কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ভূদৃশ্যেও বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। একসময় যেখানে ছিল কৃষিজমি, বন কিংবা মরুভূমি, সেসব জায়গায় এখন গড়ে উঠছে বিশাল আকারের ডেটা সেন্টার। এআই চালাতে বিপুল কম্পিউটিং ক্ষমতার প্রয়োজন হওয়ায় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো দেশজুড়ে একের পর এক বড় ডেটা সেন্টার নির্মাণ করছে।
স্যাটেলাইট ছবিতে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন এলাকার এই পরিবর্তন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। টেক্সাসের মিলাম ও টেলর কাউন্টি, নিউ মেক্সিকোর দোনা আনা কাউন্টি, উইসকনসিনের ওজাকি কাউন্টি, অ্যারিজোনার ম্যারিকোপা কাউন্টি এবং মিশিগানের ওয়াশটেনাও কাউন্টির মতো এলাকাতেও ডেটা সেন্টার নির্মাণের কারণে জমির ব্যবহার বদলে যাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে প্রায় ১০০টি ‘হাইপারস্কেল’ ডেটা সেন্টার চালু আছে। এসব কেন্দ্রে সর্বোচ্চ ব্যবহারের সময়ে অন্তত ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ প্রয়োজন হতে পারে—যা প্রায় ৮০ হাজার বাড়িতে বিদ্যুৎ সরবরাহের সমপরিমাণ। এর বাইরে আরও প্রায় ১২০টি ডেটা সেন্টার নির্মাণাধীন এবং প্রায় ৪৬০টি প্রকল্প পরিকল্পনায় রয়েছে বলে ডেটা সেন্টার নির্মাণের বাজার পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান ক্লিনভিউয়ের তথ্য।

এই বিপুল সম্প্রসারণের বড় একটি অংশ হচ্ছে আগে অন্য কাজে ব্যবহৃত জমিতে। বর্তমানে চালু থাকা হাইপারস্কেল ডেটা সেন্টারগুলোর প্রায় ৪০ শতাংশ আগে থেকেই উন্নয়ন করা জমিতে তৈরি হয়েছে। বাকি অংশের জন্য কৃষিজমি, ঝোপঝাড় ও বনভূমি ব্যবহার করা হয়েছে।
ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি, ফুলারটনের অবকাঠামো বিশেষজ্ঞ ডেভিড অ্যাডামসের মতে, পুরোনো ডেটা সেন্টারগুলো সাধারণত তুলনামূলকভাবে সমৃদ্ধ মহানগর ও শহরাঞ্চলে গড়ে উঠেছে। কারণ এসব জায়গায় নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ এবং দ্রুতগতির ইন্টারনেট সহজে পাওয়া যায়।
তবে এআইয়ের জন্য তৈরি নতুন প্রজন্মের ডেটা সেন্টারগুলোর বিদ্যুতের চাহিদা অনেক বেশি। শক্তিশালী চিপ চালাতে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ প্রয়োজন হওয়ায় নির্মাণ এখন শহর থেকে গ্রামীণ এলাকার দিকে সরে যাচ্ছে। এসব এলাকায় জমির দাম তুলনামূলক কম, আবার অনেক ক্ষেত্রেই দ্রুতগতির ফাইবার ইন্টারনেটের সংযোগ পাওয়া যায়।
শুধু জমিই নয়, ডেটা সেন্টারগুলোর বিদ্যুতের চাহিদা স্থানীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপরও চাপ তৈরি করছে। কোনো কোনো প্রকল্প তাই জাতীয় বা স্থানীয় বিদ্যুৎ গ্রিডের ওপর পুরোপুরি নির্ভর না করে নিজেদের বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবস্থা করছে। এতে বিদ্যুৎ সরবরাহের চাপ কমানোর পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দাদের বিদ্যুতের দাম বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা নিয়ে সমালোচনাও কিছুটা এড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে নিজস্ব বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরির প্রয়োজন হলে ডেটা সেন্টারের জন্য আরও বেশি জমি লাগতে পারে।

