১২ বছর বয়সে নিজের স্মার্টফোন থাকা কিশোর-কিশোরীদের ১৪ বছর বয়সে খাওয়াদাওয়া নিয়ে অস্বাভাবিক আচরণ বা সমস্যার লক্ষণ দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা বেশি হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৯ হাজার কিশোর-কিশোরীর তথ্য বিশ্লেষণ করে করা নতুন এক গবেষণায় এমন সম্পর্কের কথা উঠে এসেছে।
চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী JAMA Network Open-এ প্রকাশিত গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, সান ফ্রান্সিসকোর শিশু বিশেষজ্ঞ জেসন নাগাতা ও তাঁর সহকর্মীরা। গবেষণায় মূলত দেখা হয়েছে, শিশুরা কোন বয়সে নিজেদের স্মার্টফোন পায় এবং পরবর্তী সময়ে তাদের খাওয়াদাওয়া ও শরীর নিয়ে উদ্বেগের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক আছে কি না।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ১২ বছর বয়সী শিশুদের প্রায় ৭০ শতাংশের নিজস্ব স্মার্টফোন ছিল। তাদের মধ্যে প্রায় ২৪ শতাংশ ১৪ বছর বয়সে অন্তত একটি অস্বাভাবিক খাওয়াদাওয়ার লক্ষণের কথা জানিয়েছে। অন্যদিকে, ১২ বছর বয়সে যাদের নিজস্ব স্মার্টফোন ছিল না, তাদের মধ্যে ১৪ বছর বয়সে এমন লক্ষণের কথা জানিয়েছে ১৬ শতাংশেরও কম।
তবে গবেষণাটি স্মার্টফোন ব্যবহার সরাসরি খাওয়াদাওয়ার সমস্যার কারণ—এমন প্রমাণ দেয়নি। বরং স্মার্টফোন পাওয়ার বয়স এবং পরবর্তী সময়ে এ ধরনের সমস্যার লক্ষণের মধ্যে একটি সম্পর্ক পাওয়া গেছে। শিশুদের সামাজিক পরিবেশ, মানসিক স্বাস্থ্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারসহ আরও অনেক বিষয় এতে ভূমিকা রাখতে পারে।
শরীর ও চেহারা নিয়ে তুলনার নতুন জগৎ
গবেষণার প্রধান লেখক জেসন নাগাতার মতে, একটি স্মার্টফোন শিশুর হাতে শুধু যোগাযোগের যন্ত্র তুলে দেয় না; এর মাধ্যমে তার সামনে শরীর, সৌন্দর্য, ওজন ও চেহারা নিয়ে বিপুল পরিমাণ অনলাইন কনটেন্টও খুলে যায়।
কৈশোরের শুরুতে শিশুদের শরীরে দ্রুত পরিবর্তন আসে। একই সময়ে নিজের চেহারা ও শরীর নিয়ে অন্যদের সঙ্গে তুলনা করার প্রবণতাও স্বাভাবিকভাবে বাড়তে পারে। আগে এই তুলনা প্রধানত বন্ধু বা আশপাশের মানুষের সঙ্গে সীমাবদ্ধ থাকলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সেই তুলনার পরিধি অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে।
অনলাইনে শিশুরা এমন প্রভাবশালী ব্যক্তি বা তারকার ছবি দেখতে পারে, যেগুলো সাজানো, সম্পাদিত বা ছাঁকা হতে পারে। বাস্তব জীবনের চেহারার সঙ্গে এসব ছবির পার্থক্য থাকলেও শিশু তা সবসময় বুঝতে পারে না। ফলে নিজের শরীরকে অন্যদের সঙ্গে তুলনা করে অসন্তুষ্টি বা আত্মমর্যাদাবোধ কমে যাওয়ার মতো সমস্যা তৈরি হতে পারে।
গবেষকদের মতে, শরীর নিয়ে অসন্তুষ্টি এবং নিজের মূল্যকে ওজন বা চেহারার সঙ্গে যুক্ত করার প্রবণতা পরবর্তী সময়ে অস্বাভাবিক খাওয়াদাওয়ার আচরণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
ওজন নিয়ন্ত্রণের প্রবণতাও বেশি
গবেষণায় দেখা গেছে, ১২ বছর বয়সে স্মার্টফোন থাকা শিশুদের মধ্যে নিজের মূল্যবোধকে ওজনের সঙ্গে যুক্ত করার প্রবণতা স্মার্টফোন না থাকা শিশুদের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ ছিল।
এ ছাড়া তারা ওজন নিয়ন্ত্রণের জন্য কম ক্যালরির খাবার খাওয়া বা অতিরিক্ত ব্যায়ামের মতো আচরণে জড়ানোর সম্ভাবনাও প্রায় দেড় গুণ বেশি ছিল।
এ ধরনের আচরণ সবসময় কোনো নির্দিষ্ট খাওয়াদাওয়ার রোগের অর্থ বহন করে না। তবে এগুলো পরবর্তীতে আরও গুরুতর সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। অস্বাভাবিক খাওয়াদাওয়ার মধ্যে খাবার ও ওজন নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা, নিজের শরীরের আকার নিয়ে বিকৃত ধারণা, প্রয়োজনের তুলনায় কম খাওয়া কিংবা খাওয়া খাবারের ক্যালরি কমানোর জন্য বমি করা বা অতিরিক্ত ব্যায়ামের মতো আচরণ থাকতে পারে।
শুধু স্ক্রিনে কত সময় কাটায়, সেটাই নয়
আগের অনেক গবেষণায় শিশু-কিশোররা দিনে কতক্ষণ স্ক্রিন ব্যবহার করে, সেই বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু নতুন গবেষণায় গবেষকেরা অন্য একটি প্রশ্ন সামনে এনেছেন—শিশুরা ঠিক কোন বয়সে নিজের স্মার্টফোন পায়?
