শহরের তাপমাত্রা কমাতে শুধু গাছ লাগানো বা ছাদে সবুজায়ন করাই যথেষ্ট নয়। শহরের ভেতর দিয়ে বাতাস কতটা স্বাভাবিকভাবে চলাচল করতে পারছে, সেটিও মানুষের তাপ অনুভূতি, বায়ুদূষণ এবং নগরের উষ্ণতা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরিকল্পিত উঁচু ভবন, উঁচু দেয়াল, পডিয়াম ও ঘনবসতি অনেক সময় বাতাসের স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করে। ফলে একই তাপমাত্রাতেও মানুষের কাছে গরম আরও অসহনীয় মনে হতে পারে।
ভারতের বড় শহরগুলোতে ভবনের উচ্চতা বাড়ছে, জনঘনত্বও বাড়ছে। এর সঙ্গে অনেক শহরে গরম দিনের পাশাপাশি আর্দ্রতাও বেশি থাকছে। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় বাতাসকে সরু রাস্তা, ভবনের ফাঁক ও নানা কাঠামোর মধ্য দিয়ে চলাচল করতে হয়। ফলে পথচারীদের কাছে বাতাসের স্বাভাবিক প্রবাহ অনেক কম বলে মনে হতে পারে।
বাতাসের গতি কমে গেলে তাপ অনুভূতির ওপর তার প্রভাব পড়ে। সাধারণত মাটির কাছাকাছি বাতাসে বাষ্পীভবনের কারণে জলীয়বাষ্প জমে থাকে। বাতাস দ্রুত চললে তুলনামূলক শুষ্ক বাতাস এসে সেই আর্দ্র বাতাসকে সরিয়ে দেয়। কিন্তু বাতাস ধীর হলে এই প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হতে পারে। ফলে আর্দ্রতা বেশি অনুভূত হয় এবং গরমের অস্বস্তিও বাড়তে পারে।

বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ১৯৮০-এর দশক থেকে ভূমির কাছাকাছি বাতাসের গতি কমে যাওয়ার একটি প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যাকে ‘টেরেস্ট্রিয়াল স্টিলিং’ বা স্থলভাগে বাতাসের স্থবিরতা বৃদ্ধি বলা হয়। তবে শহরায়নের কারণে এই প্রবণতা কতটা বাড়ছে, তা নিয়ে এখনো পর্যাপ্ত নির্দিষ্ট গবেষণা নেই।
বেঙ্গালুরুর ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট ফর হিউম্যান সেটেলমেন্টসের (আইআইএইচএস) সাসটেইনেবল এনার্জি ল্যাবের পরামর্শক অমৃতরাজ এম এন বলেন, ভূমির কাছাকাছি বাতাসের গতি কমে যাওয়ার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। সাধারণত ভূমি থেকে প্রায় ১০ মিটার উচ্চতার এলাকাকে পৃষ্ঠসংলগ্ন স্তর হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যেখানে শহরের অধিকাংশ পথচারী চলাচল করেন। কয়েক দশক ধরে এই স্তরে বাতাসের গতি কমার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব আলাবামা ইন হান্টসভিলের আবহাওয়াবিদ অ্যারন সেরের মতে, ঘন নগর অবকাঠামো ও উঁচু ভবন বাতাসের স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করে। এতে অশান্ত বায়ুপ্রবাহ বা টার্বুলেন্স তৈরি হয় এবং ভূমির সঙ্গে বাতাসের ঘর্ষণ বাড়ে। এর ফলে মাটির কাছাকাছি বাতাসের গতি কমে যেতে পারে।
শুধু ভবন নয়, শহর থেকে গাছপালা ও জলাভূমি কমে যাওয়াও পরিস্থিতিকে জটিল করে। গাছপালা হারিয়ে গিয়ে যখন তার জায়গায় পিচ ও কংক্রিটের বিস্তার ঘটে, তখন বাষ্পোৎসর্জন কমে যায়। এতে শহরের ‘আরবান হিট আইল্যান্ড’ বা নগর তাপদ্বীপ প্রভাব আরও তীব্র হতে পারে।
