মহাকাশে গ্রহের জন্ম, বিবর্তন ও টিকে থাকার প্রচলিত ধারণাকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে চীনা বিজ্ঞানীদের একটি আবিষ্কার। গবেষকেরা এমন তিনটি বহির্গ্রহের সন্ধান পেয়েছেন, যেগুলো তাদের বয়সী নক্ষত্রের এমন কক্ষপথে অবস্থান করছে, যেখানে প্রচলিত তাত্ত্বিক মডেল অনুযায়ী গ্রহগুলোর নক্ষত্রের ভেতরে বিলীন হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বিস্ময়করভাবে গ্রহ তিনটি এখনো টিকে আছে। এই আবিষ্কার নক্ষত্র ও গ্রহের বিবর্তন সম্পর্কে নতুন প্রশ্ন তুলেছে। একই সঙ্গে কয়েকশ কোটি বছর পর সূর্যের পরিণতি এবং পৃথিবীর ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন করে আলোচনার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
চীনের ইউনান বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান ও জ্যোতির্বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ছিয়ান শেংবাংয়ের নেতৃত্বে গবেষক দলটি এ আবিষ্কার করেছে। বুধবার গবেষক দলটি জানায়, তিনটি বহির্গ্রহের সন্ধান প্রচলিত নক্ষত্র ও গ্রহের বিবর্তনসংক্রান্ত মডেলের সঙ্গে মেলে না। একাধিক গ্রহের ক্ষেত্রে একই ধরনের ঘটনা দেখা যাওয়ায় বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, এটি নিছক কাকতালীয় ঘটনা নাও হতে পারে। এর পেছনে এমন কোনো ভৌত প্রক্রিয়া কাজ করতে পারে, যা এখনো পুরোপুরি বোঝা যায়নি।
বয়স বাড়লে নক্ষত্রের পরিণতি কী হয়
সূর্যের মতো অধিকাংশ নক্ষত্রের কেন্দ্রে হাইড্রোজেন পরমাণু যুক্ত হয়ে হিলিয়াম তৈরি হয়। এই প্রক্রিয়ায় বিপুল পরিমাণ শক্তি উৎপন্ন হয়, যা নক্ষত্রকে আলো ও তাপ দেয়। কিন্তু একসময় নক্ষত্রের কেন্দ্রে হাইড্রোজেনের জ্বালানি ফুরিয়ে আসে। তখন নক্ষত্রের গঠনে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে এবং এটি প্রসারিত হয়ে লোহিত দানব নক্ষত্রে পরিণত হয়।
এই পর্যায়ে নক্ষত্রের আয়তন মূল অবস্থার তুলনায় কয়েক লাখ, এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে কয়েক মিলিয়ন গুণ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। ফলে নক্ষত্রের কাছাকাছি থাকা গ্রহগুলোর অস্তিত্ব মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়ে। প্রসারিত নক্ষত্রের বাইরের বায়বীয় স্তর সরাসরি গ্রহকে গ্রাস করতে পারে। আবার নক্ষত্র ও গ্রহের মধ্যকার জোয়ার-ভাটাজনিত মহাকর্ষীয় বলের প্রভাবে গ্রহের কক্ষপথ ক্রমে ছোট হয়ে সেটি নক্ষত্রের দিকে এগিয়ে যেতে পারে। শেষ পর্যন্ত গ্রহটি নক্ষত্রের ভেতরে বিলীন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
বিজ্ঞানীদের প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, নক্ষত্রের এই বিবর্তনপর্বে কাছাকাছি থাকা গ্রহগুলোর টিকে থাকা কঠিন। কিন্তু নতুন আবিষ্কৃত তিনটি বহির্গ্রহের ক্ষেত্রে দেখা গেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র।
