ভারতে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) স্থগিত এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে অপসারণের দাবিতে আন্দোলন অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী। তাঁর ভাষ্য, আদালত বা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর না করে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের দাবিতে রাজনৈতিক ও জনতার প্রতিরোধ চলবে।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) নয়াদিল্লিতে বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতা, ছাত্রনেতা ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে এক বৈঠকে তিনি এ অবস্থান জানান। চা-চক্রের আয়োজন করে আন্দোলনের পরবর্তী কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করেন রাহুল। এর আগের দিন এসআইআর বন্ধের দাবিতে সুপ্রিম কোর্টের উদ্দেশে মিছিল করে আবেদন জমা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিলেন আন্দোলনকারীরা।
উৎসবের বিরতিতেও চলবে আন্দোলন
বৈঠক-সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে দ্য হিন্দু জানিয়েছে, নবরাত্রি ও দুর্গাপূজার কারণে বড় আকারের কর্মসূচিতে সাময়িক বিরতি আসতে পারে। তবে আন্দোলন বন্ধ হবে না। আপাতত দিল্লিকে আন্দোলনের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে। বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’র শরিক দলগুলো যৌথ কর্মসূচি ঠিক করতে প্রতিদিন নিজেদের মধ্যে সমন্বয় করবে।
রাহুল গান্ধী বলেন, সুপ্রিম কোর্ট, ভারতের প্রধান বিচারপতি ও বিচারব্যবস্থার প্রতি তাঁদের গভীর শ্রদ্ধা রয়েছে। তাঁরা আশা করেন, বিচারব্যবস্থা যথাযথ ভূমিকা পালন করবে। তবে রাজনৈতিক প্রতিরোধের ভবিষ্যৎ কেবল আদালতের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল নয়। তাঁর দাবি, যে প্রতিষ্ঠানই ভূমিকা রাখুক বা না রাখুক, রাজনৈতিক ও জনতার প্রতিরোধ অব্যাহত থাকবে এবং শেষ পর্যন্ত সফল হবে।
বৈঠকে ১৬টি বিরোধী দলের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন সিপিআইএমের এম এ বেবি, সিপিআইয়ের ডি রাজা ও পি সান্থোষ কুমার, রাষ্ট্রীয় জনতা দলের তেজস্বী যাদব ও মনোজ ঝা, সমাজবাদী পার্টির প্রতিনিধিরা, শিবসেনা (ইউবিটি) নেতা সঞ্জয় রাউত এবং তৃণমূল কংগ্রেসের মহুয়া মৈত্র ও সাগরিকা ঘোষ। কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে, সোনিয়া গান্ধী, প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভদ্র এবং কে সি বেণুগোপালও উপস্থিত ছিলেন। ছাত্রনেতা নেহা বোরা ও আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণ বৈঠকে যোগ দেন।
‘ভোট চুরি’র অভিযোগে কঠোর বার্তা
রাহুল গান্ধী অভিযোগ করেন, ভারতের সংবিধান ও নির্বাচনী ব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে এ ঘটনার প্রধান পরিকল্পনাকারী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে বাস্তবায়নকারী এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারসহ অন্যদের দায়ী করে তিনি বলেন, তাঁদের বিচারের মুখোমুখি করার ব্যাপারে বিরোধীদের অঙ্গীকার রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
বৈঠকে জনসমাবেশের জন্য নির্ধারিত দিল্লির যন্তর মন্তরকে প্রতিবাদস্থল হিসেবে ব্যবহারের অনুমতি বাতিলের বিষয়টিও আলোচনায় আসে। বিরোধী নেতারা সিদ্ধান্তটির বিরোধিতা করে স্থানটি পুনরুদ্ধারের অঙ্গীকার করেন।
রাহুল বলেন, গণতান্ত্রিক দাবি ও প্রতিবাদ প্রকাশের গুরুত্বপূর্ণ জায়গা ছিল যন্তর মন্তর। সেটি ব্যবহারের সুযোগ বন্ধ করার সিদ্ধান্তকে তাঁরা চ্যালেঞ্জ করবেন। তেজস্বী যাদব একে ক্ষমতাসীন দলের ভয়ের বহিঃপ্রকাশ বলে মন্তব্য করেন। এম এ বেবি অভিযোগ করেন, আগে ভোট চুরি, এখন প্রতিবাদের স্থান কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে। ডি রাজাও যন্তর মন্তর ফিরে পাওয়ার লড়াই চালানোর কথা জানান।
বেঙ্গালুরুতে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
এদিকে কর্ণাটকের বেঙ্গালুরুতে এসআইআরের বিরুদ্ধে বিক্ষোভকারীদের ওপর পুলিশের পদক্ষেপ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন রাজ্যটির মুখ্যমন্ত্রী ডি কে শিবকুমার। সোমবার কর্ণাটকের প্রধান নির্বাচন কর্মকর্তার কার্যালয়ের দিকে মিছিল করার চেষ্টা করলে শতাধিক ব্যক্তিকে আটক করে পুলিশ। ওই দিন বিক্ষোভকারীদের পাশাপাশি সাংবাদিক ও আলোকচিত্রীদের সঙ্গে পুলিশের দুর্ব্যবহারের অভিযোগও ওঠে।
শিবকুমার জানান, ঘটনাটির বিষয়ে তিনি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন চেয়েছেন। অপ্রয়োজনীয় বলপ্রয়োগ বা বাড়াবাড়ি হয়ে থাকলে দায়ীদের জবাবদিহি করতে হবে বলেও সতর্ক করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ গণতন্ত্রের মৌলিক অধিকার; দিল্লিতে যে অধিকার দাবি করা হচ্ছে, বেঙ্গালুরুতে তা অস্বীকার করা যায় না।
কর্ণাটকের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিয়াঙ্ক খাড়গেও শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে বাধা না দিতে পুলিশকে নির্দেশ দেওয়ার কথা জানান। তাঁর মতে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি নাগরিকদের ভয়হীনভাবে মতভিন্নতা প্রকাশের পরিবেশ নিশ্চিত করাও প্রশাসনের দায়িত্ব।












