যুক্তরাজ্যের একটি বিমানঘাঁটি, যেটি মার্কিন সামরিক বাহিনীও ব্যবহার করে, সেখানে কথিত সন্ত্রাসী হামলার ষড়যন্ত্রে ‘বিদেশি কোনো পক্ষের’ হাত রয়েছে বলে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। তবে ওই বিদেশি পক্ষের পরিচয় বা তাদের ভূমিকা সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানাননি তিনি।
রুবিওর এই মন্তব্য এমন সময়ে এলো, যখন ইংল্যান্ডের পশ্চিমাঞ্চলের রয়্যাল এয়ার ফোর্স (আরএএফ) ফেয়ারফোর্ড ঘাঁটির কাছে আটক পাঁচ ব্রিটিশ নাগরিককে জামিনে মুক্তি দিয়েছে যুক্তরাজ্যের পুলিশ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাদের মুক্তি দেওয়ার সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে বলেছেন, তিনি এমনটা করতেন না।
ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সোমবার রুবিও বলেন, সপ্তাহান্তে যে ঘটনা ঘটেছে, সেটি ‘খুবই গুরুতর হুমকি’ হয়ে উঠতে পারত। তদন্তে আরও তথ্য সামনে আসবে বলেও ইঙ্গিত দেন তিনি।
রুবিও বলেন, “এতে স্পষ্টভাবেই কোনো বিদেশি পক্ষের হাত ছিল।” তবে তদন্তের স্বার্থে এ মুহূর্তে এর চেয়ে বেশি বিস্তারিত জানাতে তিনি রাজি হননি।
ফেয়ারফোর্ড ঘাঁটির কাছে রোববার ভোরে ২৩ থেকে ২৫ বছর বয়সী পাঁচ ব্যক্তিকে আটক করা হয়। ব্রিটিশ পুলিশ জানিয়েছে, তারা সবাই ব্রিটিশ নাগরিক এবং লন্ডন এলাকার বাসিন্দা। সোমবার তাদের জামিনে মুক্তি দেওয়া হলেও চলাফেরার ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, আটক ব্যক্তিরা ইরানের সঙ্গে যুক্ত ‘হতে পারে’। তবে তিনি দাবি করেন, এ বিষয়ে তিনি আরও নির্দিষ্ট তথ্য জানেন। একই সঙ্গে সেই তথ্য প্রকাশ না করার সিদ্ধান্তের কথাও জানান তিনি।
ট্রাম্প বলেন, “আমি এটা করতাম না”—অর্থাৎ এত দ্রুত সন্দেহভাজনদের জামিনে মুক্তি দেওয়ার সিদ্ধান্তের সঙ্গে তিনি একমত নন।
রুবিও অবশ্য ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের ভূমিকার প্রশংসা করে বলেন, তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অত্যন্ত সহযোগিতামূলক আচরণ করছে এবং পরিস্থিতি যথাযথভাবে সামলাচ্ছে।
তবে যুক্তরাজ্য এখনো প্রকাশ্যে কোনো বিদেশি রাষ্ট্র বা পক্ষের সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করেনি। দেশটির সরকারের পক্ষ থেকেও ট্রাম্প বা রুবিওর বক্তব্যের বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো নতুন মন্তব্য করা হয়নি।
ইরানের দিকে সন্দেহ, তেহরানের অস্বীকার
ঘটনার পর ইরানের নাম আলোচনায় এলেও তেহরান শুরু থেকেই কোনো ধরনের সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
লন্ডনে ইরানের দূতাবাস সোমবার এক বিবৃতিতে বলেছে, ফেয়ারফোর্ড ঘাঁটির কাছে পাঁচ ব্যক্তিকে আটকের সঙ্গে ইরানকে যুক্ত করার যে ‘ভিত্তিহীন ও বিদ্বেষপূর্ণ’ প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে, তা তারা কঠোরভাবে নিন্দা করে।

তবে রুবিওর সর্বশেষ মন্তব্যের বিষয়ে ইরানি দূতাবাস এখনো কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
ফেয়ারফোর্ড ঘাঁটিটি ইরান-সংক্রান্ত সামরিক অভিযানের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রের বি-১ বোমারু বিমান এই ঘাঁটি থেকে ইরানের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর আগে জুলাইয়ে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী ফেয়ারফোর্ড ঘাঁটিতে মার্কিন বোমারু বিমান ব্যবহারের বিষয়টি উল্লেখ করে যুক্তরাজ্যকে সতর্ক করেছিল। তাদের বক্তব্য ছিল, ইরানের ভূখণ্ডে হামলার কাজে ব্যবহৃত যেকোনো ঘাঁটি তাদের বাহিনীর জন্য বৈধ লক্ষ্য হিসেবে বিবেচিত হবে।
পাঁচজনকে কেন ছেড়ে দেওয়া হলো
পুলিশ জানিয়েছে, পাঁচ সন্দেহভাজনকে মুক্তি দেওয়া হলেও তদন্ত শেষ হয়নি। তাদের চলাফেরার ওপর কঠোর শর্ত আরোপ করা হয়েছে এবং তদন্তকারীরা ঘটনার সব দিক খতিয়ে দেখছেন।
ব্রিটিশ গণমাধ্যমের কয়েকটি প্রতিবেদনে সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, সন্দেহভাজনদের ব্যবহৃত ভ্যানগুলোর পেছনে কোনো বিস্ফোরক পাওয়া যায়নি। ফলে প্রথমে যে ধরনের তাৎক্ষণিক ও বড় ধরনের হামলার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল, সেটি হয়তো ততটা আসন্ন ছিল না—এমন সম্ভাবনার কথাও আলোচনায় এসেছে।
তবে যুক্তরাজ্যের সন্ত্রাসবিরোধী আইনে সন্দেহভাজনদের আরও দীর্ঘ সময় আটক রাখার সুযোগ রয়েছে। ফলে দ্রুত জামিনে মুক্তি দেওয়াকে তদন্ত শেষ হয়ে যাওয়ার লক্ষণ হিসেবে দেখছে না পুলিশ।
সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে জ্যেষ্ঠ সন্ত্রাসবিরোধী পুলিশ কর্মকর্তা লরেন্স টেলর বলেন, পুলিশ সম্ভাব্য সব দিক বিবেচনা করছে। এর মধ্যে এমন সম্ভাবনাও রয়েছে যে ঘটনাটি কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের হয়ে কাজ করা ব্যক্তি বা প্রতিনিধিদের মাধ্যমে সংঘটিত হয়ে থাকতে পারে—তারা সচেতনভাবে বা অজ্ঞাতসারেও এমন কাজে যুক্ত হতে পারে।

