০৭:৫৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বিরামপুর সীমান্তে ১২ থেকে ১৫ জনকে পুশইনের চেষ্টা, বিজিবি-গ্রামবাসীর বাধায় পিছু হটল বিএসএফ নতুন ছাঁটে চমকে দিলেন কনর স্টোরি, ক্রিয়েটিভ আর্টস এমিসে আত্মপ্রকাশ ‘বাজকাট’ লুকে জঙ্গলে মিলল নিখোঁজ যুবকের কঙ্কাল, পোশাক দেখে শনাক্ত করলেন বাবা কৃষিকে বদলে দিতে বিশ্বব্যাংকের ‘এগ্রিকানেক্ট’, লক্ষ্য ৩০ কোটি ক্ষুদ্র কৃষক সাইফুর রহমানের মৃত্যু দুর্ঘটনা নাকি ষড়যন্ত্র, তদন্ত চান রিজভী শরতের ফ্যাশনে জেন বারকিনের পুরোনো ছবিই আজকের নতুন অনুপ্রেরণা শরতের সাজে সুয়েড জ্যাকেট, ৬ দারুণ স্টাইলিং আইডিয়া সিয়ারা মা হচ্ছেন পঞ্চমবার, রাসেল উইলসনের সঙ্গে আসছে নতুন অতিথি ভেনিসে আবারও আলোচনায় ব্রুকলিন-নিকোলা, পুরোনো বিরতির পর ফিরলেন আলোয় ওজন কমানোর ওষুধ সেবনে যে ১০ খাবার রাখতে পারেন

যুদ্ধ থামছে না কেন?

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ যেন থামতেই চাইছে না। এক পক্ষ হামলা করছে, অন্য পক্ষ পাল্টা হামলা করছে। কিছুদিন শান্ত থাকার পর আবার শুরু হচ্ছে নতুন সংঘাত। আর প্রতিটি পক্ষই বলছে, তারা আত্মরক্ষার জন্যই হামলা চালাচ্ছে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, এইভাবে কি সত্যিই নিরাপত্তা পাওয়া সম্ভব? নাকি নিরাপত্তার নামে এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে, যেখানে যুদ্ধই হয়ে উঠছে স্থায়ী বাস্তবতা?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে ফিরে তাকাতে হয় প্রায় ৩০ বছর আগের একটি নীতিপত্রের দিকে।

৩০ বছর আগের একটি পরিকল্পনা

১৯৯৬ সালে কয়েকজন মার্কিন গবেষক ইসরায়েলের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর জন্য একটি নীতিপত্র তৈরি করেছিলেন। এর নাম ছিল ‘ক্লিন ব্রেক’।

সেখানে বলা হয়েছিল, ইসরায়েলের নিরাপত্তার জন্য শুধু শান্তি আলোচনা বা সমঝোতার ওপর নির্ভর করলে চলবে না। বরং ইসরায়েলকে নিজের সামরিক শক্তি বাড়াতে হবে এবং প্রয়োজন হলে সম্ভাব্য শত্রুকে আগেই দুর্বল করে দিতে হবে।

সিরিয়াকে দুর্বল করা, ইরাকের সাদ্দাম হোসেনকে ক্ষমতা থেকে সরানো এবং শত্রুর হামলার অপেক্ষা না করে আগেই হামলা করার মতো ধারণাও সেখানে ছিল।

তবে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। এই নীতিপত্র যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সরকারি পরিকল্পনা ছিল না। এটি কয়েকজন মার্কিন নীতিবিশেষজ্ঞের তৈরি একটি প্রস্তাব মাত্র। পরবর্তী সময়ে তাঁদের কয়েকজন মার্কিন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কাজ করেন।

তাই মধ্যপ্রাচ্যের পরবর্তী সব যুদ্ধকে শুধু এই একটি নথির ফল বলা ঠিক হবে না।

ইরাক যুদ্ধ কী শিক্ষা দিয়েছে

What the Iraq War can teach the US about avoiding a quagmire in Ukraine – 3  key lessons

২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ইরাকে যুদ্ধ শুরু হয়। সাদ্দাম হোসেনের সরকার দ্রুত ভেঙে পড়ে।

কিন্তু সরকার পড়ে যাওয়ার পর কি ইরাকে শান্তি এসেছিল?

