আত্মহত্যা নিয়ে সমাজে সচেতনতা বাড়লেও বিষয়টি এখনো নানা ধরনের সামাজিক লজ্জা, ভয় ও ভুল ধারণায় ঢাকা পড়ে থাকে। অনেক মানুষ আত্মহত্যার চিন্তার কথা কাউকে জানান না। আবার পরিবার ও বন্ধুরাও অনেক সময় বুঝতে পারেন না—কীভাবে এমন একজন মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বিষয়টি এড়িয়ে না যাওয়া। বরং কেউ যদি নিজের জীবন নিয়ে হতাশা, বেঁচে থাকার ইচ্ছা হারিয়ে ফেলা কিংবা আত্মহত্যার চিন্তার কথা জানান, তাহলে শান্তভাবে তার কথা শোনা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পেশাদার সহায়তার সঙ্গে যুক্ত করা জরুরি।
যুক্তরাষ্ট্রের আত্মহত্যা প্রতিরোধবিষয়ক সংস্থার প্রধান চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. ক্রিস্টিন মুটিয়ের বলেন, মানুষ অনেক সময় উদ্বিগ্ন ব্যক্তির কাছ থেকে দূরে সরে যাওয়ার কারণ খোঁজেন। কেউ মনে করেন আত্মহত্যার কথা বলা স্বার্থপরতার প্রকাশ, আবার কেউ ভয় পান—এ নিয়ে কথা বললে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।
কিন্তু এই ধারণা ঠিক নয়। গবেষণায় দেখা গেছে, কারও সঙ্গে আত্মহত্যার চিন্তা নিয়ে সরাসরি কথা বললে তার আত্মহত্যার ঝুঁকি বাড়ে না। বরং অনেক ক্ষেত্রে এমন আলোচনা মানুষকে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে এবং সাহায্য নেওয়ার দিকে এগিয়ে যেতে সহায়তা করতে পারে।
সরাসরি কথা বলতে ভয় পাবেন না
আপনার পরিচিত কেউ যদি আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখান, নিজের মধ্যে গুটিয়ে যান, হতাশার কথা বলেন কিংবা জীবনের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন, তাহলে তার সঙ্গে কথা বলার জন্য উপযুক্ত একটি সময় বের করুন।
শুরুতেই খুব কঠিন কোনো প্রশ্ন করার প্রয়োজন নেই। সহজভাবে জানতে পারেন, ‘সত্যি করে বলো, তুমি কেমন আছ?’
যদি মনে হয় সমস্যাটি গুরুতর, তাহলে আত্মহত্যার চিন্তা আছে কি না—সরাসরি জিজ্ঞেস করাও প্রয়োজন হতে পারে। যেমন বলা যায়, ‘তোমার সাম্প্রতিক সময়টা খুব কঠিন যাচ্ছে। কখনো কি তোমার মনে হয়েছে যে তুমি আর বেঁচে থাকতে চাও না বা নিজের জীবন শেষ করে দিতে চাও?’
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রশ্নটি এমনভাবে করা উচিত যাতে বোঝা যায় আপনি সত্যিই তার কথা শুনতে চান। ‘তুমি নিশ্চয়ই আত্মহত্যার কথা ভাবছ না, তাই তো?’—এ ধরনের প্রশ্ন বিচার করার মতো শোনাতে পারে এবং মানুষকে আরও গুটিয়ে দিতে পারে।
কথা বলার সময় বেশি শুনুন
কেউ যখন নিজের আত্মহত্যার চিন্তার কথা আপনাকে বলেন, তখন আতঙ্কিত হয়ে পড়া স্বাভাবিক। কিন্তু সেই মুহূর্তে তাকে দীর্ঘ উপদেশ দেওয়া বা নিজের আবেগ চাপিয়ে দেওয়া সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি নয়।
