মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করছেন, তাঁর আরোপ করা শুল্ক যুক্তরাষ্ট্রের গাড়িশিল্পকে আবার শক্তিশালী করেছে, এমনকি তিনি বলেছেন—এই নীতির কারণেই তিনি ‘আমেরিকার অটোমোবাইল ব্যবসাকে পুনরুজ্জীবিত’ এবং ‘রক্ষা’ করেছেন। কিন্তু বাস্তব চিত্র বলছে, ট্রাম্পের এই দাবির সঙ্গে গাড়িশিল্পের বর্তমান পরিস্থিতির মধ্যে বড় ধরনের ফারাক রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে দ্রুত বাড়তে থাকা বাণিজ্যযুদ্ধ উত্তর আমেরিকার প্রায় ১ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলারের গাড়িশিল্পের ওপর বড় চাপ তৈরি করছে। দুই দেশের গাড়ি উৎপাদন ব্যবস্থা এতটাই পরস্পরনির্ভর যে একটি গাড়ি তৈরি হওয়ার আগেই তার যন্ত্রাংশ সীমান্ত পেরিয়ে একাধিকবার যাতায়াত করে। রয়্যাল ব্যাংক অব কানাডার হিসাবে, কোনো কোনো যন্ত্রাংশ গাড়ি তৈরির আগে যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা সীমান্ত সর্বোচ্চ আটবার পর্যন্ত অতিক্রম করে।
ফলে এক দেশের শিল্পকে শুল্ক দিয়ে সুরক্ষা দিতে গিয়ে অন্য দেশের সরবরাহব্যবস্থাকে আঘাত করা হলে তার প্রভাব আবার নিজের দেশেও ফিরে আসে।
যুক্তরাষ্ট্র-কানাডার গাড়ি বাণিজ্যে বড় ঝুঁকি
কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের গাড়ি ও গাড়ির যন্ত্রাংশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার। দেশটিতে যুক্তরাষ্ট্রের গাড়ি-সংক্রান্ত রপ্তানির পরিমাণ পরবর্তী ১০টি বাজারের সম্মিলিত পরিমাণের চেয়েও বেশি। ২০২৬ সালে দুই দেশের মোট গাড়ি বাণিজ্যের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলার।
এই গভীর আন্তঃনির্ভরতার মধ্যেই ট্রাম্প প্রশাসন কানাডার গাড়ির ওপর শুল্ক আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা করেছে। ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে কানাডার জন্য গাড়ি খাতে শুল্ক ৫০ শতাংশে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। জবাবে কানাডাও সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত পাল্টা শুল্ক আরোপ করেছে, যা ৮ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হয়েছে।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে দুই দেশেরই গাড়ি উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের অনেক কারখানা কানাডা থেকে আসা যন্ত্রাংশের ওপর নির্ভরশীল, আবার কানাডার অনেক কারখানাও যুক্তরাষ্ট্রের যন্ত্রাংশ ও বাজারের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
কানাডার অটোমোটিভ পার্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট ফ্লাভিও ভলপে সতর্ক করেছেন, গাড়ির যন্ত্রাংশের ওপর শুল্ক কার্যকর হলে সীমান্তের দুই পাশের শিল্পই বড় ধরনের সংকটে পড়তে পারে। তাঁর যুক্তি, ছয় দশকের শিল্প-সমন্বয়কে উপেক্ষা করে যুক্তরাষ্ট্র একতরফাভাবে কানাডাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে চাইলে শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রকেও বড় মূল্য দিতে হবে।
‘আমেরিকাকে বাঁচিয়েছে শুল্ক’—ট্রাম্পের দাবি কতটা বাস্তব?
