চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম সাড়ে তিন মাসে দেশে প্রায় ১ হাজার কোটি ডলারের প্রবাসী আয় এসেছে। অর্থাৎ অঙ্কটি ১০ বিলিয়ন ডলারের ঘরে পৌঁছেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্যে এ চিত্র উঠে এসেছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রবাসী আয় বেড়েছে প্রায় ১৩ শতাংশ। শুধু অক্টোবরের প্রথম দুই সপ্তাহেই এসেছে ১৪০ কোটি ডলারের বেশি। মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতার মধ্যেও এই প্রবৃদ্ধি অর্থনীতির জন্য স্বস্তির খবর। প্রবাসী আয়ের হিসাব প্রায় প্রতিদিন হালনাগাদ হয়, তাই চূড়ান্ত অঙ্ক কিছুটা বদলাতে পারে। অর্থনীতির নানা সূচকে চাপের মধ্যে প্রবাসী আয় তাই বড় ভরসা হয়ে আছে।
গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে সাড়ে ৩৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি প্রবাসী আয় এসেছিল। এক অর্থবছরে এটিই ছিল দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। চলতি অর্থবছরের শুরুটাও সেই ধারা ধরে রেখেছে। প্রথম সাড়ে তিন মাসের এই গতি বজায় থাকলে বছর শেষে আরেকটি বড় অঙ্ক দেখা যেতে পারে। তবে সামনের মাসগুলোর চিত্র নির্ভর করবে বিদেশে কর্মসংস্থান আর আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির ওপর। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এবারের শুরুটা আরও শক্তিশালী।
প্রবাসী আয়ের এই প্রবাহ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকেও সহায়তা দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের বা আইএমএফের হিসাব পদ্ধতি অনুযায়ী অক্টোবরের মাঝামাঝি রিজার্ভ ছিল প্রায় ৩ হাজার ১৪০ কোটি ডলার। আমদানির দাম মেটানো, বিদেশি ঋণ শোধ আর টাকার মান স্থিতিশীল রাখতে রিজার্ভ খুব গুরুত্বপূর্ণ। রপ্তানি আয়ের পাশাপাশি প্রবাসী আয়ই দেশের বৈদেশিক মুদ্রার সবচেয়ে বড় উৎস। তাই প্রবাসী আয় বাড়লে সরাসরি স্বস্তি পায় পুরো অর্থনীতি। রিজার্ভ শক্ত থাকলে আমদানিকারকদের ডলার পেতে কম ঝামেলা হয়। এতে জ্বালানি, সার ও খাদ্যপণ্য আমদানিও সহজ হয়। সাধারণ মানুষের কাছে এর মানে বাজারে জিনিসপত্রের সরবরাহ ঠিক থাকা।
এই অর্থের পেছনে আছেন সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রসহ নানা দেশে কাজ করা লাখো বাংলাদেশি। তাঁদের পাঠানো টাকায় গ্রামের পরিবারগুলোর সংসার চলে, সন্তানের পড়াশোনা হয়, নতুন ঘর ওঠে। তবে সামনে কিছু ঝুঁকিও আছে। সৌদি আরবের বিমানবন্দরে হামলার পর বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স রিয়াদ ও দাম্মামের ফ্লাইট রবিবার পর্যন্ত স্থগিত রেখেছে। এতে নতুন কর্মী ও ছুটিতে আসা প্রবাসীদের যাতায়াতে ভোগান্তি হচ্ছে। অন্যদিকে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ আবার শুরুর ঘোষণা এসেছে, যা সামনে প্রবাসী আয়ে সহায়ক হতে পারে। ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সও ২১ অক্টোবর পর্যন্ত ঢাকা-রিয়াদ ফ্লাইট বাতিল করেছে। যাত্রীরা এখন জেদ্দা ও মদিনা হয়ে সৌদি আরবে যাচ্ছেন। বিদেশে কাজ করা অনেক কর্মী মাসের আয়ের বড় অংশই দেশে পরিবারের কাছে পাঠান।
প্রবাসী আয় বেড়েছে, তবে এর ধারাবাহিকতা কয়েকটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করবে। বৈধ পথে টাকা পাঠানো সহজ ও লাভজনক রাখা দরকার। বিদেশে যাওয়ার খরচ কমানো এবং দক্ষ কর্মী পাঠানো বাড়ানোও জরুরি। প্রবাসীরা হুন্ডি এড়িয়ে ব্যাংক বা অনুমোদিত মোবাইল আর্থিক সেবায় টাকা পাঠালে সেই অর্থ সরাসরি রিজার্ভে যোগ হয়। প্রবাসী আয় বেড়েছে, এই খবর তাই শুধু সংখ্যার নয়, লাখো পরিবারের ভরসারও খবর। সরকারের সামনে তাই দুটি কাজ: নতুন শ্রমবাজার খোলা এবং পুরোনো বাজারে কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।












