অ্যাপলের প্রথম ভাঁজ করা স্মার্টফোন আইফোন ডু বাজারে আসার কয়েক দিনের মধ্যেই পর্দায় ত্রুটির অভিযোগ উঠেছে। সমস্যার কথা স্বীকার করে অল্পসংখ্যক ফোনের ভেতরের পর্দায় ত্রুটি দেখা দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানটি। একই সঙ্গে যেসব গ্রাহকের ফোনে এ সমস্যা দেখা দিয়েছে, তাঁদের অ্যাপলের সঙ্গে যোগাযোগ করে ফোন বদলে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
গত সপ্তাহে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অ্যাপলের দোকানগুলোতে ক্রেতাদের ভিড়ের মধ্য দিয়ে আইফোন ডুর যাত্রা শুরু হয়। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর বাজারে আসা এই ফোনকে ঘিরে প্রযুক্তিপ্রেমীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু বিক্রি শুরুর কয়েক দিনের মধ্যেই পর্দার ত্রুটি নিয়ে অভিযোগ ওঠায় নতুন এই পণ্যটির নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত কয়েকটি ছবিতে ফোনটির ভাঁজ করা পর্দার ডান পাশে একাধিক রেখা দেখা গেছে। কোনো কোনো ব্যবহারকারী পর্দার মাঝের ভাঁজ বরাবর ফাটল দেখা দেওয়ার অভিযোগও করেছেন। আবার ফোনটি খোলার সময় ভেতর থেকে মচমচ শব্দ হওয়ার কথাও জানিয়েছেন কয়েকজন গ্রাহক।
আইফোন ডুর একজন ব্যবহারকারী জাস্টিন লোকোস তাঁর ফোনের পর্দার ডান পাশে রেখার ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন। পরে তিনি ত্রুটিযুক্ত ফোনটির পাশে নতুন একটি ফোনের ছবিও পোস্ট করেন। নিউইয়র্কের একটি অ্যাপল স্টোর থেকে ফোন বদলে নিতে সহায়তা পাওয়ায় তিনি প্রতিষ্ঠানটির প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।
অ্যাপল জানিয়েছে, অল্পসংখ্যক আইফোন ডুর ভেতরের পর্দায় সমস্যা দেখা দেওয়ার বিষয়টি তাদের নজরে এসেছে। তবে ঠিক কতটি ফোনে ত্রুটি রয়েছে, সে বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটি কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা প্রকাশ করেনি। ফলে সমস্যাটি কতটা বিস্তৃত, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সব ছবিকেও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা যাচ্ছে না। কিছু ছবি এআই দিয়ে তৈরি হয়ে থাকতে পারে বলে সন্দেহ রয়েছে। তাই প্রকাশিত ছবির ভিত্তিতে আইফোন ডুর পুরো উৎপাদনপ্রক্রিয়ায় ত্রুটি রয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইডিসির প্রযুক্তি বিশ্লেষক ফ্রান্সিসকো জেরোনিমো বলেন, অ্যাপলের মতো বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের প্রকৌশলগত দক্ষতা ও সরবরাহব্যবস্থা অত্যন্ত শক্তিশালী হলেও ভাঁজ করা ফোন তৈরির ক্ষেত্রে নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তাঁর মতে, প্রাথমিক পর্যায়ে যেসব সমস্যার খবর পাওয়া যাচ্ছে, তা দেখিয়ে দিচ্ছে যে এই প্রযুক্তিতে দক্ষতা অর্জনের জন্য অ্যাপলকেও কঠিন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে।
দামি ফোন, জটিল প্রযুক্তি
আইফোন ডুর ভেতরের পর্দার আকার ৭ দশমিক ৬ ইঞ্চি বা প্রায় ১৯ দশমিক ৩ সেন্টিমিটার। পর্দাটিকে মাঝখানের একটি বিশেষ কবজার সাহায্যে ভাঁজ ও খোলা যায়। এই কাঠামো তৈরিতে জটিল প্রকৌশলপ্রযুক্তি ব্যবহার করতে হয়। ফলে পর্দার স্থায়িত্ব ও ভাঁজের জায়গায় ত্রুটি দেখা দেওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
ভাঁজ করা ফোনের ক্ষেত্রে এ ধরনের সমস্যা অবশ্য নতুন নয়। ২০১৯ সালে স্যামসাংয়ের প্রথম ভাঁজ করা ফোন গ্যালাক্সি ফোল্ড বাজারে আসার পরও একই ধরনের সমস্যার মুখে পড়েছিল। পর্যালোচকদের কয়েকজনের ব্যবহৃত ফোনের পর্দায় ত্রুটি দেখা দেওয়ায় তখন পণ্যটি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়।