‘তোমার তো অনেক কিছু আছে’, ‘অন্যদের অবস্থা আরও খারাপ’, ‘এভাবে ভাবা ঠিক নয়’ কিংবা ‘তোমার মৃত্যুতে পরিবারের কী হবে’—এ ধরনের কথা পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে। এতে ওই ব্যক্তি মনে করতে পারেন, তার কষ্টকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না।
বরং শান্তভাবে বলা যায়, ‘আমাকে বিশ্বাস করে কথাটা বলার জন্য ধন্যবাদ। তুমি কী অনুভব করছ, সেটা আমি আরও বুঝতে চাই।’
তার কষ্টকে স্বীকার করুন, তবে আত্মহত্যাকে কোনো সমাধান হিসেবে সমর্থন করবেন না। যেমন বলা যায়, ‘তুমি যে সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছ, সেটা সত্যিই খুব কঠিন মনে হচ্ছে। তোমার জন্য আমি চিন্তিত এবং তোমার পাশে থাকতে চাই।’
আত্মহত্যার পরিকল্পনা আছে কি না জানতে হবে
কেউ আত্মহত্যার চিন্তার কথা বললেই যে সে তাৎক্ষণিকভাবে নিজের জীবন নেওয়ার ঝুঁকিতে আছে, এমন নয়। তবে পরিস্থিতির গুরুত্ব বোঝার জন্য কিছু বিষয় জানতে হবে।
জিজ্ঞেস করা যেতে পারে—এ ধরনের চিন্তা কখন আসে, তখন তিনি কী করেন, কী বিষয় তাকে কিছুটা স্বস্তি দেয় এবং তিনি নিজের জীবন শেষ করার কোনো পরিকল্পনা করেছেন কি না।
যদি তিনি নির্দিষ্ট পরিকল্পনার কথা জানান, নিরাপদ থাকতে পারবেন কি না তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন অথবা আত্মহত্যার চিন্তা আরও সক্রিয় হয়ে ওঠে, তাহলে বিষয়টিকে জরুরি হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আত্মহত্যার ঝুঁকি বোঝার ক্ষেত্রে আচরণগত, মানসিক এবং কথাবার্তার কিছু পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। যেমন—মাদক বা অ্যালকোহলের অপব্যবহার, অস্বাভাবিক ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ, মৃত্যু নিয়ে অতিরিক্ত ব্যস্ততা, নিজের জিনিসপত্র অন্যদের দিয়ে দেওয়া, স্বাভাবিক কাজ বা পড়াশোনায় আগ্রহ হারানো এবং আত্মহত্যার প্রস্তুতির মতো আচরণ।
এ ছাড়া দীর্ঘস্থায়ী হতাশা, অসহায়ত্বের অনুভূতি, একাকিত্ব, সামাজিক যোগাযোগ কমে যাওয়া, জীবনের কোনো কারণ নেই বলে মনে হওয়া এবং মেজাজে বড় ধরনের পরিবর্তনও সতর্ক হওয়ার কারণ হতে পারে।
কেউ যদি বলেন, ‘আমি সবার জন্য বোঝা’ বা ‘আমার এখানে থাকার কোনো কারণ নেই’—এ ধরনের কথাকেও গুরুত্ব দিতে হবে। এমনকি কেউ মজা করেও আত্মহত্যা বা মৃত্যুর কথা বললে তার খোঁজ নেওয়া উচিত।
একবার কথা বলেই থেমে যাবেন না
কেউ যদি বলেন যে তার আত্মহত্যার কোনো পরিকল্পনা নেই, তারপরও ধরে নেওয়া যাবে না যে তিনি পুরোপুরি সুস্থ হয়ে গেছেন।
পরিস্থিতি পরিবর্তিত হতে পারে। তাই কয়েক দিন পরপর তার সঙ্গে যোগাযোগ রাখা গুরুত্বপূর্ণ। ফোন করা, বার্তা পাঠানো কিংবা দেখা করার পাশাপাশি স্বাভাবিক বিষয় নিয়েও কথা বলুন। সবসময় তার মানসিক স্বাস্থ্য নিয়েই আলোচনা করার প্রয়োজন নেই। তিনি একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ—তার আগ্রহ, কাজ, পরিবার, বন্ধুত্ব ও দৈনন্দিন জীবনও গুরুত্বপূর্ণ।
প্রয়োজনে তাকে সরাসরি জিজ্ঞেস করতে পারেন, ‘তোমাকে কীভাবে পাশে পেলে তোমার ভালো লাগবে?’