অমৃতরাজের মতে, ভবন নির্মাণের সময় এমনভাবে পরিকল্পনা করা সম্ভব, যাতে নির্দিষ্ট উচ্চতায় বাতাস চলাচলের সুযোগ থাকে। কিন্তু বাস্তবে অনেক শহরে এ ধরনের পরিকল্পনা নিয়মিতভাবে অনুসরণ করা হয় না। উঁচু সীমানাপ্রাচীর, পডিয়াম ও অন্যান্য স্থাপনা আগে থেকে থাকা বাতাস চলাচলের পথও আটকে দিতে পারে।
ভারতের মহানগরগুলোতে বিভিন্ন উচ্চতার ভবন অনেক সময় পর্যাপ্ত দূরত্ব না রেখে পাশাপাশি নির্মাণ করা হয়েছে। এর ফলে বাতাসের গতি ও দিক—দুটিই বদলে যেতে পারে। ভবনের আকৃতি ও অবস্থানের ওপর নির্ভর করে কোথাও বাতাস একেবারে আটকে যেতে পারে, আবার কোথাও সরু জায়গা দিয়ে প্রবাহিত হয়ে হঠাৎ দ্রুতগতির ঝাপটা তৈরি করতে পারে।

সরু পথ দিয়ে বাতাসের গতি বেড়ে যাওয়ার এই ঘটনাকে ‘ভেনচুরি প্রভাব’ বলা হয়। লন্ডন ও জয়পুরসহ বিভিন্ন শহরে এর উদাহরণ দেখা গেছে। আবার উঁচু ভবনের গায়ে জোরে বাতাস আঘাত করলে তা ভবনের পাশ দিয়ে নিচের দিকে নেমে আসতে পারে। এই ঘটনাকে ‘ডাউনড্রাফট প্রভাব’ বলা হয়। এর ফলে পথচারী পর্যায়ে হঠাৎ শক্তিশালী বাতাসের ঝাপটা তৈরি হতে পারে।
তবে আইআইএইচএসের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা ও সাসটেইনেবল এনার্জি ল্যাবের প্রধান প্রসাদ বৈদ্য সতর্ক করে বলেছেন, বাতাসের স্থবিরতা নিয়ে গবেষণা থাকলেও গ্রাম ও শহরের মধ্যে এই প্রবণতার পার্থক্য এবং শহরায়নের সরাসরি প্রভাব নির্ধারণের মতো পর্যাপ্ত নির্দিষ্ট গবেষণা এখনো নেই।
শহর উষ্ণ হওয়া, গাছ কমে যাওয়া, জলাশয় হারিয়ে যাওয়া এবং বাতাসের গতি পরিবর্তনের মধ্যে সম্পর্কও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। এসব পরিবর্তনের মধ্যে কোনটি অন্যটির সরাসরি কারণ, তা নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন।
তবে ভবনের বিন্যাসের প্রভাব একেবারে উপেক্ষা করা যায় না। ভবনের উচ্চতা, আকৃতি, চারপাশের কাঠামো ও অবস্থানের ওপর নির্ভর করে কোনো কোনো রাস্তা বাতাস থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে। সেখানে যদি নগর তাপদ্বীপের প্রভাবও থাকে, তাহলে বাতাসের অভাব মানুষের তাপজনিত অস্বস্তি আরও বাড়াতে পারে।
প্রসাদ বৈদ্য বলেন, অপরিকল্পিত উঁচু ভবনের বিন্যাস কম বাতাস চলাচল এবং অতিরিক্ত তাপজনিত চাপের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে—যদিও এর সরাসরি সম্পর্ক নিশ্চিত করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
বাতাসের গতি বোঝার ক্ষেত্রেও তথ্যের ঘাটতি রয়েছে। ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট আহমেদাবাদের জে এস ডব্লিউ স্কুল অব পাবলিক পলিসির সহযোগী অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান যুগাঙ্ক গোয়ালের মতে, প্রথমে একটি মানসম্মত ও সমন্বিত বাতাসের তথ্যভান্ডার তৈরি করা দরকার। কারণ বিভিন্ন জায়গায় বাতাসের গতি মাপার যন্ত্র বা অ্যানিমোমিটার বসানোর পদ্ধতি এক নয়। ফলে বিভিন্ন এলাকার তথ্য সরাসরি তুলনা করা কঠিন হতে পারে।