তা হয়নি।

রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়ে পড়ে। সাম্প্রদায়িক সংঘাত বাড়ে। সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ পায়। পরে ইরানে প্রভাবও বাড়ে।

এখানেই বড় একটি শিক্ষা রয়েছে।

একটি সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়া সহজ হতে পারে, কিন্তু তার জায়গায় একটি স্থিতিশীল ও গ্রহণযোগ্য রাষ্ট্র গড়ে তোলা অনেক কঠিন।

শুধু একজন শাসককে সরিয়ে দিলেই একটি দেশের সমস্যা শেষ হয়ে যায় না।

এখন বদলেছে নিরাপত্তার ধারণা

আগে নিরাপত্তার একটি প্রচলিত ধারণা ছিল—শত্রুকে বোঝাতে হবে যে হামলা করলে কঠিন পাল্টা জবাব দেওয়া হবে।

কিন্তু এখন নিরাপত্তার ধারণায় আরেকটি বিষয় ক্রমেই গুরুত্ব পাচ্ছে। সেটি হলো, শত্রু ভবিষ্যতে শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে—এমন আশঙ্কা থাকলেও আগেই তাকে আঘাত করা।

নেতানিয়াহুর সাম্প্রতিক বক্তব্যে এই পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তিনি বলেছেন, ইসরায়েল এখন শুধু হামলার জবাব দেবে না; বরং প্রয়োজন হলে আগে থেকেই উদ্যোগ নিয়ে হামলা করবে।

অর্থাৎ শত্রু হামলা করার অপেক্ষা না করে সম্ভাব্য হুমকি তৈরি হওয়ার আগেই তা ধ্বংস করার নীতি গুরুত্ব পাচ্ছে।

শুনতে এটি শক্তিশালী নিরাপত্তা নীতি মনে হতে পারে। কিন্তু এর মধ্যে বড় একটি বিপদও আছে।

তাহলে যুদ্ধ শেষ হবে কখন?

ধরা যাক, একটি দেশ মনে করল তার প্রতিবেশী কয়েক বছর পর শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে।

The war in the Middle East in maps, video and photos | US-Israel war on Iran  | The Guardian

তাহলে কি আজই তাকে আক্রমণ করা হবে?

সেই দেশ যদি পাল্টা হামলা করে, তাহলে আবার বলা হবে—দেখুন, আমরা ঠিকই বলেছিলাম, তারা হুমকি।

তারপর তাদের আরও দুর্বল করার জন্য নতুন হামলা চালানো হবে।

এভাবে এক হামলা থেকে আরেক হামলা, এক পাল্টা হামলা থেকে আরেক পাল্টা হামলা চলতেই থাকবে।

যখন ভবিষ্যতের সম্ভাব্য হুমকিকেও বর্তমান যুদ্ধের কারণ হিসেবে ধরা হয়, তখন যুদ্ধ শেষ করার স্বাভাবিক কোনো জায়গা থাকে না।

এটাই বর্তমান মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় সমস্যা।

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতেও একই চিত্র

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সাম্প্রতিক সংঘাত এই সমস্যাটিই চোখের সামনে তুলে ধরছে।

যুক্তরাষ্ট্র বলছে, ইরান আবার সামরিক সক্ষমতা তৈরি করছে। তাই সেটি ঠেকাতে হামলা চালানো প্রয়োজন।

ইরান পাল্টা হামলা চালাচ্ছে। এরপর সেই পাল্টা হামলাকেই আবার নতুন মার্কিন হামলার কারণ হিসেবে দেখানো হচ্ছে।

ফলে একটি ভয়ংকর চক্র তৈরি হচ্ছে।

এক পক্ষ হামলা করছে নিরাপত্তার নামে। অন্য পক্ষ পাল্টা হামলা করছে আত্মরক্ষার নামে। তারপর সেই পাল্টা হামলাই পরবর্তী হামলার কারণ হয়ে যাচ্ছে।

এভাবে যুদ্ধের কোনো শেষ দেখা যাচ্ছে না।

শুধু যুদ্ধ দিয়ে নিরাপত্তা আসে না

ইসরায়েলের জনগণের নিরাপত্তার প্রয়োজন আছে। ফিলিস্তিনিদেরও নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও মর্যাদার প্রয়োজন আছে। ইরানেরও বাইরের শক্তির চাপ বা শাসন পরিবর্তনের হুমকি ছাড়া নিরাপদ থাকার অধিকার আছে।