কারণ একটি শিশু ফোন হাতে পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শুধু স্ক্রিন ব্যবহারের সময়ই বাড়ে না; তার অনলাইন জগতের প্রবেশাধিকারও বদলে যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভিডিও, ছবি, বিজ্ঞাপন এবং শরীর ও সৌন্দর্যকেন্দ্রিক নানা বার্তা তখন আরও সহজে তার কাছে পৌঁছাতে পারে।
বিশ্বজুড়ে শিশু ও কিশোরদের মধ্যে অস্বাভাবিক খাওয়াদাওয়ার বিভিন্ন লক্ষণও কম নয়। গবেষণাভিত্তিক অনুমান অনুযায়ী, বিশ্বে প্রায় ২২ শতাংশ শিশু ও কিশোরের মধ্যে এ ধরনের আচরণের কিছু লক্ষণ দেখা যেতে পারে।
স্মার্টফোন দেওয়ার সময় কি পিছিয়ে দেওয়া উচিত?
এই গবেষণা শিশুদের স্মার্টফোন দেওয়ার জন্য কোনো নির্দিষ্ট আদর্শ বয়স নির্ধারণ করেনি। গবেষণার প্রধান লেখকও বলেছেন, কখন শিশুকে স্মার্টফোন দেওয়া উচিত—এর কোনো একক বা ‘জাদুকরী’ উত্তর নেই।
তবে নর্থ ক্যারোলাইনা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান ও স্নায়ুবিজ্ঞানের অধ্যাপক মিচ প্রিনস্টেইন, যিনি গবেষণাটির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না, মনে করেন শিশুদের কিছুটা পরে স্মার্টফোন দেওয়া মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হতে পারে। তাঁর মতে, সাম্প্রতিক কিছু গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, স্মার্টফোন ও অন্যান্য ডিজিটাল যন্ত্র ব্যবহারের সুযোগ ছয় মাস বা এক বছর পিছিয়ে দিলে কিছু ক্ষেত্রে শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
তাঁর পরামর্শ হলো, শিশুকে স্মার্টফোন দেওয়ার পর একসঙ্গে সব ধরনের অনলাইন সুবিধা উন্মুক্ত না করে ধীরে ধীরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া।
১৩ বছরের আগেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রবেশ
বড় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোর অনেকগুলোতেই অ্যাকাউন্ট খোলার ন্যূনতম বয়স ১৩ বছর। কিন্তু জেসন নাগাতার আগের গবেষণায় দেখা গেছে, ১১ ও ১২ বছর বয়সী শিশুদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশেরই টিকটক ও ইনস্টাগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্মে অ্যাকাউন্ট রয়েছে।
এ কারণে শুধু প্ল্যাটফর্মের বয়সসীমা নির্ধারণ করলেই শিশুদের অনলাইন ঝুঁকি পুরোপুরি কমানো সম্ভব নয় বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। পরিবারের নজরদারি এবং শিশুর সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
বাবা-মায়ের কী করা উচিত?
গবেষকেরা বলছেন, সন্তানকে স্মার্টফোন দেওয়া হলে সেটিকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণহীন করে দেওয়া উচিত নয়। কোন ধরনের অ্যাপ ডাউনলোড করা যাবে, কতক্ষণ ফোন ব্যবহার করা যাবে এবং কোন সময় ফোন থেকে দূরে থাকতে হবে—এসব বিষয়ে পরিবারের স্পষ্ট নিয়ম থাকতে পারে।
শিশুর ঘরে রাতে ফোন না রাখার নিয়মও কার্যকর হতে পারে। এতে ঘুমের সময় ফোন ব্যবহারের সুযোগ কমার পাশাপাশি বাবা-মায়ের পক্ষে সন্তানের ডিজিটাল অভ্যাস সম্পর্কে ধারণা রাখা সহজ হয়।
তবে শুধু নজরদারি করাই যথেষ্ট নয়। শিশু অনলাইনে কী দেখছে, কোন বিষয় তাকে অস্বস্তিতে ফেলছে বা নিজের শরীর সম্পর্কে তার ধারণা কীভাবে বদলাচ্ছে—এসব নিয়েও খোলামেলা কথা বলা প্রয়োজন।
বিশেষ করে শিশুর খাওয়ার অভ্যাসে পরিবর্তন, খাবার নিয়ে অতিরিক্ত ভয় বা অপরাধবোধ, নিজের শরীর বা ওজন নিয়ে বারবার নেতিবাচক মন্তব্য, কিংবা ওজন কমানোর জন্য অস্বাভাবিকভাবে খাবার কমিয়ে দেওয়া বা অতিরিক্ত ব্যায়ামের মতো আচরণ দেখা গেলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত।
খাবারের সময় ফোন ব্যবহার না করার পারিবারিক নিয়ম থাকলেও সেই সময়টিকে সন্তানের সঙ্গে অনলাইন অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা বলার সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, স্মার্টফোনকে শুধু একটি প্রযুক্তিপণ্য হিসেবে না দেখে শিশুর বেড়ে ওঠার পরিবেশের অংশ হিসেবে দেখা। ফোন কখন দেওয়া হচ্ছে, কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে এবং শিশুটি অনলাইনে কী ধরনের কনটেন্টের মুখোমুখি হচ্ছে—এসব বিষয় তার মানসিক ও শারীরিক সুস্থতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তাই বয়স অনুযায়ী সীমা, পারিবারিক নিয়ম এবং সন্তানের সঙ্গে খোলামেলা যোগাযোগ—এই তিনটি বিষয়ই বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।












