আফ্রিকার দেশ সুদানে খাদ্যনিরাপত্তা পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি এবং আগামী কয়েক মাসে দুর্ভিক্ষ দেখা দেওয়ার আশঙ্কায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েক ডজন দেশ। যুদ্ধকবলিত মানুষের কাছে জরুরি খাদ্য ও মানবিক সহায়তা পৌঁছে দিতে সংঘাতের পক্ষগুলোকে বাধা দূর করার আহ্বান জানিয়েছে তারা। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সহায়তার অর্থায়ন বাড়ানো এবং সুদানের ভয়াবহ খাদ্যসংকট মোকাবিলায় আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যক্রমের ধরন পরিবর্তনের অনুরোধ জানানো হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর প্রকাশিত এক যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সুদানে খাদ্যনিরাপত্তার পরিস্থিতি উদ্বেগজনকভাবে খারাপ হচ্ছে। আগামী কয়েক মাসে দুর্ভিক্ষের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করেছে জাতিসংঘ-সমর্থিত খাদ্যনিরাপত্তা পর্যবেক্ষণব্যবস্থা। এই পরিস্থিতিতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, সুদানের মানুষের দুর্ভোগ কমানোর ক্ষেত্রে সংঘাতে জড়িত পক্ষগুলোরই প্রধান দায়িত্ব রয়েছে। মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর পথে সব ধরনের বাধা দূর করতে তাদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।
যৌথ বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারী দেশ ও প্রতিনিধিদের মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি এবং ইউরোপীয় কমিশনের সমতা, প্রস্তুতি ও সংকট ব্যবস্থাপনাবিষয়ক কমিশনার। তারা মনে করছে, পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আগেই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
যুদ্ধ ও খরায় বাড়ছে খাদ্যসংকট
সুদানের সেনাবাহিনী এবং আধাসামরিক বাহিনী র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসের (আরএসএফ) মধ্যে ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে সংঘর্ষ চলছে। বেসামরিক শাসনে উত্তরণের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দুই বাহিনীকে কীভাবে একীভূত করা হবে, তা নিয়ে বিরোধের জেরে যুদ্ধ শুরু হয়।
দীর্ঘস্থায়ী এই সংঘাত দেশটির কৃষি, খাদ্য সরবরাহ ও সাধারণ মানুষের জীবিকাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে বহু কৃষক সময়মতো ফসল কাটতে পারেননি। এর সঙ্গে সাম্প্রতিক খরা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ফলে খাদ্যের উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি দরিদ্র মানুষের জন্য খাবার সংগ্রহ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
জাতিসংঘ-সমর্থিত বৈশ্বিক খাদ্যসংকট পর্যবেক্ষণব্যবস্থা ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি ফেজ ক্লাসিফিকেশন (আইপিসি) গত জুনে জানিয়েছিল, সুদানে ৫১ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্যসংকটের মুখে রয়েছে। নতুন করে দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় পরিস্থিতি মোকাবিলায় আরও দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর পথ খুলে দেওয়ার দাবি
যৌথ বিবৃতিতে সংঘাতের পক্ষগুলোকে দেশের ভেতরে যুদ্ধরত বিভিন্ন এলাকার মধ্য দিয়ে এবং সীমান্ত পেরিয়ে মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর সব পথ ব্যবহারের অনুমতি দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। বিশেষ করে দারফুর অঞ্চলে আকাশপথে সহায়তা পৌঁছানোর সুযোগ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া সুদানের বিভিন্ন এলাকায় মানবিক সহায়তাকর্মীদের উপস্থিতি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলা থেকে বিরত থাকারও আহ্বান জানিয়েছে দেশগুলো। যুদ্ধের মধ্যে ত্রাণকর্মীদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে খাদ্য, ওষুধ ও অন্যান্য জরুরি সহায়তা পৌঁছানো আরও কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর গত মাসে বলেছিল, সুদানের সেনাবাহিনী, আরএসএফ কিংবা তাদের কোনো নেতাই দেশটির বৈধ সাংবিধানিক শাসনের প্রতিনিধিত্ব করেন না। এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে ওয়াশিংটন সংঘাতে জড়িত কোনো পক্ষকেই সুদানের বৈধ সাংবিধানিক সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে স্বীকৃতি না দেওয়ার অবস্থান তুলে ধরেছে।
বাস্তুচ্যুতি ও জাতিগত সহিংসতায় বিপর্যস্ত সুদান
যুদ্ধের কারণে সুদানে ১ কোটি ৪০ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। অনেক মানুষ বাড়িঘর ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটতে বাধ্য হয়েছে। একই সঙ্গে দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে জাতিগত বিদ্বেষ থেকে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনাও সামনে এসেছে।
জাতিসংঘের একটি তদন্তে গত জুলাইয়ে বলা হয়, আরএসএফ গত বছর অবরোধের পর দখল করা একটি শহরে ব্যাপক হত্যাকাণ্ড, ধর্ষণ ও জোরপূর্বক অনাহারে রাখার মতো ঘটনা ঘটিয়েছে। তদন্তকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব কর্মকাণ্ড পরিকল্পিত নীতির অংশ ছিল এবং তা গণহত্যার পর্যায়ে পড়তে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
ওয়াশিংটনও আরএসএফের বিরুদ্ধে গণহত্যা এবং সুদানের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ তুলেছে। তবে উভয় পক্ষই এর আগে নিজেদের বিরুদ্ধে ওঠা নির্যাতন ও অন্যান্য অপরাধের অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
যুদ্ধ, খরা ও খাদ্যসংকটের সম্মিলিত প্রভাবে সুদানের সাধারণ মানুষের জীবন ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সর্বশেষ আহ্বানের মূল লক্ষ্য হলো, দুর্ভিক্ষের ঝুঁকি আরও বাড়ার আগেই মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর বাধা দূর করা, ত্রাণের অর্থায়ন বাড়ানো এবং সংঘাতকবলিত মানুষের জীবন রক্ষায় জরুরি পদক্ষেপ নিশ্চিত করা।












