রংপুর নগরের মচ্ছুয়াপাড়া এলাকায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের চার সদস্যকে হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার দুই সন্দেহভাজন সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধা দাসের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ মিলেছে বিভিন্ন আলামতের ডিএনএ পরীক্ষায়। ঘটনাস্থল থেকে সংগ্রহ করা খেজুরের আঁটি, শসার টুকরা, সিগারেটের অবশিষ্টাংশ ও তোয়ালের নমুনা পরীক্ষা করে তাঁদের ডিএনএ পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র।
ঢাকায় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ফরেনসিক পরীক্ষাগারে করা ডিএনএ বিশ্লেষণের প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। তদন্ত কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, খেজুরের আঁটিতে মুগ্ধা দাসের, শসার একটি টুকরায় সিদ্ধার্থ দাসের এবং সিগারেটের অবশিষ্টাংশে দুজনেরই ডিএনএ পাওয়া গেছে। নিহত পৃতিলতা চক্রবর্তীর গলায় প্যাঁচানো তোয়ালের নমুনায়ও মুগ্ধা দাসের ডিএনএ শনাক্ত হয়েছে।
রংপুর মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) পরিদর্শক ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা জিন্নাত আলী বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। রোববার বিকেলে রংপুর মহানগর পুলিশের ডিবি কার্যালয়ে তিনি তদন্তের অগ্রগতি, ফরেনসিক প্রতিবেদন এবং হত্যাকাণ্ডের সম্ভাব্য উদ্দেশ্য সম্পর্কে বিস্তারিত জানান।
জিন্নাত আলী বলেন, ডিএনএ পরীক্ষার প্রতিবেদন, উদ্ধার করা আলামত, আদালতে দেওয়া আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি এবং সাক্ষীদের বক্তব্য বিশ্লেষণ করে চার হত্যাকাণ্ডে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধার সংশ্লিষ্টতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে। তাঁর দাবি, ঘটনাস্থলে নিহত পরিবারের চার সদস্য ও দুই সন্দেহভাজন ছাড়া অন্য কারও ডিএনএর প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
তদন্ত কর্মকর্তা জানান, গত বৃহস্পতিবার ঢাকায় সিআইডি সদর দপ্তর থেকে ডিএনএ পরীক্ষার প্রতিবেদন তাঁদের হাতে পৌঁছায়। এর আগে গত ৩১ আগস্ট ও ১ সেপ্টেম্বর ঘটনাস্থল থেকে সংগ্রহ করা ৩১ ধরনের নমুনা পরীক্ষার জন্য সিআইডির ফরেনসিক পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়েছিল।
এসব নমুনার মধ্যে ছিল খেজুরের আঁটি, শসার টুকরা, ফল কাটার ছুরি, ইয়াবা সেবনে ব্যবহৃত ফয়েল, সিগারেটের অবশিষ্টাংশ, বেসিনের বিভিন্ন দাগ এবং দুই সন্দেহভাজনের রক্তের নমুনা। তদন্তের বিভিন্ন পর্যায়ে এসব আলামত সংগ্রহ করে পরীক্ষার মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করার চেষ্টা চালানো হয়।
তদন্ত কর্মকর্তা আরও জানান, ডিএনএ পরীক্ষার ফল, জব্দ করা আলামত ও অন্যান্য সাক্ষ্যপ্রমাণ পর্যালোচনা করে তদন্তের কাজ শেষ করা হয়েছে। আগামী এক মাসের মধ্যে দুই সন্দেহভাজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হবে বলে তিনি জানান।
ধর্ষণের কোনো প্রমাণ মেলেনি
চার হত্যাকাণ্ডের পর গণপতি চক্রবর্তীর মেয়ে আগমী চক্রবর্তী ও তাঁর স্ত্রী পৃতিলতা চক্রবর্তীর ওপর ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। বিষয়টি নিশ্চিত করতে তদন্তকারীরা দুই নারীর যোনিপথ থেকে সংগ্রহ করা নমুনা ডিএনএ পরীক্ষার জন্য সিআইডির ফরেনসিক পরীক্ষাগারে পাঠান।
তদন্ত কর্মকর্তা জিন্নাত আলী জানান, পরীক্ষার প্রতিবেদনে ধর্ষণের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে তদন্তে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতেই পুলিশ এমন বক্তব্য দিয়েছে।
কীভাবে হত্যা করা হয় পরিবারের চার সদস্যকে
ডিএনএ পরীক্ষার প্রতিবেদন, ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা আলামত, আদালতে দেওয়া দুই সন্দেহভাজনের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি এবং সাক্ষীদের বক্তব্য বিশ্লেষণ করে হত্যাকাণ্ডে প্রত্যেকের কথিত ভূমিকা সম্পর্কে ধারণা পেয়েছেন তদন্তকারীরা।
তদন্ত কর্মকর্তা জিন্নাত আলীর ভাষ্য অনুযায়ী, গণপতি চক্রবর্তীকে সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধা দাস দুজন মিলে হত্যা করেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে। গণপতির স্ত্রী পৃতিলতা চক্রবর্তীকে হত্যার জন্য মুগ্ধা দাসকে দায়ী করা হয়েছে। তাঁদের কলেজপড়ুয়া মেয়ে আগমী চক্রবর্তীকে সিদ্ধার্থ দাস হত্যা করেন বলে তদন্ত কর্মকর্তার দাবি। আর পরিবারের ১২ বছর বয়সী ছেলে আয়ুষ চক্রবর্তীকে দুজন মিলে হত্যা করেন বলে জানানো হয়েছে।
এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পুলিশ আদালতে সাক্ষ্য দেওয়া চারজনের বক্তব্য এবং পুলিশের কাছে জবানবন্দি দেওয়া ৫৬ জনের বক্তব্যও পর্যালোচনা করেছে বলে জানান তদন্ত কর্মকর্তা।
তবে অভিযোগপত্র আদালতে দাখিল এবং বিচারিক প্রক্রিয়ায় প্রমাণ যাচাইয়ের আগে এসব অভিযোগকে তদন্তে উঠে আসা বক্তব্য হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে। মামলার চূড়ান্ত দায় নির্ধারণ করবেন আদালত।












