খুলনায় একের পর এক হত্যাকাণ্ড, গুলিবর্ষণ, ছুরিকাঘাত ও অন্যান্য সহিংসতার ঘটনা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। গত সেপ্টেম্বর মাসে নগরীর সোনাডাঙ্গায় এক যুবককে ছুরিকাঘাতে হত্যা, হরিণটানায় বিশ্ববিদ্যালয়শিক্ষার্থীর মৃত্যু, সুন্দরবনের কয়রা এলাকায় দুই জেলেকে কুপিয়ে জখম এবং রূপসায় গুলিবিদ্ধ এক যুবকের মরদেহ উদ্ধারের মতো ঘটনা জননিরাপত্তার প্রশ্নকে সামনে এনেছে। এসব ঘটনার পেছনে রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপট। তবে অপরাধের ধরন, তদন্তের অগ্রগতি এবং একের পর এক হত্যাকাণ্ডের ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
জেলার অপরাধ পরিস্থিতির একটি চিত্র পাওয়া যায় জেলা পুলিশের পরিসংখ্যানে। ৭ অক্টোবর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৬ সালের প্রথম নয় মাসে খুলনা জেলায় ৩৩টি হত্যা মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে রূপসা, পাইকগাছা, দিঘলিয়া ও কয়রা—এই চার উপজেলায় ২৪টি মামলা হয়েছে। শুধু রূপসাতেই নথিভুক্ত হয়েছে ১১টি হত্যা মামলা। পুলিশের হিসাবে, ৩৩টি মামলার মধ্যে ২৫টির রহস্য উদ্ঘাটন করা হয়েছে; বাকি আটটির তদন্ত তখনো শেষ হয়নি।
সেপ্টেম্বরে সহিংসতার নানা চিত্র
৯ সেপ্টেম্বর রাতে খুলনা মহানগরীর সোনাডাঙ্গা এলাকায় মুস্তাকিন নামে ২৮ বছর বয়সী এক যুবককে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। তালুকদার কমিউনিটি সেন্টারের কাছে তাঁর ওপর ধারালো অস্ত্র নিয়ে হামলা চালানো হয় বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। পুলিশ হত্যার কারণ অনুসন্ধান ও জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে তদন্ত শুরু করে।
এর কয়েক দিন পর, ১৫ সেপ্টেম্বর সুন্দরবনের কয়রা এলাকায় নৌকায় ঘুমিয়ে থাকা দুই জেলেকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর আহত করা হয়। কাঁকড়া আহরণ শেষে তাঁরা নৌকায় বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। পরে তাঁদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হয়। হামলাকারীদের তাৎক্ষণিকভাবে শনাক্ত করা যায়নি। ঘটনাটি শুধু অপরাধের ঝুঁকিই নয়, সুন্দরবনে জীবিকার জন্য যাওয়া জেলেদের নিরাপত্তার বিষয়টিও সামনে আনে।
১৯ সেপ্টেম্বর হরিণটানা এলাকায় নর্থ ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী মো. আজমল হোসেনের মৃত্যু আরেকটি উদ্বেগজনক ঘটনা হয়ে ওঠে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, একটি ছাত্রাবাসে মারধরের অভিযোগ ওঠার পর তাঁকে গুরুতর আহত অবস্থায় পাওয়া যায়। পরে হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়। প্রাথমিক প্রতিবেদনে খাবার নিয়ে বিরোধের অভিযোগ উঠে এলেও ঘটনার প্রকৃত কারণ, অভিযুক্তদের ভূমিকা ও মৃত্যুর পরিস্থিতি তখনো তদন্তাধীন ছিল। তদন্তে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত এসব অভিযোগকে নিশ্চিত ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
মাসের শেষ দিকে, ২৮ সেপ্টেম্বর রূপসা উপজেলার ইলাইপুর-মোমিনবাগ এলাকার একটি মাছের ঘের থেকে বাপ্পি ওরফে কলম বাপ্পির গুলিবিদ্ধ মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ জানায়, তাঁর শরীরে গুলির চিহ্ন এবং মাথায় আঘাতের চিহ্ন ছিল। হত্যার উদ্দেশ্য ও জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
পারিবারিক বিরোধ থেকে গুলিবর্ষণ—অপরাধের নানা ধরন
হত্যার সংখ্যা পরিস্থিতির একটি দিক তুলে ধরে; অপরাধের ধরন ও কারণও সমান গুরুত্বপূর্ণ। জেলা পুলিশের তথ্য উদ্ধৃত করে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, বছরের প্রথম নয় মাসে নথিভুক্ত ৩৩টি হত্যা মামলার মধ্যে ১১টি পারিবারিক বিরোধের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। সাতটি ঘটনায় আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করা হয়। আরও নয়টি ঘটনা মাদক, চুরি-ছিনতাই কিংবা তখনো নিশ্চিত না হওয়া কারণের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, সব হত্যাকাণ্ডের পেছনে একই ধরনের বিরোধ বা উদ্দেশ্য কাজ করেনি। পারিবারিক দ্বন্দ্ব থেকে শুরু করে মাদক-সংশ্লিষ্ট অপরাধ এবং আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার—প্রতিটি ক্ষেত্রেই ঘটনার প্রেক্ষাপট আলাদাভাবে তদন্ত করা জরুরি। অপরাধের উদ্দেশ্য শনাক্ত করা এবং অভিযুক্তদের বিচারের আওতায় আনা না গেলে শুধু মামলা নথিভুক্ত হওয়ার সংখ্যা দিয়ে পরিস্থিতির প্রকৃত চিত্র বোঝা সম্ভব নয়।