এর একটি বড় উদাহরণ ইলন মাস্কের নেতৃত্বাধীন এক্সএআইয়ের ‘কলোসাস ২’ ডেটা সেন্টার। মেমফিস এলাকায় পাঁচ বছর আগেও যে স্থানে বনভূমি ছিল, সেখানে এখন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় চালু ডেটা সেন্টারগুলোর একটি দাঁড়িয়ে গেছে। মাস্কের এআই প্রতিষ্ঠান এক্সএআই জায়গাটি কেনার পর সেখানে বিশাল অবকাঠামো তৈরি করা হয়। এর ছাদে ‘ম্যাক্রোহ্যার্ড’ ও ‘ম্যাক্রোহ্যার্ডার’ লেখা রয়েছে, যা মাইক্রোসফটকে ব্যঙ্গ করে দেওয়া নাম।
কলোসাস ২ একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশেই নির্মাণ করা হয়েছে। বিদ্যুৎ সরবরাহ স্থিতিশীল রাখতে সেখানে বিশাল আকারের ব্যাটারির সারিও রয়েছে। নির্মাণকাজ চলার সময় কেন্দ্রটি অস্থায়ী গ্যাস টারবাইনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ পাচ্ছে। তবে এসব টারবাইন জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডের বিদ্যুতের তুলনায় বেশি দূষণ সৃষ্টি করতে পারে।
মেমফিসে মাস্কের আগের ডেটা সেন্টার কলোসাসের কাছাকাছি বসবাসকারী মানুষ ইতিমধ্যে কেন্দ্রটির নিজস্ব জেনারেটর থেকে নির্গত দূষণ নিয়ে প্রতিবাদ করেছেন। অর্থাৎ এআই অবকাঠামোর বিস্তার শুধু জমির ব্যবহার বদলাচ্ছে না, স্থানীয় পরিবেশ ও মানুষের জীবনযাত্রা নিয়েও নতুন প্রশ্ন তৈরি করছে।
ডেটা সেন্টার অবশ্য নতুন কোনো ধারণা নয়। কিন্তু বর্তমানের হাইপারস্কেল প্রকল্পগুলোর আকার আগের তুলনায় অনেক বড়। অ্যাডামসের ভাষায়, আগে সাধারণত শহরের ভেতরে একটি ভবনেই ডেটা সেন্টার সীমাবদ্ধ থাকত। এখন বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো একটি ভবন দিয়ে শুরু করে পরে সেটিকে দুই, তিন, চার, পাঁচ বা ছয়টি ভবনের বিশাল ক্যাম্পাসে পরিণত করছে।

লুইজিয়ানার গ্রামীণ এলাকায় মেটা এমনই একটি বিশাল ক্যাম্পাস তৈরি করছে, যার নাম ‘হাইপেরিয়ন’। এর আয়তন কলোসাস ২-এর চেয়েও বড় হবে এবং নিউইয়র্কের সেন্ট্রাল পার্কের আয়তনকেও ছাড়িয়ে যাবে। অথচ বর্তমানে পরিকল্পনায় থাকা সব ডেটা সেন্টার নির্ধারিত সময় অনুযায়ী নির্মিত হলে ২০৩০ সালের মধ্যে হাইপেরিয়ন যুক্তরাষ্ট্রের আয়তনের দিক থেকে মাত্র পঞ্চম বৃহত্তম ডেটা সেন্টার ক্যাম্পাস হতে পারে।
এতে বোঝা যায়, এআইয়ের জন্য প্রয়োজনীয় কম্পিউটিং অবকাঠামো কত দ্রুত বড় হচ্ছে। প্রযুক্তির অগ্রগতির পেছনে যে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ, জমি ও অবকাঠামো প্রয়োজন, তার প্রভাব এখন যুক্তরাষ্ট্রের শহর ও গ্রাম—দুই জায়গাতেই দৃশ্যমান।
এআইয়ের যুগে তাই শুধু সফটওয়্যার বা কম্পিউটার চিপই বদলাচ্ছে না; বদলে যাচ্ছে আমেরিকার ভৌগোলিক চিত্রও। কৃষিজমি, বন ও মরুভূমির জায়গায় একের পর এক বিশাল ডেটা সেন্টার গড়ে ওঠার মধ্য দিয়ে প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির নতুন বাস্তবতা ক্রমেই দৃশ্যমান হয়ে উঠছে।