কিন্তু একটি পক্ষের নিরাপত্তা যদি অন্য পক্ষের স্থায়ী অনিরাপত্তার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে কেউই নিরাপদ থাকবে না।

একটি দেশ তার প্রতিবেশীকে যত বেশি দুর্বল করবে, সেই প্রতিবেশী থেকে তত বেশি অস্থিরতা, সন্ত্রাস, অস্ত্র, অপরাধ ও শরণার্থী সংকট তৈরি হতে পারে।

ইরাক ও সিরিয়ার অভিজ্ঞতা তার বড় উদাহরণ।

হরমুজ প্রণালি দিয়ে দৈনিক সর্বোচ্চ ১৫টি জাহাজ চলাচল করতে পারবে

যুদ্ধের খরচ শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে হয় না

যুদ্ধ মানেই শুধু বোমা, ক্ষেপণাস্ত্র আর সেনাবাহিনী নয়।

যুদ্ধের প্রভাব মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও পড়ে।

জ্বালানির দাম বাড়ে। পণ্য পরিবহন ব্যাহত হয়। ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। খাদ্যের দাম বাড়তে পারে। দেশের বিপুল অর্থ অস্ত্র কেনা ও যুদ্ধ চালাতে ব্যয় হয়।

হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সংঘাতের কারণে বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহ ও বাণিজ্যেও বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

অর্থাৎ মধ্যপ্রাচ্যের একটি যুদ্ধ শুধু মধ্যপ্রাচ্যের সমস্যা থাকে না। তার প্রভাব বিশ্বের বহু মানুষের জীবনেও পড়ে।

শান্তির জন্য অন্য পথ দরকার

শুধু সামরিক শক্তি দিয়ে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি তৈরি করা যায় না।

একটি অঞ্চলে যদি মানুষের কাজের সুযোগ থাকে, ভালো শিক্ষা ও চিকিৎসা থাকে, কার্যকর সরকার থাকে এবং মানুষ নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ পায়, তাহলে সেখানে চরমপন্থী শক্তির জায়গা কমে যায়।

দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য বাড়ানো, জ্বালানি ও পানি নিয়ে সহযোগিতা করা, যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত করা এবং মানুষের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানো—এসবও নিরাপত্তার অংশ।

কারণ মানুষ যখন পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত থাকে, তখন যুদ্ধের চেয়ে শান্তি থেকে লাভ বেশি হয়।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন

Iran war: What's next for the Middle East? | World Economic Forum

তিন দশক আগের সেই নীতিপত্র নিয়ে বিতর্ক থাকতেই পারে। কিন্তু আজকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সেটি নয়।

প্রশ্ন হলো—শত্রুকে বারবার আগেই আঘাত করে কি সত্যিই স্থায়ী নিরাপত্তা পাওয়া যায়?

যদি একটি হামলা আরেকটি হামলা ডেকে আনে, যদি প্রতিটি পাল্টা আক্রমণ নতুন আক্রমণের কারণ হয়, তাহলে এই নীতি শেষ পর্যন্ত নিরাপত্তা তৈরি করে না। বরং নতুন অনিরাপত্তা তৈরি করে।

শক্তি দিয়ে শত্রুকে ভয় দেখানো হয়তো কিছু সময়ের জন্য কাজ করতে পারে। কিন্তু স্থায়ী শান্তির জন্য দরকার রাজনৈতিক সমাধান, ন্যায়বিচার, পারস্পরিক নিরাপত্তা এবং আলোচনার পথ।

যুদ্ধ দিয়ে যুদ্ধ থামানো যায় না।

মধ্যপ্রাচ্যের মানুষের জন্য সবচেয়ে প্রয়োজন এমন একটি ভবিষ্যৎ, যেখানে নিরাপত্তার অর্থ হবে শুধু শত্রুকে ধ্বংস করা নয়—বরং এমন পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে মানুষ আর যুদ্ধকে নিজের ভবিষ্যতের স্বাভাবিক অংশ হিসেবে দেখতে বাধ্য হবে না।

