১৯৯৬ সালে প্রণীত ‘এ ক্লিন ব্রেক’ নামের একটি কৌশলগত নীতিপত্র আবারও আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। প্রায় তিন দশক পর মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের নতুন নিরাপত্তা ভাবনা এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের ধারাবাহিকতায় ওই নীতিপত্রের কিছু ধারণার সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির মিল খুঁজে পাচ্ছেন বিশ্লেষকেরা।
তবে ১৯৯৬ সালের ওই নথিকে পরবর্তী সব যুদ্ধের একমাত্র নকশা হিসেবে দেখলে ইতিহাসের জটিলতা উপেক্ষিত হয়। বরং গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—কেন প্রতিরোধমূলক হামলা, শক্তির ভারসাম্য ও স্থায়ী সামরিক চাপের মতো ধারণাগুলো এত দীর্ঘ সময় ধরে টিকে আছে?
১৯৯৬ সালের কৌশলগত ভাবনা
‘এ ক্লিন ব্রেক’ নীতিপত্রটি যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকজন নীতিবিশেষজ্ঞের একটি দল তৈরি করেছিল। এতে ইসরায়েলের প্রচলিত ‘ভূমির বিনিময়ে শান্তি’ নীতির পরিবর্তে শক্তির ভারসাম্য, কৌশলগত উদ্যোগ এবং আগাম হামলার ওপর জোর দেওয়া হয়।
নথিতে সিরিয়াকে দুর্বল করা, ইরাকে সাদ্দাম হোসেনের শাসনের অবসান এবং ইসরায়েলের কৌশলে আগাম আক্রমণকে পুনরায় গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের কথা বলা হয়েছিল।

এই নীতির সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন ব্যক্তি পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী পরিসরে প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন। বিশেষ করে ইরাক যুদ্ধের সময় তাদের ধারণার প্রভাব নিয়ে গবেষণা হয়েছে।
তবে এটিকে সরাসরি মার্কিন সরকারের আনুষ্ঠানিক নীতি বলা ঠিক হবে না। ইরাকে সাদ্দাম হোসেনের সরকার উৎখাতের সিদ্ধান্তের পেছনে আরও অনেক কারণ ছিল। ২০০১ সালের সন্ত্রাসী হামলা, যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা-ভাবনায় পরিবর্তন, গোয়েন্দা ব্যর্থতা, গণবিধ্বংসী অস্ত্র নিয়ে ভুল দাবি এবং একক পরাশক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের আত্মবিশ্বাস—সবকিছুই ইরাক যুদ্ধের পটভূমি তৈরি করেছিল।
‘প্রতিরোধ’ থেকে ‘স্থায়ী প্রতিরোধমূলক আক্রমণ’
২০২৬ সালের পরিস্থিতিতে নীতিপত্রটির প্রাসঙ্গিকতা নতুনভাবে সামনে এসেছে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু প্রকাশ্যেই এমন একটি নিরাপত্তা ধারণার কথা বলেছেন, যেখানে সম্ভাব্য হুমকি বড় হয়ে ওঠার আগেই আঘাত করা হবে।
তার বক্তব্যে প্রতিরোধ ও পাল্টা জবাবের পরিবর্তে উদ্যোগ, অভিযান এবং আক্রমণকে নিরাপত্তা নীতির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
এর অর্থ হলো, কোনো প্রতিপক্ষ ভবিষ্যতে সামরিক সক্ষমতা পুনর্গঠন করতে পারে—এমন আশঙ্কাকেও হামলার যথেষ্ট কারণ হিসেবে বিবেচনা করা। এর ফলে সাময়িকভাবে সামরিক সুবিধা পাওয়া সম্ভব হলেও যুদ্ধ ও শান্তির মধ্যকার সীমারেখা ক্রমেই অস্পষ্ট হয়ে যায়।
ইরাকের অভিজ্ঞতা বড় সতর্কবার্তা
ইরাক এই নীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাগুলোর একটি।

সাদ্দাম হোসেনকে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছিল। কিন্তু তার পর দেশটির রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়ে পড়ে, সাম্প্রদায়িক সংঘাত ভয়াবহ রূপ নেয় এবং উগ্রপন্থী সংগঠনগুলোর বিস্তারের সুযোগ তৈরি হয়। একই সময়ে ইরানে প্রভাব বিস্তারের সুযোগও বেড়ে যায়।
