কুড়িগ্রামের ভুরুঙ্গামারী উপজেলায় দুধকুমার নদের ওপর নির্মাণাধীন সোনাহাট সেতুর কাজ সাত বছরেও শেষ হয়নি। জমি অধিগ্রহণ নিয়ে জটিলতার কারণে আটকে আছে সেতুটির নির্মাণকাজ। এ পর্যন্ত প্রকল্পের মেয়াদ ছয়বার বাড়ানো হয়েছে, আর ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৪১ কোটি টাকায়। ফলে সীমান্তবর্তী এলাকার ছয়টি ইউনিয়নের হাজারো মানুষ এবং সোনাহাট স্থলবন্দর দিয়ে পণ্য পরিবহনকারী ভারী যানবাহনকে চলাচল করতে হচ্ছে ১৮৮৭ সালে নির্মিত জরাজীর্ণ রেলসেতুর ওপর দিয়ে। এতে প্রতিদিনই দুর্ঘটনার ঝুঁকি নিয়ে পারাপার হতে হচ্ছে সাধারণ মানুষ ও পণ্যবাহী যানবাহনকে।
সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ) এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, ৬৪৫ মিটার দীর্ঘ সেতুটির মূল কাঠামোর প্রায় ৭৫ শতাংশ নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। ইতিমধ্যে সেতুর ১৪টি স্ল্যাব, ৭০টি গার্ডার ও ১৪টি স্প্যান নির্মাণ করা হয়েছে। পশ্চিম প্রান্তে সংযোগ সড়কের প্রায় এক কিলোমিটার অংশের কাজও শেষ হয়েছে।
তবে পূর্ব প্রান্তে প্রায় ২৮০ মিটার সংযোগ সড়কের নির্মাণকাজ এখনো বন্ধ রয়েছে। বাংলাদেশ রেলওয়ের জমি ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে বিরোধের কারণে জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া আটকে আছে। আর এই জটিলতার কারণেই সেতুর বাকি কাজ শেষ করা সম্ভব হচ্ছে না।
ছয়বার মেয়াদ বাড়লেও শেষ হয়নি কাজ

প্রকল্পের নথি অনুযায়ী, ২০১৮ সালে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) সোনাহাট সেতু নির্মাণ প্রকল্পের অনুমোদন দেয়। তখন প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ১৩৬ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। পরে তা বাড়িয়ে প্রায় ১৪১ কোটি টাকা করা হয়। এমএম বিল্ডার্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড ও ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেডের যৌথ উদ্যোগে গঠিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে নির্মাণকাজের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
২০১৯ সালের ২২ জুলাই সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হয়। ২০২১ সালের ২২ জানুয়ারির মধ্যে কাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু নকশাগত ত্রুটি, নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি, ঠিকাদারের ধীরগতিতে কাজ এবং জমি অধিগ্রহণসংক্রান্ত জটিলতার কারণে নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পটি শেষ করা যায়নি। এরপর ছয়বার মেয়াদ বাড়ানো হলেও সেতুটি এখনো যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া সম্ভব হয়নি।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপক শামীম রেজা জানান, পূর্ব প্রান্তের ২৮০ মিটার সংযোগ সড়কের জমিসংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য সম্প্রতি আন্তমন্ত্রণালয় পর্যায়ে একটি বৈঠক হয়েছে। তবে এখনো কোনো চূড়ান্ত সমাধান পাওয়া যায়নি।
ঝুঁকিপূর্ণ রেলসেতুই ভরসা
নতুন সেতু চালু না হওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দা ও সোনাহাট স্থলবন্দর দিয়ে পাথর, কয়লাসহ বিভিন্ন পণ্য পরিবহনকারী শত শত যানবাহনকে প্রতিদিন পুরোনো রেলসেতুটি ব্যবহার করতে হচ্ছে। এক লেনের এই সেতুর পাটাতন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় যানবাহন চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে। প্রায়ই তৈরি হচ্ছে যানজট, পাশাপাশি বাড়ছে দুর্ঘটনার আশঙ্কা।
স্থানীয় অটোরিকশাচালক আশরাফুল আলম বলেন, পুরোনো সেতুর পাটাতন নষ্ট হয়ে যাওয়ায় স্বাভাবিক পরিস্থিতিতেও পারাপারের জন্য আধা ঘণ্টার বেশি অপেক্ষা করতে হয়। বাজারের দিন দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, সেতু নির্মাণে দীর্ঘসূত্রতার কারণে সীমান্তবর্তী এলাকার যোগাযোগব্যবস্থা ও ব্যবসা-বাণিজ্য মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে পণ্য পরিবহনে বাড়তি সময় লাগায় স্থলবন্দরকেন্দ্রিক বাণিজ্য এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াত কঠিন হয়ে পড়েছে।

আগামী জুনে চালুর আশা
কুড়িগ্রাম সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মীর নিজাম উদ্দিন আহমেদ জানান, সেতুর মূল কাঠামোর প্রায় ৭৫ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। জমি অধিগ্রহণসংক্রান্ত জটিলতা নিরসন করা গেলে দ্রুত বাকি কাজ শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি জানান, সব জটিলতা কাটিয়ে নির্মাণকাজ শেষ করা সম্ভব হলে আগামী বছরের জুনের মধ্যে সেতুটি যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থাৎ, ২০২৬ সালের অক্টোবরের হিসাবে লক্ষ্যটি ২০২৭ সালের জুন।
তবে জমির বিরোধ কবে নিষ্পত্তি হবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। ফলে দীর্ঘদিন ধরে নতুন সেতুর অপেক্ষায় থাকা স্থানীয় মানুষ ও ব্যবসায়ীদের দুর্ভোগ কবে শেষ হবে, তা নির্ভর করছে জমি অধিগ্রহণের জটিলতা নিরসন এবং অবশিষ্ট নির্মাণকাজ দ্রুত শেষ করার ওপর।