যে তিন গ্রহ বদলে দিচ্ছে প্রচলিত ধারণা
গবেষকেরা তিনটি গ্রহের নক্ষত্রকে শনাক্ত করেছেন 24 Boo, HD 12648 এবং TYC 4282-605-1 নামে। উপগ্রহ থেকে পাওয়া তথ্য এবং নক্ষত্রের কম্পন বিশ্লেষণের মাধ্যমে তাঁরা নক্ষত্রগুলোর উজ্জ্বলতার সূক্ষ্ম পরিবর্তন পরীক্ষা করেন। এই বিশ্লেষণ থেকে নিশ্চিত হওয়া যায়, নক্ষত্র তিনটি লোহিত দানব পর্যায় অতিক্রম করে বর্তমানে কেন্দ্রে হিলিয়াম দহনের পর্যায়ে পৌঁছেছে।
নক্ষত্রের কেন্দ্রে হিলিয়াম দহনের এই পর্যায়কে জ্যোতির্বিজ্ঞানে লোহিত গুচ্ছ নক্ষত্রের পর্যায়ও বলা হয়। এর আগে নক্ষত্রগুলো প্রসারিত হয়ে এমন অবস্থায় পৌঁছেছিল, যখন তাদের বর্তমান কক্ষপথে থাকা গ্রহগুলো গ্রাস হয়ে যাওয়ার কথা। অথচ গ্রহ তিনটি এখনো অস্তিত্ব বজায় রেখেছে।
এরপর গবেষকেরা গাণিতিক মডেলের সাহায্যে নক্ষত্রগুলোর অতীত বিবর্তন পুনর্গঠন করেন। নক্ষত্রগুলো অতীতে কতটা প্রসারিত হয়েছিল, তা হিসাব করে গ্রহগুলোর বর্তমান কক্ষপথের সঙ্গে তুলনা করা হয়। বিশ্লেষণে দেখা যায়, তিনটি গ্রহই এমন অঞ্চলে ঘুরছে, যেখানে প্রচলিত তাত্ত্বিক হিসাব অনুযায়ী তাদের নক্ষত্রের ভেতরে বিলীন হয়ে যাওয়ার কথা ছিল।
এই অপ্রত্যাশিত ঘটনাকেই গবেষকেরা গ্রহের টিকে থাকার একটি বৈপরীত্য হিসেবে দেখছেন। তাঁদের মতে, একই ধরনের তিনটি উদাহরণ পাওয়ায় বিষয়টি আরও গভীরভাবে অনুসন্ধান করা প্রয়োজন।
অধ্যাপক ছিয়ান শেংবাংয়ের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, আগে যদি এ ধরনের একটি মাত্র গ্রহের সন্ধান পাওয়া যেত, তাহলে সেটিকে ব্যতিক্রমী ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা সম্ভব হতো। কিন্তু একই সঙ্গে তিনটি গ্রহের টিকে থাকার ঘটনা ইঙ্গিত দেয়, এর পেছনে সবার ক্ষেত্রে কার্যকর কোনো সাধারণ ভৌত প্রক্রিয়া থাকতে পারে।
৩০ দিনে একবার নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণ করে 24 Boo b
আবিষ্কৃত তিনটি গ্রহের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য 24 Boo b। এটি তার নক্ষত্রকে প্রায় ৩০ দিনে একবার প্রদক্ষিণ করে। গ্রহটির কক্ষপথের দূরত্ব পৃথিবী থেকে সূর্যের গড় দূরত্বের মাত্র ১৮ শতাংশ।
গবেষক দলের দাবি, লোহিত গুচ্ছ নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণ করা পরিচিত বহির্গ্রহগুলোর মধ্যে 24 Boo b তার নক্ষত্রের সবচেয়ে কাছাকাছি অবস্থানকারী গ্রহ। এত কাছাকাছি থেকেও গ্রহটির টিকে থাকা নক্ষত্রের বিবর্তনের সময় গ্রহের পরিণতি সম্পর্কে প্রচলিত ধারণাকে আরও জটিল করে তুলেছে।
তবে গ্রহটি কীভাবে নক্ষত্রের প্রসারণের সময় ধ্বংস হওয়া এড়িয়েছে, তা এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। গবেষকদের সামনে এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, গ্রহগুলোর কক্ষপথ ও নক্ষত্রের বিবর্তনের মধ্যে এমন কী ধরনের পারস্পরিক ক্রিয়া ঘটেছে, যার ফলে তারা প্রত্যাশিত বিপর্যয় এড়াতে পেরেছে।