অর্থাৎ একটি রাষ্ট্রের সামরিক শক্তি ধ্বংস করা তুলনামূলক সহজ হলেও তার জায়গায় বৈধ, কার্যকর ও গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক কাঠামো তৈরি করা অনেক বেশি কঠিন।
সিরিয়ার ঘটনাও একই ধরনের শিক্ষা দেয়। দীর্ঘ স্বৈরশাসন, বিদ্রোহ, দমন-পীড়ন, উগ্রপন্থী তৎপরতা এবং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তির হস্তক্ষেপ দেশটিকে বিপর্যস্ত করেছে। কিন্তু প্রতিবেশী কোনো রাষ্ট্রকে দুর্বল করে রাখা যে দীর্ঘমেয়াদে নিরাপত্তা নিশ্চিত করে না, সিরিয়ার অভিজ্ঞতা তারও প্রমাণ।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতে একই চক্র
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সাম্প্রতিক সংঘাত এই নিরাপত্তা-দ্বন্দ্বকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
ওয়াশিংটন বলছে, তেহরান সামরিক সক্ষমতা পুনর্গঠন করছে বলেই হামলা চালানো হচ্ছে। ইরান পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে জবাব দিচ্ছে এবং গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে হুমকি তৈরি করছে। এরপর ইরানের পাল্টা হামলাকেই আবার যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী আক্রমণের যুক্তি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
এভাবে একটি বিপজ্জনক চক্র তৈরি হয়। প্রতিটি পক্ষই নিজেদের পরবর্তী পদক্ষেপকে আত্মরক্ষামূলক বলে ব্যাখ্যা করতে পারে, কারণ তার আগের পদক্ষেপটি ছিল প্রতিপক্ষের হামলার জবাব।
যদি নিরাপত্তার অর্থ হয় প্রতিপক্ষকে কখনোই আবার হুমকিস্বরূপ সামরিক সক্ষমতা অর্জন করতে না দেওয়া, তাহলে যুদ্ধ থামানোর স্বাভাবিক কোনো জায়গা থাকে না।
যুদ্ধের অর্থনৈতিক মূল্যও বাড়ছে
স্থায়ী সামরিক প্রস্তুতির আরেকটি বড় প্রশ্ন অর্থনীতি।
বারবার সামরিক অভিযান, প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধি, ধ্বংসের পর পুনর্গঠন এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বিঘ্ন—এসবের অর্থনৈতিক মূল্য শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষকেই বহন করতে হয়।
হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনা দেখিয়ে দিয়েছে, একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংকট কীভাবে দ্রুত জ্বালানি, পণ্য পরিবহন, মূল্যস্ফীতি ও বৈশ্বিক উন্নয়নকে প্রভাবিত করতে পারে।
যখন রাষ্ট্রের অর্থ ও বৈজ্ঞানিক সক্ষমতার বড় অংশ অস্ত্র ও সামরিক প্রযুক্তির দিকে চলে যায়, তখন শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আবাসন ও পরিবেশের মতো খাতগুলোও চাপের মুখে পড়ে।
নিরাপত্তা শুধু সামরিক শক্তির হিসাব নয়
দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা কেবল ক্ষেপণাস্ত্র, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বা সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করে না। কার্যকর রাষ্ট্রব্যবস্থা, অর্থনৈতিক সুযোগ, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং মানুষের মর্যাদা—এসবও নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তির জন্য তাই প্রতিটি পক্ষের নিরাপত্তা ও অধিকারকে একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