অ্যান্ড্রয়েড ব্যবহারকারীদের জন্য এরই মধ্যে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ভাঁজ করা ফোনের একাধিক বিকল্প রয়েছে। অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো যখন এই প্রযুক্তির বাজারে নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছে, তখন অ্যাপলও দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা ও উন্নয়নের পর আইফোন ডু নিয়ে এসেছে।
যুক্তরাজ্যে আইফোন ডুর প্রারম্ভিক দাম ১ হাজার ৯৯৯ পাউন্ড, যা মার্কিন মুদ্রায় প্রায় ২ হাজার ৬৬৮ ডলার। আর সর্বোচ্চ সুবিধাসম্পন্ন সংস্করণটির দাম ৩ হাজার ১৯৯ পাউন্ড পর্যন্ত। ফলে এটি অ্যাপলের ইতিহাসে সবচেয়ে দামি আইফোন।
এত বেশি দামের একটি ফোনে পর্দার ত্রুটির অভিযোগ ক্রেতাদের প্রত্যাশা ও আস্থার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে অ্যাপল আইফোন ডুকে প্রচলিত ভাঁজ করা ফোনের একটি উন্নত ও উচ্চমূল্যের বিকল্প হিসেবে তুলে ধরেছে।
জেরোনিমোর মতে, নতুন প্রজন্মের এই ফোনে দেখা দেওয়া প্রাথমিক সমস্যাগুলো অ্যাপল কীভাবে সামলায়, তার ওপর ভাঁজ করা ফোনের বাজারে ক্রেতাদের আস্থা অনেকটাই নির্ভর করবে। শুধু আইফোন ডুর বিক্রিই নয়, এ ধরনের ফোন সম্পর্কে ক্রেতাদের ভবিষ্যৎ ধারণাও এর দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, অ্যাপলের বড় গ্রাহকভিত্তি এবং বিস্তৃত খুচরা বিক্রয়কেন্দ্রের নেটওয়ার্ক রয়েছে। ফলে ত্রুটিযুক্ত ফোন দ্রুত বদলে দেওয়ার সুযোগও প্রতিষ্ঠানটির আছে। তবে ৩০ অক্টোবর আরও ২৮টি বাজারে ফোনটি ছাড়ার আগে ওয়ারেন্টি ও ফোন বদলে দেওয়ার নীতি সম্পর্কে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া জরুরি।
অ্যাপলের নকশায় বড় পরিবর্তন
আইফোন ডু অ্যাপলের স্মার্টফোনের নকশায় প্রায় দুই দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনগুলোর একটি। প্রতিষ্ঠানটির নতুন প্রধান নির্বাহী জন টার্নাস সেপ্টেম্বরে টিম কুকের কাছ থেকে দায়িত্ব নেওয়ার পর এই ফোনটি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
ফোনটি বন্ধ অবস্থায় দেখতে তুলনামূলক চওড়া আইফোনের মতো। কিন্তু খুললে এটি ছোট ট্যাবলেট কম্পিউটারের মতো বড় পর্দার একটি যন্ত্রে পরিণত হয়। ফোন ও ট্যাবলেটের সুবিধা একই যন্ত্রে দেওয়ার লক্ষ্যেই এই নকশা তৈরি করা হয়েছে।
গত মাসে ক্যালিফোর্নিয়ায় অ্যাপলের সদর দপ্তরে ফোনটি পরিচয় করিয়ে দেওয়ার সময় টার্নাস বলেছিলেন, অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর কিছু ভাঁজ করা ফোনকে তাঁর কাছে পাশাপাশি জোড়া লাগানো দুটি ফোনের মতো মনে হয়েছে। আইফোন ডুর মাধ্যমে ভাঁজ করা ফোন ব্যবহারের অভিজ্ঞতাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করার লক্ষ্য রয়েছে বলে জানান তিনি।
তবে নতুন নকশা ও প্রযুক্তির এই উচ্চাকাঙ্ক্ষা বাস্তবে কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করছে ফোনটির স্থায়িত্ব, ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতা এবং বিক্রয়-পরবর্তী সেবার ওপর। বাজারে আসার পরপরই পর্দার ত্রুটি নিয়ে ওঠা অভিযোগ তাই অ্যাপলের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ত্রুটিযুক্ত ফোন বদলে দেওয়ার উদ্যোগে গ্রাহকদের তাৎক্ষণিক সমস্যা কিছুটা কমতে পারে। তবে ঠিক কতজন ব্যবহারকারী সমস্যায় পড়েছেন, ত্রুটির মূল কারণ কী এবং ভবিষ্যতের উৎপাদিত ফোনগুলোতে একই সমস্যা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি। নতুন বাজারে প্রবেশের এই পর্যায়ে এসব বিষয়ে স্বচ্ছতা বজায় রাখাই অ্যাপলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হবে।