এ ক্ষেত্রে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ: খুলনা মহানগর ও জেলার অপরাধের পরিসংখ্যান এক নয়। মহানগর পুলিশের আওতাধীন এলাকা এবং জেলা পুলিশের আওতাধীন উপজেলাগুলোর হিসাব আলাদা। তাই অপরাধের প্রবণতা মূল্যায়নের সময় কোন এলাকার তথ্য, কোন সময়সীমা এবং কোন ধরনের অপরাধ গণনা করা হচ্ছে, তা স্পষ্ট রাখা প্রয়োজন।
অভিযান চলছে, তবু থামছে না হত্যাকাণ্ড
অপরাধ দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অভিযান জোরদার করেছে। ৭ অক্টোবর বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়, রূপসা, দিঘলিয়া, তেরখাদা ও বটিয়াঘাটা উপজেলায় যৌথ বিশেষ অভিযান শুরু হয়েছে। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং মাদক-সংশ্লিষ্ট অপরাধ দমন ছিল অভিযানের প্রধান লক্ষ্য।
জেলা পুলিশ সুপারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ওই সময় পর্যন্ত জেলায় ৩৫টি হত্যাকাণ্ডের তথ্য পাওয়া গিয়েছিল। এর মধ্যে ২৫টির রহস্য উদ্ঘাটন হয়েছে এবং বাকি ১০টির কারণ তখনো নিশ্চিত হয়নি। এই সংখ্যা একই দিনে প্রকাশিত অন্য একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা ৩৩টি হত্যা মামলার হিসাবের সঙ্গে মেলে না। দুটি পরিসংখ্যানের সময়সীমা, সংজ্ঞা বা গণনার পদ্ধতিতে পার্থক্য থাকতে পারে। তাই যাচাই ছাড়া এগুলোকে একই হিসাব হিসেবে ধরা ঠিক হবে না।
অক্টোবরের শুরুতেও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ৫ অক্টোবর রূপসায় আখতার ঢালী নামে এক ব্যক্তিকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এর আগে ১৫ আগস্ট তাঁর ছেলে জয় ঢালীকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। আখতার ঢালীর হত্যার উদ্দেশ্য তখনো নিশ্চিত হয়নি বলে পুলিশ জানিয়েছিল। বাবা ও ছেলের পরপর হত্যাকাণ্ড স্থানীয় নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। তবে তদন্তে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত দুটি ঘটনার মধ্যে সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে বলে ধরে নেওয়া যাবে না।
নিরাপত্তা ফেরাতে প্রয়োজন কার্যকর তদন্ত
খুলনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামাল দিতে অভিযান গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে অপরাধ নিয়ন্ত্রণের জন্য শুধু অভিযান যথেষ্ট নয়। হত্যাকাণ্ডের রহস্য দ্রুত উদ্ঘাটন, অবৈধ অস্ত্রের উৎস শনাক্ত, অপরাধী চক্রের কার্যক্রম অনুসন্ধান এবং মামলার তদন্তের অগ্রগতি নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে পারিবারিক বিরোধ, মাদক-সংশ্লিষ্ট সংঘাত ও স্থানীয় দ্বন্দ্ব থেকে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি চিহ্নিত করতে হবে।
রূপসা, দিঘলিয়া, তেরখাদা ও বটিয়াঘাটার মতো এলাকায় অপরাধ দমনে মহানগর ও জেলা পুলিশের সমন্বয়ও গুরুত্বপূর্ণ। অপরাধী শনাক্ত, তথ্য বিনিময় এবং এক এলাকার অপরাধের সঙ্গে অন্য এলাকার সম্ভাব্য যোগসূত্র যাচাইয়ে কার্যকর সমন্বয় তদন্তকে আরও গতিশীল করতে পারে।
সব মিলিয়ে, সেপ্টেম্বরের হত্যাকাণ্ড ও অন্যান্য সহিংসতার ঘটনাগুলো খুলনায় জননিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের বাস্তব ভিত্তি তুলে ধরে। তবে পরিস্থিতির কতটা অবনতি হয়েছে, তা নির্ধারণে বিচ্ছিন্ন ঘটনাগুলোর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি অপরাধের পরিসংখ্যান, মামলার নিষ্পত্তি, তদন্তের অগ্রগতি এবং অপরাধ পুনরাবৃত্তির তথ্যও প্রয়োজন। মানুষের নিরাপত্তাবোধ ফিরিয়ে আনতে দৃশ্যমান অভিযানের সঙ্গে কার্যকর তদন্ত, অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।