৩১ আগস্ট ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেন, তিনি ‘আমেরিকার অটোমোবাইল ব্যবসাকে পুনরুজ্জীবিত’ করেছেন এবং ‘রক্ষা’ করেছেন। এর কারণ হিসেবে তিনি নিজের শুল্কনীতিকেই সামনে আনেন।
কিন্তু গাড়ি শিল্পের উৎপাদন, বিক্রি ও কর্মসংস্থানের সাম্প্রতিক প্রবণতা সেই দাবিকে পুরোপুরি সমর্থন করছে না। বরং শুল্কের কারণে গাড়ি নির্মাতাদের খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে একই সঙ্গে বেশি উৎপাদন ব্যয়, ভোক্তাদের দুর্বল ক্রয়ক্ষমতা এবং পরিবর্তিত বাজারচাহিদার সঙ্গে লড়তে হচ্ছে। ফলে শুল্ক দিয়ে শিল্পকে সুরক্ষিত করার নীতি বাস্তবে গাড়ির দাম বাড়ানো এবং বাজার সংকুচিত করার ঝুঁকি তৈরি করছে।
অটোফোরকাস্ট সলিউশন্সের বৈশ্বিক গাড়ি পূর্বাভাস বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট স্যাম ফিওরানি মনে করেন, উত্তর আমেরিকার গাড়িশিল্প গত তিন দশকে এমন একটি উৎপাদনব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর সম্পদের সমন্বয়ের ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
তাঁর মতে, কানাডা ও মেক্সিকোর সম্পদ ও সরবরাহব্যবস্থা ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের গাড়িশিল্প ইউরোপীয় ইউনিয়নের গাড়ি নির্মাতাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় আরও সমস্যায় পড়বে এবং চীনের তুলনায় পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকিও বাড়বে।
সবচেয়ে বেশি চাপ পড়তে পারে মিশিগানে
যুক্তরাষ্ট্রের গাড়ি উৎপাদনের অন্যতম কেন্দ্র মিশিগান এই বাণিজ্যযুদ্ধের বড় ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। ২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে যুক্তরাষ্ট্রের মোট গাড়ি উৎপাদনের ১৮ দশমিক ১ শতাংশ এসেছে এই রাজ্য থেকে।
মিশিগানেই রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহ্যবাহী ‘ডেট্রয়েট থ্রি’—ফোর্ড, জেনারেল মোটরস ও স্টেলান্টিস।
ট্রাম্প তাঁর শুল্কনীতির সাফল্যের উদাহরণ হিসেবে ফোর্ডকে প্রায়ই সামনে আনছেন। তিনি দাবি করেছেন, ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ঘোষণা দেওয়ার সময় ফোর্ডের একটি বড় কারখানা বন্ধ হওয়ার পথে ছিল। কিন্তু এখন সেটি ২৪ ঘণ্টা চালু থাকে এবং বিশ্বের অন্যতম লাভজনক গাড়ি কারখানায় পরিণত হয়েছে।
তবে এই দাবির পক্ষে কারখানাটি বন্ধ হওয়ার পথে ছিল—এমন প্রমাণ পাওয়া যায় না। ট্রাম্পের বক্তব্যটি সম্ভবত মিশিগানের ডিয়ারবর্ন ট্রাক প্ল্যান্টকে ঘিরে। ওই কারখানায় ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে তৃতীয় শিফট চালু করা হয় এবং সপ্তাহে ছয় দিন ২৪ ঘণ্টা উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়ানো হয়।
অন্যদিকে, ফোর্ড জানিয়েছে, ২০২৬ সালে শুল্কের কারণে তাদের প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত খরচ হতে পারে। একই সময়ে ২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে প্রতিষ্ঠানটির গাড়ি বিক্রি ১০ শতাংশ কমেছে।
কানাডার বাজার হারানোর ঝুঁকি
ফোর্ডের জন্য কানাডার বাজার বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। রয়্যাল ব্যাংক অব কানাডার হিসাবে, কানাডার মানুষ বছরে প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলারের আমদানি করা গাড়ি কেনেন।

ফোর্ডের এফ-সিরিজ পিকআপ ট্রাকও টানা ১৫ বছর ধরে কানাডার সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া গাড়ি। ফলে দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কের অবনতি হলে ফোর্ডের মতো মার্কিন গাড়ি নির্মাতাদের জন্য কানাডার বাজারে চাপ আরও বাড়তে পারে।
