সোমবার বিকেলে ঢাকার বাংলাবাজারে ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেডের (ইউপিএল) বিক্রয়কেন্দ্রে ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বই বিক্রি বন্ধের দাবি ঘিরে উত্তেজনা ও দুই বিক্রয়কর্মীকে হয়রানির অভিযোগ উঠেছে। ইউপিএল জানিয়েছে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের লেখা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ কোনো নিষিদ্ধ বই নয় এবং আইনগতভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা না হওয়া পর্যন্ত বইটির প্রকাশনা ও বিক্রি বন্ধ করার কোনো কারণ তারা দেখছে না।
ঘটনার বর্ণনা দিল ইউপিএল
ইউপিএলের বিবৃতি অনুযায়ী, সোমবার বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে কয়েকজন ব্যক্তি বাংলাবাজারের তাদের শোরুমে প্রবেশ করেন। তারা আক্রমণাত্মক আচরণ করে ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’র বিপণন বন্ধ করার দাবি জানান। তাদের দাবি ছিল, বইটি নিষিদ্ধ। তবে ইউপিএলের ভাষ্য, বইটি নিষিদ্ধ হওয়ার বিষয়ে তারা কোনো সরকারি বা আদালতের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের কথা জানে না।
প্রকাশক প্রতিষ্ঠানটি জানায়, একপর্যায়ে শোরুমের শাটার নামিয়ে দেওয়া হয় এবং সেখানে থাকা দুই বিক্রয়কর্মীকে হয়রানির শিকার হতে হয়। পরে তাদের ফরিদাবাদ পুলিশ ফাঁড়িতে নিয়ে কিছু সময় আটক রাখা হলেও পরে ছেড়ে দেওয়া হয়।

ইউপিএল বলেছে, কোনো বই নিষিদ্ধ করতে হলে নির্দিষ্ট আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। সংশ্লিষ্ট সবাইকে বিষয়টি জানাতে হয় এবং প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নিতে হয়। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’র ক্ষেত্রে এমন কোনো প্রক্রিয়া নেওয়া হয়েছে বলে তাদের জানা নেই।
আইনগত সিদ্ধান্ত হলে ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা
ইউপিএল জানিয়েছে, সরকার বা আদালত বইটির বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো সিদ্ধান্ত নিলে তারা আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। তবে তার আগে বইটির প্রকাশনা ও বিক্রি বন্ধ করার চাপকে তারা মেনে নেবে না বলে জানিয়েছে।
প্রকাশক প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, প্রায় সব সরকারের সময়ই বিভিন্ন বই নিয়ে তাদের ওপর চাপ এসেছে। সরকারি সংস্থা, ব্যক্তি ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান অতীতে তাদের কিছু প্রকাশনা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে। তবে পেশাগত নীতিমালা অনুসরণ করেই তারা প্রকাশনা কার্যক্রম চালিয়ে এসেছে।
ইউপিএলের দাবি, তাদের প্রকাশনার পাণ্ডুলিপি স্বাধীনভাবে পর্যালোচনা করা হয়। পর্যালোচকদের মতামত ও মূল্যায়নের ভিত্তিতেই বই প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এমনকি কোনো বই প্রত্যাহার করলে বাণিজ্যিক ক্ষতি হলেও চাপের মুখে তারা অতীতে কোনো বই প্রত্যাহার করেনি।

‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’র ঐতিহাসিক গুরুত্ব
ইউপিএল জানিয়েছে, তারা এখনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’র বিজ্ঞাপন দিচ্ছে। একই সঙ্গে সম্প্রতি ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাকের লেখা জামায়াতে ইসলামীর ইতিহাসবিষয়ক একটি বইও প্রকাশ করেছে। বিশেষজ্ঞ পর্যালোচকদের মূল্যায়নে বাংলাদেশের ইতিহাস বোঝার ক্ষেত্রে বইটিতে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান রয়েছে বলে তারা সেটি প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেয়।
প্রকাশক প্রতিষ্ঠানটির মতে, বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ। এতে বাংলাদেশের জন্মপ্রক্রিয়া এবং মুক্তিযুদ্ধের সূচনাপর্ব সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ পটভূমি রয়েছে।
বই প্রকাশে ভয়ভীতির সংস্কৃতি নিয়ে সতর্কতা
ইউপিএল বলেছে, অপরাধে উসকানি দেয় না—এমন বইয়ের প্রকাশনা ও বিক্রিতে হস্তক্ষেপ জ্ঞান ও সংস্কৃতির বিকাশের জন্য ক্ষতিকর। তারা অতীতে আদর্শ প্রকাশনীর বইমেলার স্টল বন্ধের ঘটনাতেও প্রতিবাদ জানিয়েছিল। ইউপিএলের ভাষ্য, ওই স্টলে থাকা তিনটি বই নিয়ে আপত্তি থাকলেও সেগুলো আইনগতভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়নি।

প্রকাশক প্রতিষ্ঠানটি লেখক, পাঠক, শিক্ষক, সাংবাদিক, সহপ্রকাশক, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী রাজনৈতিক নেতা, সরকারের সদস্যসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে একাডেমিক প্রকাশনার ওপর কথিত হামলার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
ইউপিএল আরও বলেছে, প্রকাশনা খাতে ভয়ভীতি ও চাপের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হলে জ্ঞানভিত্তিক বিতর্ক ও সাংস্কৃতিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। রাষ্ট্র, সমাজ ও জ্ঞানভিত্তিক আলোচনার স্বার্থে বেআইনি কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ারও আহ্বান জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
বাংলাবাজারে ইউপিএলের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ নিয়ে উত্তেজনা ও দুই বিক্রয়কর্মীকে হয়রানির অভিযোগের পর প্রকাশক প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, আইনগতভাবে নিষিদ্ধ না হওয়া পর্যন্ত বইটির প্রকাশনা ও বিক্রি অব্যাহত থাকবে।