সূর্যের ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন প্রশ্ন
এই আবিষ্কারের গুরুত্ব শুধু দূরবর্তী নক্ষত্র ও গ্রহের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আমাদের নিজস্ব সৌরজগতের ভবিষ্যৎও।
জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের ধারণা, কয়েকশ কোটি বছর পর সূর্যের কেন্দ্রে হাইড্রোজেনের জ্বালানি ফুরিয়ে এলে এটি প্রসারিত হয়ে লোহিত দানব নক্ষত্রে পরিণত হবে। তখন সূর্যের আকার অনেক বেড়ে যাবে। প্রচলিত তত্ত্ব অনুযায়ী, সেই সময় পৃথিবী সূর্যের প্রসারিত বাইরের স্তরের মধ্যে গ্রাস হয়ে যাওয়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে।
নতুন আবিষ্কারটি দেখাচ্ছে, নক্ষত্রের বিবর্তনের সময় গ্রহের পরিণতি সব ক্ষেত্রে প্রচলিত মডেল দিয়ে সহজে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নাও হতে পারে। কিছু গ্রহ এমন পরিস্থিতিতেও টিকে থাকতে পারে, যেখানে তাদের ধ্বংস হয়ে যাওয়ার কথা।
তবে এ আবিষ্কারের ভিত্তিতে পৃথিবী ভবিষ্যতে সূর্যের গ্রাস থেকে বেঁচে যাবে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। গবেষক ছিয়ান শেংবাংও সতর্ক করে বলেছেন, নতুন ফলাফল সূর্যের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে প্রচলিত পূর্বাভাস সরাসরি বদলে দিচ্ছে না। বরং এটি বয়সী নক্ষত্র ও তাদের গ্রহের পারস্পরিক সম্পর্ক কতটা জটিল, তা আরও স্পষ্ট করছে।
পৃথিবীর ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য ধারণা পেতে হলে নক্ষত্রের প্রসারণ, মহাকর্ষীয় প্রভাব, গ্রহের কক্ষপথের পরিবর্তন এবং অন্যান্য সম্ভাব্য ভৌত প্রক্রিয়া নিয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
গবেষণায় নতুন দিগন্ত
গবেষণাটির ফলাফল যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় বিজ্ঞান একাডেমির সাময়িকী প্রসিডিংস অব দ্য ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্সেস-এ প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণাপত্রটির শিরোনাম The Survival Paradox of Close-In Planets Orbiting Red Clump Giants।
আবিষ্কারটি নক্ষত্রের শেষ পর্যায়ে গ্রহের টিকে থাকার প্রক্রিয়া বোঝার ক্ষেত্রে নতুন অনুসন্ধানের পথ খুলে দিয়েছে। বিশেষ করে, নক্ষত্রের প্রসারণের সময় গ্রহ কীভাবে নিজের কক্ষপথ বজায় রাখে, কোন পরিস্থিতিতে ধ্বংস এড়াতে পারে এবং প্রচলিত মডেলে কোন বিষয়গুলো অনুপস্থিত থাকতে পারে—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বিজ্ঞানীদের আরও কাজ করতে হবে।
তিনটি গ্রহের এই অপ্রত্যাশিত টিকে থাকা মহাবিশ্ব সম্পর্কে মানুষের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতাও মনে করিয়ে দেয়। একই সঙ্গে এটি ভবিষ্যতে গ্রহের বিবর্তন ও সৌরজগতের পরিণতি নিয়ে আরও নির্ভুল মডেল তৈরির জন্য গুরুত্বপূর্ণ সূত্র দিতে পারে।