সত্যিকারের ‘ক্লিন ব্রেক’ তাই কোনো পুরোনো যুদ্ধ পরিকল্পনা নয়। সত্যিকারের পরিবর্তন হবে সেই চিন্তা থেকে বেরিয়ে আসা, যেখানে নিরাপত্তার জন্য অনন্ত যুদ্ধকেই একমাত্র পথ মনে করা হয়।

যুদ্ধের চক্র ভাঙতে হলে শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের ওপর নয়, শান্তির ওপরই ভরসা করতে হবে।

মধ্যপ্রাচ্যের জন্য এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন আরেকটি যুদ্ধ নয়—একটি বাস্তব শান্তির পথ।

জনপ্রিয় সংবাদ

বিরামপুর সীমান্তে ১২ থেকে ১৫ জনকে পুশইনের চেষ্টা, বিজিবি-গ্রামবাসীর বাধায় পিছু হটল বিএসএফ

যুদ্ধ থামছে না কেন?

১১:০৮:৩৭ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ যেন থামতেই চাইছে না। এক পক্ষ হামলা করছে, অন্য পক্ষ পাল্টা হামলা করছে। কিছুদিন শান্ত থাকার পর আবার শুরু হচ্ছে নতুন সংঘাত। আর প্রতিটি পক্ষই বলছে, তারা আত্মরক্ষার জন্যই হামলা চালাচ্ছে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, এইভাবে কি সত্যিই নিরাপত্তা পাওয়া সম্ভব? নাকি নিরাপত্তার নামে এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে, যেখানে যুদ্ধই হয়ে উঠছে স্থায়ী বাস্তবতা?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে ফিরে তাকাতে হয় প্রায় ৩০ বছর আগের একটি নীতিপত্রের দিকে।

৩০ বছর আগের একটি পরিকল্পনা

১৯৯৬ সালে কয়েকজন মার্কিন গবেষক ইসরায়েলের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর জন্য একটি নীতিপত্র তৈরি করেছিলেন। এর নাম ছিল ‘ক্লিন ব্রেক’।

সেখানে বলা হয়েছিল, ইসরায়েলের নিরাপত্তার জন্য শুধু শান্তি আলোচনা বা সমঝোতার ওপর নির্ভর করলে চলবে না। বরং ইসরায়েলকে নিজের সামরিক শক্তি বাড়াতে হবে এবং প্রয়োজন হলে সম্ভাব্য শত্রুকে আগেই দুর্বল করে দিতে হবে।

সিরিয়াকে দুর্বল করা, ইরাকের সাদ্দাম হোসেনকে ক্ষমতা থেকে সরানো এবং শত্রুর হামলার অপেক্ষা না করে আগেই হামলা করার মতো ধারণাও সেখানে ছিল।

তবে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। এই নীতিপত্র যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সরকারি পরিকল্পনা ছিল না। এটি কয়েকজন মার্কিন নীতিবিশেষজ্ঞের তৈরি একটি প্রস্তাব মাত্র। পরবর্তী সময়ে তাঁদের কয়েকজন মার্কিন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কাজ করেন।

তাই মধ্যপ্রাচ্যের পরবর্তী সব যুদ্ধকে শুধু এই একটি নথির ফল বলা ঠিক হবে না।

ইরাক যুদ্ধ কী শিক্ষা দিয়েছে

What the Iraq War can teach the US about avoiding a quagmire in Ukraine – 3  key lessons

২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ইরাকে যুদ্ধ শুরু হয়। সাদ্দাম হোসেনের সরকার দ্রুত ভেঙে পড়ে।

কিন্তু সরকার পড়ে যাওয়ার পর কি ইরাকে শান্তি এসেছিল?