একই সঙ্গে কানাডা যদি মার্কিন গাড়ির ওপর পাল্টা শুল্ক বজায় রাখে, তাহলে মার্কিন নির্মাতাদের গাড়ির দাম কানাডার বাজারে বাড়তে পারে। এতে ক্রেতাদের সামনে বিকল্প গাড়ির সংখ্যা কমে যেতে পারে এবং বিক্রি আরও কমার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।
চীন ও ইউরোপের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় বড় প্রশ্ন
শুধু যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা সম্পর্কের বিষয় নয়, এই শুল্কনীতি উত্তর আমেরিকার গাড়িশিল্পের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার সক্ষমতাকেও প্রভাবিত করতে পারে।
গত কয়েক দশকে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো মিলে এমন একটি সমন্বিত উৎপাদনব্যবস্থা তৈরি করেছে, যেখানে কাঁচামাল, যন্ত্রাংশ, শ্রম ও উৎপাদন সক্ষমতা সীমান্তজুড়ে ছড়িয়ে আছে। এই ব্যবস্থা তুলনামূলক কম খরচে বড় পরিসরে গাড়ি উৎপাদনে সহায়তা করেছে।
শুল্ক বাড়লে সেই সরবরাহব্যবস্থার খরচ বাড়বে। আর অতিরিক্ত খরচ শেষ পর্যন্ত গাড়ির দাম, নির্মাতাদের মুনাফা অথবা উভয়ের ওপরই চাপ ফেলতে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্মাতা এবং বিশেষ করে চীনের দ্রুত বিকাশমান গাড়িশিল্পের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
বাজার এমনিতেই চ্যালেঞ্জের মুখে
যুক্তরাষ্ট্রের গাড়িশিল্প এমন এক সময়ে শুল্কযুদ্ধের মধ্যে পড়েছে, যখন শিল্পটির সামনে এমনিতেই অনিশ্চয়তা রয়েছে।
পিডব্লিউসি-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ভোক্তাদের সীমিত ব্যয়ক্ষমতা এবং গাড়ি কেনার ক্ষেত্রে পরিবর্তিত পছন্দের কারণে ২০৩০ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের গাড়ি বিক্রির প্রবৃদ্ধি প্রায় স্থবির হয়ে থাকতে পারে।

অর্থাৎ শিল্পটির জন্য শুধু উৎপাদন বাড়ানোই যথেষ্ট নয়। ক্রেতারা কতটা গাড়ি কিনতে পারছেন, কোন ধরনের গাড়ি চাইছেন এবং গাড়ির দাম কতটা নাগালের মধ্যে থাকছে—এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।
এই পরিস্থিতিতে শুল্কের কারণে উৎপাদন ব্যয় বাড়লে তা বাজারকে আরও দুর্বল করে দিতে পারে।
পুনরুদ্ধার সম্ভব, তবে বাণিজ্যযুদ্ধের মধ্যে নয়
গাড়িশিল্পের পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে না। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এর জন্য যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর মধ্যে স্থিতিশীল বাণিজ্যিক সম্পর্ক জরুরি।
স্যাম ফিওরানির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৭ সালে উত্তর আমেরিকার গাড়িশিল্পে প্রায় ১ দশমিক ২ শতাংশ পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এই পূর্বাভাস নির্ভর করছে কানাডা ও মেক্সিকোর সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কের ভারসাম্য ফিরে আসার ওপর।
সম্পর্ক স্বাভাবিক না হলে গাড়ির দাম বাড়তে পারে, ক্রেতাদের বিকল্প কমতে পারে এবং বাজারের চাহিদা আরও দুর্বল হতে পারে। তখন প্রত্যাশিত পুনরুদ্ধারের পূর্বাভাসও কমিয়ে আনতে হবে।
সব মিলিয়ে ট্রাম্পের শুল্কনীতি কিছু মার্কিন উৎপাদককে স্বল্পমেয়াদে সুরক্ষা দেওয়ার সুযোগ তৈরি করলেও উত্তর আমেরিকার গভীরভাবে সমন্বিত গাড়ি উৎপাদনব্যবস্থায় এর খরচও বড়। তাই ‘শুল্ক দিয়ে মার্কিন গাড়িশিল্পকে বাঁচানো হয়েছে’—এই দাবি এখনো প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। বরং মূল প্রশ্ন হয়ে উঠেছে, দীর্ঘমেয়াদে শুল্ক কি সত্যিই যুক্তরাষ্ট্রের গাড়িশিল্পকে আরও শক্তিশালী করবে, নাকি কানাডা ও মেক্সিকোর ওপর নির্ভরশীল সরবরাহব্যবস্থাকে দুর্বল করে যুক্তরাষ্ট্রকেই প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে দেবে।












