয়ে গেল তাঁর উত্তরাধিকার?

রিচার্ডস একসময় যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে পরিচিত রূপান্তরকামী ব্যক্তিদের একজন ছিলেন। পরে তাঁর পরিচিতিকে ছাড়িয়ে যান ক্যাটলিন জেনারসহ অন্যরা। ফলে কয়েক দশকের মধ্যেই রিচার্ডসের নাম সাধারণ মানুষের স্মৃতি থেকে অনেকটাই আড়ালে চলে যায়।

জুলি ক্লিগম্যানের বই সেই বিস্মৃত ইতিহাসকে আবার সামনে আনতে চাইছে।

রিচার্ডসের জীবন মনে করিয়ে দেয়, সামাজিক পরিবর্তনের ইতিহাস কখনো সরলরেখায় এগোয় না। একজন মানুষ কোনো সময়ে যে পরিবর্তনের প্রতীক হয়ে ওঠেন, পরবর্তী জীবনে তাঁর নিজের মতামত সেই পরিবর্তনের সঙ্গেই বিরোধে দাঁড়াতে পারে।

ইতিহাসের মানুষ, শুধু প্রতীক নন

রেনে রিচার্ডসের জীবন তাই কেবল টেনিসের একটি পুরোনো বিতর্ক নয়। এটি ব্যক্তিগত পরিচয়, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা, খেলাধুলা, চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং সময়ের সঙ্গে মানুষের চিন্তার পরিবর্তনের এক জটিল কাহিনি।

১৯৭৭ সালের আদালতের লড়াই তাঁকে ইতিহাসে জায়গা দিয়েছিল। টেনিসের মাঠে তাঁর উপস্থিতি বহু মানুষের কাছে ছিল নজিরবিহীন। আবার জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে তাঁর নিজের বক্তব্যই সেই পুরোনো ইতিহাসকে নতুন প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছে।

সম্ভবত এখানেই রেনে রিচার্ডসের গল্পের সবচেয়ে বড় তাৎপর্য। তিনি কোনো নিখুঁত প্রতীক নন। তিনি একজন বাস্তব মানুষ—যিনি নিজের পরিচয়ের জন্য লড়েছেন, সাফল্য পেয়েছেন, বিতর্কের মুখোমুখি হয়েছেন এবং সময়ের সঙ্গে নিজের কিছু মতও বদলেছেন।

আর সেই কারণেই তাঁর উত্তরাধিকার আজও আলোচনার দাবি রাখে।