নিউইয়র্কে জলবায়ু পরিবর্তন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়ে একটি আলোচনাসভায় শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে সাময়িকভাবে বিঘ্ন ঘটে। গত ২৩ সেপ্টেম্বর ক্লাইমেট উইক এনওয়াইসি-তে আয়োজিত ওই আলোচনায় প্রযুক্তি খাতের পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তোলেন বিক্ষোভকারীরা।
আলোচনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার পরিবেশগত প্রভাব এবং জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় এআই কীভাবে ভূমিকা রাখতে পারে, সে বিষয়ে কথা বলছিলেন এনভিডিয়ার টেকসই উন্নয়নবিষয়ক প্রধান জশ পার্কার। এ সময় একদল শিক্ষার্থী ও তরুণ আন্দোলনকারী আলোচনাস্থলে বিক্ষোভ শুরু করেন এবং প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর পরিবেশগত দায় নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, দ্রুত এআই প্রযুক্তির বিস্তারের সঙ্গে বিশাল আকারের তথ্যকেন্দ্র বা ডেটা সেন্টারের সম্প্রসারণও ঘটছে। এসব অবকাঠামো পরিচালনায় বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ ও পানি প্রয়োজন হয়। একই সঙ্গে এর সঙ্গে কার্বন নিঃসরণ ও পরিবেশের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
বিক্ষোভকারীরা প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর পরিবেশবান্ধব কর্মকাণ্ডের প্রচার নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তাদের অভিযোগ, পরিবেশ রক্ষায় প্রযুক্তি খাতের বিভিন্ন উদ্যোগের প্রচারের সঙ্গে বাস্তব পরিবেশগত প্রভাবের মধ্যে পার্থক্য থাকতে পারে। তারা এটিকে করপোরেট ‘গ্রিনওয়াশিং’ হিসেবে সমালোচনা করেন।
তরুণদের জলবায়ু আন্দোলনভিত্তিক সংগঠন সানরাইজ মুভমেন্ট জানায়, করপোরেট গ্রিনওয়াশিংয়ের বিরুদ্ধে অবস্থান জানাতেই এই প্রতিবাদ করা হয়েছে। সংগঠনটি ক্লাইমেট উইক আয়োজকদের সমালোচনা করে বলেছে, জলবায়ু নিয়ে আলোচনায় এআই নির্বাহীদের আমন্ত্রণ জানানো হলেও প্রযুক্তির পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন তোলা হচ্ছে না।
বিক্ষোভের সময় একজন আন্দোলনকারী এনভিডিয়ার পরিবেশগত স্থায়িত্ব নিয়ে করা দাবির বিষয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণের একটি পরিসংখ্যান উল্লেখ করেন। বিক্ষোভকারীরা এআই-সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তির ইসরায়েলে ব্যবহারের বিষয়টিও সামনে আনেন।
সানরাইজ মুভমেন্ট জানিয়েছে, সংগঠনটির তরুণ কর্মীরা পুরো সপ্তাহজুড়েই প্রযুক্তি খাতের নির্বাহীদের বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্ন করে আসছিলেন। তাদের মূল উদ্বেগের একটি হলো—এআই প্রযুক্তির দ্রুত সম্প্রসারণের পরিবেশগত মূল্য কতটা এবং সেই মূল্য কে বহন করছে।
এআই নিয়ে বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এর পরিবেশগত প্রভাবও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে এআই মডেল পরিচালনা ও প্রশিক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় বিশাল কম্পিউটিং অবকাঠামো এবং তথ্যকেন্দ্রগুলোর বিদ্যুৎ ব্যবহার নিয়ে পরিবেশবিদদের উদ্বেগ রয়েছে। পানি ব্যবহারের বিষয়টিও ক্রমেই আলোচনায় আসছে।
অন্যদিকে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর বক্তব্য হলো, এআই শুধু পরিবেশের ওপর চাপ তৈরি করছে না; বরং সঠিকভাবে ব্যবহার করা গেলে এটি বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা, জ্বালানি দক্ষতা বাড়ানো এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিভিন্ন সমস্যা মোকাবিলাতেও সহায়তা করতে পারে।
এই দুই ভিন্ন অবস্থানের সংঘাতই নিউইয়র্কের আলোচনাসভায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একদিকে প্রযুক্তি খাত এআইকে ভবিষ্যতের পরিবেশগত সমাধানের একটি সম্ভাব্য হাতিয়ার হিসেবে তুলে ধরছে, অন্যদিকে পরিবেশ আন্দোলনের কর্মীরা বলছেন, প্রযুক্তির সম্ভাব্য সুবিধার কথা বলার পাশাপাশি এর বাস্তব পরিবেশগত খরচও স্পষ্টভাবে হিসাব করতে হবে।
বিক্ষোভের ভিডিও সানরাইজ মুভমেন্টের মাধ্যমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। পরে আল জাজিরা ইংলিশসহ বিভিন্ন মাধ্যমে ভিডিওগুলো প্রচারিত হলে তা অনলাইনে ব্যাপক সাড়া ফেলে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। কেউ কেউ তরুণদের পরিবেশগত বিষয়ে সরাসরি প্রশ্ন তোলার সাহস ও উদ্যোগের প্রশংসা করেছেন। আবার কেউ বলেছেন, পরিবেশের ক্ষতিকে ‘পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া’ হিসেবে দেখিয়ে একই সঙ্গে টেকসই উন্নয়নের কথা বললে তা অবশ্যই প্রশ্নের মুখে পড়া উচিত।
নিউইয়র্কের এই বিক্ষোভ তাই শুধু একটি আলোচনাসভায় সাময়িক বিঘ্ন ঘটানোর ঘটনা নয়। এটি এআই প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার, তথ্যকেন্দ্রের বাড়তে থাকা চাহিদা এবং জলবায়ু সংকটের মধ্যে তৈরি হওয়া একটি বড় প্রশ্নকে সামনে এনেছে—প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ গড়ার সময় তার পরিবেশগত মূল্য কীভাবে হিসাব করা হবে।
এআই যত দ্রুত বিশ্ব অর্থনীতি ও দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠছে, ততই এর বিদ্যুৎ, পানি ও কার্বন নিঃসরণের হিসাব নিয়ে বিতর্ক আরও জোরালো হতে পারে। নিউইয়র্কের শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ সেই বিতর্ককেই আরও দৃশ্যমান করে তুলেছে।