ইসরায়েলের জনগণের বিরুদ্ধে সহিংসতা বন্ধ করার অধিকার যেমন স্বীকার করতে হবে, তেমনি ফিলিস্তিনিদের রাজনৈতিক স্বাধীনতা, মর্যাদা ও কার্যকর রাষ্ট্রের অধিকারও অস্বীকার করা যায় না। ইরানেরও বহিরাগতভাবে সরকার পরিবর্তনের চাপ থেকে নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার রয়েছে, পাশাপাশি প্রতিবেশীদের জন্য হুমকি তৈরি করে এমন কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে বিশ্বাসযোগ্য ব্যবস্থা প্রয়োজন।
আরব দেশগুলোকে বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতার যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করা হলে স্থায়ী নিরাপত্তা আসবে না। পারমাণবিক ঝুঁকির ক্ষেত্রেও সবার জন্য একই ধরনের নীতি প্রয়োজন।
শান্তিরও অর্থনৈতিক ভিত্তি রয়েছে

শান্তি শুধু যুদ্ধ বন্ধ করার নাম নয়; এটি একটি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানও।
যেসব সমাজে কার্যকর সরকার, অর্থনৈতিক সুযোগ এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণ থাকে, সেসব সমাজকে উগ্রপন্থী সংগঠনের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া তুলনামূলক কঠিন।
বাণিজ্য, জ্বালানি, পানি, অবকাঠামো, বিজ্ঞান ও মানুষের চলাচলের মাধ্যমে একটি অঞ্চল যত বেশি পরস্পরনির্ভর হয়ে ওঠে, স্থিতিশীলতার প্রতি তার স্বার্থও তত বাড়ে।
সামরিক প্রতিরোধ অবশ্যই প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু রাজনৈতিক সমাধানের কোনো লক্ষ্য ছাড়া প্রতিরোধ কেবল বারবার ফিরে আসা যুদ্ধকে পরিচালনা করার পদ্ধতিতে পরিণত হয়।
আসল প্রশ্ন এখন অন্য জায়গায়
‘এ ক্লিন ব্রেক’-এর গুরুত্ব এই দাবি প্রমাণ করা নয় যে ১৯৯৬ সালের একটি নথি পরবর্তী প্রতিটি যুদ্ধের পরিকল্পনা করেছিল। বরং এর গুরুত্ব হলো—কৌশলগত ধারণা কীভাবে দীর্ঘ সময় ধরে নীতিনির্ধারণকে প্রভাবিত করতে পারে, তা বোঝানো।
একটি ধারণা যখন রাষ্ট্রীয় নীতিতে প্রবেশ করে, তখন তার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা বদলালেও ধারণাটি টিকে থাকতে পারে। সংকট আবার সেই ধারণাগুলোকে সামনে নিয়ে আসে, যেগুলো একসময় অতিরিক্ত কঠোর বলে বিবেচিত হয়েছিল।
সবচেয়ে বড় বিপদ তখনই তৈরি হয়, যখন কোনো নীতি নিজের ব্যর্থতার প্রমাণ থেকেও শিক্ষা নিতে অস্বীকার করে। প্রতিটি পাল্টা প্রতিক্রিয়াকে যদি আরও বেশি সামরিক চাপের প্রয়োজনীয়তার প্রমাণ হিসেবে দেখা হয়, তাহলে নীতিটি কখনোই নিজেকে ব্যর্থ বলে স্বীকার করবে না।
তিন দশক পর তাই প্রশ্নটি আর এই নয় যে কারও কাছে কোনো গোপন মহাপরিকল্পনা ছিল কি না। আসল প্রশ্ন হলো—স্থায়ী প্রতিরোধমূলক যুদ্ধ কি সত্যিই এমন শান্তি তৈরি করতে পারে, যেখানে মানুষ নিরাপদে বসবাস করতে পারে?
সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত বরং বিপরীত চিত্রই দেখাচ্ছে। আধিপত্যের মাধ্যমে শান্তি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা যে নিরাপত্তাহীনতা দূর করতে চায়, শেষ পর্যন্ত সেই নিরাপত্তাহীনতাকেই নতুন করে তৈরি করতে পারে।
মানবতার প্রয়োজন তাই আরও একটি যুদ্ধের নকশা নয়; প্রয়োজন এমন এক নিরাপত্তা-ভাবনা থেকে বেরিয়ে আসা, যেখানে যুদ্ধ নিজেই শান্তির বিকল্প হয়ে দাঁড়ায়।
যুদ্ধ ও শান্তির সীমারেখা মুছে দিয়ে নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করা যায় না—স্থায়ী শান্তির জন্য প্রয়োজন প্রতিরোধের পাশাপাশি রাজনৈতিক সমাধান, পারস্পরিক নিরাপত্তা ও ন্যায়ভিত্তিক আঞ্চলিক ব্যবস্থা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