ঘটনাস্থলে কী ঘটেছিল
রোববার ভোরে ফেয়ারফোর্ড ঘাঁটির কাছাকাছি এলাকায় তিনটি সাদা ভ্যান দেখতে পান স্থানীয় বাসিন্দারা। পরে ওই এলাকায় সন্দেহজনক গতিবিধি দেখে পুলিশকে খবর দেওয়া হয়।
এক স্থানীয় বাসিন্দা জানান, তিনটি ভ্যান ঘাঁটির বেড়া থেকে প্রায় ১০০ মিটার দূরে অস্বাভাবিকভাবে দাঁড় করানো ছিল। তার দাবি, কয়েকজনের মুখ ঢাকা ছিল এবং তিনি পাঁচজনের বেশি মানুষকে সেখানে দেখেছেন। তবে পুলিশ এখন পর্যন্ত অতিরিক্ত কাউকে খুঁজছে বলে জানায়নি।
ওই নারী জানান, তিনি রাত ১টা ৪০ মিনিটের দিকে জরুরি সেবায় ফোন করেন। ১০ থেকে ১৫ মিনিটের মধ্যে সশস্ত্র পুলিশ সেখানে পৌঁছে যায়।
এরপর ওই এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। বোমা নিষ্ক্রিয়কারী একটি রোবটকে ভ্যানগুলোর আশপাশে কাজ করতে দেখা যায়। দুটি ভ্যানের পেছনের দরজা খোলা ছিল এবং কাছাকাছি মাটিতে বড় কালো কিছু বস্তু ছড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।
ঘটনাস্থলের কাছাকাছি থাকা সিএনএন দলের সদস্যরা পরে গ্রামের দিক থেকে নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণের মতো শব্দ শুনেছেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঘটনার পর প্রায় ৮৫টি পরিবারকে নিরাপত্তার কারণে এলাকা থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। সোমবার সন্ধ্যায় তাদের বাড়িতে ফেরার অনুমতি দেওয়া হয়। তবে তিনটি গাড়িকে ঘিরে পুলিশের নিরাপত্তাবেষ্টনী তখনও বহাল ছিল।

যুক্তরাজ্যের তদন্তে এখন মূল প্রশ্ন
ঘটনাটি নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—পাঁচ সন্দেহভাজনের সঙ্গে কোনো বিদেশি রাষ্ট্র বা সংগঠনের যোগাযোগ ছিল কি না এবং তারা সত্যিই কোনো হামলা চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল কি না।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, তারা আগে থেকেই গোয়েন্দা নজরদারিতে ছিল কি না। ট্রাম্প রোববার বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য দীর্ঘ সময় ধরে তাদের তদন্ত করছিল। কিন্তু ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ প্রকাশ্যে এমন কোনো তথ্য নিশ্চিত করেনি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্যের সঙ্গেও কিছু প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। একজন প্রত্যক্ষদর্শী পাঁচজনের বেশি মানুষ এবং মুখ ঢাকা কয়েকজনকে দেখেছেন বলে দাবি করলেও পুলিশ এখন পর্যন্ত অন্য কাউকে খুঁজছে না।
ব্রিটিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং অবশ্য স্থানীয় বাসিন্দার বর্ণনাকে ঘটনাটির ‘আংশিক চিত্র’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, পুলিশ ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর অনেক কাজই নিরাপত্তার কারণে প্রকাশ্যে জানানো হয় না।
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম সোমবার জাতীয় জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য গঠিত কোবরা কমিটির বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন। একই দিনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ জানান, ঘটনাস্থল এখন নিরাপদ।
তবে রুবিওর ‘বিদেশি পক্ষের’ সম্পৃক্ততার মন্তব্য তদন্তকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ এখনো এ বিষয়ে প্রকাশ্যে নিশ্চিত কোনো তথ্য না দেওয়ায়, সন্দেহভাজনদের সঙ্গে বিদেশি কোনো রাষ্ট্রের যোগাযোগ ছিল কি না—সেটিই তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে রয়েছে।