বাতাস কমে যাওয়ার আরেকটি সমস্যা হলো বায়ুদূষণ। বাতাসের স্বাভাবিক চলাচল কম থাকলে দূষিত কণা ও অন্যান্য দূষক ছড়িয়ে পড়তে বেশি সময় লাগতে পারে। আবার শহরের কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় বাতাস চলাচলের জন্য করিডর তৈরি করলেও সেটি কার্যকর রাখা সহজ নয়।
প্রসাদ বৈদ্য জানান, কম্পিউটারভিত্তিক তরলগতিবিদ্যার মডেল ব্যবহার করে তারা কিছু পরীক্ষা করেছেন। এতে দেখা গেছে, কোনো বাতাস চলাচলের পথ বা করিডরে সামান্য ভবন-পরিবর্তনও বায়ুপ্রবাহের ধরন বদলে দিতে পারে। ছোটখাটো পরিবর্তনের কারণে ঘূর্ণি তৈরি হয়ে করিডরের ভেতর বাতাসের গতি কমে যেতে পারে।
কম্পিউটারভিত্তিক তরলগতিবিদ্যার মডেলকে বলা হয় ‘কম্পিউটেশনাল ফ্লুইড ডায়নামিক্স’। এর মাধ্যমে বিভিন্ন পরিস্থিতিতে তরল বা বাতাসের গতিবিধি কম্পিউটারে বিশ্লেষণ করা হয়। কিন্তু শহরের অশান্ত বায়ুপ্রবাহের সব স্তর ও পরিবর্তন বিশ্লেষণ করতে বিপুল কম্পিউটার ক্ষমতা প্রয়োজন। ফলে এ ধরনের গবেষণা ব্যয়বহুল এবং দক্ষ জনবলের ওপর নির্ভরশীল।

শহরের জটিলতার কারণে ছোট পরিবর্তনও বড় প্রভাব ফেলতে পারে। একটি ভবনের জানালা, ছাউনি কিংবা রাস্তার পাশের ছোট কোনো কাঠামোও বাতাসের গতিপথ বদলে দিতে পারে। তাই শুধু বড় ভবনগুলোর অবস্থান দেখলেই শহরের বায়ুপ্রবাহ পুরোপুরি বোঝা সম্ভব নয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শহর পরিকল্পনায় বাতাস চলাচলের বিষয়টি আরও গুরুত্বের সঙ্গে যুক্ত করা প্রয়োজন। জার্মানির স্টুটগার্ট, দক্ষিণ কোরিয়ার সিউল ও হংকংয়ে শহরের বায়ু চলাচল উন্নত করার জন্য বিভিন্ন ধরনের মূল্যায়ন করা হয়েছে। ভারতের চেন্নাই ও মুম্বাইয়ের মতো শহরেও এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
গোয়ালের মতে, উপগ্রহচিত্র ব্যবহার করে সময়ের সঙ্গে একটি শহরের গঠন কীভাবে বদলেছে, তা বিশ্লেষণ করা যেতে পারে। ভবনের উচ্চতা, খোলা জায়গা, রাস্তা ও অন্যান্য কাঠামোর তথ্য একত্র করে প্রতিটি শহরের জন্য ‘সিটি ভেন্টিলেশন ম্যাপ’ বা নগরের বাতাস চলাচলের মানচিত্র তৈরি করা সম্ভব হতে পারে। পরে এসব মানচিত্র শহরের মহাপরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে।
অর্থাৎ, ভবিষ্যতের শহরকে শুধু কতটা উঁচু বা কতটা ঘন করে নির্মাণ করা হবে—সেই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। কোথা দিয়ে বাতাস ঢুকবে, কোথায় তা আটকে যাবে এবং কীভাবে বাতাস শহরের তাপ ও দূষণ ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করবে—এসব বিষয়ও নগর পরিকল্পনার অংশ হওয়া প্রয়োজন।
শহরকে ঠান্ডা রাখার সমাধান তাই শুধু শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বা আরও বেশি গাছ লাগানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পরিকল্পিত ভবন, খোলা জায়গা, সবুজ ও জলভাগ সংরক্ষণ এবং বাতাস চলাচলের পথ রক্ষা—সবকিছুকে একসঙ্গে বিবেচনা করেই ভবিষ্যতের তাপসহনশীল শহর গড়ে তোলার পথ তৈরি হতে পারে।