কেউ পেশাদার সহায়তা নিতে অনিচ্ছুক হলে জোর করে তাকে বাধ্য করার পরিবর্তে ধীরে ধীরে উৎসাহ দেওয়া বেশি কার্যকর হতে পারে। চাইলে তার সঙ্গে বসে চিকিৎসক বা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ খুঁজে দেওয়া, অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেওয়া কিংবা প্রথম সাক্ষাতে সঙ্গে যাওয়ার প্রস্তাব দেওয়া যায়।
কখন পরিস্থিতিকে জরুরি ধরে নিতে হবে
আত্মহত্যার চিন্তা যদি শুধু ‘আর বেঁচে থাকতে ইচ্ছা করছে না’ ধরনের অনুভূতি থেকে নির্দিষ্ট পরিকল্পনা বা তাৎক্ষণিক ঝুঁকির দিকে যায়, তখন দ্রুত পেশাদার সহায়তা প্রয়োজন।
যদি কেউ বলেন তিনি নিজের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে নিরাপদ থাকতে পারবেন কি না তা নিয়ে নিশ্চিত নন, আত্মহত্যার নির্দিষ্ট পরিকল্পনার কথা বলেন, অথবা হঠাৎ আত্মহত্যা-সংক্রান্ত নানা সতর্কসংকেত দেখাতে শুরু করেন, তাহলে বিষয়টি একা সামলানোর চেষ্টা করা উচিত নয়।
এমন পরিস্থিতিতে পরিবারের অন্য সদস্য, ঘনিষ্ঠ বন্ধু বা দায়িত্বশীল ব্যক্তিকে যুক্ত করা প্রয়োজন হতে পারে। ব্যক্তি বিষয়টি গোপন রাখতে বললেও তার জীবন তাৎক্ষণিক ঝুঁকিতে থাকলে নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
যদি কেউ আত্মহত্যার চেষ্টা শুরু করেন বা তাৎক্ষণিকভাবে নিজের জীবন নেওয়ার ঝুঁকিতে থাকেন, জরুরি চিকিৎসা সহায়তা নিতে হবে। বাংলাদেশে এমন পরিস্থিতিতে স্থানীয় জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থা বা নিকটস্থ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে দ্রুত যোগাযোগ করা উচিত। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে স্থানীয় আত্মহত্যা প্রতিরোধ বা সংকটকালীন সহায়তা কেন্দ্রও রয়েছে।
কেউ আত্মহত্যার চেষ্টা করছেন এমন অবস্থায় তার কাছে থাকলে নিজের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে হবে। পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত না করে শান্ত স্বরে কথা বলা, নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা এবং সম্ভব হলে বিপজ্জনক জিনিস থেকে দূরে থাকার সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে—তবে কোনোভাবেই নিজেকে ঝুঁকিতে ফেলা উচিত নয়।
পাশে থাকতে গিয়ে নিজের যত্নও জরুরি
আত্মহত্যার চিন্তায় থাকা প্রিয় মানুষের পাশে দীর্ঘদিন থাকা মানসিকভাবে অত্যন্ত কঠিন হতে পারে। তার জন্য ভয়, দুশ্চিন্তা, রাগ, অসহায়ত্ব কিংবা অপরাধবোধ তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
তাই সহায়তাকারীকেও নিজের মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে নজর দিতে হবে। নিজের জন্য সময় রাখা, পছন্দের কাজ করা, অন্য বিশ্বস্ত মানুষের সঙ্গে কথা বলা এবং প্রয়োজন হলে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেওয়া জরুরি।
মনে রাখা দরকার, কাউকে ভালোবাসা এবং তার পাশে থাকা গুরুত্বপূর্ণ হলেও একজন মানুষের জীবন বা মৃত্যুর সম্পূর্ণ দায় অন্য একজনের ওপর বর্তায় না। আত্মহত্যার পেছনে সাধারণত একাধিক জটিল কারণ কাজ করে। তাই একজনকে বাঁচানোর দায়িত্ব একা নিজের কাঁধে তুলে নিয়ে অপরাধবোধে ভোগা উচিত নয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—কেউ যখন জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়ে সংযোগ, বোঝাপড়া ও সাহায্যের প্রয়োজন অনুভব করেন, তখন তাকে একা না রাখা এবং প্রয়োজনীয় পেশাদার সহায়তার সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করা।
জরুরি সহায়তা
যদি আপনি নিজে আত্মহত্যার চিন্তার সঙ্গে লড়াই করেন, অথবা আপনার পরিচিত কেউ তাৎক্ষণিক ঝুঁকিতে থাকেন, একা পরিস্থিতি সামলানোর চেষ্টা করবেন না। কাছের বিশ্বস্ত মানুষকে জানান এবং স্থানীয় জরুরি চিকিৎসা বা মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ করুন।
যুক্তরাষ্ট্রে ৯৮৮ নম্বরে ফোন করে ৯৮৮ সুইসাইড অ্যান্ড ক্রাইসিস লাইফলাইনের প্রশিক্ষিত পরামর্শদাতার সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সংকটকালীন সহায়তার নম্বর খুঁজতে ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন ফর সুইসাইড প্রিভেনশন ও বেফ্রেন্ডার্স ওয়ার্ল্ডওয়াইডের সহায়তা নেওয়া যায়।