তা হয়নি।

রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়ে পড়ে। সাম্প্রদায়িক সংঘাত বাড়ে। সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ পায়। পরে ইরানে প্রভাবও বাড়ে।

এখানেই বড় একটি শিক্ষা রয়েছে।

একটি সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়া সহজ হতে পারে, কিন্তু তার জায়গায় একটি স্থিতিশীল ও গ্রহণযোগ্য রাষ্ট্র গড়ে তোলা অনেক কঠিন।

শুধু একজন শাসককে সরিয়ে দিলেই একটি দেশের সমস্যা শেষ হয়ে যায় না।

এখন বদলেছে নিরাপত্তার ধারণা

আগে নিরাপত্তার একটি প্রচলিত ধারণা ছিল—শত্রুকে বোঝাতে হবে যে হামলা করলে কঠিন পাল্টা জবাব দেওয়া হবে।

কিন্তু এখন নিরাপত্তার ধারণায় আরেকটি বিষয় ক্রমেই গুরুত্ব পাচ্ছে। সেটি হলো, শত্রু ভবিষ্যতে শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে—এমন আশঙ্কা থাকলেও আগেই তাকে আঘাত করা।

নেতানিয়াহুর সাম্প্রতিক বক্তব্যে এই পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তিনি বলেছেন, ইসরায়েল এখন শুধু হামলার জবাব দেবে না; বরং প্রয়োজন হলে আগে থেকেই উদ্যোগ নিয়ে হামলা করবে।

অর্থাৎ শত্রু হামলা করার অপেক্ষা না করে সম্ভাব্য হুমকি তৈরি হওয়ার আগেই তা ধ্বংস করার নীতি গুরুত্ব পাচ্ছে।

শুনতে এটি শক্তিশালী নিরাপত্তা নীতি মনে হতে পারে। কিন্তু এর মধ্যে বড় একটি বিপদও আছে।

তাহলে যুদ্ধ শেষ হবে কখন?

ধরা যাক, একটি দেশ মনে করল তার প্রতিবেশী কয়েক বছর পর শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে।

The war in the Middle East in maps, video and photos | US-Israel war on Iran  | The Guardian

তাহলে কি আজই তাকে আক্রমণ করা হবে?

সেই দেশ যদি পাল্টা হামলা করে, তাহলে আবার বলা হবে—দেখুন, আমরা ঠিকই বলেছিলাম, তারা হুমকি।

তারপর তাদের আরও দুর্বল করার জন্য নতুন হামলা চালানো হবে।

এভাবে এক হামলা থেকে আরেক হামলা, এক পাল্টা হামলা থেকে আরেক পাল্টা হামলা চলতেই থাকবে।

যখন ভবিষ্যতের সম্ভাব্য হুমকিকেও বর্তমান যুদ্ধের কারণ হিসেবে ধরা হয়, তখন যুদ্ধ শেষ করার স্বাভাবিক কোনো জায়গা থাকে না।

এটাই বর্তমান মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় সমস্যা।

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতেও একই চিত্র

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সাম্প্রতিক সংঘাত এই সমস্যাটিই চোখের সামনে তুলে ধরছে।

যুক্তরাষ্ট্র বলছে, ইরান আবার সামরিক সক্ষমতা তৈরি করছে। তাই সেটি ঠেকাতে হামলা চালানো প্রয়োজন।

ইরান পাল্টা হামলা চালাচ্ছে। এরপর সেই পাল্টা হামলাকেই আবার নতুন মার্কিন হামলার কারণ হিসেবে দেখানো হচ্ছে।

ফলে একটি ভয়ংকর চক্র তৈরি হচ্ছে।

এক পক্ষ হামলা করছে নিরাপত্তার নামে। অন্য পক্ষ পাল্টা হামলা করছে আত্মরক্ষার নামে। তারপর সেই পাল্টা হামলাই পরবর্তী হামলার কারণ হয়ে যাচ্ছে।

এভাবে যুদ্ধের কোনো শেষ দেখা যাচ্ছে না।

শুধু যুদ্ধ দিয়ে নিরাপত্তা আসে না

ইসরায়েলের জনগণের নিরাপত্তার প্রয়োজন আছে। ফিলিস্তিনিদেরও নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও মর্যাদার প্রয়োজন আছে। ইরানেরও বাইরের শক্তির চাপ বা শাসন পরিবর্তনের হুমকি ছাড়া নিরাপদ থাকার অধিকার আছে।

কিন্তু একটি পক্ষের নিরাপত্তা যদি অন্য পক্ষের স্থায়ী অনিরাপত্তার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে কেউই নিরাপদ থাকবে না।

একটি দেশ তার প্রতিবেশীকে যত বেশি দুর্বল করবে, সেই প্রতিবেশী থেকে তত বেশি অস্থিরতা, সন্ত্রাস, অস্ত্র, অপরাধ ও শরণার্থী সংকট তৈরি হতে পারে।

ইরাক ও সিরিয়ার অভিজ্ঞতা তার বড় উদাহরণ।

হরমুজ প্রণালি দিয়ে দৈনিক সর্বোচ্চ ১৫টি জাহাজ চলাচল করতে পারবে

যুদ্ধের খরচ শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে হয় না

যুদ্ধ মানেই শুধু বোমা, ক্ষেপণাস্ত্র আর সেনাবাহিনী নয়।

যুদ্ধের প্রভাব মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও পড়ে।

জ্বালানির দাম বাড়ে। পণ্য পরিবহন ব্যাহত হয়। ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। খাদ্যের দাম বাড়তে পারে। দেশের বিপুল অর্থ অস্ত্র কেনা ও যুদ্ধ চালাতে ব্যয় হয়।

হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সংঘাতের কারণে বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহ ও বাণিজ্যেও বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

অর্থাৎ মধ্যপ্রাচ্যের একটি যুদ্ধ শুধু মধ্যপ্রাচ্যের সমস্যা থাকে না। তার প্রভাব বিশ্বের বহু মানুষের জীবনেও পড়ে।

শান্তির জন্য অন্য পথ দরকার

শুধু সামরিক শক্তি দিয়ে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি তৈরি করা যায় না।

একটি অঞ্চলে যদি মানুষের কাজের সুযোগ থাকে, ভালো শিক্ষা ও চিকিৎসা থাকে, কার্যকর সরকার থাকে এবং মানুষ নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ পায়, তাহলে সেখানে চরমপন্থী শক্তির জায়গা কমে যায়।

দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য বাড়ানো, জ্বালানি ও পানি নিয়ে সহযোগিতা করা, যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত করা এবং মানুষের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানো—এসবও নিরাপত্তার অংশ।

কারণ মানুষ যখন পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত থাকে, তখন যুদ্ধের চেয়ে শান্তি থেকে লাভ বেশি হয়।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন

Iran war: What's next for the Middle East? | World Economic Forum

তিন দশক আগের সেই নীতিপত্র নিয়ে বিতর্ক থাকতেই পারে। কিন্তু আজকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সেটি নয়।

প্রশ্ন হলো—শত্রুকে বারবার আগেই আঘাত করে কি সত্যিই স্থায়ী নিরাপত্তা পাওয়া যায়?

যদি একটি হামলা আরেকটি হামলা ডেকে আনে, যদি প্রতিটি পাল্টা আক্রমণ নতুন আক্রমণের কারণ হয়, তাহলে এই নীতি শেষ পর্যন্ত নিরাপত্তা তৈরি করে না। বরং নতুন অনিরাপত্তা তৈরি করে।

শক্তি দিয়ে শত্রুকে ভয় দেখানো হয়তো কিছু সময়ের জন্য কাজ করতে পারে। কিন্তু স্থায়ী শান্তির জন্য দরকার রাজনৈতিক সমাধান, ন্যায়বিচার, পারস্পরিক নিরাপত্তা এবং আলোচনার পথ।

যুদ্ধ দিয়ে যুদ্ধ থামানো যায় না।

মধ্যপ্রাচ্যের মানুষের জন্য সবচেয়ে প্রয়োজন এমন একটি ভবিষ্যৎ, যেখানে নিরাপত্তার অর্থ হবে শুধু শত্রুকে ধ্বংস করা নয়—বরং এমন পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে মানুষ আর যুদ্ধকে নিজের ভবিষ্যতের স্বাভাবিক অংশ হিসেবে দেখতে বাধ্য হবে না।

সত্যিকারের ‘ক্লিন ব্রেক’ তাই কোনো পুরোনো যুদ্ধ পরিকল্পনা নয়। সত্যিকারের পরিবর্তন হবে সেই চিন্তা থেকে বেরিয়ে আসা, যেখানে নিরাপত্তার জন্য অনন্ত যুদ্ধকেই একমাত্র পথ মনে করা হয়।

যুদ্ধের চক্র ভাঙতে হলে শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের ওপর নয়, শান্তির ওপরই ভরসা করতে হবে।

মধ্যপ্রাচ্যের জন্য এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন আরেকটি যুদ্ধ নয়—একটি বাস্তব শান্তির পথ।